প্রথমেই তোমাদের একটি অবিশ্বাস্য, রোমাঞ্চকর উদ্ধার অভিযানের গল্প বলতে চাই। ২০১৮ সালের ২৩শে জুন। থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই প্রদেশের ঘটনা। ১২ জন কিশোর তাদের ফুটবল কোচের সাথে পাহাড়ি এলাকায় ঘুরতে গিয়েছিল। তারা প্রথমে সাইক্লিং করে, তারপর থাম লুয়াং নামের একটি গুহা পেয়ে সাইকেল রেখে সবাই গুহায় ঢুকে পড়ে। কৌতূহলবশতঃ গুহার গভীরে যেতে থাকে তারা। কিন্তু তখন ছিল বৃষ্টির মওসুম। সেদিন হঠাৎ অতিমাত্রায় বৃষ্টিপাত হয়। তারা ভেতরে যেতে যেতে খেয়াল করলো গুহার ভেতরে পানি ঢুকতে ঢুকতে গুহার পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা গুহার ভেতরে একটা উঁচু জায়গা পেয়ে সেখানে আশ্রয় নিলো। প্রচণ্ড বৃষ্টিপাতে তাদের বাইরে যাওয়ার পথ পুরোটাই পানিতে ডুবে গেল। গুহার গভীরে অন্ধকার জায়গায় আটকে পড়লো তারা।
স্কুলের ছাত্ররা ফিরে না আসায় খবর ছড়িয়ে পড়লো সবখানে। পুলিশ এবং প্রাথমিক উদ্ধারকারী টিম এসে কিছুই করতে পারলো না। পরে থাই নেভি সিলের ডুবুরিদের আনা হলো। কিন্তু তারা সাগরের পানির গভীরে গিয়ে অভ্যস্ত, গুহার সরু পথে ডাইভিং এর অভিজ্ঞতা নেই। তাই কাজ হলো না। ইঞ্জিনিয়াররা গুহাপথের পানি পাম্প করে সরাতে চেষ্টা করলেন। কিছুটা সরালেনও। কিন্তু বৃষ্টি থাকায় এই পদ্ধতিতে ফল পাওয়া যাচ্ছিল না। তখন বিদেশি এক্সপার্টদের সহায়তা নেয়া হলো। যুক্তরাজ্যের দুইজন ডুবুরি- জন ভোলানতেন এবং রিক স্ট্যানটন, যারা গুহাপথে ডুবসাঁতারে অভিজ্ঞ, তারা এলেন। অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তারা এগিয়ে গেলেন গুহাপথে। উঁচু নিচু, আঁকাবাঁকা, সর্পিল গুহাপথ। কিছু জায়গায় একটু প্রশস্ত, আবার সবচেয়ে সরু জায়গাটা দিয়ে একজন মানুষ কোনোভাবে পার হতে পারে। সেই পথ পাড়ি দিয়ে গুহার প্রবেশমুখ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার ভেতরে গিয়ে ২ জুলাই তারিখে প্রথমবার তারা সেই কিশোরদের পর্যন্ত পৌঁছতে পারেন। এর মাঝে কেটে গেছে ১০ দিন। কিন্তু উদ্ধারকারী ডুবুরি গিয়ে দেখলেন তারা সবাই চাঙ্গা আছে। ভাবতে পারো! দশদিন তারা অন্ধকার গুহায় বন্দি। ভয়েই তো মরে যাবার কথা! তার উপরে খাবার নেই। কিশোরদের ভাষ্যমতে, তারা গুহার দেয়াল চুঁইয়ে নেমে আসা পানি খেয়ে বেঁচেছিল এতদিন। আর কীভাবে তারা শান্ত ছিল? তারা জানায় তাদের কোচ, যার নাম ‘একাপোল’, তাদের ধ্যান করিয়েছে আর সবসময় সাহস জুগিয়েছে। বলেছে- নিশ্চয়ই কেউ না কেউ তোমাদের উদ্ধারে এগিয়ে আসবে। তাদেরকে ধীরস্থির থাকতে বলেছে, যাতে করে মুভমেন্টের কারণে শক্তিক্ষয় হয়ে কেউ দুর্বল না হয়ে যায়।
তাদের সন্ধান পাওয়ার পর সবার আগে তাদের জন্য খাবার পাঠানো হয়। তাদের আশ্বস্ত করা হয় যে তাদের শীঘ্রই উদ্ধার করা হবে। কিন্তু কীভাবে! এমন সরু গুহাপথ, যা আবার পানিতে ডুবে আছে, এমন দুর্গম জায়গা থেকে উদ্ধার অভিযানের কোনো ঘটনা আগে ঘটেনি। তার উপরে কিশোরেরা সাঁতার জানে না। তাদের কীভাবে বের করা যাবে এখান থেকে! বিশেষজ্ঞ টিমের সামনে তিনটি অপশন এলো- ১. বৃষ্টির দিন শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা, যাতে পানি কমে গেলে তাদের বের করা যায়। ২. গুহাপথে না গিয়ে পাহাড়ের উপর থেকে কিশোরদের অবস্থান পর্যন্ত পৌঁছার জন্য গর্ত খুঁড়ে পথ তৈরি করা। ৩. গুহা পথেই তাদের দ্রুত উদ্ধার করা। প্রথম অপশনে যাবার সুযোগ ছিল না, কারণ আরও মাসখানেক লাগতো বৃষ্টির দিন শেষ হতে। দ্বিতীয় অপশনের জন্য সার্ভে করতে গিয়ে দেখা গেল তারা পাহাড়ের উপর থেকে প্রায় নয়শো মিটার গভীরে গুহায় আছে। পাহাড়ে গর্ত খুঁড়ে সে পর্যন্ত যাওয়া অসম্ভব পর্যায়ের কাজ। তাই তৃতীয় উপায়টি বেছে নিলেন তারা। এর মধ্যে কেটে গেল আরো ৬ দিন। এ সময়ের মধ্যে গুহায় পর্যাপ্ত অক্সিজেন সরবরাহ করার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠানো হলো। গুহাপথে সিলিন্ডার পরিবহন করতে গিয়ে ‘সামান কুনান’ নামে একজন থাই নেভি সিলের ডুবুরি মারা যান। অক্সিজেন পৌঁছে দিতে দিতে তার নিজের অক্সিজেনই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
৮ জুলাই শুরু হলো কিশোরদের বের করে আনার অভিযান। বিশ্বব্যাপী মিডিয়াতে প্রতিদিনের ব্রেকিং নিউজের মধ্যে ছিল এই উদ্ধার অভিযানের আপডেট। অভিযানে অংশ নিতে থাইল্যান্ড ও বিভিন্ন দেশ থেকে আসে দশ হাজারের বেশি উদ্ধারকর্মী, শতাধিক দক্ষ ডুবুরি। এছাড়া টিমে ছিল ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, মনোবিজ্ঞানী, খাবার ও পানি সরবরাহকারী দল, লজিস্টিক টিম, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীর সদস্যরা এবং হাজার হাজার স্বেচ্ছাসেবক। টিমওয়ার্কের একটি যুগান্তকারী ঘটনা ছিল এই উদ্ধার অভিযান। বিশেষজ্ঞরা সিদ্ধান্ত নিলেন যে প্রতিদিন চারজন করে বের করা হবে। কিশোররা যাতে ভীত হয়ে না পড়ে এবং উদ্ধারকাজে বিঘ্ন না ঘটায় সেজন্য চিকিৎসকদের পরামর্শ চাওয়া হলো। তারা বললেন তাদেরকে চেতনানাশক ইঞ্জেকশন দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে বহন করে নিয়ে আসতে হবে। ডুবন্ত গুহাপথে প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা ধরে একেকজন কিশোরকে বয়ে নিয়ে নিয়ে আসে ডুবুরিরা। সেদিন চারজনকে উদ্ধার করা হয়। তারপরের দুই দিনে আরও ৪ জন করে ৮ জনকে বের করা হয়। সবশেষে তাদের কোচ একাপোলকে উদ্ধার করা হয়।
বিশ্ব গণমাধ্যমে এই ঘটনাকে বলা হয়- Miracle of Thailand. নিউজের হেডলাইন হলো- Mission impossible has become Mission Incredible. আটকে পড়া সব মানুষকে জীবিত, অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করতে পেরে কান্নায় ভেঙে পড়েন উদ্ধারকারীরা। টিভির সামনে বসা বিশ্বের কোটি কোটি দর্শক দীর্ঘদিনের রুদ্ধশ্বাস অবস্থা থেকে মুক্তি পায়, আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়।
এই পুরো ঘটনা থেকে আমরা বুঝতে পারি টিমওয়ার্কের গুরুত্ব কতখানি। ১২ কিশোর এবং তাদের কোচ ছিল গুহায় আটকে পড়া টিমে। আর বাইরে ছিল হাজার হাজার মানুষের টিম। আটকে পড়া টিমের সদস্যরা একজন আরেকজনকে উৎসাহ দিয়ে, সাহস দিয়ে, আশা দিয়ে চাঙ্গা রেখেছিল। আর বাইরের হাজার হাজার মানুষের টিম বিস্তারিত গবেষণা করে উদ্ধারের উপায় বের করেছে, শেষ পর্যন্ত সফলভাবে উদ্ধার করেছে।
টিমওয়ার্ক কী সেটা তো আর ব্যাখ্যা করার প্রয়োজন নেই। তোমার স্কুলের এসাইনমেন্ট করার জন্য টিমওয়ার্ক করতে হয়। কোনো পারফরম্যান্সের ক্ষেত্রে টিমওয়ার্ক লাগে। কোনো অনুষ্ঠান আয়োজন বা কর্মসূচি উদযাপন করতেও টিমওয়ার্ক প্রয়োজন। এবার চলো টিমওয়ার্কের জন্য প্রয়োজনীয় গুণাবলি জেনে নিই।
১. টিমের প্রতিটি সদস্যের পরস্পরের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা ও সম্মান থাকতে হবে (Respect)
২. সহযোগিতামূলক মনোভাব (Cooperation)- নিজের দায়িত্বের বাইরে গিয়ে দলকে সাহায্য করতে আগ্রহী হওয়া। অনেক সময় দলের কেউ কেউ দুর্বল থাকে। তখন বাকিদের একটু বেশি কাজ করতে হয়। এটাকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিতে হবে।
৩. দলের মধ্যে কোনো তথ্য ঘাটতি থাকা যাবে না। যোগাযোগ দক্ষতা থাকতে হবে (Communication Skill)
৪. ধৈর্য ও সহনশীলতা (Patience & Tolerance)- দলের ভিন্ন ভিন্ন স্বভাব, রুচি, মতামত সহ্য করতে পারা।
৫. দায়িত্ববোধ (Responsibility)- নিজের কাজ যথাযথভাবে করে সময়মতো শেষ করা।
৬. নেতৃত্বের যোগ্যতা (Leadership)- দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া, সঠিক নির্দেশনা দেওয়া, সমস্যা হলে দ্রুত সমাধান বের করা।
৭. ইতিবাচক মনোভাব (Positive Attitude)- সমস্যার বদলে সমাধান খোঁজা, হতাশ না হওয়া।
৮. মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা (Adaptability)- পরিবেশ পরিস্থিতি অনুযায়ী সহনশীল আচরণ ও কাজ করা।
টিমওয়ার্ক সফল হবার জন্য কিছু বিষয়ে লক্ষ রাখতে হবে –
১. শুরুতেই সঠিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা। দল জানবে- ‘আমরা কী করতে চাই?’ ‘কেন করতে চাই?’ ‘কখন শেষ করতে চাই?’ ‘কার দায়িত্ব কী?’ দলকে এবং বিশেষত দলের নেতাকে কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত নিবিষ্টভাবে লেগে থাকতে হবে। কোনো ধরনের লোভ, অলসতা ও অন্যের প্ররোচনায় পথ হারিয়ে ফেললে হবে না।
২. সবার মতামত শোনা- যে কোনো পরিকল্পনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দলের সবাইকে কথা বলার সুযোগ দিতে হবে। কারণ কম গুরুত্বপূর্ণ কারো কাছ থেকেও অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ আসতে পারে।
৩. কাজ ভাগ করে দেওয়া- কে কী করবে- এটা স্পষ্ট করে দিলে ভুল কম হবে, সময়ও বাঁচবে।
৪. নিয়মিত মিটিং বা আলোচনার মাধ্যমে অগ্রগতি দেখা- দলের কাজ ঠিক পথে আছে কি না তা জানতে নির্ধারিত সময় পর পর ছোট ছোট বৈঠক করা।
৫. সমস্যা হলে দোষারোপ না করে সমাধান খোঁজা- ‘কার কারণে সমস্যা হলো?’ এর চেয়ে ‘সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায়?’- এটা গুরুত্বপূর্ণ।
৬. একে অপরকে উৎসাহ দেওয়া- কেউ ভালো করলে প্রশংসা করা, পিছিয়ে পড়লে সাহায্য করা।
৭. তথ্য সবার সাথে শেয়ার করা- দলের একজন যা জানে, অন্যরা তা না জানলে ভুল বোঝাবুঝি হয়। সবার কাছে একই রকম তথ্য জানা থাকা উচিত।
৮. সময়মতো কাজ শেষ করা- নিজের কাজ দেরি করলে পুরো দল পিছিয়ে যায়- এজন্য সময়মতো দায়িত্ব শেষ করা আবশ্যক।
৯. দলগত সাফল্য উদযাপন করা- কাজ শেষ হলে দল একসঙ্গে সাফল্য উদযাপন করলে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হয়।
১০. ভুল থেকে শেখা- দল কোথায় ভুল করেছে, পরের বার কীভাবে উন্নতি করা যায়- এটি বিশ্লেষণ করা।
একা একা আমরা ছোট ছোট পরিবর্তন আনতে পারি। বড় পরিবর্তন আনতে গেলে অবশ্যই টিমওয়ার্ক লাগবে। সেজন্য নিজেকেও একজন ভালো টিমমেট হিসেবে তৈরি করতে হবে। আবার যদি টিমের লিডারশীপের দায়িত্ব নিতে হয় তখন নেতৃত্বের যোগ্যতাও গড়ে তুলতে হবে।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫



