যেদিন সবাই মুক্ত হলো

0
0

ক্লাস ওয়ানে পড়ে আবিদ। লিকলিকে তার গড়ন। লিকলিকে হলে কী, দেখতে কী যে মায়াবী মুখখানা! চোখে গোলগোল চশমা এঁটে থাকে সবসময়। বাবা-মায়ের সাথে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শহিদ মিনারমুখী স্টাফ কোয়ার্টারে।
তখন জুলাইয়ের ১৭ তারিখ। এর দুদিন আগেই বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় বেশ গণ্ডগোল হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীদের রক্তে লাল হয়েছে ক্যাম্পাস। হলগুলো বন্ধ হলো। অনেক শিক্ষার্থী পরিবারের চাপে গ্রামের বাড়িতে চলে যাচ্ছিল। সারা ক্যাম্পাস জুড়ে পুলিশের সাথে বিভিন্ন বাহিনী।
আবিদ বিশতলা বিল্ডিংয়ের দশতলা ফ্লাট থেকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে।
দিন যায়। পরিস্থিতি ততই খারাপ হয়ে আসে। আবিদের এখন কোয়ার্টার থেকে বাইরে বেরুনো নিষেধ। ও শুধু তাকিয়ে দেখে বাইরে থমথমে পরিবেশ। পুলিশ টহল দিচ্ছে। চিউ চিউ করে পুলিশের গাড়ি আসছে আর যাচ্ছে। আন্দোলন হচ্ছে থেকে থেকে। পুলিশ কাঁদুনে গ্যাস, রাবার বুলেট ছুঁড়ছে। দিনে তো হরহামেশাই। রাতেও থেমে নেই। ককটেল ফাটছে এখানে-ওখানে। আবিদের ছোট্ট মন বুঝতে পারে না দেশে কী হচ্ছে!
কিন্তু আবিদের ঘরে বসে থাকতে মোটেও ভালো লাগে না। ওর বন্ধুদের সাথে খেলতে ইচ্ছে করে। সায়ানের সাথে। জিসানের সাথে। টুপ্পুর সাথে। ওরা পাশের শিববাড়ি এলাকায় থাকে। কেউ আর বাসা থেকে বের হয় না। আবিদের মন আরও খারাপ হয়ে আসে।
আবিদের আব্বু বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক। অন্যায় দেখতে পারে না। আজকে শিক্ষকদের সাথে প্রতিবাদ করতে গিয়েছিল। আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে এলো।
আব্বু যখন বিশ্রাম নিচ্ছিল, তখন আবিদ পা টিপে টিপে আব্বুর কাছে হাজির হলো।
আর বলল, ‘আব্বু, আমার কিছু ভালো লাগছে না।’
আব্বু বলল, ‘কী হয়েছে আমার সোনা আবিদের?’
আবিদ বলল, ‘শুধু পুলিশ আর পুলিশ আব্বু। সারাদিন গাড়ির চিউ চিউ শব্দ আর শব্দ! আমার এসব ভালো লাগছে না আব্বু। আচ্ছা, আব্বু, আমি কি আর বাইরে খেলতে যেতে পারব না?’
আব্বু বলল, ‘খুব তাড়াতাড়ি পারবে সোনা। আর ক’টাদিন ˆধর্য ধরো। তখন না হয় খেলো।’
বাবার কথা শেষ না করতেই আবিদ বলল, ‘আমার আর বন্দি থাকতে ভালো লাগে না আব্বু। সায়ান, জিসান, টুপ্পুর সাথে খেলতে ভালো লাগে। ওরাও কি আমার মতো ছটফট করছে আব্বু?’
‘হ্যাঁ সোনা। ওরাও তোমার মতো বাইরে এসে খেলতে চায়। কী আর করা! ছাত্র-জনতার বিজয় না এলে যে আমরা মুক্ত হবো না সোনা।’ আব্বু বলল।
আবিদ কিছু না বুঝে একটু মন খারাপ করে বলল, ‘আমরা কি মুক্ত হব না আব্বু?’
আব্বু বলল, ‘আমরা মুক্ত হবো সোনা। তখন তুমি খেলবে। ইচ্ছেমতো খেলবে। পাখির মতো উড়বে স্বাধীন আকাশে।’
আবিদের ছোট্ট মন। খেলতে চায় বন্ধুদের সাথে। ক্রিকেট, ফুটবল। ব্যাডমিন্টনও খেলে। এখন ঘরবন্দি থেকে ভীষণ খারাপ লাগছে ওর।’

একদিন সময় এলো। আব্বু-আম্মু গল্প করছে, ছাত্ররা তো ১ দফা দিয়ে দিয়েছে। আগামীকাল ৫ তারিখ লং মার্চ টু ঢাকার ঘোষণা দিয়েছে সমন্বয়কেরা। সারাদেশ থেকে ঢাকায় আসবে লক্ষ লক্ষ মানুষ। মনে হচ্ছে আগামীকালই একটা হেস্তনেস্ত করেই ছাড়বে। আবিদ পাশে বসেই শুনছিল আব্বুর কথা। আবিদের মনে আশার বাতি জ্বলে ওঠে। আগামীকাল তাহলে কিছু একটা হবে! আব্বুর কথা শুনে মনে মনে আবিদ দারুণ খুশি হয়।
আগস্টের ৫ তারিখ। না না, জুলাইয়ের ৩৬। রক্তাক্ত জুলাই তো। আন্দোলন যে শেষ হয়নি। সারাদেশ থেকে সমুদ্রের স্রোতের মতো মানুষ ঢুকছে ঢাকা শহরে। আব্বুও সেই সকালেই বেরিয়ে গেছে। এদিকে আবিদের মন উশখুশ করছে। কী হবে! কী হবে!
হঠাৎ আম্মু বলে উঠল, ‘আমরা মুক্ত। আমরা মুক্ত। ফ্যাসিস্ট সরকার দেশত্যাগ করেছে।’
আম্মুর কথা শুনে আবিদের আনন্দ আর কে দেখে। বাইরে বেরোনোর জন্য আম্মুকে তাড়া দিতে লাগল।
আবিদরা যখন বেরিয়ে এলো- জিসান, সায়ান, টুপ্পুরাও বেরিয়ে এসেছে। জিসান ওর আম্মুর সাথে। সায়ান তার বড় ভাইয়ের সাথে। টুপ্পু ওর ছোট ফুপির সাথে। শহিদ মিনারে হাজারো মানুষের ঢল। মিনারের শিখরে চড়ে লাল-সবুজের পতাকা উড়াচ্ছে পতপত করে ছাত্ররা। আবিদের তখন কী যে আনন্দ আর আনন্দ! চোখেমুখে হাসি আর হাসি। আজকে থেকে ওরা সবাই মুক্ত। আবারও খেলবে একসাথে বিকেল হলে। চারবন্ধু যে ভীষণ খুশি।
ছোট্ট মন ওদের। দেশের পরিস্থিতি বুঝতে না পারলেও, ওদের মন বুঝতে পেরেছে আজকে থেকে ওরা মুক্ত। থাকবে না আর ঘরে বন্দি হয়ে। ছোট্ট চারটে মন, পাখির মতো উড়বে সারাক্ষণ…।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৫