উড়ে যায় ছক্কারা

প্রিয় ফুলকুঁড়ি বন্ধুরা, আজ তোমাদের সাথে এক মজাদার টপিক নিয়ে গল্প করবো। আমাদের মধ্যে তো সবাই খেলাধুলা না করলেও খেলা দেখার মানুষ অনেককেই পাওয়া যাবে, তাই না?
তো ক্রিকেট ইতিহাসের কিছু বড় বড় ছয় হাঁকানোর ঘটনাগুলো নিয়েই আজকের গল্প। যদিও তোমরা অনেকেই এগুলো আগে থেকে জানো তবুও চলো, একটু ভিন্ন আঙ্গিকে জেনে নিই!

১১৯
‘যুবরাজ সিং’ নামটার সাথে তো সবারই পরিচয় থাকার কথা। ২০০৭ সালে স্টুয়ার্ট ব্রডকে টি-২০ বিশ্বকাপে ওভারের ৬ বলে ৬ ছক্কা হাঁকিয়েছিলেন! চাট্টিখানি কথা না কিন্তু! হ্যাঁ, যুবরাজ তার প্রাইমে এমনই অপ্রতিরোধ্য ছিলেন। খেলতেন দৃষ্টিনন্দন সব শট।
তো, ২০০৭ সালের ঐ বিশ্বকাপেই ভারত বনাম অস্ট্রেলিয়া ম্যাচের ৯ম ওভারে বল হাতে এসেছিলেন কিংবদন্তি পেসার ব্রেট লি। প্রথম বলটা করলেন দারুণ লেন্থে। যুবরাজ ডিফেন্স করলেন, বল ব্রেট লির হাতে। তিনিও বল ধরেই ফিরতি স্ট্যাম্পে থ্রো করার ভঙ্গি করে যুবরাজকে উস্কানি দিতে চাইলেন! যুবরাজ কিন্তু শান্তই ছিলেন। মনে মনে যে অন্য এক ছক এঁকেছিলেন। ওভারের শেষ বল করলেন ব্রেট লি, যুবরাজের পায়ের মধ্যে। যুবরাজও সপাটে ফ্লিক শট খেললেন। বল উড়ে গিয়ে টপ গ্যালারিতে পড়লো! স্ক্রিনের নিচে ভেসে উঠলো ‘Last six : 119m’
ব্রেট লির উস্কানির জবাব এর থেকে ভালো আর কী হতে পারে!
১২০
স্টিভ ওয়াহ এবং মার্ক ওয়াহ- দুই ভাইকে অস্ট্রেলিয়ান গ্রেট হিসেবেই সবাই চিনে ও জানে। মার্ক ওয়াহ নিজের ক্যারিয়ারের প্রাইম টাইমে ছিলেন অনবদ্য এক ব্যাটার।
১৯৯৭ সালে অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ডের মধ্যেকার টেস্ট ম্যাচে কিংবদন্তি স্পিনার ড্যানিয়েল ভেট্টরির বলে ডাউন দ্যা গ্রাউন্ডে এসে ১২০ মিটারের একটি বিশাল ছক্কা হাঁকান। টেস্ট ম্যাচের লাল বল, ওডিআই/টি-২০ এর সাদা বল অপেক্ষা তুলনামূলক ভারী। সেজন্য শট খেলাও তুলনামূলক কঠিনই বলা যায়। তবুও এই লাল বলেই মার্ক ওয়াহ হাঁকিয়েছিলেন তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় ছয়টি!
১২২
সময়টা ২০১৪ সাল। ভারত ও নিউজিল্যান্ডের মধ্যেকার ওডিআই ম্যাচ চলছে। ম্যাচের ৪৩তম ওভার করতে এসেছেন ভারতের পেসার মোহাম্মদ শামি। ব্যাটিংয়ে দুর্ধর্ষ কিউই ব্যাটার কোরি অ্যান্ডারসন তখন ১৮ বলে ২৭ করে অপরাজিত। (যদিও তিনি এখন যুক্তরাষ্ট্রের ক্রিকেট দলের হয়ে মাঠ মাতাচ্ছেন)।
যাই হোক। তো ঐ ম্যাচের ৪৩ ওভারের দ্বিতীয় বল করলেন শামি। কোরি অ্যান্ডারসন তার ব্যাট সজোরে টানলেন, বল লেগ সাইডের উপর দিয়ে একেবারে স্টেডিয়ামের ছাদে! ১২২ মিটারের বিশাল ছক্কা।

১২২
এবার শোনো আরেকটি ম্যাচের ঘটনা। ২০২১ সালে ইংল্যান্ড ও পাকিস্তানের মধ্যকার টি-২০ ম্যাচে ১৬তম ওভারে আসলেন পাকিস্তানের স্পিডস্টার হারিস রউফ। ব্যাটিংয়ে লিয়াম লিভিংস্টোন! ওভারের ১ম বলেই স্ট্রেইট ১২২ মিটারের সিক্স! হারিস রউফ আর তাকিয়েও দেখলেন না যে বল কোথায় গেল! একেবারে স্টেডিয়ামের ছাদে!

১২৭
এবারে আরেক নিউজিল্যান্ড ব্যাটার, মারকুটে ওপেনার মার্টিন গাপটিল ব্যাটিংয়ে। নিউজিল্যান্ড ও সাউথ আফ্রিকার মধ্যকার ম্যাচ। বোলিংয়ে লনওয়াবো সোৎসোবি! (Lonwabo Tsotsobe উচ্চারণ করতে ছোটবেলায় অনেকেরই দাঁত আস্ত থাকেনি মনে হয়!)
তো ৬ষ্ঠ ওভারের ৫ম বলে মার্টিন গাপটিল লেগ সাইডে এমনভাবে টানলেন যে বল স্টেডিয়ামের একদম টপে লেগে পুনরায় মাঠে ফিরে এলো! ১২৭ মিটারের সিক্স শুধুই চেয়ে চেয়ে দেখলেন ফিল্ডাররা।

১৩০
এটাও এক কিউই বোলিং অলরাউন্ডারের- ‘জ্যাকব ওরাম’। তোমরা কেউ ২০১০ এর আগে খেলা দেখে থাকলে তারা হয়তো চিনবে ভালো করে। মূলত বোলার, তবে ব্যাটটাও চালাতে পারতেন ভালোই। বাঁহাতি ব্যাটার এবং ডানহাতি ফাস্ট বোলার ছিলেন ওরাম।
তো অস্ট্রেলিয়া বনাম নিউজিল্যান্ডের মধ্যেকার টি-২০ ম্যাচে মিচেল জনসনের বলে জ্যাকব ওরামের মিডউইকেট অঞ্চলে হাঁকানো ১৩০ মিটার ছক্কাটি এখনো বিখ্যাত!

১৪৩
দি গ্রেট ‘ব্রেট লি’কে তো সবাই চিনো। অস্ট্রেলিয়া দলে ব্রেট লি এবং শন টেইট একত্রে বোলিং করলে বিপক্ষ দলের পায়ে কাঁপুনি ধরতে বাধ্য!
অস্ট্রেলিয়া বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের মধ্যকার টেস্ট ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার রান তখন ৮ উইকেটে ৪ শতাধিক অতিক্রম করেছে। ব্রেট লি ব্যাটিং প্রান্তে আর বোলিং করছেন ড্যারেন পাওয়েল। ব্রেট লি মিড উইকেটের ওপর দিয়ে স্টেডিয়ামের বাইরের প্র‍্যাকটিস গ্রাউন্ডে আছড়ে ফেললেন একদম! তখনও ছক্কাটি কত বড় তা জানা যায় না। পরে অবশ্য ক্রিজ থেকে প্র‍্যাকটিস গ্রাউন্ডের দূরত্ব মেপে জানতে হয়েছিল।

১৫৮
এবারে বলবো সবচেয়ে বড় ছক্কাটির ঘটনা।
জোহানেসবার্গের স্টেডিয়াম, ২০১৩ সালের ১৭ই মার্চ। সাউথ আফ্রিকা বনাম পাকিস্তানের ওডিআই সিরিজে পাকিস্তান ইতোমধ্যে ২-০ তে পিছিয়ে আছে।
৩য় ম্যাচে পাকিস্তানকে ৩৪৪ রানের বিশাল টার্গেট দিয়েছে সাউথ আফ্রিকা। এদিকে পাকিস্তানের ব্যাটাররাও খুব দ্রুত আউট হয়ে যাচ্ছিলো। এক প্রান্তে একাই লড়ে যাচ্ছিলেন শহীদ আফ্রিদি। পর্যাপ্ত উইকেট না থাকায় ২৫ ওভারের দিকেই ব্যাটিং পাওয়ারপ্লে­ নিয়েছিলেন আফ্রিদি ও মিসবাহ উল হক।
তখনকার সময়ে ম্যাচের প্রথম ১০ ওভার ম্যান্ডাটোরি পাওয়ারপ্লে­ থাকতো। আবার ইনিংসের শেষে ১০ ওভারের দ্বিতীয় পাওয়ারপ্লে থাকতো। তবে ব্যাটাররা চাইলে ম্যাচের যেকোনো সময় দ্বিতীয় পাওয়ারপ্লে নিতে পারতো।
যাই হোক, আবারও ম্যাচে ফিরে আসি!
মিসবাহর আউটের মাধ্যমে ৬ষ্ঠ উইকেটের পতন হয়। ক্রিজে ওয়াহাব রিয়াজকে নিয়ে লড়াই চালিয়ে যান আফ্রিদি। ম্যাচের ৩৫তম ওভারে রায়ান ম্যাকলারেন এসেছেন বোলিংয়ে। ওভারের শুরু থেকেই বেধড়ক পেটাতে শুরু করেন আফ্রিদি। প্রথম বলে চার, দ্বিতীয় বল ডট, তৃতীয় বলে সিক্স, চতুর্থ বলে আফ্রিদি সজোরে হাঁকাতে গিয়ে ইনসাইড এজ হয়ে একেবারে বোল্ড। গ্যালারিতে থাকা সাউথ আফ্রিকার দর্শকেরা উল্লাসে ফেটে পড়লো।
সোজা প্যাভিলিয়নের পথে হাঁটা ধরলেন তিনি। কিন্তু আম্পায়ার বিলি বাউডেন পথ আটকালেন। রিভিউতে দেখা গেলো বলটি নো হয়েছে। আফ্রিদি আবারো ক্রিজে ফিরলেন। মাথার সুন্দর চুলে হাত বুলিয়েই হেলমেট পরে নিলেন আবার। এবারের বল তো ফ্রি হিট! ম্যাকলারেন বল করলেন। কিন্তু এবার ওয়াইড। অর্থাৎ আবারও ফ্রি হিট। ম্যাকলারেন বল করলেন; এবারে একদম স্টাম্পে পড়লো বল। বুম বুম আফ্রিদিও সাথে সাথে সজোরে হাঁকালেন। ব্যাটে-বলের অসাধারণ টাইমিংয়ের ফলস্বরূপ বল হাওয়ায় ভাসছে আর যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। কিপিং থেকে এবি ডি ভিলিয়ার্স, লং অনের ফিল্ডার ফাফ ডু প্লেসি, এমনকি কোচ গ্যারি কারস্টেনও অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে তাকিয়ে শুধুই দেখলেন। বল স্ট্রেইট স্টেডিয়ামের উপরের ছাদে কয়েকটা লাফ দিয়ে ক্যামেরার দৃষ্টিসীমারও বাইরে চলে গেলো। আম্পায়ার বিলি বাউডেন তার ঐতিহাসিক স্টাইলে হাত তুলে জানান দিলেন ছক্কা! ১৫৮ মতান্তরে ১৫৩ মিটারের বিশাল ছক্কা।
ধারাভাষ্যকার তো বলেই ফেললেন : ‘There are times when a shot deserves more than six!’

শেষমেশ আফ্রিদি ম্যাচটি জিতাতে পারেননি। ৪৮ বলে ৭টি ছক্কা ও ৫টি চারে ১৮৩ স্ট্রাইকরেটে ৮৮ রান করে ক্যাচ আউট হয়ে মাঠ ছাড়তে হয়েছিলো। আর পাকিস্তানও ৩০৯ রানে অলআউট হয়ে ৩৪ রানের পরাজয় বরণ করে।

বন্ধুরা, এই ছিলো ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় কয়েকটি ছক্কার গল্প। ভালো থেকো সবাই।

প্রকাশকাল: নভেম্বর ২০২৫