কেপ ভার্দে নামের যে একটি দেশ পৃথিবীতে আছে তা ক’জনই বা জানতো। উন্নত বিশ্বের অনেকে হয়তো জানতেন। কারণ আটলান্টিক মহাসাগরের বুকে ১০টি দ্বীপ নিয়ে গড়া এই দেশটিতে ইউরোপ-আমেরিকার ভ্রমণপিপাসু লোকেরা বেড়াতে গিয়ে থাকেন প্রায়ই। পর্যটন খাত থেকেই এ দেশের সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক মূদ্রা আয় হয়। আমাদের যেমন আয় হয় প্রবাসীদের পাঠানো অর্থ থেকে- যাকে আমরা রেমিট্যান্স বলে থাকি। অবশ্য এ দেশটিরও অর্ধেক মানুষ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। নানাভাবে অর্থ উপার্জন করে দেশে পাঠায় তারা। তো হঠাৎ এই কেপ ভার্দে নামের দেশটি নিয়ে আলোচনা কেন? হ্যাঁ, তোমাদের মধ্যে যারা খেলাধুলা নিয়ে; বিশেষ করে ফুটবল নিয়ে খোঁজ-খবর রাখো তারা এরই মধ্যে নিশ্চয়ই জেনে গিয়েছ দেশটির নাম।
গত ১৩ অক্টোবর এই কেপ ভার্দে বিশ্বের সকল সংবাদমাধ্যমে জায়গা করে নেয় খেলার সাফল্য দিয়েই। ওই দিন তারা ২০২৬ সালে যে বিশ্বকাপ ফুটবল প্রতিযোগিতা হবে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা আর মেক্সিকোতে; তাতে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে নিয়েছে। বাছাই পর্বে আফ্রিকা অঞ্চলের ডি গ্রুপে খেলেছে কেপ ভার্দে। এই গ্রুপেই ছিল অদম্য সিংহ নামে পরিচিত বিশ্বকাপে সাড়া জাগানো দেশ ক্যামেরুন। আফ্রিকা থেকে সবচেয়ে বেশি আট বার তারা বিশ্বকাপে খেললেও এবার তারা কেপ ভার্দের সাথে পেরে ওঠেনি। চার পয়েন্ট পেছনে পড়ে যায় তারা। সেপ্টেম্বরে রাজধানী প্রাইয়াতে নিজেদের মাঠে ক্যামেরুনকে ১-০ গোলে হারানোর পরেই কেপ ভার্দের বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্নটা বাস্তবের কাছাকাছি চলে আসে। পরের দুই ম্যাচের একটিতে জিতলেই কেল্লাফতে হবে। কিন্তু পরের ম্যাচে শক্তিশালী লিবিয়ার মাঠে গিয়ে ৩-৩ গোলে ড্র করায় শেষ ম্যাচ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় তাদের।
১৩ অক্টোবর ছিল তাদের স্বপ্ন পূরণের দিন। নিজেদের মাঠে খেলা। ১৫০০০ দর্শক ধারণ ক্ষমতার জাতীয় স্টেডিয়াম ছিল কানায় কানায় ভর্তি। দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে মারিয়া নেভেসও মাঠে ছিলেন ইতিহাসের সাক্ষী হওয়ার জন্য। সেদিন তাদের প্রতিপক্ষ ছিল গ্রুপের দুর্বলতম দল ইসওয়াটিনি, যে দেশটির নামও আমাদের কেউ আগে শুনেছে কি না সন্দেহ। তবে তারাও কম যায়নি। প্রথমার্ধে কোনো গোল করতে পারেনি কেপ ভার্দে। দেশটির সমর্থকেরা তাই ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কারণ জিততেই হতো তাদের। তবে শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয়ার্ধে তারা ৩ গোল দিয়ে জয় ছিনিয়ে নেয়। সাথে সাথে আনন্দে উল্লাসে মেতে ওঠে গোটা দেশ।
আগামী বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দেশ খেলার সুযোগ পাচ্ছে। আগে ৩২টি দেশ খেলতে পারতো। কেপ ভার্দের অবস্থান আফ্রিকার পশ্চিম দিকে যেখান থেকে ইউরোপ মহাদেশের কাছে হলেও এটি আফ্রিকা মহাদেশের অন্তর্ভূক্ত। আগে আফ্রিকা থেকে বিশ্বকাপে ৫টি দেশ খেলার সুযোগ পেত। এবার খেলবে আটটি দেশ। তাহলে কেপ ভার্দেকে নিয়ে এত আলোচনা কেন? কারণ এই দেশটির জনসংখ্যা। দেশটির আয়তন মাত্র ৪০৩৩ বর্গ কিলোমিটার। এই দেশের মোট মানুষ হলো মাত্র ৫ লাখ ২৫ হাজার। বাংলাদেশের খুব কম উপজেলা আছে যেখানে এর চেয়ে কম মানুষ বাস করে। আমাদের ঢাকার মেট্রোরেলেই প্রতিদিন গড়ে চার লাখের বেশি লোক যাতায়াত করে। বিশ্বকাপ ফুটবলের ইতিহাসে এর চেয়ে কম জনসংখ্যা নিয়ে মাত্র একটি দেশ চূড়ান্ত পর্বে খেলার এই কৃতিত্ব অর্জন করতে পেরেছে। সেই দেশটি অবশ্য কম পরিচিত নয়। ইউরোপের সেই দেশ আইসল্যান্ড ২০১৮তে রাশিয়া বিশ্বকাপে যখন খেলার যোগ্যতা অর্জন করে তখন দেশটির মোট জনসংখ্যা ছিল মাত্র তিন লাখ ৫০ হাজার।
মজার ব্যাপার হলো কেপ ভার্দে দলের বেশির ভাগ খেলোয়াড়ই বিশ্বের বিশেষ করে ইউরোপ ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে খেলে থাকে। আর আমাদের দেশের জাতীয় দলে এখন যেমন প্রবাসী ফুটবলারের সংখ্যা বাড়ছে তেমন ওদের দেশের শক্তিও প্রবাসী ফুটবলাররা। যেমন, কেবল এই একটি খেলার জন্য আয়ারল্যান্ড থেকে উড়িয়ে এনেছিল রবার্তো লোপেজকে। তিনি আইরিশ লীগের শীর্ষ দল শার্মক রোভার্সে খেলেন। এই ম্যাচে খেলেই তিনি পাড়ি জমান আয়ারল্যান্ডে। বর্তমান জাতীয় দলের ২৬ জনের ৬ জনই খেলেন পর্তুগালের লীগে। ৩ জন করে ইসরাএয়ল, তুরস্কে, একজন করে সৌদি আরব, হাঙ্গেরি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসে খেলেন। কেপ ভার্দে জাতীয় লীগ হয় ১২ দলে।
কেপ ভার্দে দেশটি দীর্ঘদিন পর্তুগালের দখলে ছিল। ১৯৭৫ সালে তারা স্বাধীনতা লাভ করে। অর্থাৎ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্ণ হলো এবারই। দারুণ এক অর্জন দিয়ে উদযাপন করবে দেশবাসী তাদের ৫০ বছর পূর্তি উৎসব। স্বাধীনতার ৩ বছর পর ১৯৭৮ সালের ২৯ মে গিনির বিপক্ষে প্রথম আন্তর্জাতিক ফুটবল খেলে কেপ ভার্দে। দেশটির ফুটবল ফেডারেশন গঠিত হয় ১৯৮২ সালে আর ফিফার সদস্যপদ লাভ করে তারা ১৯৮৬ সালে। বিশ্বকাপ বাছাইয়ে প্রথম অংশ নেয় ২০০২ আসরের জন্য। ২০১৩ সালে আফ্রিকান নেশন্স কাপে প্রথমবার খেলতে এসেই কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় তারা। ২০২৩ আসরেও তারা কোয়ার্টার ফাইনালে উঠেছিল। বর্তমানে ফিফা র্যাংকিংয়ে কেপ ভার্দের অবস্থান ৭০ নাম্বারে। কেপ ভার্দে দলটি ব্লু শার্ক নামে পরিচিত।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫



