হাত পা কাঁপে, পরীক্ষাতে?

0
2

পরীক্ষা! উফ! শব্দটা শুনলেই বুক ধড়ফড় করে ওঠে অনেকের। প্রায় সবারই পরীক্ষা নিয়ে কম-বেশি ভীতি কাজ করে। পড়াশুনা করেছ বেশ, প্রস্তুতি খুব ভালো, কিন্তু পরীক্ষার হলে ঢুকলেই কিংবা প্রশ্নপত্র হাতে পেলেই যেন ভয়ে গা শিউরে ওঠে। মস্তিষ্ক কাজ করে না, মুখস্থ-ঠোঁটস্থ বিষয়গুলোও মনে আসে না। লিখতে গিয়ে হাত চলে না, অবস হয়ে আসে। এগুলোকে বলে এক্সামফোবিয়া (Exam phobia) কিংবা টেস্ট অ্যাংজাইটি (Test Anxiety)। এই ভীতির ফলে তোমার রেজাল্ট খারাপ হয়, তুমি আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলো। মনে প্রশ্ন জাগে- এত পড়ে লাভ কী? যদি হলে গিয়ে সব ভুলেই যাই! চলো আজকে এই ভীতি নিয়ে আলাপ করা যাক।

পরীক্ষা-ভীতি কেন হয়?
পরীক্ষার হলে গিয়ে সব ভুলে যাওয়ার পেছনে কয়েকটি শারীরিক-মানসিক ব্যাপার কাজ করে।
১. কগনিটিভ বিহেভিয়ার থিয়োরি: এই থিয়োরি অনুযায়ী আমাদের চিন্তা আমাদের ইমোশন বা অনুভূতি তৈরি করে, আর এর ফলে আমাদের আচরণ প্রভাবিত হয়। যদি আমরা ভালো বা ইতিবাচক চিন্তা করি তাহলে আমাদের আচরণ ইতিবাচক হয়, যদি নেতিবাচক বা ব্যর্থতার চিন্তা করি তাহলে আচরণও নেতিবাচকতা এবং ব্যর্থতার দিকে যায়।
এর মানে, পরীক্ষার হলে যাওয়ার আগেই বদ্ধমূল ধারণা থাকে যে ‘প্রশ্ন মনে হয় খুব কঠিন হবে’, ‘আমি যা যা পড়েছি তা থেকে হয়তো কমন আসবে না’, ‘এইবারও ফুল মার্কের উত্তর লিখে শেষ করতে পারবো না’, ‘এইবার ফেল করবো’ — ইত্যাদি ইত্যাদি। এর ফলে আমাদের মস্তিষ্ক সেই অনুযায়ী আচরণ করে। সে সব কিছুকে কঠিনভাবে দেখায়, মুখস্থ জিনিস গুলিয়ে ফেলে। আর আমরাও পরীক্ষার খাতায় সব ছ্যাড়াব্যাড়া করে দিয়ে আসি।
২. Yerkes–Dodson Law:
এই নীতি অনুযায়ী- আমাদের পারফরমেন্স, কাজের পেছনে উত্তেজনা বা চাপের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। মধ্যম পর্যায়ের চাপে থাকলে আমরা সবচেয়ে ভালো কাজ উপহার দিয়ে থাকি। চাপ না থাকলে আমরা কাজ করার উৎসাহ পাই না, আবার বেশি চাপে পড়লে তখন আমরা হাল ছেড়ে দিই।
এর শারীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যায় বলা হয় হালকা চাপে আমাদের মস্তিষ্ক ডোপামিন এবং নরঅ্যাড্রেনালিন হরমোন নিঃসরণ করে। এতে কাজের প্রতি আমাদের মনোযোগ বাড়ে।
আবার অতিরিক্ত চাপে মস্তিষ্ক কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ করে। এর ফলে আমাদের অস্থিরতা বাড়ে, মনোযোগ কমে যায়, সিদ্ধান্তগ্রহণে বিঘ্ন ঘটে।
3. Fight or Flight Response:
এটি আমাদের মস্তিষ্কের একটি মৌলিক নীতি। আমাদের সামনে যেকোনো পরিস্থিতি আসুক, মস্তিষ্ক যেকোনো একটি সিদ্ধান্ত নেয়, হয় ফাইট করবে অর্থাৎ মোকাবেলা করবে কিংবা ফ্লাইট করবে বা পালিয়ে যাবে বা এড়িয়ে যাবে। যেমন- সাপ দেখলে আমরা কী করি? হয় দৌড় দিই অথবা আশে পাশে লাঠি পেলে সাপটাকে মারতে চেষ্টা করি। এটাই হলো ফাইট অর ফ্লাইট রেসপন্স।
এক্ষেত্রে আমাদের মস্তিষ্ক এড্রেনালিন এবং কর্টিসল হরমোন নিঃসরণ করে। এর ফলে আমাদের দেহে কিছু পরিবর্তন আসে। যেমন- হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়, দেহে রক্ত প্রবাহ বেশি হয়, শ্বাসপ্রশ্বাস দ্রুত হয় ইত্যাদি।
পরীক্ষার হলে বেশি টেনশনে আমাদের হাত শক্ত হয়ে আসে, ঘাম বেশি হয়, বুক ধুকপুক বেশি হয় এই রেসপন্সের কারণেই।
৪. এছাড়া পারফেকশনিস্ট মনোভাবের কারণেও পরীক্ষাভীতি হয়। অর্থাৎ মাথায় শুধু ঘুরতে থাকে- আমি সবচেয়ে ভালো অ্যান্সার করতে পারবো তো? কোনো কিছু মিস হবে না তো? কোনো জায়গায় ভুল হবে না তো? এই মনোভাবের কারণেও টেনশন তৈরি হয়।
কারণগুলো তো জানা গেল। এবার কিছু সমাধান নিয়ে আলোচনা করা যাক। কীভাবে আমরা এই ভয়কে জয় করতে পারি-

পরীক্ষার আগে : পরীক্ষার আগে অবশ্যই নিয়মিত পড়াশুনা করতে হবে। পরীক্ষার রাতে গোগ্রাসে সিলেবাস গেলার চেষ্টা করলে মস্তিষ্কে চাপ বেশি পড়ে। তাই পড়াশুনায় নিয়মিত হওয়া উচিত। ক্লাসের সাথে সাথে হোমওয়ার্ক ঠিকমতো করে পড়াশুনাকে সময়ের সাথে এগিয়ে রাখতে হবে।
বাড়িতে বা কোচিং-এ পরীক্ষা দিয়ে প্র্যাকটিস করলে পরীক্ষাভীতি কমে আসে।
পজিটিভ চিন্তার চর্চা করতে হবে। নিজেকে বারবার বলতে হবে- এবার পরীক্ষাগুলো ভালো হবে, প্রশ্ন কমন আসবে, আমি ঠিকভাবে লিখতে পারবো। এইভাবে ভাবতে পারলে আত্মবিশ্বাস তৈরি হবে।
পরীক্ষার আগের রাতে জামা-কাপড়, জুতো, কলম পেন্সিল, প্রবেশপত্র ইত্যাদি যা যা পরীক্ষার হলে নিতে হবে তা গুছিয়ে রাখতে হবে, যাতে করে সকালে সেগুলো খুঁজতেই মেজাজ চড়ে না যায়।
পরীক্ষার রাতে পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করতে হবে। যাতে হলে গিয়ে ঘুমে চোখ বুঁজে না আসে।

পরীক্ষার দিনে : সকালে সময়মতো ঘুম থেকে উঠে নাশতা করে নিতে হবে। ক্ষুধা নিয়ে পরীক্ষার হলে গেলে শরীর দুর্বল থাকবে, মস্তিষ্কও ঠিকমতো কাজ করবে না। পর্যাপ্ত পানি পান করতে হবে। হলে যাওয়ার জন্য হাতে সময় নিয়ে রওয়ানা হতে হবে। রাস্তায় জ্যাম থাকার সম্ভাবনা থাকলে সে অনুযায়ী আগে বের হতে হবে। হলে যাওয়ার আগে বা ঢোকার সময় প্রার্থনা করে নিবে যেন স্রষ্টা তোমার পরীক্ষা সহজ করেন।
প্রশ্নপত্র নেয়ার সময় হামলে পড়বে না। ধীরস্থিরভাবে প্রশ্ন নিবে। প্রশ্ন নিয়েই হুড়োহুড়ি করে পড়তে শুরু করবে না। চোখ বন্ধ করে একটু দম নিয়ে মনে মনে বলবে- আমার পড়া থেকেই প্রশ্ন আসবে, কমন আসবে ইনশাআল্লাহ। এরপর চোখ খুলে প্রশ্নগুলো পড়বে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত। এরপর কোনটা কোনটা দিবে সেটা সিলেক্ট করবে। যদি প্রশ্ন কমন না পড়ে, টেনশনে পড়ে যাও, অস্থিরতা শুরু হয়, তাহলে আবার স্থির বসে কয়েকবার লম্বা লম্বা শ্বাস নাও, শ্বাস ছাড়ো। দেখবে টেনশন কমেছে। তারপর যে প্রশ্নের উত্তর তোমার সবচেয়ে ভালো জানা আছে, সবচেয়ে ভালোভাবে খাতায় লিখতে পারবে কিংবা তুমি ভাবছো এ প্রশ্নটার উত্তর দেখলে শিক্ষক বেশি খুশি হবে, সেই প্রশ্নের উত্তর দিয়ে লেখা শুরু করবে।
কোনো উত্তর লিখতে গিয়ে কয়েকটা পয়েন্ট মনে আসছে না, সূত্র ভুলে গেছো? তাহলে মনে মনে স্রষ্টাকে স্মরণ করো। তিনি মনে করিয়ে দিবেন।
পরীক্ষা দিতে দিতে ব্রেইন হ্যাং হয়ে গেছে বলে মনে হচ্ছে? তাহলে শিক্ষকের অনুমতি নিয়ে পানি খেয়ে নাও। ভালো লাগবে।
লিখতে লিখতে হাত ব্যথা হয়ে যাচ্ছে? লেখা বন্ধ করে একটু হাতের মুভমেন্ট করো, ম্যাসেজ করো। তাহলে হাত ফ্রি হয়ে যাবে।
পরীক্ষা যদি খুব খারাপ হচ্ছে বলে মনে হয়, তবুও হাল ছেড়ে দেয়া যাবে না। একবার ফেল করার ভয় বা খারাপ হবার ভয় মাথায় কাজ শুরু করলে তখন অল্পস্বল্প যা পারতে, সেগুলোও মাথা থেকে হারিয়ে যাবে। মাথা হ্যাং হয়ে থাকবে, সে আর কাজ করতে চাইবে না। তাই মনে সাহস রাখতে হবে। ভাবতে হবে- যা আছে কপালে! আমি যেটুকু পারি, তার পুরোটা লিখে যাবো।
সবশেষ কথা হচ্ছে, ছাত্রজীবনে পরীক্ষা দিতে হয় পরীক্ষার হলে। আর পরবর্তীতে পরীক্ষা দিতে হয় হলের বাইরে সর্বত্র। তাই পরীক্ষার ভয়ে কেউ নাওয়া খাওয়া ছেড়ে দিয়ো না। পরীক্ষার ভয়ে কখখনো নিজের ক্ষতি করার কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ো না। আজকে পরীক্ষা খারাপ হলে, প্রস্তুতি নাও যেন আগামী পরীক্ষায় সাফল্যের সোনালি আলো যেন তোমার জীবনকে আলোকিত করে।

প্রকাশকাল: অক্টোবর ২০২৫