সকালে তাড়াহুড়ো করে স্কুলে চলে গেছো। গণিত সাবজেক্টের ক্লাস শুরু হবার সময় ব্যাগ খুলে দেখলে বই-ই নাওনি। অথবা হোমওয়ার্কের খাতা নাওনি। কিংবা জ্যামিতি বক্স নাওনি। এমন ঘটনা তো প্রায়ই ঘটে, তাই না? কোনো কাজ করতে গেলে দেখা যায় একটা না একটা কিছু বাদ পড়ে যায়। পরে খুব আফসোস হয়। কিংবা কাজটা করতে গিয়ে কষ্ট হয়, দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়। পরীক্ষার দিনে প্রবেশপত্র নিয়ে যাওনি, আবার বাসায় ফিরতে হয়, প্রবেশপত্র খুঁজে নিয়ে আবার রওয়ানা হতে হয় পরীক্ষার হলের উদ্দেশ্যে। এইসব সমস্যার সমাধান দিতে পারে চেকলিস্ট ব্যবহারের অভ্যাস করা।
চেকলিস্ট কী? চেকলিস্ট হলো এমন একটি তালিকা যেখানে দিনের বা সপ্তাহের করণীয় কাজগুলো এক জায়গায় লিখে রাখা হয়, এবং সম্পন্ন হলে টিক চিহ্ন দেওয়া হয়। এতে সময় বাঁচে, ভুল কমে এবং আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যেমন ধরো তুমি স্কুল থেকে পিকনিকে যাবে। তো, একটা চেকলিস্ট তৈরি করতে বসলে-
– রেজিস্ট্রেশন করা
– চাঁদা দেয়া
– জামা-কাপড় ধুয়ে রেডি রাখা
– কেডস পরিষ্কার করা
পিকনিকের ব্যাগে
– স্কুলের আইডি কার্ড
– নোটবুক-কলম
– পানির বোতল
– টিফিন বক্স
– এক্সট্রা টি-শার্ট
– টিস্যু/রুমাল
– ফার্স্ট এইডের জন্য ওয়ানটাইম ব্যান্ডেজ, স্যাভলন
– গল্পের বই
– মৌসুম অনুযায়ী ছাতা/শীতের কাপড়
– সানগ্লাস/দূরবীন ইত্যাদি।
চেকলিস্টের সুবিধা কী?
চেকলিস্ট তৈরি করার সময় তুমি পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে সে কাজটা বা অনুষ্ঠানটাকে ভিজুয়ালাইজ করো। এতে করে অনুষ্ঠান বা কাজটির জন্য মানসিক প্রস্তুতি নেয়া হয়। কাজের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো চোখে পড়ে। কোথায় কী সমস্যা হতে পারে, তা নিয়ে সমাধানের পরিকল্পনা হয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। চেকলিস্টে ঢুকে যায় সমাধানের জন্য করণীয় কী? চেকলিস্ট তৈরি করলে কাজ/প্রোগ্রাম খুব গোছানো হয়। চেকলিস্ট বানালে কাজ বাদ পড়ে যাবার সম্ভাবনা খুবই কম থাকে। চেকলিস্ট অনুযায়ী কাজ করলে কাজও দ্রুত হয়। কারণ কোন কাজটার পর কোনটা করতে হবে, সেটা চেকলিস্টে ধারাবাহিক উল্লেখ থাকে। তাই কাজ শুরু করে সিদ্ধান্ত নিতে বিলম্ব হয় না। চেকলিস্টের আরেকটা বড় সুবিধা হলো এটি আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। কীভাবে? চেকলিস্টের কাজগুলো একটা একটা করে করার পর যখন চেকলিস্টের পয়েন্টগুলোতে টিক চিহ্ন দাও, তখন মনে সাহস জন্মে যে আমার করণীয়গুলো আমি করে ফেলেছি। কাজে শৃঙ্খলা আনে চেকলিস্ট। চেকলিস্ট তোমাকে কাজ এগিয়ে নিতে মোটিভেশন দেয়। কারণ লিস্টের যে কাজগুলো করা হয়নি, সেগুলো তোমাকে তাড়া দিতে থাকে দ্রুত শেষ করে টিক দেয়ার জন্য। চেকলিস্টের অভ্যাস তোমার দৈনন্দিন কাজগুলোকে আরো বেশি ফলপ্রসূ করে তুলতে পারে।
এবার চেকলিস্টের প্রয়োগ কোথায় কীভাবে করা যায় সেটা আলোচনা করা যাক। চেকলিস্টের জন্য তোমার কাছে সবসময় একটা নোটবুক এবং একটা কলম দরকার। নোটবুকের জন্য দোকানে গিয়ে স্পেশাল অর্ডার দিয়ে কিনতে হবে, এমনটা জরুরি না। তুমি কাগজ কেটেও নোট প্যাড বানাতে পারো। সহজ কথা- বিরাট বড় খাতার বদলে সহজে বহন করা যায়, পকেটে নিয়ে ঘোরা যায় এমন একটা নোট প্যাড দরকার। এই নোট প্যাডে যখন যেটা করার জন্য আদেশ বা নির্দেশনা আসবে, তা লিখে ফেলবে। যেমন- ক্লাসে বলা হলো যে অমুক দিনে স্পেশাল জ্যামিতি ক্লাস হবে। সেদিন জ্যামিতি বক্স আনতে হবে। নোট প্যাডে সেটা লিখে ফেলবে। আবার বাসা থেকে হয়তো বলেছে স্কুল থেকে ফেরার সময় ইস্ত্রির দোকান থেকে কাপড়গুলো নিয়ে যেতে হবে, সেটাও লিখে নিবে। বন্ধু বলেছে পরের দিন স্কুলে ইংরেজি গ্রামার বইটা নিয়ে যেতে, নোট প্যাডে সেটা লিখবে। এগুলো হলো চেকলিস্ট তৈরির মালসামানা জোগাড় করা।
এবার তোমার টেবিলের সামনে কয়েকটা চেকলিস্ট থাকতে হবে। প্রথমত, তোমার ব্যাগের চেকলিস্ট। অর্থাৎ তোমার ব্যাগে কোনদিন কোন কোন জিনিস থাকবে সেটার একটা চেকলিস্ট বানিয়ে লাগিয়ে রাখো। ব্যাগ নিয়ে স্কুলে দৌড় দেয়ার আগে একবার চেকলিস্টে চোখ পড়লেই কোনো জিনিস আর বাদ পড়বে না। সেখানে স্পেশাল কোনো বিষয় থাকলে সেটাও যোগ করতে পারো। যেমন বললাম স্পেশাল ক্লাসে জ্যামিতি বক্স নিতে হবে, সেটা আগেই লিখে রাখবে।
দ্বিতীয়ত, দৈনন্দিন পড়াশুনার চেকলিস্ট। আগের দিন রাতে এই চেকলিস্ট বানাতে পারো-সকাল থেকে সারাদিন কী কী পড়বে। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান যে যে সাবজেক্ট পড়বে, যে চ্যাপ্টার পড়বে, তা লিখে রাখো। পরদিন সেগুলো পড়ে টিক চিহ্ন দাও। নিজেকেই মনে হবে নিজের শিক্ষক। পড়াশুনায় তোমার উন্নতি হবে দ্রুত।
তৃতীয়ত, পড়াশুনার বাইরে ঘরের কাজ বা নিজের আর কী কী কাজ আছে তার একটা চেকলিস্ট বানাও। যেমন- নামাজ, ব্যায়াম বা খেলাধুলা, বাগান পরিচর্যা করা, নিজের বিছানা গুছানো, কাপড় ধোয়া ইত্যাদি। কাজ করা হয়ে গেলে টিক চিহ্ন দাও। প্রতিদিন করা হলে একই বক্সে বারবার টিক চিহ্ন দাও। কোনো সমস্যা নেই।
এরপর হলো ইভেন্টভিত্তিক চেকলিস্ট। ওই যে শুরুতে বলেছিলাম পিকনিকে যাওয়ার চেকলিস্টের কথা। ধরো তোমার স্কুলের বিজ্ঞান মেলা আছে। সেখানে তুমি প্রজেক্ট জমা দিতে চাও। তাহলে এটার জন্য একটা চেকলিস্ট বানিয়ে ফেলো। কার কাছ থেকে পরামর্শ নিবে, কী কী উপাদান/উপকরণ লাগবে, কোথা থেকে সংগ্রহ করবে, প্রেজেন্টেশন চার্টে কী কী থাকবে সেগুলোর চেকলিস্ট বানিয়ে ফেলো।
অথবা বন্ধুরা মিলে টুর্নামেন্ট আয়োজন করতে যাচ্ছো, তার একটা চেকলিস্ট বানাও। স্কুলের কালচারাল প্রোগ্রাম? তুমি কী কী করবে তার চেকলিস্ট বানাও। বাড়িতে একটা খাবারের আয়োজন আছে? কী কী লাগবে তার চেকলিস্ট বানাও।
চেকলিস্টের মূল বৈশিষ্ট্য হলো এটি পয়েন্টভিত্তিক হবে। তোমার যত ইভেন্ট আছে, যত কার্যক্রম আছে সব চেকলিস্টের আওতায় নিয়ে আসো। ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করো। দোকানে লাল-হলুদ-সবুজ কালারের স্টিকি প্যাড পাওয়া যায়। সেগুলোকেও চেকলিস্টের জন্য ব্যবহার করতে পারো। অথবা সাদা কাগজে হাইলাইটার দিয়ে কোন কাজটা জরুরি সেটা মার্ক করতে পারো।
তুমি যত বড় হতে থাকবে, তত তোমার ব্যস্ততা বাড়তে থাকবে, ততই বিভিন্ন মাত্রার কাজ করতে হবে। তাই কাজ ভুলে যাবার সমস্যা তৈরি হবে। সেজন্য এখন থেকেই চেকলিস্ট ব্যবহারের অভ্যাস করতে হবে। তাহলে দেখবে তোমার কাজগুলো সুন্দরভাবে সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হবে।



