আলোফুল

0
0

একদিন সকালবেলা আলোফুল ঘুম থেকে উঠে জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখে আকাশটা হঠাৎ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে আছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা, যেন পাখিরাও হারিয়ে গেছে কোথাও। কোনো কোলাহল নেই। যেন নিশ্চুপ এক গ্রাম!
এই অবস্থা দেখে আলোফুল তার পাশে শুয়ে থাকা দাদিকে জিজ্ঞেস করল, দাদি, আমাদের গ্রাম আজ এত চুপচাপ কেন? মনে হচ্ছে গ্রামটা বুঝি মরে গেছে! কোথাও কোনো স্পন্দন নেই!
আলোফুলের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে দাদি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তারপর তিনি বললেন, একটু একটু করে আলো হারিয়ে যেতে যেতে এখন সবটুকু আলোই হারিয়ে গেছে বইন। সেই যে ষোল-সতের বছর আগে নীল পরিরা অভিমানে, নাকি অন্য কেউ তাদের নিয়ে চলে গেল… আর তখন থেকেই সবকিছু বদলে গেছে। স্বপ্নও হারিয়ে গেছে আমাদের এই গ্রামের মতো দেশের সকল গ্রাম-শহর থেকেও।

আলোফুল অবাক হয়। বলে, নীল পরিরা?
—হ্যাঁ গো বইন, তারা আসত রাতের বেলা স্বপ্ন দিতে, দিনে আলো জাগাতে। কিন্তু এক দুষ্ট রানি অন্যায়ভাবে তাদের বন্দি করে ফেলল। তাই এখন আর কেউ হাসে না, স্বপ্ন দেখে না। মুখ থাকতেও বোবা। কান থাকতেও কালা। কেবলই শ্বাস নিয়ে বেঁচে আছে কোনোরকমে।

দাদির কাছ থেকে এসব কথা শুনে রাতের বেলা আলোফুল ঘুমাতে পারে না। সে মনে মনে ভাবল, কিছু একটা করতে হবে এবং তাকেই। পরদিন খুব সকালে কেউ যখন ঘুম থেকে ওঠেনি, তখন সে কাঁধে তার ছোট্ট লাল ব্যাগ নেয়। ব্যাগে আছে কয়েকটা আঁকিবুকি করা কাগজপত্র, এক টুকরো রুটি, একটু জেলি, আর দাদির দেয়া এক ছোট্ট জ্বলজ্বলে পাথর।

সে রওনা দিলো একা, পাহাড়ের ওপারে যাবে সে। যেই পাহাড়ের কাছে যেতেও যে কোনো মানুষ ভয় পায়।
রাতের বেলায় সে পাহাড়ের ওপারে গিয়ে খোলা মাঠে বসে রইল, কিছুটা ভয় ভয় করছে তার। হঠাৎ চমৎকার দেখতে একটি রূপালি পাখি তার সামনে এসে নামে। গুটিগুটি পায়ে তার কাছে আরো এগিয়ে আসে পাখিটা।
—তুমি কাঁদছ? ওর ছলছল চোখ দেখে পাখিটি জিজ্ঞেস করল।
আলোফুল কোনো ভূমিকা না করে বলল, আমি নীল পরিদের খুঁজছি। কোথায় পাই তাদের বলো তো?

পাখিটি বুঝতে পারল বিষয়টা। তার ডানা ঝাপটে সে তখন বলল, তুমি যে নীল পরিদের খুঁজছো, তারা বন্দি হয়ে আছে দুষ্ট রানির গুহায়। দিনরাত তারা দুষ্ট রানির লোকেদের অত্যাচার, নির্যাতন সহ্য করছে। তুমি যদি সত্যি সাহসী হও, তবে এসো— আমি তোমাকে পথ দেখাব। তুমি তাদের মুক্ত করো। শেষ হয়ে যাওয়া আলো পুনরায় ফিরিয়ে আনো আলোফুল।
রূপালি পাখির কথায় যেন কিছুটা ভরসা পায় আলোফুল। আশায় বুক বেঁধে তারা সেই গুহার কাছে পৌঁছায় কিছুক্ষণের মধ্যেই। সেখানকার চারপাশে তখন কালো ধোঁয়া, গুমোট আর নিস্তব্ধতা। একটা ভয় ধরানো পরিবেশ বিরাজ করছে। তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে হঠাৎ চারদিক থেকে রানির সেনারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে বেরিয়ে আসে। তাদের ঘিরে ধরে। দেখেই বুঝা যায়, ওরা আলোফুলদের কিছুতেই এখান থেকে ফিরে যেতে দেবে না। কিন্তু আলোফুল মোটেও ভয় পেল না।
সে তার কাছে থাকা জ্বলজ্বলে পাথরটা উঁচিয়ে ধরল ওদের দিকে। সঙ্গে সঙ্গে আর সেই পাথর থেকে ছড়িয়ে পড়ল এক ধরনের হালকা আভা, যা দুষ্ট রানির সেনাদের বিস্ময়করভাবে থামিয়ে দিলো। পাথরের তীব্র আলোয় তাদের চোখ ধাঁধিয়ে গেল। সামনে আর এগোতে পারল না তারা। যে যেখানে ছিল, সে সেখানেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
এ সময় রূপালি পাখিটি ফিসফিস করে বলল, এটা তো আলোর পাথর আলোফুল…!
আলোফুল মাথা নাড়াল। কিছু বলল না।
এবার আলোফুল আর রূপালি পাখি গুহার ভেতরে চোখ রাখল। সেখানে তারা দেখতে পেল নীল পরিরা একে অপরের পাশে কুঁকড়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়ে রয়েছে, তারা নিঃশব্দ, ক্লান্ত, নিস্তেজ, নিষ্প্রাণ। আলোফুল ধীরে ধীরে তাদের কাছে এগিয়ে গেল। দাদির দেয়া পাথরটা আবার সে পরিদের ওপর উঁচিয়ে ধরল। সেটা থেকে তখন অন্য এক বর্ণের আলো বের হয়ে এলো।
ওটার ভেতর থেকে একটা আঁকা ছবি ভেসে ওঠে— তাতে স্পষ্ট একটা রঙিন পৃথিবীর ছবি। নতুন জীবনের ছবি জ্বলজ্বল করছে।

সেই ছবিটা মাটিতে ভেসে উঠতেই তা থেকে বের হয়ে এলো একটা মিষ্টি আলোর আভা।
আর এতেই নীল পরিরা জেগে উঠল। তারা আনন্দে হাসল, খুশিতে ডানা ঝাপটাল। তাদের চোখে জ্বলে উঠল নীল আলো স্ফুরণ।
দুষ্ট রানি খবর পেয়ে এ সময় হঠাৎ কোথা থেকে যেন ছুটে এলো। আর তারস্বরে গর্জে উঠল— তোমরা আবার আলো আনতে চাও? পারবে না! আমি কিছুতেই তা হতে দেবো না। আমি তোমাদের সবাইকে শেষ করে দেবো আমার সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে।
দুষ্ট রানির কথা শুনে এবার নীল পরিরা হাত মেলাল আলোফুলের সঙ্গে। চারদিক জ্বলে উঠল তীব্র নীল আলোয়। ধাঁধিয়ে ওঠা নীল আলোয় দুষ্ট রানির স্থির হয়ে থাকা সেনারা গলে গেল মোমের মতো, রানির রাজমুকুটও মাথা থেকে খসে পড়ল। টিকতে না পেরে সেও পালিয়ে বাঁচল সেখান থেকে।
গ্রামে গ্রামে আবার আলো ফিরে এলো। নতুন সূর্য উঠল, পাখিরা গলা ছেড়ে গান গাইল, শিশুরা মেতে উঠল খেলার মাঠে।
দাদি বললেন, তুই শুধু আমাদের নয়, একটা রাজ্যকে রক্ষা করলি বইন।
পরিরা আলোফুলকে সম্মান দিয়ে তাদের ‘আলোকতারা’ বন্ধু বলে ডাকল।

সেই রাজ্যে এখন প্রতি বছর আলো দিবস পালন করা হয়, সেই দিনটিতে— যেদিন একটা ছোট্ট মেয়ে তার একাকীত্ব আর সাহসে এক নতুন সকাল এনে দিয়েছিল।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫