কী? শোনা শোনা লাগছে না?
হ্যাঁ, ঠিকই ধরেছো। আব্রহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স ওরফে এবিডি ভিলিয়ার্স, যিনি সারা বিশ্বের মানুষের কাছে মি. ৩৬০ডিগ্রি হিসেবে পরিচিত। সেটা কেন, তা তো আমরা সবাই জানি। কিন্ত শুধু ক্রিকেটের ৩৬০ডিগ্রি নয়, বরং তিনি যে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই মি. ৩৬০ ডিগ্রি; সেটা নিয়েই আজকের গল্প।
এবিডি ভিলিয়ার্স, যিনি শুধু একজন ক্রিকেটারই নন। বরং একাধারে একজন ফুটবলার, রাগবি প্লেয়ার, গলফার, সাঁতারু, টেনিস খেলোয়াড়, হকি খেলোয়াড় এবং একজন গায়কও! শুধু তাই নয়। তিনি মেধার পরিচয় দিয়ে জাতীয় বিজ্ঞান প্রজেক্টের জন্য পেয়েছেন ‘মেন্ডেলা অ্যাওয়ার্ড’ও।
১৯৮৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন এবি। বাবা একজন রাগবি প্লেয়ার হওয়ার দরুণ তিনিও রাগবিতে আগ্রহী ছিলেন। তিনি জুনিয়র রাগবি টিমের নেতৃত্বও দিয়েছেন। ছোটবেলায় এসবের পাশাপাশি সাঁতার, টেনিস, হকিতেও ছিলো তার বড় আগ্রহ। তিনি জুনিয়র সাঁতার প্রতিযোগিতায় পুরস্কারও জিতেছেন। জাতীয় হকি দলে ক্যাম্পও করেছেন, তেমন জাতীয় ফুটবল দলেও ডাক পেয়েছিলেন। আবার টেনিসের জন্য তাকে একজন সম্ভাবনাময় প্লেয়ার হিসেবেই বিবেচনা করা হতো। এছাড়া বয়সভিত্তিক ব্যাডমিন্টন টুর্নামেন্টেও হয়েছিলেন চ্যাম্পিয়ন।
তার এই বহুমুখী প্রতিভার ভিড়ে নতুন মাত্রা যুক্ত হয় স্কুলের সহপাঠী ফাফ ডু প্লেসির মাধ্যমে। ডু প্লেসি তাকে ক্রিকেটের প্রতি আগ্রহী করে তোলেন। ওপেনিং ব্যাটিং এবং উইকেট কিপিংটা ভালোভাবেই করতে শুরু করেন। খুব দ্রুতই অনূর্ধ্ব-১৪ দলে ডাক পান। ২০০৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ দলে ভালো ক্রিকেট খেলার ফলে ২০০৪ সালেই তার আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়। তারপরে কিছু খারাপ সময় গেলেও পুরো ক্যারিয়ার জুড়েই এবি ছিলেন উজ্জ্বল তারকা। তার ক্রিকেট ক্যারিয়ারের ব্যাপারে তো আমরা সবাই কমবেশি জানি। তবুও এমন কিছু ঘটনা আছে, যেগুলো তোমাদের স্মরণ করিয়ে না দিলেই নয়!
আমরা তো এবিকে মাঠের চতুর্দিকে সমানতালে শট খেলার জন্যেই ৩৬০ডিগ্রি বলি। তিনি একদিকে যেমন বোলারদের বেধড়ক পেটাতে পারতেন, অন্যদিকে দূর্ভেদ্য দেয়ালও তৈরি করেছেন বহুবার। চলো একটি মুহূর্ত তুলে ধরি!
২০১৫ সালে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচের প্রথম ইনিংসে দক্ষিণ আফ্রিকা দাঁড়াতেই পারেনি। মাত্র ১২১ রানে অলআউট হয়ে যায়। সেজন্য দ্বিতীয় ইনিংসে ম্যাচ ড্র করার লক্ষ্য নিয়ে হাশিম আমলা ও এবি মিলে গড়ে তুলেছিলেন বাস্তিল দূর্গ! হাশিম আমলা ২৪৪ বলে ২৫ রান করে আউট হয়ে গেলেও এবি মাটি কামড়ে পরে ছিলেন। ৩৫৪ মিনিট ব্যাট করে ২৯৭ বলে ৪৪ রান করে এবি আউট হয়ে গেলে দক্ষিণ আফ্রিকার আর শেষ রক্ষা হয়নি। ১৪৩.১ ওভার খেলে ১৪৩ রানেই অলআউট হতে হয় প্রোটিয়াদের।
টেস্টে এবির এমন ইনিংস আরো অনেক আছে যেগুলোতে তার স্ট্রাইক রেট ১৯ এর নিচে। এতো কম স্ট্রাইক রেটে এমন ইনিংস খেলেছেন প্রায় ১৫টি।
রান করার দিক থেকেও ছিলেন অত্যন্ত ধারাবাহিক। টেস্টে টানা হাফসেঞ্চুরি করা প্লেয়ারদের তালিকায় রয়েছেন সবার উপরে। একটানা ১২ ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি।
আবার ওয়ানডেতে তার ১৫০ এর উপরে স্ট্রাইক রেটের ইনিংস আছে ১৬টি। ২০১৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বোলারদের চোখে সরষে ফুল দেখিয়ে দিয়েছিলেন এবি। করেছিলেন ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম ওয়ানডে সেঞ্চুরি। সেদিন ইনিংসের ৩৯তম ওভারে ব্যাট করতে ক্রিজে আসেন এবি। এসেই তাণ্ডব শুরু করেন। ১৬ বলে দ্রুততম অর্ধশতক পূরণ করেন। পরের ১৫ বলে করেন সেঞ্চুরি। মোট ৩১ বলে করেন ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরি। ইনিংস শেষ করেন ৯টি চার এবং ১৬টি ছক্কায় ৪৪ বলে ১৪৯ রানে!! দক্ষিণ আফ্রিকা পায় ৪৩৯ রানের পাহাড় সমান সংগ্রহ।
ক্যারিয়ারে ওয়ানডেতে ২১৮ ইনিংস খেলে ৫৩ গড়ে, ২৫টি সেঞ্চুরি ও ৫৩টি হাফ সেঞ্চুরিতে করেন ৯৫৭৭ রান; টেস্টে ১১৪ ম্যাচে ৫০ গড়ে, ২২টি সেঞ্চুরি ও ৪৬টি হাফ সেঞ্চুরিতে করেন ৮৭৬৫ রান; টি-২০ তে ৭৮ ম্যাচে ১৬৭২ রান।
এবিডি ভিলিয়ার্স শুধু ব্যাটিং নয় বরং ফিল্ডিং, কিপিং, বোলিংয়েও দলে অবদান রেখেছেন। সব ফরম্যাট মিলিয়ে ‘ফিল্ডারের’ ভূমিকায় নিয়েছেন ২৩৮টি ক্যাচ এবং ‘উইকেটকিপার’ হিসেবে তাঁর ঝুলিতে রয়েছে ২৩১টি ডিসমিসাল।
ক্রিকেট জীবনের বাইরে তিনি ছিলেন একজন পুরোদমের গলফার। গলফ খেলতে তিনি খুব পছন্দ করতেন। সুযোগ পেলেই চলে যেতেন গলফ খেলতে।
এবি ২০১৮ সালে আন্তর্জাতিক এবং ২০২১ সালে পেশাদার ক্রিকেট থেকে অবসর নেন। তবে তিনি এখনও ফুরিয়ে যাননি। সম্প্রতি সাবেক প্লেয়ারদের নিয়ে আয়োজিত লিজেন্ডস লিগেও হাঁকিয়েছেন সেঞ্চুরি।
এবি তার অবসরে গিটারের ছন্দে মেতে উঠতেন। শুধু মেতেই থাকেননি, বন্ধু অ্যাম্পি ডু প্রিজের সাথে মিলে ‘Make Your Dream Come True’ নামে একটি অ্যালবামও বের করেছেন ইতোমধ্যেই।
এগুলোর বাইরে দাতব্য কাজেও তিনি ছিলেন অগ্রগামী। সাবেক রাগবি তারকা ফ্রঁসোয়া পিয়েনারের সাথে মিলে ‘Make A Difference’ নামের একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন ডি ভিলিয়ার্স; যারা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের বিনামূল্যে পড়ালেখার সুযোগ করে দেয়। তিনি নিজেও কয়েকজনের দায়িত্ব নিয়েছেন।
২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এবিডি ভিলিয়ার্সের ‘AB: The Autobiography’ নামে একটি আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
এবিডি ভিলিয়ার্স; এমন একজন যে তার জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই এমনভাবে পদচারণা করেছেন যে, সাফল্য তাকে ধরা দিয়েছে। তার মতো হওয়া কি সহজ?
সেটা কিংবদন্তি অলরাউন্ডার জ্যাক ক্যালিসের ভাষায় শুনো,
“আপনি ক্রিকেটার ডি ভিলিয়ার্স হওয়ার স্বপ্ন দেখতে পারেন, কিন্তু ব্যক্তি ডি ভিলিয়ার্স নয়।”
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৬



