শিশুরা চঞ্চল। এই চঞ্চল শিশুদের নিয়ে ভাবনার অন্ত নেই। শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে পরিবেশ ও খাবারের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। শিশুকে খাওয়ানোর বিষয়টিও মা বাবার জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। গত একটি সংখ্যা ফুলকুঁড়িতে শিশুদের রঙিন খাবার বিষয়ে লিখেছিলাম। বিষয়টির প্রতি সবার সাড়া দেখে ভালো লাগছে। আজ আরও একটি প্রসঙ্গ নিয়ে এলাম। বন্ধু ফুলকুঁড়িরা এটা পড়ে সতর্ক হতে পারো। আর মা বাবারা এটা পড়ে ঠিক করবেন কী খাওয়াবেন শিশুকে। যাক, আসল কথায় আসি।
আজকাল অনেক পরিবারে সদস্যরা কাজে বেশি ব্যস্ত থাকে। তারা ঘরে তৈরি খাবার রান্না করতে সময় পায় না বা করে না। ফলে হাতের কাছে চটজলদি রেডি টু ইট বা প্যাকেটজাত খাবার যা পায় তা বাচ্চাদের খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। এসব খাবার খুব সহজলভ্য হলেও শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর নয় মোটেই। এসব খাবারের পার্শপ্রতিক্রিয়ায় শিশুরা হাইপারঅ্যাকটিভিটি বা অতিরিক্ত চঞ্চলতা, বিরক্তিকর মনোভাব ও বিষণ্নতায় ভোগে। শিশুরা এমনিতেই চঞ্চল। এটা বেড়ে গেলে বিপদ। পাশাপাশি শিশুরা হৃদরোগ, পরিপাকতন্ত্রের হজমজনিত সমস্যা, হাঁপানি, পুষ্টির ঘাটতিসহ নানা রোগের শিকার হতে পারে যা একটি শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোর মধ্যে কয়েকটি আমাদের দেশে বেশ প্রচলিত রয়েছে। যেমন বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, চকলেট, নিম্নমানের নুডুলস, কেক, বিভিন্ন সিরিয়ালপন্য জুস ইত্যাদি। এ খাবারগুলো অত্যন্ত পরিশোধিত যাতে পুষ্টির মান খুব কম থাকে। পাশাপাশি চিনি, লবণ, তেল ও বিভিন্ন প্রকার রাসায়নিক উপাদান দিয়ে তৈরি করা হয়। এসব নিয়মিত গ্রহণে শিশুর দীর্ঘস্থায়ী ক্রনিক রোগ হতে পারে। ফুলকুঁড়িদের বলবো- তোমরা এসব খাবার কম খাবে। যদি পারো না-ই খাবে। যারা অসচ্ছ্বল তারা তো এসব খাবার খায় না। তাদের কথাও ভাবো একবার।
প্রক্রিয়াজাত খাবারে কী আছে?
১. প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে প্রায়ই বিভিন্ন কৃত্রিম রং, স্বাদ, টেক্সচার ও রং মেশানো থাকে যা আপাতদৃষ্টিতে খেতে খুব স্বাদ হলেও এগুলো শিশুর স্বাস্থ্যের উপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এসব খাবার নিয়মিত গ্রহণে শিশুর অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া, ক্ষুধামন্দা ও হাইপারঅ্যাকটিভিটির সমস্যা দেখা দিতে পারে।
২. প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে বেশিরভাগ উচ্চ শর্করা, চিনি ও লবণের পরিমাণ বেশি থাকে যা শিশুর ওজন বৃদ্ধি, টাইপ টু ডায়াবেটিস, ও দাঁতের সমস্যাসহ নানা রোগ হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তুলে। এছাড়া প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে ফাইবার, ভিটামিন এবং খনিজের মতো প্রয়োজনীয় পুষ্টির অভাব থাকে। এতে শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
৩. প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে অতিরিক্ত ক্যালরি থাকে যার ফলে শিশুরা অল্প বয়সে স্থুলতার ঝুঁকিতে থাকে। এছাড়া গবেষণায় দেখা গেছে যেসব শিশু খুব বেশি প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করে তারা অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ করবে। এই চিনি রক্তে শর্করার বৃদ্ধি করে ডায়াবেটিসের দিকে পরিচালিত যেমন করে, তেমনি শিশুদের মধ্যে ক্লান্তি অলসতা বাড়িয়ে তোলে। পাশাপাশি বড়দের মতো উচ্চ রক্তচাপ, টাইপ-টু ডায়াবেটিস ও কার্র্ডিওভাস্কুলার রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
৪. প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলোতে অতিরিক্ত চিনি, চর্বি ও শর্করা থাকায় এগুলো শিশুর স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও মেজাজকে প্রভাবিত করতে পারে যা মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ফলে দেখা যায়, শিশুরা কোনো কিছু সহজে মনে রাখতে পারে না। পড়া মনে রাখতে বা মুখস্থ করতে পারে না।
৫. প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো আগে থেকে প্রস্তুত করা থাকে। এগুলো দীর্ঘসময় স্থায়ী হয়। এসব প্রক্রিয়াজাত খাবারের মধ্যে রয়েছে নাইট্রাইট এবং নাইট্রেট, সোডিয়াম বেনজোয়েট ও মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট যা শিশুর পেট ও মন ভরলেও পেটের মাইক্রোবায়োম পরিবর্তন করে আসক্ত করে তোলে।
শিশুর খাবারের ধরনটি কেমন হওয়া উচিত? শিশুকিশোর বন্ধুদের বলছি- তোমরা নিয়মিত বিরতিতে সুষম খাবার খাবে। আর বড়দের বলছি, পরিকল্পনা করুন যেন খাবারটি শিশুরা আনন্দ করে খেতে পারে। শিশুর জন্য সবসময় ঘরের তৈরি স্বাস্থ্যকর ও বৈচিত্র্যময় খাবার খেতে দিন। এতে খাবারের প্রতি শিশুরা রূচিশীল ও মননশীল হয়ে উঠবে। শিশুদের খাদ্যতালিকায় তাজা ফল, শাকসবজি, বাদাম, বীজ অন্তর্ভুক্ত করুন। এতে প্রয়োজনীয় পুষ্টি যেমন ভিটামিন বি, জিঙ্ক, আয়রন, ম্যাগনেসিয়াম পাবে। আরও একটি কথা- শিশু সারাদিন পর্যাপ্ত পানি গ্রহণ করছে কি না, তা খেয়াল করুন। শিশুকে ওমেগা-থ্রি ফ্যাটি অ্যাসিডযুক্ত খাবার খেতে দিন। যেমন সপ্তাহে দুদিন সামুদ্রিক মাছ বা তৈলাক্ত মাছ, তিসিবীজ, আখরোট বাদাম ইত্যাদি। এগুলো শিশুর মানসিক স্বাস্থ্য ভালো রাখতে সাহায্য করবে।
আমাদের দেশে আগে লাল চাল, লাল আটার প্রচলন বেশি ছিল। এদুটো জিনিসই ভালো। বাচ্চার স্নায়বিক বিকাশের জন্য লাল চাল, লাল আটার তৈরি খাবার দিন।
ছোট্ট বন্ধুরা, তোমাদের নিয়মিত পর্যাপ্ত পরিমাণে প্রোটিন খেতে হবে। বড়দের বলবো- ওদেরকে প্রেটিন খেতে দিন যা তার সামগ্রিক সুস্থতাকে প্রভাবিত করবে। আরেকটা বিষয় মনে রাখা দরকার- শিশুদের পর্যাপ্ত ফাইবারসমৃদ্ধ খাবার খেতে দিন। যেমন সকল রকম শাকসবজি ও ফল, মটরশুঁটি ইত্যাদি।
ফুলকুঁড়ি বন্ধুরা, তোমাদের বলবো তোমরা বেশি জুস খেয়ো না। শিশুদের বেশি জুস বা তরল খাবার না খাইয়ে গোটা ফল চিবিয়ে খেতে উৎসাহিত করতে পরামর্শ দেবো অভিভাবকদের। আর চকলেট বা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার খাওয়াবেন না। এতে দাঁতের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৪



