আজ কোচিং তাড়াতাড়িই ছুটি দিয়ে দিলো। দক্ষিণ আকাশে কালো মেঘের উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে। একটু পরেই ঝুম বৃষ্টি নামবে। এজন্যই তাড়াতাড়ি ছুটি দিয়ে দেয়া। সাইকেল চালাতে চালাতে ঠান্ডা বাতাস উপভোগ করতে ভালোই লাগে। অন্যান্য দিনে তো গরমে বাড়ি থেকে বের হওয়ায় যায় না। তাই আজকের বাতাসটা ভালোই লাগছিল। সাইকেল ধীরে ধীরে চালাচ্ছি আর বাতাসের মজা নিচ্ছি। কিন্তু হঠাৎই বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। তাড়াতাড়ি একটি দোকানের ছাউনিতে দাঁড়িয়ে গেলাম। উফফ…! বৃষ্টি যে কখন থামবে? কখন যে যাবো? রাস্তা থেকে দোকানের ছাউনিতে আসতে সর্বোচ্চ ৩০ সেকেন্ড লাগল। তবুও ভিজে গেছি অনেক। ভাবো তাহলে, কত জোরে বৃষ্টি পড়ছে। আমার সাথে আরও কয়েকজন ছাউনিতে আশ্রয় নিলো। এক বৃদ্ধ লোকও আসলো সেখানে সাইকেল নিয়ে। লাল দাড়ি, সাদা পাঞ্জাবি-পায়জামা পরা ৬০-৭০ বছর বয়সী বয়স্ক ব্যক্তিটাও সাইকেল নিয়ে ছাউনিতে আশ্রয় নিলো।
আরও আসলো একজন মধ্যবয়সী লোক ও ২ জন কলেজ পড়ুয়া ছেলে। বড়োদের মাঝে আমি ক্লাস এইটে পড়ুয়া ছোট্ট একটি ছেলে।
সবাই ছাউনিতে দাঁড়িয়ে আছে। সেই মধ্যবয়সী আংকেল ফোন বের করে চাপাচাপি শুরু করলেন। কলেজ পড়ুয়া ছেলেগুলো ফোন বের করে বৃষ্টির ছবি আর ভিডিও করতে ব্যস্ত। এই ছবি আর ভিডিওগুলো আজকেই তাদের স্যোশাল মিডিয়ায় পোস্ট করা হবে। তাদের কোনো খেয়ালই নেই বৃষ্টির কথা। সবাই ফোনে মগ্ন। বৃদ্ধ দাদুটা চুপচাপ বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছে। আর আমি? আমি কে কী করছে তা দেখে বেড়াচ্ছি। হঠাৎ করে বজ্রপাত শুরু হলো। ছেলেদুটো সেটারও ভিডিও করলো। আংকেল একটুখানি আকাশের দিকে তাকালেও পরে আবার ফোন নাড়াঘাটা শুরু করলেন। আর বৃদ্ধ দাদু জোরে জোরে পড়তে লাগলেন আল্লাহু আকবার, সুবহানাল্লাহ, লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ, লা-হাওলা ওয়ালা কু’ওয়াতা ইল্লা-বিল্লাহ। আরও কতো কী? দেখে বিষ্মিত হলাম। সবাই নিজ নিজ ফোনের জগতে ব্যস্ত। কিন্তু বৃষ্টিটা কেউ উপভোগ করছে না। বজ্রপাত হলেও তা ঠিক ভয়াবহ না। বৃষ্টি পেয়ে তারা মনে হয় খুশি না। এতো গরমের পর যখন একদিন বৃষ্টি হচ্ছে সেটার জন্য কেউ আল্লাহর কাছে শুকরিয়া জানাচ্ছে না। সবাই বিরক্ত, কারণ বৃষ্টির জন্য তারা আটকে আছে। সবাই চিন্তা করছে কখন বৃষ্টি থামবে? আল্লাহর রহমতকে পরোয়া করছে না।
অবশ্য আমি নিজেও যে খুব ভালো, তা না। বৃষ্টির দোয়া পড়িনি। দোয়াটা সেই ছোট্টবেলায় শিখেছি। দাদুর দোয়া পড়া দেখে আমিও পড়ে ফেললাম, ‘আল্লাহুম্মা সাইয়েবান নাফিয়া।’ দাদু এখন পর্যন্ত কারো সাথে কথা না বললেও আমাকে চুপচাপ দেখে বললেন,
– বাসা কোথায়?
– আমি বাসায় থাকি না, মেসে থাকি।
– কোন মেস?
– সোনার তরী ছাত্রাবাস।
– কাজীপাড়ায়?
– জ্বি।
– আমার বাসাও কাজীপাড়া। প্রাইমারি স্কুলের পাশে।
– ওওও।
– আসল বাড়ি কোথায়?
– রাণীশংকৈল উপজেলার নেকমরদ ইউনিয়নে।
– ওওও। নেকমরদ হাটে তো আমি ব্যবসা করতে যেতাম।
– আচ্ছা।
অনেকক্ষণ ধরে বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি থামছে না দেখে তিনি তার মোবাইল-মানিব্যাগ একটা পলিথিনে ঢুকিয়ে বললেন,
– থাকো
– চলে যাবেন?
– হ্যাঁ। একটু পরেই মাগরিবের আজান হবে। নামাজ পড়তে হবে। এখানে থাকলে তো নামাজ দেরি হয়ে যাবে।
– ওওও
– তুমি ভিজিও না কিন্তু। এখন তোমার পড়াশুনার সময়। বৃষ্টিতে ভিজে যদি অসুস্থ হয়ে যাও…
– আচ্ছা, ঠিক আছে।
এরপর তিনি সাইকেলে বসে পড়লেন যাওয়ার জন্য।
আমি উনাকে সালাম দিলাম। তিনি একটু মুচকি হেসে সালামের জবাব দিয়ে চলে গেলেন।
সত্যিই তিনি একজন ভালো মানুষ। তার কাছে ভালো ব্যবহার শেখা যায়। বৃষ্টিতে আল্লাহর শুকরিয়া করে বৃষ্টিটা উপভোগ করতে পেরেই তিনি খুশি। অন্যদের মতো ৬ ইঞ্চির মোবাইল ফোনে তিনি ডুবে ছিলেন না। তার কাছে এটাই শিখলাম। এটাই হলো বৃষ্টিতে এক অপরিচিত দাদুর দেওয়া অমূল্য শিক্ষা। বৃষ্টিদিনের এ শিক্ষা মনে থাকবে অনেকদিন।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫



