বার্ষিক পরীক্ষা শেষে অনেকেই গ্রামের বাড়িতে কিংবা পর্যটন কেন্দ্রে ঘুরতে যাও। ধরো, গ্রামের বাড়িতে গেছো। বিস্তীর্ণ ধানের খেতের মাঝখান দিয়ে সরু আইলের উপর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে একটা খাল পড়লো। খালের উপরে বাঁশের কিংবা কাঠের তৈরি সাঁকো। সাঁকো পেরিয়ে ওপারে রাস্তার মাথায় বিশাল বটগাছ। বটগাছের নিচে গিয়ে তোমার মনে পড়ে গেল সেই বন্ধুর কথা যার সাথে চার বছর আগে শেষবার এইখানেই দেখা হয়েছিল। বন্ধুর সাথে এই গাছের নিচে বসে তোমরা আমের ভর্তা খেয়েছিলে, মার্বেল খেলেছিলে কিংবা গুলতি দিয়ে খেলা করেছিলে। তখন বিকেলের ঝিরঝির বাতাস বইছিল। বন্ধুটি তার মায়ের কাছ থেকে আনা দশ টাকা দিয়ে কতগুলো চকলেট কিনেছিল। সেখান থেকে তোমাকেও দিয়েছিল। সেই চকলেটের স্বাদ এখনো মনে পড়ছে! বন্ধুর সাথে বসে দেখছিলে- খালপাড়ে কতগুলো বক মাছ ধরছে। আকাশে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ছে চড়ুই, শালিক আর টিয়ে। সেই যে মধুর স্মৃতি তোমাকে আলোড়িত করলো। তুমি স্মৃতিবিভোর হয়ে গেলে। বাড়িতে গিয়েও তোমার সেই স্মৃতিতে আচ্ছন্নতা কাটছে না। কী করবে? হ্যাঁ, চিঠি লিখে ফেলো।
স্মৃতিকাতর এই মুহূর্তগুলো কখ্খনো মিস করবে না। যার সাথেই এমন আনন্দময়, উচ্ছ্বল সময় কেটেছিল, তার কথা মনে পড়লেই চিঠি লিখে ফেলবে। চিঠি কীভাবে লেখে? বানান ভুল হয় কি না? কীভাবে শুরু, কীভাবে শেষ করতে হয় তা জানো না? কোনো সমস্যা নেই। লেখা শুরু করে দাও, তাহলেই হবে।
স্মৃতিময় চিঠিগুলোর জন্য মূলত চারটি জিনিস লাগে। কবে লিখছো (তারিখ), কখন লিখছো (সময়), কোথায় বসে লিখছো আর মনের অনুভূতিগুলোর খোলামেলা বিবরণ। কবে লিখছো সেটা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পরবর্তীতে এই চিঠিটি রেফারেন্স হিসেবে কাজে লাগতে পারে। সময়টা লিখে দিলে তোমার স্মৃতিকাতরতার সময় এবং প্রাসঙ্গিকতা বোঝা যায়। যদিও বেশিরভাগ চিঠি বিকেল কিংবা রাতেই লেখা হয়। কারণ এই সময়েই মানুষ স্মৃতিকাতর হয় বেশি। কোথায় বসে লিখছো এটাও গুরুত্বপূর্ণ; কারণ এটা তোমার স্মৃতির ইতিহাসের অংশ।
যেমন তুমি তোমার গ্রামের বাড়ি (দাদা/নানা বাড়ি) তে বসে লিখতে পারো। বা কোনো মাঠের পাশে, গাছের ছায়ায় বসে লিখতে পারো, নদীর ধারে বসে লিখতে পারো। লঞ্চ ভ্রমণে গেলে লঞ্চে বসে লিখতে পারো। শৈশবের স্কুলে গেলে সেখানে বসেই কোনো বন্ধুর কথা স্মরণ করে লিখতে পারো। ট্রেনে বসে লেখার অভ্যেস থাকলে সেখানে বসেও লিখতে পারো। চিঠিতে শুরুতেই সেটা উল্লেখ করে দিতে পারো যে ‘অমুক জায়গায় বসে তোমাকে লিখছি’। এতে বন্ধুটি চিঠি পড়ার শুরুতেই একটা স্মৃতির দোল খাবে।
কথাবার্তার শুরুতে আমরা যেমন সালাম দিই, চিঠিতেও শুরুতে সালাম দিবে। আর মনের কথার বর্ণনা বিস্তারিত লিখতে হয়। এক্ষেত্রে কোনো ব্যাকরণ বা ভাষার শুদ্ধতার পরোয়া করতে নাই। কারণ শুদ্ধ ভাষা কখনো কখনো তোমার মনের ভাব প্রকাশে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে, তোমাকে সীমাবদ্ধ করে দিতে পারে। বন্ধুর সাথে কথা বলার সময় যে ভাষায় কথা বলতে, যে আঞ্চলিকতা মিশিয়ে কথা বলতে, সেই টোনেই কথা লিখবে। বন্ধু যেন পড়ে মনে করে যে তুমি তার সাথেই কথা বলছো। তবে হ্যাঁ, অনেক ভাবগভীরতার সাহিত্যিক উপমা আছে, কবিতার লাইন আছে, বিখ্যাত উক্তি আছে সেগুলো তোমার অনুভূতির সাথে মিলে গেলে, তা চিঠিতে ব্যবহার করতে পারো। এতে তোমার চিঠিটিও হয়ে উঠতে পারে সাহিত্যের অংশ।
বন্ধুর কাছে কী লিখবে সেটা নিয়ে অতিচিন্তা করার প্রয়োজন নাই। যা মনে আসে তাই লিখবে। চিঠি যত পৃষ্ঠা হয়, হোক। অথবা একপৃষ্ঠা পুরো হচ্ছে না, আর লিখতে ইচ্ছে হচ্ছে না, থাকুক। আর লেখা লাগবে না। শেষে লিখে দাও, ‘আজ এটুকুই, আবারো লিখবো তোমার কাছে’, ব্যাস। বন্ধুর সাথে কাটানো সময়, ভালো লাগা, মন্দ লাগা, সেই বন্ধুর ব্যপারে অন্য বন্ধুদের কথাবার্তা, মনোভাব, সেই বন্ধুর সাফল্যে তোমার অনুভূতি, তার শোকে কিংবা দুর্ঘটনায় তোমার ব্যথিত হওয়ার স্মৃতি সবই লিখতে পারো। স্কুলে টিচাররা কী করতেন, স্কুল মাঠে কী হতো সবই লিখতে পারো, কোনো নিয়মের বেড়াজাল নেই এখানে। লজ্জার ঘটনা, হাস্যকর ঘটনা সবই লিখতে পারো।
চিঠির শেষে তোমার কোনো আব্দার, আবেদন কিংবা দোয়া দিয়ে শেষ করবে। যেমন- চিঠি পেলে কেমন আছো জানিয়ে চিঠি দিয়ো’। অথবা ‘তোমার সাথে তোমার পাড়ার আরেকটা ছেলে যে আসতো সেই ছেলেটা এখন কোথায়? জানো? ও একবার আমার খুব উপকার করেছিল। ওর নাম ঠিকানা, ফোন নাম্বার থাকলে দিয়ো তো’! কিংবা লিখবে- ‘আল্লাহ তোমাকে সুস্থ রাখুক, সুখে রাখুক’। বা নিজের জন্য দোয়া চাইবে।
চিঠি যে শুধু বন্ধুর কাছেই পাঠাতে হবে এমন কোনো কথা নেই। চিঠি পাঠাতে পারো তোমার চাচা/মামা/খালা কিংবা চাচাতো, মামাতো, খালাতো, ফুপাতো ভাই-বোনদের কাছেও। দাদা, নানা বেঁচে থাকলে তাদের কাছেও পাঠাতে পারো। কোনো প্রিয় শিক্ষকের কাছেও চিঠি পাঠাতে পারো। কিংবা খুব কাছের এলাকার বড় ভাই কিংবা স্কুলের বড় ভাইয়ের কাছেও চিঠি পাঠাতে পারো।
যদি তুমি বাবা-মায়ের কাছ থেকে দূরে থাকো, যেমন বোর্ডিং স্কুল বা স্কুল হোস্টেলে বা ক্যাডেট কলেজ বা আবাসিক মাদ্রাসায় তাহলে বাবা মায়ের কাছে নিয়মিত চিঠি লিখবে।
চিঠি লেখার জন্য আগে আলাদা ডিজাইনের নোট-প্যাড পাওয়া যেত। তখন পত্রিকার পাতায় পত্রমিতালি অর্থাৎ চিঠি বিনিময়ের জন্য অনেকের ঠিকানা দেয়া থাকতো। এখন চিঠি লেখার প্রচলন প্রায় নাই হয়ে গেছে। তাই সেসব প্যাড এখন তেমন একটা পাওয়া যায় না। তাই চিঠি তোমার খাতা, ডায়েরি কিংবা নোটবুক যেখানে খুশি লিখতে পারো। মোবাইলের নোটবুকেও লিখতে পারো। চিঠি লিখতে পারো ইমেইলেও। তবে নিজ হাতে কলম-খাতায় চিঠি লেখার মধ্যে একটা ভালোবাসার নিবিড় স্পর্শ থাকে। যদি তুমি বন্ধুর হাতে লেখা চিঠি পাও, তখন সেটা বুঝতে পারবে। সেটা অন্যরকম ভালোলাগা।
চিঠি পাঠাবে কীভাবে? এখনো ডাক বিভাগ চালু আছে। পোস্ট অফিসে গিয়ে খাম কিনে কিংবা ডাকটিকেট বসিয়ে দিয়ে বন্ধুর ঠিকানায় চিঠি পাঠাতে পারো। কিংবা কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমেও চিঠি পাঠাতে পারো। শহর বা মফস্বল পর্যন্ত কুরিয়ার সার্ভিসের হোম ডেলিভারি আছে; একেবারে বন্ধুর বাসায় চিঠি দিয়ে আসবে। যদি এত কিছু না পারো তাহলে চিঠির ছবি তুলে মেসেঞ্জারে, মেইলে, হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাতে পারো। অথবা সেই চিঠিটা ব্লগে লিখে পোস্ট করতে পারো। তবে ব্যক্তিগত চিঠি ব্যক্তির কাছে পাঠানোই ভালো।
হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জারের যুগে কেন চিঠি লিখতে হবে? আসলে চিঠিতে বিন্দু বিন্দু আবেগে তৈরি একটি সিন্ধু থাকে। মেসেঞ্জারের চ্যাটে বিন্দুগুলো বিন্দু হিসেবেই সেন্ড হয়ে যায়। জমে সিন্ধু হবার, পরিশীলিত হবার সময় পায় না। চিঠির মধ্যে যে আবেগের প্রকাশ ঘটানো যায়, চ্যাটিংএ ততটা ঠিকভাবে করা যায় না। এর বাইরে বললে চিঠি লেখা তোমার লেখার হাতকে শক্তিশালী করবে। তোমার বর্ণনাভঙ্গি সমৃদ্ধ হবে। প্রিয়জনের কাছে চিঠি লিখলে মনের একাকীত্ব দূর হয়। বিষণ্নতা কমে। নিজের লেখা অনুভূতিগুলো তখন নিজের চারপাশে ঘিরে ধরে একান্ত স্মৃতি-সঙ্গী হয়ে।
তাই, আধুনিকতা থেকে দূরে গিয়ে কিছুটা না হয় প্রাচীনপন্থী হও। চিঠি লেখো। এতে সম্পর্ক আরো মজবুত হবে।
আর হ্যাঁ, আমাকেও কিন্তু চিঠি লিখতে পারো। কীভাবে? চিঠির উপরে লিখবে-
শাকের জামিল,
নিজকে গড়ো বিভাগ, মাসিক ফুলকুঁড়ি, ১১৩/১ সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোড, মৌচাক, ঢাকা- ১২১৭।
কী লিখবে? যা খুশি তাই লেখো। তোমার হাসি কান্না, আনন্দ, বেদনা সবই লিখে পাঠাতে পারো। নিজকে গড়ো বিভাগ পড়তে কেমন লাগে তাও লিখতে পারো।
প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৫



