এক.
ছেলেটির বাবা নেই— মাও নেই। বাড়ি নেই— ঘর নেই। হালের বলদ বা দুধেল গাই নেই। কারো কাছে সেই ছেলেটির কোনো চাওয়া নেই— তাই পাওয়া না-পাওয়া নিয়ে দুঃখও নেই। আছে শুধু প্রতিকূল পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেয়ার প্রচেষ্টা।
যে গ্রামে ছেলেটি বাস করে সেই গ্রামে এক মোড়ল আছেন। সেই মোড়লের গরু-বাছুর দেখাশোনা করে ছেলেটি, তাই সবাই তাকে ডাকে রাখাল ছেলে।
রাখাল ছেলে মোড়লবাড়ির গোয়ালঘরে ঘুমোয়। সাতসকালে ঘুম থেকে উঠে গরু-বাছুর নিয়ে মাঠে যায়— সন্ধ্যারাতে ফিরে আসে। তবু তার কাজ শেষ হয় না। গোয়ালঘরে গরু-বাছুর তুলে ধূপ-ধুনো দেয়। গরু-বাছুরের সামনে ঘাস-বিচালি মেলে ধরে। ওদের খাওয়া শেষ হয়। তারপর তার অবসর মেলে। ছেলেটি তখন খেয়েদেয়ে ঘুমোতে যায়। গোয়ালঘরের এক কোণে পরম শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়ে সে।
সেই রাখাল ছেলেটির যে একেবারেই কিছু নেই— সে কথাও সত্যি নয়। নেই নেই করেও রাখাল ছেলেটির একটি সম্পদ আছে— অতি সাধারণ একটি বাঁশের বাঁশি। সারাটা সময় সে সেই বাঁশিটিকে সঙ্গে রাখে। যখন ইচ্ছে হয় তখন বাঁশি বাজায়। আর যখন বাঁশি বাজায় তখন চারপাশের পরিবেশে তার প্রভাব পড়ে। পাখিরা বাঁশির সুরের সঙ্গে নিজেদের সুর মেলায়। সুখীজনের মন সুরের তালে দুলে ওঠে। দুখীজন সুরের মাঝে সুখ খুঁজে পায়। কিন্তু রাখাল ছেলে তা বুঝতেও পারে না। কারণ সে বাঁশি বাজায় নিজের মাঝে নিজেকে বিলীন করে দিয়ে। অন্য কিছু দেখার প্রয়োজন অনুভব করে না সে।
যে মাঠে ছেলেটি গরু চরায় সেই মাঠে একটি গাছ আছে— ঝাঁকড়া পাতাওয়ালা ছাতিম গাছ। রোদে শরীর তেতে গেলে সেই গাছের নিচে গিয়ে বসে রাখাল ছেলে। তারপর আপন মনে বাঁশি বাজায়। বাঁশির সুর দূর থেকে দূরে ছড়িয়ে পড়ে। একদিন নয়— প্রতিদিন। দিনের পর দিন এমন করেই সে দিন কাটায়।
দুই.
সেদিন কাঠফাটা রোদে আকাশটা ঝাঁ ঝাঁ করছিলো। সারা মাঠে গরু চরিয়ে ঘেমে-নেয়ে একাকার হয়েছিলো রাখাল ছেলে। তাই ছুটে এসে গাছের ছায়ায় বসেছিলো। হাতে তুলে নিয়েছিলো বাঁশের বাঁশি।
রাখাল ছেলের চিরচেনা মাঠের বুক চিরে একটা সরু পথ কোনো এক লোকালয়ের দিকে চলে গেছে। সে যখন বাঁশি বাজাচ্ছিলো সেই পথ দিয়ে তখন এক বাউল বুড়ো যাচ্ছিলেন। যেতে যেতে তার মনে হলো, কোনো এক অদৃশ্য শক্তি যেনো তাকে পিছু টানছে। কেউ যেনো তার মনের ভেতর কথা বলছে! তাকে বলছে— এখানে একটু দাঁড়াও, হে বাউল! এমন সৌন্দর্যকে অবহেলা করে তুমি এগিয়ে যেয়ো না।
বাউল বুড়ো সৌন্দর্যের ভক্ত। তাই তিনি সৌন্দর্যের আহ্বানকে এড়িয়ে যেতে পারলেন না। রোদ ঝাঁ ঝাঁ পথে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। কে তার মনের ভেতর বসে সৌন্দর্য উপভোগের কথা বলছে, তা বোঝার চেষ্টা করলেন। সে সময় বাঁশির সুর তার কানে এলো। সেই সুর শুনে তিনি বুঝতে পারলেন, এই সুরই তার মনের ভেতর কথা বলেছে। তার চলার গতি থমকে দিয়েছে। কিন্তু এমন মিষ্টি সুরে বাঁশি বাজাচ্ছে কে?
কৌতূহলী বাউল বুড়ো এদিক-ওদিক তাকালেন। তাকাতে তাকাতে এক সময় তার চোখ পড়লো রাখাল ছেলের ওপর। তিনি দেখলেন, ছাতিম গাছের নিচে বসে এক কিশোর আপন মনে বাঁশি বাজাচ্ছে।
বাউল বুড়োর আর পথচলা হলো না। বাঁশির সুর আগেই তাকে থমকে দিয়েছিলো— এবার সেই সুর তাকে কাছে টেনে নিলো। তিনি ধীরে ধীরে ছাতিম গাছের নিচে গিয়ে বসলেন। কিন্তু রাখাল ছেলে তা বুঝতেও পারলো না। কারণ তার চোখ ছিলো বন্ধ— চোখ বন্ধ রেখেই সে বাঁশি বাজায়। শুধু আজ নয়— প্রতিদিন।
রাখাল ছেলের বাঁশির সুরে কী ছিলো কে জানে! সেই সুর শুনে বাউল বুড়োর চোখ দুটো নিজের অজান্তেই ভিজে এলো। তিনি হৃদয় নিংড়ে চোখের পানি ঝরালেন— কাঁদলেন অঝোর ধারায়। কতোক্ষণ কাঁদলেন কে জানে! সেই কান্না থামলো বাঁশি থেমে যাওয়ার পর।
বাঁশি বাজানো বন্ধ করলেও রাখাল ছেলে চোখ খুললো না। সুরের আবেশে বিলীন হয়ে সে বসে রইলো। এভাবে অনেকটা সময় কেটে যাওয়ার পর যখন সে চোখ খুলে তাকালো, তখন বাউল বুড়োকে দেখতে পেলো। রাখাল ছেলে দেখলো— অচেনা এক বুড়ো ভেজা ভেজা চোখে অপার বিস্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছেন!
অচেনা মানুষটিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে রাখাল ছেলে অবাক হলো। সে জিজ্ঞেস করলো, আপনি কে? আপনাকে তো কখনো আমাদের গ্রামের আশেপাশে দেখিনি!
বাউল বুড়ো বললেন, দেখোনি। কারণ এদিকে কখনো আসা হয়নি আমার। পথ চলতে চলতে আজই বা কেমন করে এখানে এসে পৌঁছুলাম, কোথায় গিয়ে শেষ হবে এ পথচলা, আমি তা জানি না। যেতে যেতে কানে এলো বাঁশির সুর। মনে হলো সেই সুর আমাকে ডাকছে। মন আগেই থেমে গিয়েছিলো— এবার থামলো পা। দেখলাম তুমি বাঁশি বাজাচ্ছো। তোমার বাঁশির সুর আমাকে টেনে নিয়ে এলো এখানে— এই ছাতিম গাছের নিচে। আমি একটু বসবো। তোমার আপত্তি নেই তো?
: না না, আপত্তি থাকবে কেনো! আপনার যতোক্ষণ ইচ্ছে আমার পাশে বসুন। আমার বরং তাতে ভালোই লাগবে। আমার পাশে তো কেউ বসে না। সবাই আমাকে এড়িয়ে চলে। সব সময়ই আমি তাই একাকী থাকি।
খুব আন্তরিকতা নিয়ে রাখাল ছেলে কথাগুলো বললো। আর সেই কথা শুনে বাউল বুড়ো স্নেহার্দ্র চোখে ওর দিকে তাকালেন। তারপর বললেন, বাঁশি তো আমি কতো জনাকেই বাজাতে শুনেছি। কিন্তু তাদের সুর আমাকে এমন করে টানেনি। পথচলা থামিয়ে দেয়নি! মানুষকে টেনে নেয়ার এক বিস্ময়কর জাদু আছে তোমার সুরে। তুমি এমন সুরে বাঁশি বাজাও কেমন করে— এমন মনকাড়া সুরে?
রাখাল ছেলে বললো, কেমন করে বাজাই? এ প্রশ্নের জবাব তো আমার জানা নেই বাউল দাদু। আমি ঠোঁটে বাঁশি ছোঁয়াই, তাতে ফুঁ দিই আর সেই ফুঁ সুর হয়ে দিক-দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুর কোন্ সুরে বাজে, কী তার তাল আর কী তার লয়— আমি তা জানি না। জানার প্রয়োজন রয়েছে বলেও আমি মনে করি না। বাঁশিটার সঙ্গই আমাকে সুখ দেয়— আমি সেই সুখে সুখী হই। যা হোক, এ সুর আপনার ভালো লেগেছে?
বাউল বুড়ো বললেন, শুধু ভালো লাগা? কতো যে ভালো লেগেছে, আমি কেমন করে তোমাকে তা বোঝাবো? আচ্ছা ছেলে, সত্যি করে বলো তো, তুমি কি অনেক দুখী? তোমার বুকের ভেতর কি ব্যথার নদী বইছে?
: ব্যথার নদী? আমার বুকের ভেতর? কে জানে, হয়তো তেমন কিছু বয়ে চলেছে— হয়তো একেবারেই তা নয়। আসলে কি জানেন দাদু! সুখ-দুঃখ, ব্যথা-বেদনা— এসব কেমন, আমি তা বুঝি না। বোঝার মতো অনুভূতি আমার ভেতর শিকড় গাড়েনি। তবে বুকের ভেতর একটা হাহাকার আছে— অর্থহীন জীবন বয়ে বেড়াবার হাহাকার। ওটা সবসময় আমি অনুভব করি।
: হাহাকার অনুভব করো? সবসময়? আশ্চর্য! আমিও তো অমন অনুভব করি। কী যেনো নেই, কী যেনো নেই- অনুভূতি অষ্টপ্রহর আমাকে তাড়িয়ে ফেরে। মনে হয় এক অর্থহীন জীবন বয়ে বেড়াচ্ছি আমি। মূল্যহীন এক ব্যর্থ জীবন।
: তাই? আপনারও এমন মনে হয়?
: হ্যাঁ ভাই, তেমনই মনে হয় সারাটা ক্ষণ। এ জীবনের অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছি। অনেক কিছু দেখেছি। শিখেছি। আমার ভেতরের আমিটাকে চিনতে পেরেছি। তাই বুঝতে পেরেছি নিজের মূল্য। বুঝেছি, বৃথাই বেঁচে আছি আমি। আমার তো এমন মনে হতেই পারে- জীবনের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছি আমি। কিন্তু তোমার মনে হচ্ছে কেনো? তুমি তো এক সদ্যকিশোর। জীবন-পথের নতুন পথিক। দু পা হেঁটেই তুমি হাঁপিয়ে উঠেছো কেনো?
রাখাল ছেলে বললো, জানি না বাউল দাদু। জানার প্রয়োজনও বোধ করি না। প্রয়োজন বোধ করি শুধু বাঁশিটার সঙ্গ। বাঁশি বাজাই। মন ভালো থাকলে বাজাই- মন খারাপ থাকলেও বাজাই। কেনো যে বাজাই, নিজেও তা জানি না।
বাউল বুড়ো বললেন, তুমি জানো না, তবে আমি জানি।
: আপনি জানেন? আমি কেনো বাঁশি বাজাই তা জানেন আপনি?
: হ্যাঁ ভাই, আমি তা জানি। আমি জানি, বাঁশি তোমার মন, রক্ত আর অস্তিত্বের সাথে মিশে আছে। তাই ইচ্ছেয় হোক বা অনিচ্ছেয়, বাঁশি তোমাকে বাজাতেই হয়। তোমার কী মনে হয়? আমি কি ঠিক বলেছি?
রাখাল ছেলে বললো, আপনি জ্ঞানী। আপনার কথাই হয়তো সত্যি। আসলে মানুষকে তো একটা কিছুকে আঁকড়ে ধরেই বেঁচে থাকতে হয়- আমি বাঁশিকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। বাঁশি ছাড়া আর কিই বা আছে আমার!
বাউল বুড়ো বিড়বিড় করে বললেন, ঠিক বলেছো। তুমি আঁকড়ে আছো বাঁশি আর আমি আঁকড়ে আছি সুর। তুমি বাস করছো দুরন্ত ˆকশোরে আর আমি মৃত্যুছোঁয়া বার্ধক্যে। জীবনের দু-প্রান্তে অবস্থান করছি আমরা দুজন। অথচ বসে আছি পাশাপাশি- কাছাকাছি। অবাক লাগে ভাবতে, কী বিচিত্র এ জীবন!
বাউল বুড়ো এ কথাগুলো অস্ফুট স্বরে বলছিলেন, প্রায় স্বগতোক্তির মতো বিড়বিড় করে। তাই রাখাল ছেলে তা শুনতে পেলো না। তবে অনুভব করলো, বুড়ো কিছু বলছেন। তাই জিজ্ঞেস করলো, দাদু! কিছু বলছেন?
বাউল বুড়ো ম্লান হাসলেন রাখাল ছেলের প্রশ্ন শুনে কিন্তু প্রশ্নের জবাব দিলেন না। তাই রাখাল ছেলেকে আবার প্রশ্নটা করতে হলো- ও দাদু! গুনগুন করে কী বলেছেন? আমাকে বলেছেন?
আত্মমগ্ন হয়ে কী যেনো ভাবছিলেন বাউল বুড়ো। তিনি চমকে উঠে বললেন, তোমাকে কিছু বলেছি কি না? না ভাই, তোমাকে কিছু বলিনি। আমার নিজেকে বলাই শেষ হয়নি, তোমাকে বলবো কী! সূর্য মাঝ আকাশ পেরিয়েছে। আমাকে এখন যেতে হবে।
: এখনই চলে যাবেন?
: হ্যাঁ ভাই, যেতেই হবে। যাবার আগে তোমাকে যদি কিছু দিয়ে যেতে পারতাম, আমার ভালো লাগতো। কিন্তু দেয়ার মতো কিছুই নেই আমার। আমি যে বড়োই নিঃস্ব।
রাখাল ছেলে বললো, আপনার একটা সুন্দর মন আছে। জীবন থেকে কুড়িয়ে নেয়া অভিজ্ঞতা আছে। আপনি নিঃস্ব নন দাদু। তা ছাড়া আমাকে কিছু দিতে হবে না! কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই আমার।
বাউল বুড়ো বললেন, তুমি ভাবছো তোমার প্রয়োজন নেই। কিন্তু আমি জানি, প্রয়োজন আছে। সবারই কিছু না কিছুর প্রয়োজন থাকে। কেউ তা বুঝতে পারে আর কেউ পারে না। যেমন তুমি পারছো না।
: আপনি যদি বুঝে থাকেন আমার প্রয়োজন রয়েছে, তাহলে আপনিই বলুন, কী সেই প্রয়োজন?
বিনয়ের সাথে জানতে চাইলো রাখাল ছেলে। তার প্রশ্নের জবাবে বাউল বুড়ো বললেন, বাঁশির সঙ্গে জীবন বেঁধেছো তুমি। তোমার রয়েছে নতুন নতুন সুরের প্রয়োজন। সেই সুর আমি তুলে দেবো তোমার বাঁশিতে। কিন্তু…
কথা শেষ হলো না। থমকে গেলো বাউল বুড়োর কণ্ঠ। তাতে রাখাল ছেলের কৌতূহল আরো বেড়ে গেলো। সে জিজ্ঞেস করলো, কিন্তু কী দাদু? বলুন, দয়া করে আমার কাছে কিছু লুকোবেন না। কিন্তু কী?
বাউল বুড়ো বললেন, না, লুকোবো না। চন্দ্র-সূর্যের মতো যা সত্য, তাকে কি লুকিয়ে রাখা যায়? দ্বিতীয় সত্তা হিসেবে বাঁশিকে বেছে নিয়েছো তুমি। কিন্তু বাঁশিকেই বেছে নিয়েছো কেনো? অন্য কিছু বেছে নিলেও তো পারতে!
: হয়তো পারতাম। কিন্তু আপনি এ কথা বলছেন কেনো?
: বলছি, কারণ বাঁশি কখনো বাঁশিওয়ালাকে সুখ দেয় না। বারবার শুধু দুখের সাগরে ভাসায়।
রাখাল ছেলে বললো, তা ভাসাক- যতো ইচ্ছে বাঁশিওয়ালাকে ভাসাক। বাঁশির সুর যাকে মুগ্ধ করবে, তাকে না ভাসালেই হলো।
বাউল বুড়ো বললেন, আমি জানতাম তুমি এমন কথাই বলবে। প্রকৃতির এ এক অদ্ভুত নিয়ম। কেউ দুঃখকে এড়িয়ে চলে— কেউ পরম মমতায় দুঃখকে বুকে টেনে নেয়। তুমি বুকে টেনে নিয়েছো।
: আপনার কি তাই মনে হয়- আমি দুঃখকে বুকে টেনে নিয়েছি? যদি নিয়েই থাকি, তবে কি আমি ভুল করেছি?
জিজ্ঞেস করলো রাখাল ছেলে। বাউল বুড়ো বললেন, ভুল না সঠিক, তা বোঝার সাধ্য কি আমার আছে? এ ভার সময়ের ওপর ছেড়ে দাও। সময়ই একদিন এ প্রশ্নের জবাব দেবে।
কথা শেষ করে বাউল বুড়ো আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে আক্ষেপের সুরে বললেন, হলো না। চেয়েছিলাম, কিন্তু তা আর হলো না।
রাখাল ছেলে শুনতে পেয়েছিলো কথাটা। তাই জিজ্ঞেস করলো, কী হলো না দাদু?
বাউল বুড়ো বললেন, সুপাত্রে দান করা হলো না। জানো তো, মানুষের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনো মূল্য নেই। সৃষ্টিকর্তাই হলেন সব কিছুর নিয়ন্তা।
নিয়ন্তা? কী খটমটে একটা শব্দ! কাকে বলে নিয়ন্তা- ভাবলো রাখাল ছেলে। তারপর বিপুল কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো, বাউল দাদু! ওই যে বললেন নিয়ন্তা— নিয়ন্তা মানে কী? একটু বুঝিয়ে বলুন।
বাউল বুড়ো বললেন, কী করে বুঝিয়ে বলবো! আমিই কি নিয়ন্তার স্বরূপ জানি, না তাকে চিনি? শুধু জানি, আমাদের নিয়ন্তাই সৃষ্টি করেছেন সাত সমুদ্র, সপ্ত আকাশ, গ্রহ-নক্ষত্র আর সৃষ্টির সেরা জীব— এই মানুষকে। তার ইচ্ছে মতোই ঘটে চলেছে ঘটনা আর দুর্ঘটনা। তাই মানুষের ইচ্ছে-অনিচ্ছের কোনো মূল্য নেই। এই আমার কথাই ধরো। ভেবেছিলাম যে সুরের ভাণ্ডার রয়েছে আমার কণ্ঠে, আমি তা নিঃশেষে দান করে যাবো তোমাকে। কিন্তু হলো না। বেলা বয়ে যাচ্ছে! আমাকে অজানার পথে পা বাড়াতে হবে। তো ভাই, আমি এখন যাই। মনে রেখো, এক অধমের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিলো— এ স্মৃতিটাকে তোমার মনের কোণে জিইয়ে রেখো।।
হঠাৎ যেমন এসে বসেছিলেন, তেমনি হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন বাউল বুড়ো। হাতে তুলে নিলেন একতারাটি— তারপর পা বাড়ালেন অজানার পথে। ঝাঁ ঝাঁ রোদ্দুরে, নিঝুম দুপুরের নীরবতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ছড়িয়ে পড়লো তার সুমিষ্ট সুর-
দিন আমার কাইট্যা গেলো
গভীর ঘুমের মাঝে,
আমি মরি শরম-লাজে
এ জীবন লাগলো না আর কাজে…
ধীরে ধীরে বাউল বুড়োর কণ্ঠ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে এলো। একতারার টুং টাং মিলিয়ে গেলো। দৃষ্টির আড়ালে চলে গেলেন অচেনা সেই বাউল বুড়ো।
তিন.
বাউল বুড়ো দূর থেকে দূরে চলে যাওয়ার পর নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মনে হলো রাখাল ছেলের। সে গরু-বাছুরগুলোর দিকে তাকালো। ওরা আপন মনে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আরো অনেকটা সময় রাখাল ছেলেকে প্রয়োজন পড়বে না ওদের। রাখাল ছেলে তাই বাঁশি তুলে নিয়ে ঠোঁটে ছোঁয়ালো। কিন্তু সেই বাঁশিতে সুর তুলতে পারলো না। তার আগেই সে নিজের ভেতর এক ধরনের অবসাদ অনুভব করলো। মনে হলো, সবচেয়ে আগে একটু ঘুমিয়ে নেয়া দরকার।
ছাতিম গাছের শীতল ছায়ায় ছাতিম শিকড়ে মাথা রেখে চোখ বুজলো রাখাল ছেলে। সে চোখে নেমে এলো গাঢ় ঘুম। সেই ঘুমে অনেকটা সময় কেটে গেলো। সূর্য নিভু নিভু হয়ে ছায়া ছড়ালো— তবু ছেলেটির ঘুম শেষ হলো না।
তারপর অন্ধকার যখন একটু গাঢ় হলো, সে সময় রাখাল ছেলের কোমরে প্রচণ্ড এক লাথি এসে লাগলো। দুঃসহ ব্যথায় কুঁকড়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে চোখ দুটো খুলে গেলো। তখন রাখাল ছেলে দেখলো, আগুনের মতো লাল টুকটুকে চোখ নিয়ে বদরাগী মোড়ল দাঁড়িয়ে আছেন। তার পায়ের নিচে পড়ে আছে ওর প্রিয় সঙ্গী বাঁশের বাঁশি।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫



