বিপদের বন্ধু

পর্ব-৯১

0
2

নেতা হতে হলে সেবক হতে হয়। তোমরা সবাই এটা জানো। তাহলে সেবাটা কখন লাগবে, কী ধরনের লাগবে, কে সেবা দিতে পারবে সেটা নিয়ে ভেবেছো কখনো? সেবা তখনই প্রয়োজন হয়, যখন মানুষ বিপদে পড়ে। এই বিপদ নানা পর্যায়ের হতে পারে। শারীরিক অসুস্থতা, সড়ক দুর্ঘটনা, বাড়িতে দুর্ঘটনা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, সামাজিক সমস্যা- হামলা, নির্যাতন, হয়রানি ইত্যাদি নানান রকম সমস্যা। যারা সমস্যার সমাধান জানেন তাদের কাছে হয়তো সমস্যাটা কোনো কিছুই না, কিন্তু যারা সমস্যায় পড়েন, সমাধান না জানেন, তাদের কাছে সেটা অনেক বড় বিপদ। যেমন ধরো- তোমরা বাড়ির বাইরে বেড়াতে গেছো। ফিরে এসে ঘরে ঢুকবে, তালা খুলতে যাবে, তখনই দেখলে চাবিটা ঘরের ভেতরে রেখেই তালা লাগিয়ে গেছো কিংবা রাস্তায় কোথাও চাবিটা হারিয়ে গেছে। এখন উপায়! বড় বিপদ তাই না? তখনই পাশের ফ্ল্যাটের প্রতিবেশী কিংবা দারোয়ান জানালো সে একজন লকমিস্ত্রি/ লকস্মিথ (যে তালা-চাবি মেরামত করে)-কে চিনে। তাকে ফোন দিলে কিছুক্ষণ পর সে এসে কয়েক মিনিটের মধ্যে তালাটা খুলে দিলো। তার কাছে কাজটা সহজ ছিলো। কিন্তু তার সাহায্য ছাড়া তোমরা ভেতরে ঢুকতে পারছিলে না। হয়তো দরজা ভেঙে ঢুকতে হতো।
অথবা ধরো, তোমার বাসায় সাপ দেখা গেছে। তোমরা তো ভয়ে শেষ! পরে এক বন্ধু জানালো সে স্নেক রেসকিউ গ্রুপের কাউকে চিনে। তাদেরকে জানানোর পর তারা এসে সাপটাকে সুকৌশলে উদ্ধার করে নিয়ে গেলো। কারোর ক্ষতি হলো না।
এই যে বিপদগুলো, এখান থেকে যারা উদ্ধার করছে তারা হলেন বিপদের বন্ধু। তাদের সাথে যোগাযোগ থাকা প্রয়োজন। তুমি যদি তাদের সাথে যোগাযোগ রাখো, তাহলে বিপদের মূহুর্তে তোমার বন্ধু-বান্ধব পাড়া প্রতিবেশী, এলাকার মানুষেরা আগে তোমার কাছে আসবে সাহায্যের জন্য। তখন তুমি তাদের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিয়ে সে বিপদ থেকে উদ্ধার করতে পারবে। এবার এসো কিছু জরুরি সেবা বিষয়ে আলোচনা করা যাক-
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯:
এই নাম্বারটি তো সবাই জানো। তিন ধরনের বিপদে পড়লে এই নাম্বারে ফোন করতে হয়।
১. ফায়ার সার্ভিস সংক্রান্ত : কোনো বাসায়, স্কুলে, মার্কেটে কিংবা রাস্তার কোনো স্থাপনায় আগুন লেগে গেছে। তোমার চোখে পড়লো। ফোন করে জানাও তোমার অবস্থান, আগুনের অবস্থা, ইত্যাদি। অপারেটর যা যা জানতে চাইবে তার উত্তর দাও। দেখবে কর্তৃপক্ষ সেবা পাঠিয়ে দিবে। অথবা বন্ধুরা কেউ পানিতে ডুবে গেছে, কোথাও বাড়ির দেয়াল ধ্বসে গেছে, রাস্তা দেবে গিয়ে গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে, ঝড়ে গাছ পড়ে বাড়িঘর ধ্বংস হয়ে গেছে বা রাস্তা বন্ধ হয়ে গেছে, ম্যানহোলে বা গর্তে পড়ে গেছে কেউ এ ধরনের কোনো ঘটনা থাকলেই ৯৯৯ নাম্বারে ফোন করে জানাতে পারো।
২. অ্যাম্বুলেন্স সেবা : তোমার বাসায় কারো হঠাৎ হার্ট এটাক হলো, কিংবা আঘাত পেয়ে অজ্ঞান হয়ে গেলো, কিংবা অন্য এমন কোনো শারিরীক সমস্যায় পড়েছে, যে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। তখন ফোন করে দাও ৯৯৯ নাম্বারে। ঘটনার বর্ণনা এবং তোমার বাড়ির ঠিকানা বিস্তারিত জানাও। কর্তৃপক্ষ তোমার জন্য অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করবে।
৩. পুলিশ সেবা : চুরি, ছিনতাই, ডাকাতি ইত্যাদির ঘটনা দেখলে ৯৯৯ নাম্বারে ফোন দিয়ে জানাতে পারো। তবে ঘটনা দেখামাত্রই জানালে দ্রুত প্রতিকার পাবার সম্ভাবনা থাকে। তোমার বাড়িতে কেউ হামলা চালালো, সেটাও জানাতে পারো। কাউকে নির্যাতনের ঘটনা দেখেছো বা তোমাকে কেউ নির্যাতন করেছে, হুমকি দিচ্ছে সেটাও জানাতে পারো। রাস্তায় দুর্ঘটনা ঘটেছে, কেউ মারা গেছে সেগুলোও পুলিশকে জানাও ৯৯৯ নাম্বারে। যে কোন ঘটনা জানানোর আগে নিজের অবস্থানটা ভালোভাবে জেনে নাও, যাতে অপারেটরকে জানাতে সহজ হয়।

শিশু সহায়তা হেল্পলাইন ১০৯৮ :
এই হেল্পলাইনটি শুধুমাত্র শিশুদের জন্য। যদি দ্যাখো পথে কোনো শিশু খুব ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় আছে তাকে উদ্ধার করে নিরাপদ অবস্থানে নেয়া প্রয়োজন তাহলে ১০৯৮ নাম্বারে ফোন করে জানাতে পারো শিশুটির অবস্থান এবং বিস্তারিত। যদি দ্যাখো কোনো শিশুকে মারধোর করা হচ্ছে কিংবা শিশুশ্রমে বাধ্য করা হচ্ছে তাহলেও কর্তৃপক্ষকে জানাতে পারো।
নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেবা ১০৯ :
আমাদের সমাজে নারী এবং শিশু বিশেষ করে মেয়ে শিশুরা নানান রকম নির্যাতনের শিকার হয়। বুলিং, ইভটিজিং, শারীরিক হয়রানি, হুমকি, অপহরণ ইত্যাদি বিভিন্ন রকম অত্যাচারের মুখোমুখি হতে হয় তাদের। এ ধরনের কোনো ঘটনা দেখলে বা তুমি নিজে এ ধরনের ঘটনার শিকার হয়ে থাকলে ১০৯ নাম্বারে ফোন করে ঘটনা জানাতে পারো। তোমার একটি ফোনকল হয়তো বাঁচিয়ে দিতে পারে ভিকটিমকে।
এর বাইরে আরো কিছু জরুরি সেবাদানকারী মানুষের ফোন নাম্বার সংগ্রহ করে রাখতে পারো।

১. ডাক্তার : তোমার বাড়ির কাছাকাছি থাকে এমন একজন ভালো ডাক্তারের নাম্বার যোগাড় করে রাখবে, যে প্রয়োজনে তোমার ফোনকল রিসিভ করে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিতে পারবে। তোমাদের ফ্যামিলি ডাক্তার হলে ভালো হয়, যিনি নিয়মিত তোমাদের চিকিৎসা করে থাকেন।
২. ইলেকট্রিশিয়ান : বাড়িতে জরুরি বিদ্যুতের সমস্যা তৈরি হতে পারে যে কোনো সময়। লাইট নষ্ট হওয়া, সুইচ নষ্ট হওয়া, ফ্যান বন্ধ হয়ে যাওয়া, সার্কিট জ্বলে যাওয়া ইত্যাদি নানান সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই একজন ইলেকট্রিশিয়ানের সাথে পরিচিত হবে, তার ফোন নাম্বার যোগাড় করে রাখবে।
৩. ড্রাইভার : একজন ভালো আন্তরিক ড্রাইভারের সাথে যোগাযোগ রাখবে। জরুরি প্রয়োজনে দিনে বা গভীর রাতে কখনো কোথাও যেতে হলে যেন তার গাড়িতে করে তুমি বা তোমার পরিচিতজনরা যেতে পারে। যারা নদী অঞ্চলে থাকো, নিজেদের নৌকা বা স্পিড বোট না থাকলে কোনো মাঝি বা স্পিডবোট চালকের নাম্বার রাখতে পারো। প্রত্যন্ত গ্রাম হলে রিকশা চালকের নাম্বারও রাখতে পারো।
৪. লক-মিস্ত্রি/লকস্মিথ : তালা-চাবি সারাই করে এমন একজন লক-মিস্ত্রির ফোন নাম্বার রাখবে। জরুরি প্রয়োজনে তাকে কাজে লাগতে পারে।
৫. অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার : বাড়ির যেকোনো সদস্যের বিপদ হতে পারে। অনেকসময় জরুরি সেবার নাম্বারে কল করে এ্যাম্বুলেন্স আসতে দেরি হতে পারে। তাই পরিচিত এ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার থাকলে বিপদের সময় কাজে লাগে।
৬. সাংবাদিক : কখনো তুমি বা তোমার পরিবার সামাজিক জটিলতায় পড়তে পারো। প্রতিবেশি বা এলাকার লোকজন তোমাদের উপর কোনো অন্যায় চাপিয়ে দিতে পারে। কিংবা এলাকার সন্ত্রাসীরা তোমাদের কাছে চাঁদা চাইতে পারে, হুমকি দিতে পারে। অথবা কোনো কাজ করতে গিয়ে ঘুষ-দুর্নীতির শিকার হতে পারো। সেক্ষেত্রে সাংবাদিককে জানালে তারা তাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।
৭. প্রাণী উদ্ধারকারী কর্র্তৃপক্ষ : যারা পাহাড়ি এলাকায় আছো তাদের ক্ষেত্রে বাড়িতে সাপ, বানর, গুইসাপ ইত্যাদি বিভিন্ন প্রাণী ঢুকে পড়তে পারে। সেক্ষেত্রে স্থানীয় বনবিভাগের কর্মকর্তাদের নাম্বার রাখতে পারো। অথবা মফস্বল শহর এমনকি সিটি কর্পোরেশন এলাকায়ও ইদানীং সাপের উপদ্রব দেখা যায়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে কিছু স্নেক রেসকিউ গ্রুপ আছে যারা বাড়িতে গিয়ে সাপ উদ্ধার করে থাকে। তাদের ফোন নাম্বার সংগ্রহে রাখতে পারো। বিপদে কাজে লাগবে।
৮. প্লাম্বার-ক্লিনার : বাসা-বাড়ির পানির কল অনেক সময় নষ্ট হয়ে যায়। কল ভেঙে পানি পড়তেই থাকে, ফ্লোর ভেসে যায়। কখনো পাইপে পানি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেক্ষেত্রে একজন প্লাম্বার তোমাকে সাহায্য করতে পারেন। এমন একজন প্লাম্বারের নাম্বার রাখবে। আবার কিছু ক্ষেত্রে টয়লেটের সুয়ারেজ লাইনে সমস্যা হতে পারে, পাইপ ফেটে যেতে পারে, লাইন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। সেজন্য ক্লিনিং এর কাজ করে এমন কারো নাম্বার রাখতে পারো।

তোমার এলাকাভেদে ভিন্ন রকম সমস্যা ও জরুরি সেবাদানকারী থাকতে পারে। প্রয়োজন হলে তাদের নাম্বারও রাখতে পারো। মূলকথা হলো মানুষের বিপদের বন্ধু হতে হবে। তুমি যদি কারোর এ ধরনের বিপদে এগিয়ে যাও, তাদেরকে যথাযথ মানুষটির সাথে যোগাযোগ করিয়ে দিতে পারো, তাহলে তারা উপকৃত হলো। বিপদের মূহুর্তে তোমার এগিয়ে যাওয়াকে তারা সবসময় কৃতজ্ঞতার সাথে মনে রাখবে। আর এ কাজের সওয়াব তো তুমি অবশ্যই পাবে। এর মাধ্যমে তোমার ‘বড় মানুষ’ হয়ে ওঠার প্রক্রিয়া সহজতর হবে।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬