
ঢাকার ভোরটা শুরু হয় ধোঁয়া আর আজানের মিশ্রণে— কিন্তু সেদিনের ভোরটা আলাদা ছিল। আকাশে মেঘের স্তরগুলো এমনভাবে সাজানো ছিল যেন কেউ ইচ্ছে করেই আলোছায়ার গল্প বানিয়েছে। পুরান ঢাকার সরু গলিতে যখন দোকানের শাটার উঠছে, তখনই পাঁচ কিশোর দাঁড়িয়ে আছে বুড়িগঙ্গার ধারে। নদীর কালচে পানিতে ভাঙা আকাশের প্রতিবিম্ব। লঞ্চের হর্ন, চায়ের কাপে চামচের টুংটাং— সব মিলিয়ে শহরের এক অদ্ভুত সিম্ফনি।
নীল কথা কম বললেও তার চোখে স্থিরতা আছে, যেন সে চোখ দিয়ে শোনে। দেয়ালের পোস্টার, ভাঙা সাইনবোর্ড, পড়ে থাকা কাগজ— সবকিছুই যেন সংকেত। আরিফ ঝুঁকি নেয়, বিপদকে খেলায় পরিণত করে। তিশা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয়, যেন মাথায় সবসময় কাউন্টডাউন চলে। হৃদয় প্রযুক্তির জাদুকর— ডিভাইস, কোড, সিগন্যাল তার কাছে খেলনা। আর সাবা জানে ইতিহাস, তবে জাদুঘরে আটকে রাখে না; বর্তমানের পথে নামিয়ে আনে।
বুড়িগঙ্গার ধারে পুরনো ঘাটের নিচে তারা খুঁজছিল এক চিহ্ন। ব্রিটিশ আমলের এক গুপ্ত বার্তা নাকি ঢাকার নিচে এখনো লুকিয়ে আছে। সাবার হাতে বাঘের ছাপ দেয়া এক পুরনো ডায়েরির ছেঁড়া পাতা। নীল ড্রোন উড়াল দিতেই ভাঙা ইটের ফাঁকে ধরা পড়ল তামার পাতের মতো কিছু। তিশা ঝুঁকে পাতটা তুলল। তাতে খোদাই করা—একটা বাঘের ছাপ আর নিচে তিনটা সংখ্যা। হৃদয় বলল, ‘এটা তারিখ না।’ সাবা বলল, ‘এটা কোড।’ নীল নদীর দিকে তাকিয়ে ছিল। তার চোখ ঘাটের সিঁড়ির ছায়ার দিকে, যেন একটা তীরের মতো। সে বলল, ‘এটা চলমান।’ হৃদয় মোবাইলে কোড ইনপুট দেয়। সাবা ম্যাপ দেখে বলে, ‘লালবাগ’।
লালবাগ কেল্লার দেয়ালে দুপুরের রোদ পড়ে সোনালি। পর্যটকের সাথে তারাও ঢুকে পড়ে। নীল চোখে চোখে কথা বলে— বাঁদিকে বন্ধ সুড়ঙ্গের মুখ। আরিফ গার্ডের সাথে গল্প জুড়ে দেয়। তালার দিকে তাকায় বাকিরা— নতুন নয়। ম্যাগনেটিক কী দিয়ে সহজেই খুলে যায়।
ভেতরে ঠান্ডা অন্ধকার। পায়ের নিচে পানি। পানির ফোঁটার শব্দ। সাবা দেয়ালের খোদাই পড়ে— ফারসি আর বাংলা মিশ্রণ। এটাই নির্দেশনা। ঠিক তখনই পেছনে পায়ের শব্দ। কেউ অনুসরণ করছে। তিশা আলো নিভিয়ে দেয়। তারপর নিঃশব্দে দৌড়।
সুড়ঙ্গ বেরোয় চকবাজারের দিকে। মানুষের ঢল। মশলার গন্ধে মাথা ঘোরে। ভিড়ে মিশে যায় তারা। হৃদয় টের পায় ট্র্যাক করা হচ্ছে। নীল বলে, ‘তিন মানে তিনটা জায়গা।’ সাবা বলে, ‘আহসান মঞ্জিল।’
নদীর ধারে গোলাপি প্রাসাদে সন্ধ্যা নামে। ভেতরে ঢুকে পড়ে তারা। পুরনো দরজা— সেখানে বাঘের ছাপ। ধূলিময় লাইব্রেরি। কাচের বাক্সে আরেকটা তামার টুকরো। মিলালে মানচিত্র স্পষ্ট হয়। কিন্তু অ্যালার্ম বেজে ওঠে। দৌড়, ধাক্কা, বই পড়ে যায়।
রাতের ছাদ। পাশের ভবনে লাফ। নিচে শোরগোল। উপরে নীরবতা। তারা মানচিত্র জোড়া লাগায়। শেষ চিহ্ন— কার্জন হল।
রাতের ক্যাম্পাস আলাদা। লাল ইট, বাতাসে ইতিহাস। আর্চের নিচে ঢিলা পাথর। ধাতব বাক্স। ভেতরে নোট, নকশা, চিঠি। সাবা পড়ে শোনায়— ‘জ্ঞান লুকিয়ে রাখলে মরবে, ভাগ করলে বাঁচবে।’ হঠাৎ আলো। সিকিউরিটি। তিশা শান্তভাবে ব্যাখ্যা করে। অধ্যাপক আসেন। অবাক হন। বলেন, ‘এটা শুধু ইতিহাস না— ভবিষ্যৎ।’
ভোরে আবার বুড়িগঙ্গা। ক্যামেরা যদি ধীরে প্যান করত, দেখা যেত ঢাকা আর ব্যস্ত পাঁচ কিশোর, যারা থামে দায়িত্বে। রাত ভোর হলেও তাদের অস্থিরতা কাটেনি। নদীর ধারে বসে থাকা তাদের চোখে ঘুম নেই। নদী ধীরে বইলেও, তাদের মাথার ভেতর সবকিছু দ্রুত। কার্জন হলের বাক্সটা এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভে, অধ্যাপকের তত্ত্বাবধানে। কাগজপত্র স্ক্যান হচ্ছে, নকশা ডিজিটাল হচ্ছে। তবু নীলের মনে খচখচানি।
হঠাৎ তিশার ফোনে কল আসে। কোনো কথা নেই, শুধু নিঃশ্বাসের শব্দ। তারপর কেটে যায়। হৃদয় ল্যাপটপ খোলে। কল ট্রেস করে থমকে যায়। ‘এটা লোকাল না, বাইরে থেকে রাউট করা।’
সাবা পুরনো ডায়েরির কপি আবার পড়ে। একটা লাইনে চোখ আটকায়— ‘যেখানে শব্দ থামে, সেখানেই সত্য লুকায়।’ নীল উদাস হয়ে তাকিয়ে থাকে। ট্রাফিক, হর্ন, মানুষের চিৎকার। হঠাৎ সে বলে, ‘ঢাকায় এমন জায়গা খুব কম।’ আরিফ বলে, ‘শব্দ থামে? অসম্ভব।’ নীল মাথা নাড়ে। ‘অসম্ভব নয়। কবরস্থান।’
আজিমপুর কবরস্থান নীরব থাকে দুপুরেও। পাঁচজন আলাদা হয়ে ঢোকে, যেন দল মনে না হয়। সাবার হাতে ডায়েরির শেষ পাতার স্কেচ। একটা গাছ, পাশে ভাঙা সমাধি। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে পায়ের শব্দ।
দূরে দাঁড়িয়ে দুজন। হাতে ফোন, লুকিয়ে ছবি তুলছে। হৃদয় সিগন্যাল জ্যামার চালু করে। হঠাৎ একজন বিরক্ত হয়ে ফোন নামায়। আরিফ ইচ্ছে করেই সামনে যায়। ‘ভাই, পানি আছে?’ লোকটা অবাক। এদিকে নীল আর সাবা সমাধির পেছনে।
মাটিতে ঢিলা পাথর। তুলতেই নিচে ধাতব ঢাকনা। সাবা পড়ে— ফারসি লিপি। হৃদয় দ্রুত ছবি তোলে। ঢাকনা খোলার আগেই প্রহরীর কণ্ঠ— ‘এইখানে কী?’। সে দুজন সরে যায়, চোখে স্পষ্ট হুমকি।
রাতে হৃদয়ের ঘরে সবাই আসে। ঢাকনার ছবি বড় স্ক্রিনে। সেখানে আঁকা সুড়ঙ্গ, তবে শহরের ওপরে। ফ্লাইওভার? নীল ধীরে বলে, ‘না, রেললাইন।’
কমলাপুর স্টেশন। পরিত্যক্ত রেলইয়ার্ড। রাত গভীর। ট্রেন নেই, শুধু ধাতব গন্ধ। তারা হাঁটে, পাথরে পা পড়লে শব্দ হয়। হঠাৎ লাইট জ্বলে ওঠে। ইউনিফর্ম নেই, তবে সামরিক ভঙ্গি। একজন বলে, ‘কাগজগুলো আমাদের।’
আরিফ ফিসফিস করে, ‘এরা আলাদা।’ তিশা চোখে চোখে হিসাব কষে। নীল ধীরে ধীরে সামনে এগোয়। ঠিক তখনই দূরে ট্রেনের হর্ন। মুহূর্তের বিশৃঙ্খলা। হৃদয় স্মোক বোম্ব ফেলে। ধোঁয়া। দৌড়। রেললাইনের নিচে নেমে পড়ে তারা। সেখানে সত্যিই শব্দ কম। সুড়ঙ্গের মুখ। ভেতরে পুরনো বৈদ্যুতিক প্যানেল। সাবা পড়ে যায়—। ‘যদি এটুকু পাও, তবে তুমি বিশ্বাসযোগ্য।’
সুড়ঙ্গের শেষে ছোট ঘর। দেয়ালে ঢাকার পুরনো ছবি, বন্যা, আগুন, মানুষকে বাঁচানোর দৃশ্য। মাঝের টেবিলে হার্ডড্রাইভ। হৃদয় কাঁপা হাতে ল্যাপটপে লাগায়। ফাইলের নাম— ‘ঢাকা প্রটোকল’।
তিশা নিঃশ্বাস ছাড়ে। ‘এটা শুধু ইতিহাস না, এটা কাউকে ভয়ও দেখায়।’ নীল স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকে। সে জানে, এখনো খেলা শেষ হয়নি। বাইরে আবার পায়ের শব্দ। এবার অনেক। ধোঁয়ার ভেতর সময় থেমে গেছে মনে হয়। সুড়ঙ্গে আলো-আঁধারী, বাইরে ভারী বুটের শব্দ। হৃদয় দ্রুত হার্ডড্রাইভ খুলে নেয়। পেছনের দরজার দিকে ছোটে তারা। সুড়ঙ্গ সরু হয়ে আসে। বেরুতেই রাতের বাতাস। দূরে ট্রেনের হর্ন— এই শহর কখনো ঘুমায় না। কেউ নেই পিছে।
হৃদয়ের রুমে তারা দরজা বন্ধ করে বসে। ল্যাপটপে যা দেখে, তা অসম্পূর্ণ। কিছু মানচিত্র, কিছু নাম, কিছু তারিখ— কিন্তু মাঝখানে ফাঁকা। সাবা চুপচাপ বসে থাকে। সে ইতিহাসে এমন ফাঁক দেখেছে। এখানে ইচ্ছে করেই কিছু রাখা হয়নি। ‘এটা দুর্ঘটনা না, এটাই সিদ্ধান্ত।’
তিশা বলে, ‘যে এটা বানিয়েছে, সে চায় না কেউ পুরোটা জানুক।’ আরিফ অস্বস্তি নিয়ে হাসে। ‘মানে আমরা জিতলাম না?’ নীল ধীরে মাথা নাড়ে। ‘হয়তো জেতার কথা ছিল না।’
পরদিন পত্রিকার সংবাদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্কাইভ থেকে কিছু নথি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য সরানো হয়েছে। আশেপাশের সিসিটিভি ক্যামেরা কাজ করেনি সে সময়ে। হৃদয় অবাক হয় না। সাবা চুপচাপ কাগজ ভাঁজ করে।
সন্ধ্যায় নীল একা হাঁটে। সে কার্জন হলের পাশ দিয়ে যায়, আজিমপুরের দেয়াল ছুঁয়ে আসে, দূর থেকে বুড়িগঙ্গার গন্ধ পায়। সবই আছে, কিন্তু কিছু যেন নেই। যেন শহরের ভেতর আরেকটা শহর লুকিয়ে আছে, যেটা দেখা যায় না।
হঠাৎ তার ফোনে একটি মেসেজ আসে। কোনো নাম নেই। শুধু এক লাইন— ‘সব দরজা খোলা থাকে না।’ নীল স্ক্রিন বন্ধ করে দেয়। সে উত্তর দেয় না।
হৃদয় হার্ডড্রাইভটা আলাদা করে রেখে দেয়। তিশা বলে, ‘আমরা কি এটা কর্তৃপক্ষকে দেবো?’ সাবা ধীরে বলে, ‘সব না।’ আরিফ বাইরে তাকিয়ে বলে, ‘ঢাকা তো এমনই।’
শেষ রাতে তারা পাঁচজন আবার বুড়িগঙ্গার ধারে দাঁড়ায়। নদীর জল আগের মতোই কালচে। আলো ভাঙে, শব্দ আসে। নীল মনে মনে বোঝে— ঢাকা প্রটোকলের এক অংশ তারা দেখেছে, এক অংশ তারা কখনোই দেখবে না। হয়তো এটাই শহরের নিয়ম।
ক্যামেরা যদি ধীরে পিছিয়ে যেত, দেখা যেত— শহরটা স্বাভাবিক। মানুষ হাঁটে, বাস চলে, আলো জ্বলে। কিন্তু কোথাও, কারও হাতে, এখনো অসম্পূর্ণ ফাইলটা আছে। আর এ রহস্যের কোনো সমাধান নেই— থাকবেও না।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



