খাটো জিরাফের গল্প

0
0

এক বনে একটা খাটো জিরাফ বাস করত। বয়সের তুলনায় সে খুবই খর্বকায় ছিল। অন্যান্য জিরাফের পাশে দাঁড়ালে তাকে বানরের উচ্চতার মতো মনে হতো। এই নিয়ে খাটো জিরাফের মনে অনেক দুঃখ। কিন্তু সে তা কখনও বাইরে প্রকাশ করত না। সবসময় হাসি-খুশি মুখেই ঘুরে বেড়াত। সে খাটো হওয়ায় বড় বড় গাছের পাতা খেতে পারত না। এমন কী প্রিয় খাবার বাবলা গাছের পাতা কখনও খেতে পেত না। তাই ছোট ছোট ঘাস আর লতাগুল্ম খেয়ে জীবনযাপন করত।
একদিন এক শেয়ালের সাথে দেখা হলো জিরাফের। শেয়ালটি জিরাফকে দেখে ভাবল, এ কি জিরাফ নাকি অন্য প্রাণী! জিরাফের বাচ্চাও তো এর চেয়ে অনেক লম্বা হয়।
শেয়ালটি জিরাফের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলো, হ্যালো, তুমি কে ভাই?
জিরাফ মনে মনে ভাবল, এই পাজি শেয়াল আমাকে চিনেও মশকরা করছে। আমি খাটো বলে তার কাছে সম্মান বিসর্জন দেওয়া যাবে না।
মুচকি হেসে জিরাফ উল্টো নিজেই জিজ্ঞেস করলো, ভাই তুমি কে? আমি তো এমন প্রাণী কখনও দেখিনি!
এবার শেয়াল বড় বড় চোখ পাকিয়ে ভাবল, ব্যাটা বলে কী! আমাকে চিনে না! বনের সবাই আমাকে সবচেয়ে জ্ঞানী প্রাণী হিসেবে চেনে। আরেকটু কাছে গিয়ে ধমক দিয়ে বললো, এই নাচ্ছোড় পুঁচকে জিরাফ তুই আমাকে চিনিস না?
তুমিও তো আমাকে চিনে না চেনার ভান ধরে জানতে চাইলে আমি কে? জিরাফ গলা বাঁকিয়ে বললো।
দুঃখিত জিরাফ ভাই। তোমার সাথে একটু মজা করছিলাম। তোমার উচ্চতা আর আমার উচ্চতা প্রায় সমান। আমরা কি বন্ধু হতে পারি?
শেয়ালের মিষ্টি কথায় জিরাফ আগপিছ না ভেবেই রাজি হয়ে গেল। পাশাপাশি হাঁটছে আর গল্প করছে। ধীরে ধীরে ওদের বন্ধুত্ব গভীর হতে থাকে। শেয়াল, জিরাফকে বিভিন্ন বড় বড় গাছের পাতা ছিঁড়ে দেয়। জিরাফের সবচেয়ে প্রিয় খাবার বাবলা গাছের পাতা। সেটাও শেয়াল গাছে বেয়ে ওঠে বাবলা পাতা, তার ছোট ছোট ডাল ভেঙে ফেলে। আর জিরাফ ডালসহ পাতাগুলো চিবিয়ে চিবিয়ে মজা করে খায়। শেয়াল ও জিরাফের গলায় গলায় ভাব অবিরত বাড়তে থাকে। দু’জন দু’জনের আরও বিশ্বস্ত ও ভালো বন্ধু হয়ে ওঠে।

একদিন শেয়াল বললো, বন্ধু জিরাফ। আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এসেছে।
বলো, বলো। কী বুদ্ধি বন্ধু? জিরাফ খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল।
শেয়াল বললো, বন্ধু, আমি ভাবছিলাম তোমাকে কামারের কাছে নিয়ে যাবো। ওরা ছোট জিনিসকে বড় করতে পারে। যেমন- ওরা লোহার মতো শক্ত জিনিসও ছোট থেকে বড় করতে পারে অনায়াসে। তুমি যদি লম্বা বা বড় হতে চাও তাহলে কামারের নিয়ে বাড়ি যেতে পারি। লম্বা হলে তখন তুমি নিজের ইচ্ছেমতো যেকোনো গাছের পাতা ছিঁড়ে খেতে পারবে।
জিরাফ বন্ধুর কথা ফেলতে পারলো না। একটু রয়েসয়ে রাজি হয়ে গেল। পরদিন সকাল সকাল কামারের বাড়িতে জিরাফকে নিয়ে শেয়াল হাজির হলো। কামারকে সবকথা খুলে বললো শেয়াল।
কামার বললো, গলা তো পুড়িয়ে পিটিয়ে লম্বা করা যাবে না। তবে পায়ে লোহার লম্বা পেরেক বা রড লাগিয়ে দিতে পারি। তাতে হয়তো বেশ লম্বা হতে পারবে।
কামারের কথা শুনে শেয়ালের কথামতো পায়ে পেরেক লাগাতে রাজি হয়ে গেল জিরাফ।

জিরাফের পায়ে লোহার লম্বা পেরেক লাগানোর আজ তিনদিন। সে তিন দিন যাবৎ শয্যাশায়ী। শেয়াল ঠিকমতোই দেখভাল করছে। পেরেক লাগানোর পর হতে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। লম্বা পা পেয়েছে ঠিকই কিন্তু চলাফেরা করতে পারছে না। যত সময় যাচ্ছে পা ফুলে ততই বেলুন হয়ে যাচ্ছে। অসহ্য ব্যথায় কাতরাচ্ছে জিরাফ। গায়ে জ্বর এসে পড়েছে। শেয়াল গাছগাছালির ছাল, লতাপাতা বেটে লাগাচ্ছে। অন্যান্য ওষুধপত্রও দিচ্ছে। তবুও পায়ের বেদনা ও ফোলা কমছে না কোনোমতেই।
কয়েকদিন পর, জিরাফের চার পায়ের ব্যান্ডেজ খোলা হলো। তাতে দেখা গেল পায়ে পচন ধরেছে। দুর্গন্ধও ছড়িয়েছে। শেয়াল আবার ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল। ডাক্তার দেখে বললো, পায়ের অবস্থা খুবই খারাপ। পা কেটে ফেলতে হবে। না হলে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে পচন ধরবে। তখন বাঁচানোর উপায় থাকবে না। তাই সিদ্ধান্ত নিয়ে চার পা কেটে ফেলা হলো। এখন তার একমাত্র নিত্য সঙ্গী হুইলচেয়ার। হুইলচেয়ারেরই জিরাফের বন্দি জীবন কাটতে লাগলো।

প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫