১.
কুয়াশামাখা শীতের ভোর। মহাসড়ক ধরে দ্রুত হেঁটে চলছেন বৃদ্ধ আলফাজ তালুকদার। খেজুর গাছ থেকে দ্রুত রস নামিয়ে নিয়ে আসতে হবে। গতকাল আবার ঢাকা থেকে নাতি-নাতনিরা এসেছে। এসেই দাদাভাইয়ের কাছে আবদার, দাদু, রস খাবো।
নাহ, আজকে মনে হয় বের হতে একটু দেরিই হয়ে গিয়েছে। আরেকটু ভোরে বের হতে হতো, ভাবলেন আলফাজ সাহেব।
রসের হাঁড়িতে হাত দিতেই চমকে উঠলেন তিনি। এ কী! মাত্র এতটুকু রস জমেছে কেন? সারারাতে তো এতো কম রস হওয়ার কথা না। মেজাজটাই খারাপ হয়ে গেলো তার। কিন্তু কী আর করার? যেটুকু হয়েছে, তাই নিয়ে যাই, ভাবলেন তিনি।
দড়ি খুলতেই কিছু একটা লাফ দিয়ে পায়ের নিচে মাটিতে পড়লো। নিচে তাকাতেই আজকের সকালটা দ্বিতীয়বারের মতো চমকে দিলো তাকে।
আচ্ছা, খেজুরগাছে টাকা ধরা শুরু হলো কবে থেকে?
২.
শীতের শুরুতেই ভেবে রেখেছিলাম উত্তরবঙ্গ যাবো। ঢাকায় বসে শীতটা যেন ঠিক গায়ে লাগে না। কিন্তু উপলক্ষও তো লাগবে যাওয়ার।
হুট করেই শাফিনের কল। তার বোনের বিয়েতে নাকি যেতেই হবে। ব্যস, পেয়ে গেলাম এক ঢিলে দুই পাখি মারার মওকা। শাফিনের গ্রামের বাড়ি রাজশাহীর গোদাগাড়ীতে। বিয়েও খাওয়া হবে, আবার শীতও উপভোগ করা যাবে জম্পেশ।
রাত দেড়টা। একটা মাইক্রোবাসে করে ঢাকা ফিরছি আমরা সাত বন্ধু। দিনভর বিয়েতে আনন্দ-উল্লাস আর খাওয়াদাওয়া, এরপর সন্ধ্যায় রাজশাহী শহরে এসে পদ্মাপাড়ের পদ্মাবিলাস, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরাঘুরি করতে করতে কখন যে রাত বারোটা বেজে গেল, বুঝতেই পারিনি আমরা। অবশ্য আমরা একটু রাত করেই ঢাকায় রওনা দেয়ার পরিকল্পনা করে রেখেছিলাম আগে থেকেই। না হলে ভোর তিনটায় বাসায় নেমে গেটম্যানকে দরজা খোলার অনুরোধ করতে গিয়ে ঝাড়ি খাওয়ার কোনো দরকার আছে, বলো?
গাড়িতে উঠে কিছুদূর যাওয়ার পর খেয়াল হলো, আরে! আমরা তো খেজুরের রস খেতেই ভুলে গিয়েছি। কীসের শীতবিলাস করলাম তাহলে? মনটাই তেতো হয়ে গেলো সবার। সারাদিনের যে উচ্ছ্বাস ছিল আমাদের মধ্যে, নিমিষেই মাটি হয়ে গেল সব।
এমন সময় শাহিদ বললো, না রে। সবকিছু শেষ হয়ে যায়নি এখনও। এখনও সুযোগ আছে।
তামীম : ওই ঢাকায় গিয়ে রস খাওয়ার কথা বলছিস? ওইসব চিনিমেশানো রস খাবি তুই? তোর রুচি এতো খারাপ? ছ্যা ছ্যা ছ্যা…।
শাহিদ : এই, আমার রুচি নিয়ে কথা বলবি না, খবরদার। আমরা রাতেই খেজুরের রস খাবো, এবং ঢাকা পৌঁছানোর আগেই।
ঢাকা যাওয়ার আগে কীভাবে খেজুর রস খাবো, তা আমাদের কারো মাথায় ঢুকলো না। এতো রাতে রস পাবো কোথায়? সবাই মিলে ছেঁকে ধরলাম শাহিদকে।
শাহিদ : আচ্ছা শোন। সকালে আসার সময় নাটোরে রাস্তার পাশে অনেক খেজুরের গাছ দেখেছিলাম। এখন রাতের বেলা সেসব গাছে রসের হাঁড়ি লাগানো আছে নিশ্চিত।
মুশফিক : তাই বলে রস চুরি করবি?
তামীম : ভাবতেই ঘেন্না হচ্ছে যে আমাদের মাঝে একজন পটেনশিয়াল চোর বসে আছে…।
আমরা সবাই চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছি শাহিদের দিকে। ছেলে কী কইলো এটা? আমরা শেষমেশ চুরি করবো? তাও আবার খেজুর রস!!
শাহিদ : আরে, তোরা এমন করছিস কেন? আমি কি চুরি করার কথা বলেছি?
সবাই : তো?
শাহিদ : আমরা রস কিনে নিবো।
মুশফিক : হ্যাঁ হ্যাঁ, এতো রাতে উনার জন্য মানুষ তো রসের দোকান খুলে বসে আছে, হে হে।
মুসআব এতোক্ষণ চুপচাপ বসে ছিল। এবার সুযোগ পেয়ে ফোড়ন কাটলো, শাহিদ মনে হয় বাদুড়ের থেকে রস কিনে নিবে।
মুসআবের কথা শুনে আমরা হো হো হেসে উঠলাম।
শাহিদ : তোরা যেভাবে হাসাহাসি করছিস, ব্যাপারটা এতো অবাস্তব না। ধর, এক হাঁড়িতে যেটুকু রস থাকে, তার দাম সর্বোচ্চ দুইশো টাকা।
আমরা যদি রসটুকু নিয়ে দুইশো টাকা হাঁড়ির সাথে রেখে দিই, তাহলে তো কিনে নেয়াই হলো, তাই না?
এতোক্ষণে বুঝলাম, পুরোটা না শুনেই শাহিদকে নিয়ে একটু বেশিই হাসাহাসি করে ফেলেছি আমরা। প্রস্তাবটা খুব খারাপ দেয়নি সে।
মুসআব : আচ্ছা, আমরা তো জানি যে আমরা চুরি করছি না। কিন্তু যদি পুলিশের হাতে পড়ি? পুলিশ যদি আমাদের চোর ভাবে?
শাহিদ : হ্যাঁ, পুলিশের তো আর কাজ নেই, খেজুর গাছ পাহারা দিয়ে বসে আছে…।
রাত আড়াইটা। বনপাড়া-হাটিকুমরুল মহাসড়ক।
রাস্তার পাশে খেজুরগাছ দেখে গাড়ি দাঁড় করালাম আমরা। খানিকটা উত্তেজনা, একটু ভয় ভয়, সাথে সাসপেন্স, যেন কোনো গোয়েন্দা অভিযানে যাচ্ছি।
গাড়ি থেকে নামলো শাহিদ, মুশফিক, মঈন আর তামিম।
সাজিদ এতোক্ষণ বসে বসে ঝিমাচ্ছিল। গাড়ি থেমে যাওয়ায় ও আমাদের কথাবার্তায় ধড়মড় করে উঠে বসেই বললো, কী ব্যাপার, এতো তাড়াতাড়ি ঢাকা চলে এলাম?
বললাম, নাহ।
তাহলে ওরা কোথায় যাচ্ছে? গ্লাস দিয়ে বাইরের চারজনের দিকে তাকিয়ে বললো সাজিদ।
মুসআব: খেজুর রস চুরি করতে।
সাজিদ: ওহ, তাইলে আমিও নামি।
আমি: কীহ, তুইও রস চুরি করতে যাবি? বুঝলাম, বেচারার ঘুমের ঘোর কাটেনি এখনও।
সাজিদকে নিয়ে আমি আর মুসআব হাসাহাসি করছি, এমন সময় দেখলাম রাস্তার ওপাশের একটি গাড়ি থেকে টর্চলাইটের আলো এসে পড়লো শাহিদের ওপর। শাহিদ তখন মঈনের ঘাড়ের ওপর বসে গাছ থেকে রস নামাচ্ছে। চুরির এক্কেবারে ক্লাসিক একটা দৃশ্য। ব্যস, সাথে সাথেই পুলিশের গাড়ির সাইরেন বেজে উঠলো।
খারাপ কপাল আর কাকে বলে। চুরির দায়ে এভাবেই ধরা খেয়ে গেলাম শেষ পর্যন্ত?
সাজিদ এতোক্ষণে টের পেলো, কিছু একটা ঝামেলা হয়ে গেছে। ভয়ে ভয়ে ফিসফিসিয়ে বললো, চল, আমরা গাড়ি নিয়ে পালাই।
একদম চুপ। ধমকে উঠলো মুসআব। বাকিরা বিপদে পড়েছে, আর উনি পালাবার চিন্তায় আছেন।
ধমক খেয়ে চুপসে গেল মুন্না।
এদিকে খেজুর রস নামাতে যাওয়া চার ভদ্রলোকের তিনজনই তাড়াহুড়ো করে গাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছে। শাহিদ একা পুলিশের দিকে এগিয়ে গেলো পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার জন্য।
বিধিবাম। শাহিদকে নিয়ে তিন-চারজন কনস্টেবল এগিয়ে এলো গাড়ির দিকে।
দ্রুতই পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়ে নিলো মুসআব। চার হাত-পা সমানে নাড়িয়ে পুলিশদের বুঝালো, আমরা কোনো দিক থেকেই চোর নই। একান্তই রস খাওয়ার শখ থেকে রস কিনতে গাড়ি থামিয়েছিলাম। প্রমাণস্বরূপ শাহিদ তাড়াতাড়ি করে তার কম্পমান হাতের মুঠোয় ধরে থাকা দুইশো টাকার নোট পুলিশকে দেখালো।
মুসআবের কথাতেই হোক, কিংবা বাকিদের শুকিয়ে যাওয়া মুখের দিকে তাকিয়েই হোক, পুলিশ আমাদের চোর বলে গ্রেফতার করলো না। তবে সতর্ক করে দিলো, জায়গাটা ডাকাতপ্রবণ এলাকা। আমরা যেন দ্রুত স্থান ত্যাগ করি।
তাড়াতাড়ি করে বোতলে রস ঢুকিয়ে শাহিদ আর মঈন দৌড় দিল রসের হাঁড়ি ফেরত দিতে। হাঁড়ি বাঁধার সময় দুইশো টাকার নোটটা গুঁজে দিতে অবশ্য ভুল করলো না।
তারা ফিরে আসতেই ড্রাইভার তাড়াহুড়ো করে গাড়ি টান দিলো। আমরা পেছনে তাকিয়ে দেখলাম, পুলিশের গাড়িটি তখনও দাঁড়িয়ে আছে। এতোক্ষণে আমরা সবাই হো হো করে হেসে উঠলাম।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬



