
ক্রিকেটে প্রায় প্রতিটি ম্যাচেই কেউ না কেউ মাইলফলক স্পর্শ করে। হয় দল হিসেবে নাহলে ক্রিকেটার হিসেবে। আজ তেমন কিছু গল্প শোনাবো, যা ক্রিকেট ইতিহাসের মাইলফলক হয়ে আছে। ভবিষ্যতে হয়তো এগুলো অতিক্রম করে নতুন কোনো মাইলফলক তৈরি হবে।
তো বন্ধুরা, কেমন আছো সবাই? আজ তোমাদের সামনে হাজির হলাম ক্রিকেট ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ানদের গল্প নিয়ে।
আমরা তো সবাই জানি, ক্রিকেটে ৩টি ফরম্যাটে খেলা হয়। টেস্ট, ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি। প্রতিটি ফরম্যাটের টপ ৩ জন দ্রুততম সেঞ্চুরির ঘটনা আজ তোমাদের সামনে তুলে ধরবো। চলো তাহলে টেস্ট ফরম্যাট দিয়েই শুরু করি।
এই ফরম্যাট হলো দীর্ঘ। কিন্তু এজন্য এটাকে হেলা করার সুযোগ নেই। টেস্ট ক্রিকেটে যারা ভালো তারাই বেশিরভাগ সময় ক্রিকেটের লিজেন্ডে পরিণত হয়েছেন।
৫৬
সালটা ২০১৪। পাকিস্তান বনাম অস্ট্রেলিয়ার টেস্ট ম্যাচ চলছে। ১ম ইনিংসে আজহার আলী, মিসবাহ উল হকের সেঞ্চুরি এবং ইউনিস খানের ডাবল সেঞ্চুরিতে ৫৭০ রানে ইনিংস ঘোষণা করে পাকিস্তান। রান তাড়া করতে গিয়ে খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। ২৬১ রানেই গুটিয়ে যায়।
তো ২য় ইনিংসে অলরেডি ৩০৯ রানের লিড পেয়ে গেছে। তাই সবাই মোটামুটি হাত খুলে খেলতে শুরু করে। আজহার আলী এবারও সেঞ্চুরি করেন। সাথে মিসবাহ উল হকও সেঞ্চুরি করে এক মাইলফলক স্পর্শ করেন। মাত্র ৫৬ বলে ১১টি চার এবং ৫টি ছক্কায় তিনি সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ১৭৭.১৯ স্ট্রাইক রেটে। সে সময়ে এটি ছিলো যৌথ দ্রুততম সেঞ্চুরি। পাকিস্তান ২৯৩ রানে ইনিংস ডিক্লেয়ার করে। অস্ট্রেলিয়া এবারও ২৪৬ রানে গুটিয়ে যাওয়ায় পাকিস্তান ৩৫৬ রানের জয় পায়।
৫৬
৫৬ বলে সেঞ্চুরি করা আরেকজন তাহলে কে ছিলেন?
তিনি ছিলেন কিংবদন্তি স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডস। ক্যারিবিয়ান এই তারকা ১৯৮৬ সালেই ৫৬ বলে সেঞ্চুরি করে শীর্ষে অবস্থান করছিলেন।
ওয়েস্ট ইন্ডিজ বনাম ইংল্যান্ডের মধ্যেকার সিরিজের ৫ম টেস্ট ম্যাচ চলমান। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ১ম ইনিংসে ৪৭৪ রানের বিশাল সংগ্রহ করেছে। ভিভি রিচার্ডস মাত্র ২৬ রান করেন। কিন্তু ইংল্যান্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের পেস এটাকের সামনে ধরাশায়ী। মাত্র ৩১০ রানে অল আউট।
২য় ইনিংসে ১৬৪ রানের লিড নিয়ে ব্যাটিংয়ে নেমে এবার ঝড় তোলেন ভিভ। ৫৬ বলে সেঞ্চুরি করেন। ৫৮ বলে অপরাজিত ১১০ রান করেন ৭টি করে চার ও ছক্কায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৪৬ রানে ডিক্লেয়ার দেয়।
রান তাড়া করতে গিয়ে ইংল্যান্ডের অবস্থা এবার আরও করুণ। মাত্র ১৭০ রানে অল আউট হয়ে যাওয়াতে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৪০ রানের বিশাল জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে।
৫৪
তবে মিসবাহের যৌথ দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ান হওয়া বেশিদিন অতিবাহিত না হতেই ৫৪ বলে সেঞ্চুরি করে মাইলফলক পরিবর্তন করে ফেলেন একজন কিউই ব্যাটার।
‘ব্রেন্ডন ম্যাককালাম’- আমি জানি, তোমাদের মধ্যে অনেকেরই প্রিয় ক্রিকেটার তিনি।
২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ক্রাইস্টচার্চে সিরিজের ২য় টেস্টে ১ম ইনিংসে এই রেকর্ড করেন তিনি। অস্ট্রেলিয়ার বোলাররা বাকিদের উপরে চড়াও হলেও ম্যাককালাম তাদের নিয়ে রীতিমতো ছেলেখেলা করেন। ৫৪ বলে সেঞ্চুরি করে রেকর্ড গড়ে ২১টি চার ও ৬টি ছক্কায় ইনিংস শেষ করেন ৭৯ বলে ১৪৫ রানে।
যদিও ২য় ইনিংসে মাত্র ২৫ রানে আউট হয়ে যান। ফলে অস্ট্রেলিয়াকে ছাপিয়ে আর সে ম্যাচ আর জেতা হয়ে ওঠেনি নিউজিল্যান্ডের। ৭ উইকেটের পরাজয় বরণ করতে হয়।
এবার চলো, ওয়ানডে ফরম্যাটের দ্রুততম সেঞ্চুরির গল্পে।
৩৭
নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো, কার ঝুলিতে রয়েছে এই রেকর্ড। হ্যাঁ, বুম বুম আফ্রিদি। শাহিবজাদা মোহাম্মদ শহীদ খান আফ্রিদি।
১৯৯৬ সালে পাকিস্তান বনাম শ্রীলঙ্কা ম্যাচ। প্রথমে ব্যাটে নেমেছে পাকিস্তান। শুরুটা পাকিস্তান ভালোই করেছিলো। ৬০ রানের ওপেনিং জুটি ভাঙার পরে শহীদ আফ্রিদি নামলেন এবং হাঁকালেন ৩৭ বলের সেঞ্চুরি। ১১টি ছক্কা, ৬টি চারে ২৫৫+ স্ট্রাইক রেটে ৪০ বলে ১০২ রানে আউট হন। পাকিস্তানও পায় ৩৭১ রানের বিশাল পুঁজি। রান তাড়ায় শ্রীলঙ্কা ২৮৯ রানে গুটিয়ে গেলে পাকিস্তান ৮২ রানের জয় পায়।
সেদিন সাঈদ আনওয়ার ও অরভিন্দ ডি সিলভাও সেঞ্চুরি করলেও আফ্রিদি ছিলেন তুমুল আলোচনা কেন্দ্রে। পরবর্তী ১৮ বছর পর্যন্ত দ্রুততম সেঞ্চুরির খেতাব ছিলো তাঁর দখলে।
৩৬
তাহলে ১৮ বছর পরে সে রেকর্ড কে ভাঙলো? জানো কি?
হ্যাঁ। কিউই অলরাউন্ডার কোরি এন্ডারসন মাত্র ১ বল কম খেলে ৩৬ বলে সেঞ্চুরি করে আফ্রিদির রেকর্ড ভেঙে দেন।
২০১৪ সালের ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে বৃষ্টিভেজা ২১ ওভারের ম্যাচে প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে দলের অন্য ব্যাটাররা সুবিধা করতে না পারলেও জেসি রাইডার ও কোরি এন্ডারসন একের পর এক বাউন্ডারির বন্যা বইয়ে দেন। জেসি ৫১ বলে ১০৪ রানে আউট হয়ে গেলেও কোরি ছিলেন শেষ পর্যন্ত। ৪৭ বলে ১৩১ রানে অপরাজিত ছিলেন। বাউন্ডারি মেরেছিলেন মোট ২০টি; ৬টি চার এবং ১৪টি ছয়। সংগ্রহ গিয়ে থেমেছিল ২৮৩ রানে। রান তাড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ খুব একটা সুবিধা করতে পারেনি। ১৫৯ রানে ম্যাচটি জিতে নেয় নিউজিল্যান্ড।
(বি. দ্র. কোরি এন্ডারসন কিন্তু বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে মাঠ মাতান!)
৩১
দ্রুততম সেঞ্চুরি তাহলে কার? এবার তাহলে ৩১ বলে সেঞ্চুরির গল্প শোনো।
২০১৫ সাল, ওয়েস্ট ইন্ডিজের সাথে ২য় ম্যাচ। ঐদিন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটারদের উপরে যেন দানব ভর করেছিলো। ওপেনিংয়ে হাশিম আমলার ১৪২ বলে ১৫৩ রানের অপরাজিত ইনিংস, রাইলি রুশোর ১১৫ বলে ১২৮ রানকে ছাপিয়ে মিস্টার ৩৬০ক্ক ওরফে এবিডি ভিলিয়ার্স করেন ৪৪ বলে ১৪৯ রান। এর মধ্যে তুলে নেন ৩১ বলে ওয়ানডে ইতিহাসের দ্রুততম সেঞ্চুরি।
সেদিন ইনিংসের ৩৯তম ওভারে ব্যাট করতে ক্রিজে আসেন এবিডি। এসেই শুরু করেন পেটানো। ১৬ বলে দ্রুততম অর্ধশতক পূরণের পর ১৫ বলেই করেন বাকিটুকু। ইনিংস শেষ করেন ৯টি চার এবং ১৬টি ছক্কায়! দল পায় ৪৩৯ রানের পাহাড় সমান সংগ্রহ। মোট বাউন্ডারি ছিলো ৫২টি; ১৮টি ছয় ও ৩৪টি চার। রান তাড়ায় ওয়েস্ট ইন্ডিজ ২৯১ রানে থামলে ১৪৮ রানের জয় পায় দক্ষিণ আফ্রিকা।
স্বীকৃত টি-টোয়েন্টিতে কিন্তু এমন জমকালো সেলিব্রিটি প্লেয়াররা এই তালিকায় নেই! অদ্ভুত লাগছে না শুনতে? তাহলে চলো, শুনে আসি অদ্ভুতুড়ে কাহিনি!
৩৪
কুশাল মাল্লা! নেপালের এই ব্যাটার মাত্র ৩৪ বলে সেঞ্চুরি তুলে নেন চেঙ্গিস খানের উত্তরসূরীদের বিপক্ষে! মানে মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে আরকি।
প্রথমে ব্যাটিং নিয়ে নেপালের সবাই পেটাতে থাকেন। কিন্তু কুশাল অন্যদের ছাড়িয়ে যান। ৩৪ বলে সেঞ্চুরি তুলেই ক্ষান্ত হননি। অপরাজিত ছিলেন ৫০ বলে ১৩৭ রানে। বাউন্ডারি হাঁকিয়েছিলেন ২০টি; ৮টি চার ও ১২টি ছক্কা।
নেপালের কাপ্তান রোহিতও ২৭ বলে ৬১ রানের ক্যামিওতে কুশালের সঙ্গে ছিলেন!
৩৩
এবারের প্লেয়ারের নামও অদ্ভুত! নামিবিয়ার ব্যাটার ‘জ্যাক নিকোল লফটি ইটন’।
নেপালের সাথে নামিবিয়ার ম্যাচ। প্রথমে ব্যাটিংয়ে নেমে নামিবিয়া ভালোই আগাতে থাকে। কিন্তু রানের চাকা দৌড়ানো শুরু করে জ্যাক মাঠে নামার পরে। মালান ক্রুগারের সাথে করেন ১৩৫ রানের পার্টনারশিপ। জ্যাক ৮টি ছয় ও ১১টি চারে ৩৩ বলেই সেঞ্চুরি তুলে নেন।
২০৭ রানের টার্গেটে নেপাল অবশ্য ১৮৬ রানেই গুটিয়ে যায়।
২৭
সাইপ্রাস বনাম এস্তোনিয়ার ম্যাচ। প্রথমে নেমে সাইপ্রাস ১৯১ রান করে।
তাড়া করতে নেমে ৪০ রানে ৩ উইকেট হারায় এস্তোনিয়া। কিন্তু সাহিল চৌহান থেমে যাননি। তিনি স্টেফান গুচকে নিয়ে আগাতে থাকেন। বরং একা এগুনো বলাই ভালো! কেননা গুচ মাত্র ৪ বলে ৩ রানে আউট হলেও পার্টনারশিপ ছিল ১৩ বলে ৪৯ রানের। তারপরে সাহিলকে সঙ্গ দিয়েছিলো বিলাল মাসুদ। এদিকে সাহিল একাই বোলারদের কচুকাটা করতে থাকেন। ২৭ বলে তুলে নেন টি-২০ সংস্করণের দ্রুততম সেঞ্চুরি। ইনিংস শেষ করেন অপরাজিত ৪১ বলে ১৪৪ রানে। বাউন্ডারি হাঁকান ২৪টি; যার মধ্যে ছক্কাই ছিলো ১৮টি! এস্তোনিয়া ৬ উইকেট হাতে রেখে মাত্র ১৩ ওভারেই জয় তুলে ফেলে।
তো এই ছিলো ইন্টারন্যাশনাল ফরম্যাটগুলোতে দ্রুততম সেঞ্চুরিয়ানদের গল্প।
তবে ডোমেস্টিক লীগগুলোর হিসেব করলে আইপিএলে বেঙ্গালুরুর হয়ে ক্রিস গেইলের ৩০ বলে সেঞ্চুরি উল্লেখযোগ্য। সেদিন গেইল একাই ৬৬ বলে ১৭৫ রানে অপরাজিত ছিলেন। যা টি-টোয়েন্টিতে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ ইনিংস।
বাংলাদেশিদের মধ্যে ২জন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সেঞ্চুরি করেছেন। তামিম ইকবাল এবং পারভেজ হোসেন ইমন। স্বীকৃত রাইজিং এশিয়া কাপে বাংলাদেশের হয়ে দ্রুততম সেঞ্চুরি করেন হাবিবুর রহমান সোহান।
তো আজকের মতো এটুকুই। গল্প হবে পরের কোনো পর্বে।
প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৬



