খেলা শুধু খেলা নয়

0
1

চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোতে শুরু হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম বড় খেলার আসর- বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬। এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা এ টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছে ৪৬টি দেশের ফুটবল টিম| বিশ্বের ১৭৫টি দেশে প্রচারিত হবে বিশ্বকাপের লাইভ সম্প্রচার। ফুটবলের উত্তেজনায় কোটি কোটি মানুষ মেতে উঠবে। ফুটবল কি শুধুই খেলা? বিভিন্ন সময়ে ফুটবল বদলে দিয়েছে অনেক আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। প্রভাব ফেলেছে মানুষের মননে, সংস্কৃতিতে। সেরকম কিছু যুগান্তকারী ঘটনা নিয়ে আলোচনা করা যাক-

গৃহযুদ্ধ থামাতে ফুটবল :
পশ্চিম আফ্রিকার দেশ আইভরি কোস্ট। ২০০৫ সালের ঘটনা। পরবর্তী বছরে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ফুটবল বিশ্বকাপের বাছাই পর্ব চলছিল। সুদানকে হারিয়ে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপে জায়গা করে নেয় আইভরি কোস্ট। সেসময় দেশটির অন্যতম সেরা ও জনপ্রিয় খেলোয়াড় ছিলেন চেলসি-তারকা দিদিয়ের দ্রগবা। সুদানের সাথে ম্যাচ জয় শেষে বিশ্বকাপ নিশ্চিত হলে তিনি ড্রেসিংরুমে অদ্ভুত কাণ্ড করে বসেন। সেসময় আইভরি কোস্টে চলছিল গৃহযুদ্ধ। দেশটির উত্তরাংশ ছিল বিদ্রোহীদের দখলে, দক্ষিণাংশে চলে সরকারের শাসন। নিয়মিত যুদ্ধ পরিস্থিতি ছিল দেশজুড়ে। বিশ্বকাপে পৌঁছে যাওয়ার আনন্দময় মূহুর্তে দ্রগবা ড্রেসিংরুম থেকে টিভি ক্যামেরায় দেশবাসীর কাছে যুদ্ধ বন্ধের আবেদন জানান। দ্রগবা বলেন- ‘এই জয়ের উল্লাস গোটা দেশকে একত্রিত করুক’। এরপর ক্যামেরার সামনে পুরো টিম নিয়ে একত্রে হাঁটু গেড়ে বলেন ‘যুদ্ধ ও শত্রুতা ভুলে অস্ত্র তুলে রাখুন। আমরা আনন্দে বাঁচতে চাই, তাই গোলাগুলি বন্ধ করুন’। দ্রগবার এই ভিডিও বারবার প্রচারিত হয় আইভরি কোস্টের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে। এর ফলও পাওয়া যায়। দুই পক্ষ আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি হয়। এরপর যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত আসে। ফুটবল নিয়ে আসে শান্তির বারতা।

স্বাধীন বাংলা ফুটবল টিম :
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই। ভারতের নদীয়ার কৃষ্ণনগরে নদীয়া একাদশ দলের বিপক্ষে মাঠে নামে স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল। ২-২ গোলে ড্র হয় ম্যাচটি। কিন্তু এটি শুধু একটি সাধারণ ফুটবল ম্যাচ ছিল না। এই ম্যাচে প্রথম বিদেশের মাটিতে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান অধিনায়ক জাকারিয়া পিন্টু। ম্যাচের সহ-অধিনায়ক ছিলেন প্রতাপ শংকর হাজড়া। খেলায় গোল করেন শাহজাহান ও এনায়েত। ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো যুদ্ধকালীন দেশের ফুটবল দল। বাংলাদেশের এই ফুটবল দলের মাধ্যমে ভারতে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ব্যাপক প্রচার প্রসার হয়। স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সদস্যরা সে টুর্নামেন্টে তাদের উপার্জিত অর্থ মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে জমা করে দেন। জানা যায়, সেসময় ৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন তারা মুক্তিযুদ্ধের জন্য। বিজয়ের পর তারা ফুটবলের মাধ্যমে সারা দেশে মানুষের মনোবল চাঙ্গা করতে সচেষ্ট হন। এভাবে ফুটবল জড়িয়ে আছে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সাথে।

শ্যাপেকোনিজদের ফেরা :
ব্রাজিলের শ্যাপেকো শহরভিত্তিক ফুটবল ক্লাব- শ্যাপেকোনিজ। ১৯৭৩ সালে জন্ম নেয়া এ ক্লাবটি স্থানীয় পর্যায়ে ফুটবলকে তুলে ধরে। কয়েকবার তারা প্রাদেশিক পর্যায়ের খেলায় চ্যাম্পিয়ন হয়। ২০১৬ সালে তারা দক্ষিণ আমেরিকার ক্লাব ভিত্তিক টুর্নামেন্ট- কোপা সুডামেরিকানা’র ফাইনালে পৌঁছে যায়। ২৮ নভেম্বরে বলিভিয়া থেকে তারা রওয়ানা হয় কলম্বিয়ার মেডেলিন শহরে ফাইনাল ম্যাচ খেলতে। তাদের বহনকারী লা মিয়া এয়ারলাইন্সের ২৯৩৩ নং ফ্লাইটটি অবতরণের আগেই জ্বালানি শেষ হওয়ার কারণে বিধ্বস্ত হয়। বিমানের ৭৭ জন যাত্রীর মধ্যে ৭১ জনই মারা যায়। বিমানটিতে চারজন ক্রু ও ২২জন খেলোয়াড় ছাড়াও ছিলেন ২১ জন সাংবাদিক। খেলোয়াড়দের মধ্যে তিনজন প্রাণে বেঁচে ফিরেন। বিশ্বজুড়ে নেমে আসে শোকের ছায়া। ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ ছিল আতলেতিকো ন্যাশনাল। তারা অভাবনীয় মহানুভবতা প্রদর্শন করে। টুর্নামেন্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন জানায়, যেন শ্যাপেকোনিজদের চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়। ফলে পাঁচই ডিসেম্বর কোপা সুডামেরিকানার চ্যাম্পিয়ন হিসেবে নাম ঘোষণা করা হয় শ্যাপেকোনিজকে। আতলেতিকো ন্যাশনালের এই উদারতার ফলে তাদেরকে সেবছর সেন্টেনিয়াল ফেয়ার প্লে এওয়ার্ড এবং ফিফা ফেয়ার প্লে এওয়ার্ড দেয়া হয়। শুধু তাই না, ব্রাজিলের অন্যান্য ক্লাবগুলোও শ্যাপেকোনিজদের সহায়তায় এগিয়ে আসে। তারা তাদের ক্লাবে বিনামূল্যে খেলোয়াড় ধার দেয়ার প্রস্তাব করে। সবার সহযোগিতায় আবারো পুনর্গঠিত হয় শ্যাপেকোনিজ। পরের বছরই প্রাদেশিক টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হয়। শ্যাপেকোনিজদের এই ঘটনা খেলাধূলায় মানবিকতা, সহযোগিতা এবং উদারতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে রয়।

খেলা দেখতে থামলো যুদ্ধ :
কিংবদন্তি পেলে তাঁর আত্মজীবনীতে উল্লেখ করেছেন, ১৯৬৭/৬৯ সালে তিনি নাইজেরিয়ায় গিয়েছিলেন তার ক্লাব সান্তোসকে নিয়ে। নাইজেরিয়ায় তখন গৃহযুদ্ধ চলছিল। পেলে বলেন- তাদের খেলা দেখার জন্য বিবদমান দু’পক্ষ ৪৮ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধ থামিয়ে রেখেছিল। তখন পেলে এতটাই জনপ্রিয় ছিলেন যে তাকে চোখের সামনে খেলতে দেখাটাই যেন ছিল অবিশ্বাস্য অনুভূতি।

এবার এসো আমাদের পরিস্থিতি বিবেচনায়। ফুটবলে আমরা এখনো পর্যন্ত এশিয়া পর্যায়েই কোয়ালিফাই করতে পারিনি। কিন্তু বিশ্বকাপ নিয়ে আমাদের ‘উন্মাদনা’ যেন ঐতিহ্যবাহী! প্রতিবার বিশ্বকাপ এলেই আমাদের ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ শুরু হয় পাড়ার চায়ের দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান সব জায়গায়। কার পতাকার সাইজ কত বড় সেটা নিয়ে চলে প্রতিযোগিতা। কেউ কেউ জায়গা-জমি বিক্রি করে দিয়েও পতাকা বানায়! তারপর খেলা দেখা নিয়ে মারামারি, খুনোখুনি পর্যন্ত চলে। এসবের মাধ্যমে আমরা কী অর্জন করতে পেরেছি?
খেলাধূলায় প্রতিযোগিতা থাকবে, উৎসব-উল্লাস থাকবে। মাতামাতি থাকবে, হৈ হুল্লোড় থাকবে। কিন্তু তাই বলে এগুলোকে সহিংসতার পর্যায়ে নিয়ে যাবার কোনো মানে হয় না। খেলা নিয়ে আলোচনা, ঝগড়া, তর্কবিতর্ক করতে আমরা যতটা সময় নষ্ট করি, সে সময়টা যদি নিজেরাই ফুটবল খেলি, তাতে আমাদের ফিটনেস ভালো হবে। নিজেদের ফুটবল উন্নত করতে যদি আমরা আমাদের এ ‘উন্মাদনা’টা কাজে লাগাতে পারতাম, তাহলে দেশের ফুটবল অনেক এগিয়ে যেতো।