দূর দিগন্তের পাখি

0
0

রাফিদ হঠাৎ আজ খুব সকালে ঘুম থেকে উঠে পড়লো। উঠেই তার স্মার্টওয়াচের দিকে তাকিয়ে দেখলো- সময় এখন ৬টা বেজে ৭ মিনিট। তার বাড়িশুদ্ধ সবাই গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। সে একটু অবাক হলো। আজ সে এত তাড়াতাড়ি ঘুম থেকে উঠেছে! এটা তো সে বিশ্বাসই করতে পারছে না। অন্য দিন তো বেলা ১২টা বাজলেও তার ঘুম ভাঙে না। আর শীতকালের কথা নাই বা বললাম। সে উঠেই মনে করলো যে, তার আজকে ফজরের নামাজটি মিস হয়ে গেল। সে আবার এমন প্রকৃতির ছেলে যে, তার নামাজ এর ওয়াক্ত মিস হলেও তার কোনো যায় আসে না। আর এমনিতেও, তার নামাজের প্রতি কোনো আগ্রহই নেই। সে আবার ঘুমোতে গেল। কিন্তু কিছুতেই তার আর ঘুম আসছে না। বিছানার এপাশ ওপাশ করেও সে ঘুমকে আর তার কাছে টেনে নিয়ে আসতে পারছে না। সে এবার উঠে বসলো। পাশে ছোটো ওয়ারড্রোবের ওপর একটি পানির বোতল ছিল। সে পানির বোতল নিয়ে ঢক্ ঢক্ করে পানি গিলতে লাগলো। তখন ছিল শীতকাল। চারদিকে কুয়াশা আর ঠান্ডা। শীতের কারণে লেপ, কম্বল, কাঁথা মুড়ি দেওয়া অবস্থাতেই সে জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো। তখনও সূর্যের আলো খুব বেশি একটা এসে পৌঁছায়নি। সে জানালা দিয়ে দেখলো, তীব্র শীতেও পাখিরা গাছের ডালে বসে গান করছে, কোনো কোনো পাখিরা দল বেঁধে তাদের খাদ্য সংগ্রহ করতে যাচ্ছে। রাফিদের কাছে এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য, যেন অন্যরকম একটা শীত। এমনিতেই শীতের সকাল, চারিদিকটা কুয়াশায় আচ্ছন্ন। বাড়িশুদ্ধ সবাই এই শীতের সকালে নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। আর সে জেগে আছে। বিষয়টি তার কাছে একেবারেই ভালো লাগছে না। সে আবার ঘুমোতে চেষ্টা করল। কিন্তু তন্দ্রা যে তাকে স্পর্শই করছে না। সে এবার উঠে তার উলের তৈরি জ্যাকেটটি গায়ে পরে নিলো। তারপর বিছানা থেকে নেমে তার পড়ার টেবিলে বসলো। ঘুম যেহেতু আসছেই না তাই সে বই নিয়ে পড়তে বসলো। সামনের সপ্তাহে যেহেতু তার বার্ষিক পরীক্ষা, তাই সে এই সময়টা পড়ার কাজে লাগিয়ে দিলো। কিন্তু তার পড়ায় কেন জানি মনোযোগ বসছে না। রাফিদ অনেক মেধাবী একজন ছাত্র। সে যেই পড়া হাতে নিক না কেন তার সেই পড়া মুখস্থ হয়ে যায় ৫ মিনিটের মধ্যেই। সে ক্লাসের ভিতর সবচেয়ে মনোযোগী থাকে। তার পড়া জিজ্ঞাসা করলে সে ফটাফট উত্তর দেয়।

সে এ বছর ক্লাস সিক্সে পড়ছে। পরের বছর ক্লাস সেভেনে উঠবে। বরাবরের মতোই এবারের পরীক্ষায় ওকে ক্লাসে প্রথম হতেই হবে। সেই ভাবনায় সে অনেক আগে থেকেই ডুবে আছে পড়াশোনার ভিতরে। অনেক বেশি পরিমাণে মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করছে। বেশিরভাগ সময় ও স্কুলে না গিয়ে বাসায় বসে পড়ালেখা করে। পড়ালেখার চাপে ইচ্ছে করেই ও নামাজ পড়তে চায় না। রোজা রাখলে বলে, পড়াশোনার চাপ। এত চাপের মধ্যে রোজা রাখলে অসুস্থ হয়ে যাবে। এসব তালবাহানা ওর প্রতিদিনের নিত্যসঙ্গী। কিন্তু এখন ওর আর পড়ায় কোনো মনোযোগ আসছে না। পড়া মুখস্থ হচ্ছে না। সে কিছু একটা ভাবছে। সে ভাবছে কিছুক্ষণ আগে দলবদ্ধভাবে উড়তে দেখা পাখিদের কথা। সে চিন্তা করে দেখল যে পাখিরা খুব ভোরে উঠে তাদের এবং তাদের বাচ্চাদের খাদ্য সংগ্রহ করার জন্য কত দূরে যেয়ে খাদ্য সংগ্রহ করে। সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর তারা সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে। ফিরে এসে তারা তাদের বাচ্চাদের মুখে খাবার তুলে দেয়। তখনই তারা নিজেদের সফল মনে করে। ঠিক সেভাবেই রাফিদ তার রেজাল্ট ভালো করার জন্য এত পরিশ্রম করে। যখন তার রেজাল্ট ভালো হয় তখন সে নিজেকে সফল মনে করে। কিন্তু সে আরেকটু ভেবেচিন্তে দেখল যে এসব তো দুনিয়াবি সফলতা। তাকে যদি সত্যিকারের সফল হতে হয় তবে তাকে আখেরাতে সফল হতে হবে। সেই সত্যিকারের সফলতার জন্য তার আমল ভালো হতে হবে। জানতে হবে সেই সফলতার উদ্দেশ্য। তাকে আল্লাহর জানিয়ে দেওয়া ও রাসুল (সা.) এর দেখিয়ে দেওয়া পদ্ধতি অনুসারে প্রতিটি কাজ করতে হবে। তাকে আল্লাহ যা আদেশ করেছেন এবং যা নিষেধ করেছেন তা মেনে চলতে হবে। তবেই সে সত্যিকারের সফল ব্যক্তি হিসেবে আল্লাহর কাছে গণ্য হবে। সে আজকের পর থেকে প্রতিজ্ঞা করল, দুনিয়াবি সফলতার পাশাপাশি তাকে আখেরাতেও সফল হতে হবে। তবেই সে হতে পারবে ‘দূর দিগন্তের পাখি’।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৫