আমরা বিগত তিন পর্বে পার্সোনালিটি এবং অনুযায়ী ক্যারিয়ার চয়েসের বিষয়ে কিছুটা আলাপ করেছি। গত পর্বে বলেছিলাম ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তা হবার ক্ষেত্রে কোন ধরনের মানসিক প্রস্তুতি রাখতে হবে। আজকে আমরা চাকুরিকে ক্যারিয়ার হিসেবে নেবার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি বিষয়ে আলোচনা করবো।
প্রথম কথা হলো চাকুরি কী? চাকুরি হলো নির্ধারিত মাসিক বা সাপ্তাহিক কিংবা দৈনিক বেতনের বিনিময়ে কোনো কর্তৃপক্ষের অধীনে নির্ধারিত সময়ে কর্তৃপক্ষের দেয়া কাজ করা। এক্ষেত্রে অনেক সময় হয়তো বেঁধে দেয়া সময়ের অতিরিক্ত কাজ করতে হয়। অনেক প্রতিষ্ঠান সেক্ষেত্রে বাড়তি টাকা দেয়, আবার অনেকে দেয় না। কাজের ক্ষেত্রেও অনেক সময় কম-বেশি করা হয়। মূলকথা হলো কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা অনুযায়ী কাজ সরবরাহ করতে হবে। বেতন-ভাতাও সে অনুযায়ী হবে।
কর্মজীবনে কেউ ব্যবসায়ী হবার স্বপ্ন দেখলেও চাকুরি দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করে। কারণ নির্দিষ্ট সেক্টরে কাজ শেখার জন্য চাকুরির বিকল্প নেই। যেমন ধরো, তুমি একটি সুপারশপ এর ব্যবসা করতে চাও। সুপারশপ কীভাবে কাজ করে তা জানার জন্য কোনো একটি সুপারশপে কয়েকমাস চাকুরি করলে তুমি বুঝতে পারবে। আবার যদি গার্মেন্টস এর ব্যবসা করতে চাও,তাহলে কোনো একটিতে চাকুরি করলে তারা কীভাবে অর্ডার নেয়, কীভাবে সাপ্লাই দেয়, কীভাবে শ্রমিক নিয়োগ দেয়, তাদেরকে কীভাবে ম্যানেজ করে তা বুঝতে পারবে। রেস্টুরেন্টে কিছুদিন কাজ করলে বুঝতে পারবে কীভাবে কাস্টমারকে খাবার সার্ভ করতে হয়, কীভাবে খাবারের উপকরণ কিনতে হয়, কীভাবে বাবুর্চি রান্না করে ইত্যাদি। এছাড়া যে কোনো ব্যবসারই কিছু নিগুঢ় কৌশল এবং গ্রুপিং বা সিন্ডিকেট আছে। সেগুলোও জানা যায় সেসব সেক্টরে চাকুরি করলে। শুধু ব্যবসা করার জন্যই না, চাকুরি করতে চাওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় যে কারণ সেটা হলো স্থিতিশীলতা। আমরা চাই যে একটি ভালো প্রতিষ্ঠানে জয়েন করবো। তারপর সেখান থেকে রিটায়ার করে কর্মজীবন শেষ করবো। যেমন- সরকারি চাকুরি। কিংবা স্কুলের চাকুরি, ব্যাংকের চাকুরি, কিংবা বড় শিল্প প্রতিষ্ঠানে চাকুরি। এসব জায়গায় চাকুরির সুযোগ সুবিধা কাঠামো ভালো থাকায় বেশিরভাগই চাকুরে এক প্রতিষ্ঠানে থেকেই কর্মজীবন শেষ করে। তাছাড়া মাস শেষে বেতনটা নিশ্চিত থাকলে সেটা একটা বড় ধরনের স্বস্তি যোগায়। মধ্যবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার চায় এ ধরনের নির্ঝঞ্ঝাট জীবন। তাই এসব পরিবারে বাবা-মা আত্মীয় স্বজন সবাই চায় সন্তান ভালো কোনো ‘চাকুরি’ করুক। বড় হয়ে কী হবে? ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ম্যাজিস্ট্রেট নাকি পাইলট? এগুলোই আমাদের জিজ্ঞেস করা হয়। আমরাও এভাবেই স্বপ্ন দেখি। কারণ, এই পেশাগুলোতে যেসব চাকুরি আছে তাতে বেতন ভালো পাওয়া যায়। সুযোগ সুবিধাও ভালো থাকে। ডাক্তার ইঞ্জিনিয়াররা নিজেদের চাকুরির বাইরেও রোগী দেখে/ কনসালটেন্সি করে ভালো ইনকাম করতে পারেন। এগুলো উচ্চ মানের চাকুরি। চাকুরির সুবিধা হলো বেতন নির্ধারিত হওয়ায় সবাই নির্ধারিত খরচের মধ্য দিয়ে চলার চেষ্টা করে। সেজন্য জীবনটা অনেকটা গোছানো থাকে। নির্ধারিত বেতনের মধ্যে থেকেই সবাই চেষ্টা করে কিছুটা সঞ্চয় করতে। পরবর্তীতে বাড়ি-গাড়ি করার চেষ্টা থাকে, সন্তানের পড়াশুনার খরচ সামলানোর পরিকল্পনা থাকে। সবই সীমাবদ্ধ সামর্থ্যরে মধ্যে।
চাকুরিতে ব্যবসার মতো হঠাৎ লস করার ঝুঁকি নেই। বিরাট অংকের ঋণে পড়ে যাবার ঝুঁকি নেই। তবে হঠাৎ চাকুরি চলে যাবার ভয় আছে। বড় ধরনের ভুলে জরিমানা হওয়ার ঝুঁকি আছে।
এবার এসো ভালো চাকুরে হবার জন্য কী করতে হবে তা আলোচনা করা যাক। প্রথম কথা হলো চাকুরে হিসেবে তোমাকে তোমার কাজে দক্ষতা অর্জন করতে হবে। তোমার কাজে যদি তুমি দক্ষ হও, তাহলে তোমার প্রতিষ্ঠান তোমাকে ছাড়তে চাইবে না, উপরন্তু অন্য প্রতিষ্ঠান তোমাকে বেশি বেতন-ভাতায় অফার দিবে তাদের প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার জন্য। তাছাড়া তুমি যদি ব্যবসায়ীও হতে চাও পরবর্তীতে, তাহলেও তোমাকে সে কাজটাতে দক্ষতা অর্জন করতে হবে যাতে তুমি পরবর্তী চাকুরেদের গাইড করতে পারো।
দ্বিতীয়ত, সময়ানুবর্তিতা অনুসরণ করতে হবে। চাকুরিজীবনে সময় মেনে চলা খুব গুরুত্বপূর্ণ। অনেক প্রতিষ্ঠানেই দেরিতে উপস্থিত হলে জরিমানা করা হয়, বেতন কাটা হয়। তাই নির্ধারিত সময়ে উপস্থিত হওয়ার প্র্যাকটিস করতে হবে। আবার নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করার প্রচেষ্টাও রাখতে হবে। ডেডলাইন অনুযায়ী কাজ না করতে পারলে অনেক সময় চাকুরি থাকে না।
তৃতীয়ত, অফিসিয়াল লেভেলের কাজগুলোতে শিক্ষাগত যোগ্যতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে চাকুরির বাজার খুব সংকীর্ণ হওয়ায় ভালো রেজাল্টধারী না হলে চাকুরি পাওয়া কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তাই পড়াশুনায় ভালো হতে হবে যাতে চাকুরির পরীক্ষায় কনফিডেন্সের সাথে অবতীর্ণ হওয়া যায়। এছাড়া চাকুরিতে যোগদানের পরেও পড়াশুনা করতে হয়। চাকুরির ক্যাটাগরি অনুযায়ী বর্তমানে অনেক ধরনের ভার্সিটি ডিগ্রি এবং ট্রেইনিং কোর্স আছে। সেগুলো করতে পারলে চাকুরিতে প্রমোশন হয়, ভালো প্রতিষ্ঠানে ডাক পড়ে।
চতুর্থত, যোগাযোগ দক্ষতা। তুমি হয়তো অনেক কাজ পারো, কিংবা যেভাবে তোমার প্রতিষ্ঠানে কাজটা হচ্ছে, তার চেয়ে ভালোভাবে পারো। কিন্তু তুমি সেটা অথরিটির কাছে উপস্থাপন করতে পারছো না, তাহলে তোমার যথাযথ মূল্যায়ন হবে না। তাই তোমাকে কমিউনিকেশনে দক্ষ হতে হবে। তোমার বসদের সাথে যোগাযোগ ভালো হতে হবে। তাদের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখতে হবে।
পঞ্চমত, আনুগত্য। যে কোনো প্রতিষ্ঠান চায় তার কর্মচারীরা অনুগত থাকুক। প্রতিষ্ঠানের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে কাজ করে যাক। বসরা চায় তার অধীনস্থরা তাদের কথা মেনে চলুক। তাই কর্মচারী বা চাকুরে হতে গেলে তোমাকে অনুগত থাকতে হবে। মাথা গরম করে উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করা যাবে না। এই ˆধর্য অর্জন করতে হবে।
ষষ্ঠত, ম্যানেজমেন্ট শেখা। চাকুরি করতে গেলে একটি টিমে কাজ করতে হয়। সেক্ষেত্রে ম্যানেজমেন্ট শিখতে হবে। কীভাবে তোমার সহকর্মীদের এবং তোমার অধীনে টিম সদস্যদের চালাতে হবে সেটা শিখতে হবে। এগুলোর অনেক প্রশিক্ষণ কোর্স আছে বর্তমানে। তবে ছাত্রজীবনে বিভিন্ন কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ এর সাথে জড়িত থাকলে এগুলো শেখা সহজ হয়। যেমন- স্কুলের বিভিন্ন ক্লাব, স্কাউট, রোটারি, সামাজিক সংগঠন ইত্যাদি।
ফুলকুঁড়ি আসরের সাথে কাজ করলেও তুমি টিম ম্যানেজমেন্ট শিখতে পারবে।
সপ্তমত, যে কোনো কাজে সফল হতেই পরিশ্রমী হতে হয়। তোমার চাকুরিতে সাফল্যের জন্যও তোমাকে অবশ্যই পরিশ্রমী হতে হবে। যতদিন চাকুরিটি করবে, কাজটাকে ভালোবেসে করবে। তাহলে কাজে মন আসবে। যত বেশি কাজ শিখতে চাইবে, তত বেশি সফল হবে। একই কাজ সুন্দরভাবে করার মাত্রার কোনো শেষ নাই। তাই উন্নয়ন প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে।
আমরা পার্সনালিটি অনুযায়ী ক্যারিয়ার চয়েসের জন্য ক্যারিয়ারের দুটো মৌলিক ক্যাটাগরি নিয়ে আলোচনা করলাম। তবে মনে রাখতে হবে এ বিষয়গুলো অত্যন্ত ব্যাপক। তাছাড়া বর্তমানে ক্যারিয়ার অনেক বেশি বৈচিত্র্যময়। একই জন হয়তো একটা চাকুরি করছে, পাশাপাশি দুটো ব্যবসা সামলাচ্ছে। আবার হয়তো চাকুরি বা ব্যবসা সরাসরি করছে না কিন্তু শুধু শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করছে। কেউ হয়তো শুধু ফ্রিল্যান্সিং করছে। কেউ হয়তো কাজের পাশাপাশি কনটেন্ট ক্রিয়েশন করছে। অনেকেই একটির বেশি চাকুরি করছে। কেউবা চাকুরির পাশাপাশি উবার/পাঠাও চালাচ্ছে। সুতরাং কর্মজীবন এখন অনেক বিস্তৃত। তাই সময়ের আলোকে কর্মজীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জন করে যোগ্য হতে হবে।



