সকাল ছয়টা। আকাশে কেবল সূর্য উঠেছে। ভোরের সূর্য। পাকা আমের মতো টুকটুকে লাল। এই কাক ডাকা ভোরেই পশুপাখিরা রাজবাড়ি এসে জড়ো হয়েছে। রাজা মশাই-ই তাদের ডেকেছেন। বলেছেন, জরুরি কথা আছে।
পশু পাখিরা চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রাজবাড়ি দেখছে—
কী বিশাল বড় বাড়ি!
তেমনি পরিপাটি। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। গাছে গাছে ফুল। কাঁচাপাকা ফল। সবুজ পাতায় নরম রোদের আঁকিবুকি।
এমন গুছানো বাড়ি দেখে তারা বেশ অবাক হয়। একে অপরকে বলে- দেখলে, রাজা মশাইয়ের বাড়িটা কেমন ঝকঝকে। তকতকে। কোথাও এক চিমটি ময়লা নেই।
ওরা ভেবেছিল— বাড়ির এখানে ওখানে হাড়গোড় পড়ে থাকবে। খরগোশের দাঁত, হরিণের সিং, বকের ঠোঁট পড়ে থাকবে। বনের রাজা সিংহ। রোজই তো শিকার করেন। তাই না?
আসলে সিংহ মামা ছিলেন পরিবেশবাদী। তিনি সবসময় বাড়ি-ঘর সাফ রাখেন। কোথাও ময়লা হতে দেন না। তোমরাও বাড়ি—ঘর সাফ করে রাখবে। কেমন?
সিংহ মামা ঘর থেকে বের হয়ে এলেন। সবার কুশল জানতে চেয়ে বললেন- আপনারা ভালো আছেন? আসতে কোনো অসুবিধা হয়নিতো?
পশুপাখিরা বলল, না না রাজা মশাই। আমাদের কোনো অসুবিধা হয়নি।
তখন সিংহ মামা বললেন- বেশ বেশ। এবার হালকা নাশতা করে নিন।
এই বলে তিনি কাঠবিড়ালীদের ডাকেন- কই তোমরা? জলদি খাবার নিয়ে আসো।
সাথে সাথেই এক দল কাঠবিড়ালী হাজির। তাদের হাতে থালা ভর্তি খাবার। পোলাও-কোরমা, মাছ-মাংস, ফিরনি-পায়েশ আরও কত কী!
সবাই পেট ভরে খেলো।
এরপর সিংহ মামা বললেন, বনে একটা ইশকুল করব ভাবছি। আপনারা কী বলেন?
ইশকুলের কথা শুনে খরগোশ খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। বলে, ভালোই হবে রাজা মশাই। আমাদের ছানারা পড়াশোনা করতে পারবে।
আর হরিণ বলল, একটু আদব কায়দাও শিখতে পারবে।
বাকিরাও নিজ নিজ অভিমত জানালো। শুধু হাতিটাই ঘুমিয়ে থাকল। তারই বা কী দোষ, বলো? যেভাবে গলা অবধি খেয়েছে। ঘুম তো আসবেই। তাই না?
হাতির প্রিয় খাবার কী, জানো?
কলাগাছ।
কলাগাছ পেলে ওর আর কিছুই লাগে না।
সিংহ মামা হাতিকে ডাকেন, ও হাতি ভাই। তুমি কিছু বলো।
তার ডাক শুনে হাতি হাই তুলে বলল, আমার কিছু বলার নেই রাজা মশাই। আপনার যা মন চায় করুন। আমাকে শুধু পেট ভরে খেতে দিলেই হবে।
তার কথা শুনে সবাই হেসে ওঠে। কী পেটুক রে বাবা!
ইশকুলের কাজ শুরু হলো।
হাতি নিয়ে এলো বড় বড় গাছ। তা থেকে বের করা হলো কাঠ। সেই কাঠ দিয়ে তৈরি করা হয় ইশকুলের দেয়াল।
হরিণ আর বানর নিয়ে এলো বাঁশ। তা দিয়ে তৈরি হলো চাল।
তখন সিংহ মামা বললেন- ইশকুল তো হলো। এবার টিচার হবেন কে?
হরিণ বলল, আমাদের ভালুক দাদু। তিনি অনেক পড়াশোনা করেন। বাড়িতে হাজারটা বই। দিনরাত সেসব নিয়েই পড়ে থাকেন। তিনি টিচার হলে ছানাদের খুব উপকার হবে।
ময়না-টিয়েও সায় দিয়ে বলল, ঠিক ঠিক। ভালুক দাদু টিচার হলে ছানাদের উপকার হবে।
সিংহ মামা বললেন- বেশ বেশ। ভালুক দাদুই টিচার হবেন।
এবার পড়াশোনার পালা।
ছেলেমেয়েরা ইশকুলে এলো। দূরের বন থেকে কুমিরও এলো দুই ছানা নিয়ে। ভালুক দাদু তাদের হাতে নতুন বই তুলে দেন। তারপর কলাপাতায় বড় করে লিখেন— ‘অ’।
ছানারা জানতে চাইলো- টিচার, এটা কী?
ভালুক দাদু বললেন, এটা বাংলা বর্ণমালার প্রথম বর্ণ। নাম তার ‘স রে অ’।
অ-তে কী হয়, জানো?
ছানারা না-সূচক মাথা নাড়াল। তাতে ভালুক দাদু একটুও রাগ করেন না। মুচকি হেসে বললেন, কোনো ব্যাপার না। আমিই বলছি। অ-তে হয় অরণ্য। অরণ্য মানে বন।
তা শুনে বানরছানা লাফিয়ে ওঠে। বলে, আমাদের বন?
ভালুক দাদু বললেন- হুম, আমাদের বন। এই বনই আমাদের সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা। বন আমাদের সাইক্লোনের মতো ঝড় থেকে বাঁচায়। বন আমাদের ছায়া দেয়। খাবার দেয়। থাকার জায়গা দেয়। বন আছে বলেই আমরা ভালোভাবে বেঁচে আছি। তাই আমাদের উচিত, বনকে ভালোবাসা। ভালো রাখা।
অ-তে আর কী হয়, টিচার?
অজগর ছানা মাথা তুলে জানতে চাইল। ভালুক দাদু বললেন, অ-তে হয় অজগর।
নিজের নাম শুনে অজগর ছানা কী যে খুশি হয়। খুশিতে নাচতে শুরু করে। আর বলতে থাকে, অ-তে আমি হই। কী মজা! কী মজা!
তার নাচ দেখে সবাই হেসে ওঠে। তখন ভালুক দাদু বললেন, বাবুসোনারা। এবার একটা ছড়া শোনো। তারপরই তোমাদের ছুটি।
ভালুক দাদু ছড়া ধরেন—
আমরা বনের পশুপাখি
মিলে মিশে থাকব
সবুজ পাতায় নদীর জলে
বনের ছবি আঁকব।
ছড়া শেষ হতেই ছুটির ঘণ্টা বেজে ওঠে—ঢং ঢং ঢং।
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৬



