জুলাইয়ের সুবাস ছড়াতে থাকুক

পর্ব: ৭৯

0
0

আগের জুলাইটা ছিল ২০১৮ সালের। সে বছরের ২৯ জুলাই ঢাকার বিমানবন্দর রোডের ঘটনা। জাবালে নূর পরিবহনের দুটি বাস গতির পাল্লা দিয়েছিল সেই রোডে, কে কার আগে যাবে! সেই প্রতিযোগিতায় বাসের নিচে পিষে যায় দুজন কলেজ শিক্ষার্থীর প্রাণ। তাদের হত্যার বিচার চেয়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে তাদের বন্ধুরা এবং সেই দাবিতে একাত্ম হয় সারা দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। শুরুটা করেছিল শিশুকিশোরেরাই। সেই কয়দিনে সারা দেশ দেখেছিল কীভাবে রাস্তায় যানবাহন পরিচালনায় শৃঙ্খলা নিয়ে এসেছিল উদ্দীপ্ত কিশোরের দল। প্রথমবারের মতো রাস্তায় ইমারজেন্সি লেন তৈরি করে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি, অ্যাম্বুলেন্স চলাচলের ব্যবস্থা করেছিল তারা। রাস্তায় গাড়িচালকের লাইসেন্স চেক করা, সড়কে ওভারটেকিং এর প্রতিযোগিতা না করে সারিবদ্ধভাবে চলাফেরা করার অনেক ছবি ছড়িয়ে পড়েছিল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। নিরাপদ সড়কের দাবিতে সেই আন্দোলন পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন ভণ্ডুল করতে বিভিন্নরকম চেষ্টা চালায় সরকার। পাঁচই আগস্ট ঢাকার ধানমণ্ডিতে ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। কিন্তু আন্দোলন থামাতে না পারায় শিক্ষার্থীদের ৯ দফা দাবি মেনে নেয় সরকার। বেপরোয়া গাড়ি চালানোর ফলে মৃত্যু হলে গাড়িচালকের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে দ্রুতই সংসদে পাশ হয় ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮’। যদিও তা পরবর্তীতে কার্যকর হয়নি।
এরপর কয়েক বছর ব্যাপকভিত্তিক আন্দোলন জমে ওঠেনি। ২০২৪ এ এসে কোটাবিরোধী আন্দোলন গণজোয়ার তৈরি করলো। জুলাই হয়ে উঠলো উত্তাল। বৈষম্যের বিরুদ্ধে এক হলো ছাত্ররা। সাত জুলাই হলো দেশব্যাপী অবরোধ- বাংলা ব্লকেড। বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদের শাহাদাত এবং ১৮ জুলাই ঢাকায় মীর মুগ্ধের শাহাদাতের প্রাসঙ্গিক ভিডিও গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে তা দেখে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে পুরো দেশ। ধারাবাহিক কর্মসূচিতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্কুলছাত্র, ছোট্ট শিশুসহ নানা বয়সের নারী-পুরুষ প্রাণ হারায়। জাতিসংঘের প্রতিবেদনে আশঙ্কা করা হয় আন্দোলনে প্রায় ১৪০০ মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আহত হয়েছে হাজার হাজার। আন্দোলন দমাতে সরকার নৃশংস উপায় বেছে নেয়। ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয়া হয়। কারফিউ জারি করা হয়। পুলিশ, বিজিবির পর সেনাবাহিনীও মাঠে নামে। গুলি চলে নির্বিচারে। কিন্তু ছাত্রজনতাকে দমানো যায়নি। পাঁচই আগস্ট শেখ হাসিনা পালিয়ে গেলে দেশে বাঁধনহারা উল্লাসে ফেটে পড়ে সর্বস্তরের মানুষ। যেন জগদ্দল পাথর বুক থেকে সরে গেল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো বঞ্চিত-শোষিত-নিষ্পেষিত মানুষ। এবার যেন দেশ গড়ার আন্দোলন শুরু হলো।
এবার এসো, জুলাই আন্দোলনকে সাফল্যের পথে নিয়ে যাবার জন্য আমাদের করণীয় নিয়ে ভাবি। সেজন্য ফরাসি বিপ্লবের কিছু কথা জেনে নিই। জুলাই আন্দোলন কেন হয়েছিল? বৈষম্য বিলোপের জন্য। ফরাসি বিপ্লবের প্রেক্ষাপটও ছিল বৈষম্য। ১৭৮৯ সালের আগে সেখানে ছিল রাজার শাসন-রাজতন্ত্র। জনগণ ছিল তিন ভাগে বিভক্ত। সবচেয়ে মর্যাদার আসনে ছিল যাজক বা খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল অভিজাত শ্রেণি। আর তৃতীয় অবস্থানে ছিল সাধারণ মানুষ, যারা ছিল সংখ্যায় ৯৮ শতাংশ। কিন্তু এদের কোনো মতামত গুরুত্ব পেত না রাষ্ট্র পরিচালনায়। তারা কাজ করে আয় করতো আর সেখান থেকে কর দিতো রাজাকে। অথচ যাজক শ্রেণি এবং অভিজাত শ্রেণি যে ধরনের সুযোগ সুবিধা ভোগ করতো, তার ন্যূনতম সুযোগ তারা পেতো না। সমাজের বা রাষ্ট্রের উচ্চ পদে কখনোই সাধারণ মানুষ যেতে পারতো না। তার উপরে শেষ রাজা ষোড়শ লুই ছিলেন ভোগবিলাসে মত্ত। তার সময়ে দেশ আর্থিক সংকটে পড়ে, যা সামাল দেয়ার জন্য তিনি করের বোঝা বাড়িয়ে দেন। এতে জনগণ আরও ক্ষিপ্ত হয়। তারা ‘জুলাই’ ডেকে আনে। ১৭৮৯ সালের ১৪ জুলাই ফ্রান্সের তৎকালীন কারাগার- বাস্তিল দুর্গ আক্রমণ করে। এরপর দেশে প্রায় দশ বছর ধরে অস্থিরতা চলতে থাকে। ১৭৯৩ সালে রাজা ষোড়শ লুই এবং রানী মারীকে প্রকাশ্যে ফাঁসিতে ঝুলানো হয়। দেশে রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গণতন্ত্রের ঘোষণা দেয়া হয়। মানবাধিকার সনদে -‘আইনের চোখে সবাইকে সমান’ বলে ঘোষণা দেয়া হয়। সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। তবে সুনির্দিষ্ট সরকার কাঠামো না থাকায় দেশে অস্থিরতা চলতে থাকে। এসময় ১৭৯৯ সালে দেশের ক্ষমতা দখল করেন নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। তখন তার বয়স মাত্র তিরিশ বছর।
১৭৬৯ সালে ফ্রান্সের উপনিবেশে থাকা করসিকা দ্বীপে অভিজাত ইতালীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন নেপোলিয়ন। তার বাবা ছিলেন একজন আইনজীবী। পড়াশুনা শেষ করে নেপোলিয়ন সেনাবাহিনীতে যোগ দেন। যেহেতু তার পরিবার যাজক কিংবা অভিজাত’দের অন্তর্ভুক্ত ছিলো না, সুতরাং রাজতন্ত্র বা পূর্বের শাসন ব্যবস্থা বজায় থাকলে নেপোলিয়নের পক্ষে বেশিদূর যাওয়া সম্ভব হতো না। কিন্তু ফরাসি বিপ্লব তাঁকে সেই সুযোগ এনে দেয়। তিনি ১৭৯৩ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল হন এবং ১৭৯৬ সালে ফরাসি বাহিনীর ইতালিয়ান ফ্রন্টের প্রধান হন। তিনি ব্রিটেন, ইতালি, অস্ট্রিয়া এবং মিশরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেন। ১৭৯৯ সালে দেশের অরাজক পরিস্থিতি দেখে তিনি ক্ষমতা দখল করে নিজেকে ফার্স্ট কনসাল ঘোষণা করেন।
তিনি ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র- ‘স্বাধীনতা, সমতা, ভ্রাতৃত্ব’ কে হৃদয়ে ধারণ করে দেশ পরিচালনায় মন দেন। দেশে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি নতুন আইন ব্যবস্থা- ‘নেপোলিয়নিক কোড’ সূচনা করেন। এই কোডে মানুষের সমান অধিকারকে নিশ্চিত করা হয়। তিনি যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরির সুযোগ দেন। স্কুল, কলেজ, সামরিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন। ফ্রান্সের প্রথম ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেন নেপোলিয়ন। এর নাম ছিল ব্যাংক দ্য ফ্রান্স। দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারের সূচনা করেন এই ব্যাংকের মাধ্যমে। দেশে স্থিতিশীলতা ফিরে আসে তার কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে।
তবে দেশের ক্ষমতা দখল করার পর তাঁর সাম্রাজ্য দখলের নেশা পেয়ে বসে। তিনি আলেকজান্ডার এর মতো বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী হবার চেষ্টা করেছিলেন। ১৮১২ সালে রাশিয়াতে আক্রমণ চালানোর সময় তার লাখ লাখ সৈন্য মারা যায়। সেখানেই তার পতন শুরু হয়। তারপর ১৮১৪ সালে তাঁকে পরাজিত করে ইউরোপিয়ানরা এবং নির্বাসনে পাঠায় এলবা দ্বীপে। সেখান থেকে পালিয়ে এসে তিনি আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন এবং আবারও ব্রিটিশদের সাথে যুদ্ধ করেন। কিন্তু ওয়াটার লু’র যুদ্ধে ১৮১৫ সালে হেরে যান এবং সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে যান। সেখানেই তাঁর মৃত্যু হয় ১৮২১ সালে।
নেপোলিয়ন ফরাসি জাতিকে সমৃদ্ধ জাতি হিসেবে গড়ে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। তাদের আত্মমর্যাদা এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। নেপোলিয়নের ছিল অদ্ভুত পড়ার নেশা। তিনি বই পড়তে ভালোবাসতেন। নিজের ব্যক্তিগত পাঠাগার তো ছিলই, তিনি যুদ্ধক্ষেত্রেও শত শত বই নিয়ে যেতেন। তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিয়ানও ছিল, যে নেপোলিয়নকে বই বাছাই করে দিতো। তার ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে ১৩ হাজারের বেশি বই ছিল। সেসব বইয়ের মধ্যে কুরআন, হাদিসও ছিল। এমনকি সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নির্বাসনে থাকাকালীন তার কাছে ১২ শতাধিক বই ছিল বলে জানা যায়।
এবার বলো, তোমার জুলাই কবে আসবে, কীভাবে আসবে? কীভাবে তুমি দেশের জন্য কাজ করবে? কবে থেকে তুমি প্রস্তুতি নিবে? গত জুলাইয়ের প্রথম সারিতে থাকা নাহিদ, আসিফ, মাহফুজেরা কিন্তু কয়েক বছর ধরে পাঠচক্র, আলোচনা অনুষ্ঠান করে নিজেদের প্রস্তুত করেছে। তারা বিপ্লবের জ্ঞান, আন্দোলনের কর্মকৌশল শিখেছে যুগে যুগে বিভিন্ন দেশের আন্দোলনের ইতিহাস পড়েই। তাই ছাত্রজনতার এ অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দিতে পেরেছে। তুমিও কি জ্ঞানের সাধনায় যুক্ত হয়েছো? দেশের উন্নতির জন্য তুমি কি সিদ্ধান্ত নিতে পেরেছ?

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৫