ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শহীদ শিশু-কিশোরদের কথা

0
5

২০২৪ সালের রক্তক্ষয়ী ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্তি হতে যাচ্ছে এ মাসে। ৩৬ জুলাই তথা ৫ আগস্ট স্বৈরশাসনের পতনের পর দেশের মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কচি কিশোররাও এই আন্দোলনে শরিক হয়ে অকাতরে প্রাণ দিয়েছে। তাদের সেই অবদানের কথা স্মরণ করতে হবে জাতিকে। তাদের ঋণ কখনো শোধ হবার নয়।
সরকারি চাকরিতে প্রবেশের জন্য ৫৬ শতাংশ কোটা হিসেবে আর ৪৪ শতাংশ মেধাবীদের জন্য বরাদ্দ ছিলো বাংলাদেশে। ২০১৮ সালে ছাত্ররা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করেছিলো। আন্দোলনের পর সরকার ছাত্রদের দাবি সংস্কার না করে কোটা বাতিল করে দিয়ে পরিপত্র জারি করে। ২০২৪ সালের ৫ জুন সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এ পরিপত্রকে অবৈধ ঘোষণার পর কোটা সংস্কার আন্দোলন নতুন করে শুরু হয়। সরকার দমন নিপীড়ন শুরু করলে এটি অসহযোগ আন্দোলনে রূপ নেয়। এই গণঅভ্যুত্থানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে ভারতে পলায়ন করতে বাধ্য হন।
জুলাই মাসে আন্দোলন তীব্র রূপ নেয়, যেখানে শিক্ষার্থীরা ‘বাংলা ব্লকেড’ সহ অবরোধ কর্মসূচি চালায়। রংপুরে আবু সাঈদ নামে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী পুলিশের গুলিতে নিহত হন। এই ঘটনাটি আন্দোলনকে আরও জোরালো করে। বিভিন্ন জায়গায় আইন শৃঙ্খলা বাহিনী, ক্ষমতাসীন বিভিন্ন সংগঠনের লোকদের হামলায় অনেক হতাহত হয়।
ছাত্ররা জুলাই আন্দোলনকে স্মরণীয় রাখতে ৫ আগস্টকে ৩৬ জুলাই অভিহিত করে। সে দিন দুপুরে আসে বিজয়ের লগ্ন। এভাবে বিজয় গাঁথা রচিত হয় রক্তের পথ বেয়ে। সারা দেশে শহীদের সংখ্যা দাঁড়ায় দেড় হাজারের বেশি। এতো মৃত্যু নিকট অতীতে আর দেখা যায়নি। নিহত শিশুকিশোরের সংখ্যা প্রায় ১০০ জন। নিহত কিশোরদের মধ্যে বেশির ভাগই বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলো। পুরান ঢাকার গেন্ডারিয়া আদর্শ উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্র শাহরিয়ার খান আনাস (১৬) ৫ আগস্ট বাড়িতে চিঠি লিখে চলে যায় বিক্ষোভে। চিঠিতে সে লেখে,

“মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। নিজেকে আর আটকে রাখতে পারলাম না। মৃত্যুর ভয়ে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যু অধিক শ্রেষ্ঠ।”

৫ আগস্ট রাজধানীর চানখাঁরপুলে গুলিতে নিহত হয় আনাস।
স্থাপনা ও যানবাহনে দেওয়া আগুনে পুড়ে মারা গেছে ৯ শিশু-কিশোর। নিহত শিশুদের মধ্যে সবচেয়ে কমবয়সী শিশুটির নাম আবদুল আহাদ (৪)। সে তখনো স্কুলে যাওয়া শুরু করেনি। ২০ জুলাই রাজধানীর রায়েরবাগে ৮ তলা ভবনের বারান্দা থেকে মা-বাবার সঙ্গে বিক্ষোভ দেখার সময় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় সে। নিহত শিশু-কিশোরদের মধ্যে দুটি মেয়েও রয়েছে। তারা হলো নারায়ণগঞ্জের রিয়া গোপ (৬) ও উত্তরার নাঈমা সুলতানা (১৫)। রিয়া বাসার ছাদে ও নাঈমা বারান্দায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। নাইমা ডাক্তার হতে চেয়েছিলো কিন্তু তার সাধ পূর্ণ হলো না।
আন্দোলনে শিশুকিশোর মৃত্যুর প্রথম ঘটনা ঘটে ১৮ জুলাই। ৪ আগস্ট পর্যন্ত নিহতদের মধ্যে অন্তত ৫৬ জন শিশুকিশোর। ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। সেদিন থেকে ১১ আগস্টের মধ্যে কমপক্ষে আরও ৩৩ শিশুকিশোর নিহত হয়। ৫৭ শিশুকিশোর ঢাকায় (সাভার, টঙ্গীসহ) নিহত হয়েছে। ঢাকার বাইরে মারা গেছে ৩২ জন।

(নিহত শিশু কিশোরদের সংখ্যা বিভিন্ন সূত্রে বিভিন্ন। এখানে ৬৬ জনের নাম দেয়া হলো)

যে সব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে তার বিচারেরও আয়োজন চলছে। প্রতিটি হত্যা বিশেষ করে শিশু-কিশোর হত্যার বিচার দেখতে চায় সবাই। সেটা শেষ হলে শহীদ পরিবারগুলো খুশি হবে, খুশি হবে দেশের মানুষ। আমরা শহীদদের স্মরণ করছি। তাদের কথা জাতি চিরকাল স্মরণ রাখবে।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬