ক্লাসে একটা জিনিস প্রায় সবার সাথেই হয়। সেটা হলো স্যার ক্লাসে কোনো পড়া জিজ্ঞেস করেছেন- ‘তোমাদের মধ্যে কে পারবে এর উত্তর বলতে?’ যখন কেউ হাত তুলছে না, তখন তোমার বন্ধু তোমাকে পিঠে একটু আলতো চাপড়ে দেয় বা ধাক্কা দেয়- ‘এই ওঠ, তুই পারবি, বল’। তখন তুমি উঠে দাঁড়াও। উত্তর বলো। কিংবা কোনো কাজ দিলে সেটা করার চেষ্টা করো। এই যে আলতো চাপড়ে দেয়া কিংবা মৃদু ধাক্কা দেয়া, এটাকে ইংরেজিতে বলে নাজ (Nudge). এই হালকা ধাক্কা কিন্তু অনেক শক্তিশালী। অনেক কঠিন কাজ করে ফেলতে পারে মানুষ এই হালকা ধাক্কার কারণে।
ধরো, তোমার রেজাল্ট খারাপ হয়েছে। বাসায় মন খারাপ করে বসে আছো। কোত্থাও যেতে ইচ্ছে করছে না। ক্লাস, কোচিং কিচ্ছু ভালো লাগছে না। এমন সময় খুব প্রিয় বন্ধু কিংবা খুব প্রিয় কোনো আত্মীয় এসে পিঠে একটু চাপড়ে দিয়ে বললেন, ‘এই! রেজাল্ট খারাপ হয়েছে তো কী হয়েছে! পরেরবার ঠিকমতো পড়লেই ইনশাআল্লাহ অনেক ভালো করতে পারবে তুমি!’ সামান্য কথা। কিন্তু এতে মনের মেঘ দূর হয়ে যায়। দুঃখ কমে যায়। আবার আশার সঞ্চার হয়। তুমি তখন আবার মানসিক শক্তি ফিরে পাও।
এই ‘মৃদু ধাক্কা’ আমাদের সিদ্ধান্ত নেয়াকে প্রভাবিত করে। ধরো, প্রথম ঘটনায় তুমি হয়তো উঠে দাঁড়াবেই না বলে ভেবে রেখেছ। কিন্তু সামান্য ধাক্কা তোমাকে দাঁড় করিয়েছে। কেউ কিন্তু তোমাকে বাধ্য করেনি। হুমকি দেয়নি। কিংবা আদেশও করেনি। কিন্তু প্রভাবিত করেছে সামান্য ধাক্কা দিয়ে। দ্বিতীয় ঘটনাতে তুমি হয়তো মুষড়ে পড়ে থাকতে। বিষণ্ন হয়ে যেতে, একাকী অনুভব করতে। কিন্তু সামান্য ধাক্কা তোমাকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। কেউ আদেশ করেনি, হুঁশিয়ারি দেয়নি।
এ ধরনের সামান্য কাজের মাধ্যমে মানুষের কাজকর্ম, সিদ্ধান্তগ্রহণ বা আচরণকে প্রভাবিত করার নাম হলো নাজ থিয়োরি (Nudge THeory)। এই থিয়োরি দিয়েছেন দুজন মার্কিনী – Richard H. Thaler Ges Cass R. Sunstein এবং ঈধংং জ. ঝঁহংঃবরহ। ২০০৮ সালে তারা একটি বই প্রকাশ করেন Nudge: Improving Decisions About Health, Wealth, and Happiness শিরোনামে। এটি পাঠক সমাজে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে। মানুষের আচরণ বিজ্ঞান বিষয়ে অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৭ সালে রিচার্ড অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন।
নাজ থিয়োরি অনুযায়ী মানুষকে জোর করে নয়, বরং তার সামনে ভালো অপশনগুলো এমনভাবে উপস্থাপন করতে হবে যেন সে অপেক্ষাকৃত ভালো অপশনটিকেই বেছে নেয়। নাজ যে কোনো কিছুই হতে পারে। যেমন- উৎসাহ, সতর্কতা বা গাইডলাইনমূলক কথা, ছবি, ভিডিও এমনকি সহজলভ্যতা বা সহজপ্রাপ্যতাও আছে। থিয়োরির কঠিন শব্দাবলির ব্যাখ্যাতে না গিয়ে চলো আমরা উদাহরণে চলে যাই।
এই থিয়োরির সবচেয়ে প্রচলিত উদাহরণটি হলো রেস্টুরেন্টে সালাদ বা ভেজিটেবল আইটেম সামনে রাখলে মানুষ সেটি কিনতে আগ্রহী হবে। এটি মানুষকে স্বাস্থ্য সচেতন করবে। অর্থাৎ এখানে যে টেকনিকটি কাজে লাগানো হয়েছে তা হলো- বিষয়বস্তু পরিকল্পিতভাবে সাজানোর মাধ্যমে মানুষের অপশন নির্ধারণে প্রভাবিতকরণ। দেখা যায় আমাদের চোখের সামনে যেটি আগে পড়ে বা বেশি সময় পড়ে সেটির প্রতি আমাদের একটা মনোসংযোগ তৈরি হয়। আমরা সেই কাজ বা সেই বস্তুর প্রতি বেশি আকৃষ্ট হই। যেমন ধরো, মুদি দোকানগুলোতে চকলেটের জার বা বক্সগুলো কোথায় থাকে? সবচেয়ে সামনে এবং এমন উচ্চতায় যেটা একটা শিশু সহজে দেখবে। এতে করে কী হয়? যখন বাবার সাথে একটি শিশু দোকানে যায়, সে তার চোখের সামনেই চকলেট দেখতে পায় কিংবা চিপস ঝুলতে দেখে। তখনই সে সেটা চেয়ে বসে বাবার কাছে। দোকানদারকে আর বলতে হয় না- বাবু, চকলেট নিবে?
সিগারেটের প্যাকেটে লেখা থাকে- ‘ধূমপানে বিষপান’। এছাড়া ধূমপানের ফলে যেসব রোগ হয়, তার বীভৎস ছবিও দেয়া থাকে। এটাও একধরনের ‘নাজ’। রাস্তার ট্রাফিক সিগন্যাল মানতেই হয়, এটি ‘নাজ’ নয়। তবে কিছু সতর্কবার্তা লেখা থাকে যেমন- ‘গতিতে মরণ’ কিংবা ‘একটি দুর্ঘটনা সারা জীবনের কান্না’। এগুলো হলো ‘নাজ’। ঘুম থেকে উঠতে এলার্ম ব্যবহারও ‘নাজ’।
তারপর ধরো, আগে আমরা রেস্টুরেন্টে গিয়েই খেতাম। এখন ফুডপান্ডাতে অর্ডার করলে খাবার বাসায় পৌঁছে দেয়। এতে করে আমাদের বাইরের খাবার খাওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। এটা এক ধরনের ‘নাজ’। অর্থাৎ কোনো অপশন সহজপ্রাপ্য করলে মানুষ বেশি ব্যবহার করে।
এবারে এসো, নিজেদের উন্নয়নে নাজ থিয়োরির প্রয়োগ করার কথা আলোচনা করা যাক।
– পড়ার টেবিল থাকবে তোমার রুমের শুরুতেই, যাতে ঘরে ঢুকেই আগে টেবিলের দিকে চোখ যায়। বই খাতাগুলো গুছিয়ে রাখবে।
– টেবিলের পাশে খাটে বসে পড়ার সুযোগ বাদ দেয়া উচিত। এতে করে একটু পড়েই খাটে শুয়ে পড়তে ইচ্ছে করবে। খাটকে পড়ার টেবিল থেকে দূরে রাখবে।
– পড়ার টেবিলের সামনে কিংবা সামনের দেয়ালে বড় করে লিখে রাখো- ‘পরীক্ষা সামনে, পড়তে বসো’। দেখবে এইটা তোমাকে প্রভাবিত করবে পড়তে বসতে।
– টেবিলে একটা -To Do List রাখতে পারো। এতে করে তোমার কাজগুলো গোছানো হবে। সময়মত শেষ হবে।
– ক্যালেন্ডারে বিভিন্ন ইস্যুতে দাগ দিয়ে রাখতে পারো- কবে কী করতে হবে বা কোথায় যেতে হবে এমন।
মোবাইল ব্যবহার করো? তাহলে এই ‘নাজ’গুলো করতে পারো-
১. হোম স্ক্রিনে ‘পড়া বাকি আছে’ এ ধরনের লেখা ওয়ালপেপার সেট করতে পারো। আরেকটা ভাইরাল ডায়ালগ আছে না? ঐ যে- ‘তোর সিলেবাস শেষ হইসে?’ এ ধরনের কথাও ব্যবহার করতে পারো।
২. বেশি সময় মোবাইলে দিচ্ছো? তাহলে টাইমার সেট করে ফেলো যে কতক্ষণ ব্যবহার করলে পরে মোবাইল তোমাকে সংকেত দিবে বা নিজেই ডার্ক হয়ে যাবে।
তুমি কি প্রচণ্ড অগোছালো? কোথায় কী রাখো তার ঠিক ঠিকানা নাই? পরে খুঁজে পাও না? তাহলে তুমি লেবেলিং করো। প্রতিদিন কোথায় ব্যাগ রাখবে সেটা ঠিক করে একটা কাগজে লেখো- ‘ব্যাগ’। তারপর কাগজটা সেখানে লাগিয়ে দাও। একই রকম শার্ট যেখানে রাখবে সেখানে- শার্ট লেবেল, প্যান্ট যেখানে রাখবে সেখানে প্যান্ট লেবেল লাগিয়ে দাও। টেবিলের ড্রয়ারগুলোতেও লেবেলিং করো- নোটখাতা, রাফ খাতা ইত্যাদি।
তুমি কি পানি কম পান করো বা ভুলে যাও পানি পানের কথা? তাহলে তোমার টেবিল বা খাটের কাছে পানির বোতল এনে রাখো। সেখানে চোখ পড়লেই পানি পানের কথা মনে পড়বে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো নিজেদের মধ্যে ‘নাজ’ বা উৎসাহ চর্চা করা। তবে মনে রেখো, খারাপ কাজে কিন্তু বন্ধুরা ‘নাজ’ করে অনেক। যেমন বলতে পারে- ‘সিগারেটে একটা টান দিয়ে দেখ! কিচ্ছু হবে না’। কিন্তু এই ‘একটা টান’ থেকেই শুরু হয় ধূমপান এবং মাদকাসক্তি।
তাই নিজে বন্ধুকে ‘নাজ’ করবে যেন সে পড়াশুনা ঠিকভাবে করে, শরীরের যত্ন নেয়, স্বাস্থ্যসম্মত খাবার খায়, মোবাইলে বা গেমে আসক্ত না হয়। আবার বন্ধুকে বলবে তোমাকেও যেন সে ‘হালকা ধাক্কা’ দেয় পড়াশুনায় মনোযোগী হতে, ভালো কাজে সময় দিতে, পরিবেশের জন্য কল্যাণকর কাজ করতে।
এভাবেই পারস্পরিক উৎসাহে আমাদের নিজেদের উন্নয়ন হবে এবং একটি কল্যাণমূলক সমাজ গঠিত হবে।
প্রকাশকাল: আগস্ট ২০২৫



