নতুন ইংরেজি বছর এসেছে। দেয়ালে নতুন ক্যালেন্ডার লাগাতে গিয়ে ক্লাস সেভেনের ছাত্র আবরারের মাথায় একটা প্রশ্ন খেলে গেল। এই ক্যালেন্ডার জিনিসটা কী আর কীভাবে ইংরেজি মাসের নামগুলো এলো? বিষয়টা জানতে হবে। তার এক মামা তাদের বাসায় থেকে অনার্সে লেখাপড়া করেন। তাকেই পাকড়াও করল আবরার,
: তুই জানিস না?
: না মামা।
: এত সহজ বিষয় জানিস না?
: জানি না বলেই বলছি তোমায়, বল না।
মা বাবা দুজনই ব্যস্ত। তাদের কাছে জানার চেয়ে নাজমুল মামাই তার জ্ঞানের দরজা। মামা একদিন বললেন সব। আসলে আমরা যাকে বলি ইংরেজি সন তা কিন্তু আসলে গ্রেগরিয়ান সন। ক্যালেন্ডারের বাংলা প্রতিশব্দ বর্ষপঞ্জি। তবে এখন ক্যালেন্ডারই প্রচলিত বেশি। বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পহেলা জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ উদযাপন হয়ে থাকে। তবে আমাদের দেশে বাংলা নববর্ষ বেশি জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়।
মামা আরও বললেন, গ্রেগরিয়ান বর্ষপঞ্জি বা ক্যালেন্ডারের আগে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির প্রচলন ছিল এই পৃথিবীতে। জুলিয়ান বর্ষপঞ্জিরও পূর্বে ভ্যাটিক্যান পোপের অনুসারী খ্রিষ্টান ধর্মসম্প্রদায়বিশেষ অর্থাৎ রোমের অধিবাসীরা গ্রিক পঞ্জিকা অনুসারে ৩০৪ দিনে বছর ধরত। যা ১০ মাসে বিভক্ত ছিল। এই সময়ের ইংরেজি বছরের প্রথম দুই মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির জন্ম তখনও হয়নি। সে সময়ে মার্চ ছিল বছরের প্রথম মাস। পরবর্তী সময়ে রাজা নুমা পম্পিলিয়াস খেয়াল করেন ৩০৪ দিন হিসেবে বছর ধরলে পরিবেশের সঙ্গে মেলে না। সে কারণে তিনি খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯৩ অব্দে বছরের সঙ্গে যুক্ত করেন আরও ৬০ দিন। মোট হলো ৩৬৪ দিন। কিন্তু দিন বাড়ানোর পরে সমস্যা আরও বেড়ে গেল। ঋতুর চেয়ে সময় এগিয়ে আছে তিন মাস।
মামা আরও বললেন, গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি, গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জি, পাশ্চাত্য বর্ষপঞ্জি, বা খ্রিষ্টীয় দিনপঞ্জিকা হলো আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় সর্বত্র স্বীকৃত বর্ষপঞ্জি/দিনপঞ্জিকা। ১৫৮২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগোরির এক আদেশানুসারে এই বর্ষপঞ্জির প্রচলন ঘটে। সে বছর হাতেগোণা কয়েকটি রোমান ক্যাথলিক দেশ গ্রেগোরীয় বর্ষপঞ্জি গ্রহণ করে এবং পরবর্তীকালে ক্রমশ অন্যান্য দেশসমূহেও এটি গৃহীত হয়। আর ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র গ্রহণ করে ১৭৫২ সালের সেপ্টেম্বরে। তখন তারা তাদের ক্যালেন্ডার থেকে ১১ দিন বাদ দেয়। তাই ১৭৫২ সালের ক্যালেন্ডারে ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর এই ১১ টি দিন পাওয়া যায় না।
পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরি কর্তৃক বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা ছিল, কারণ পূর্ববর্তী জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির গণনা অনুসারে একটি মহাবিষুব থেকে আরেকটি মহাবিষুব পর্যন্ত সময়কে ধরা হয়েছিল ৩৬৫.২৫ দিন, যা প্রকৃত সময় থেকে প্রায় ১১ সেকেন্ড কম। এই ১১ সেকেন্ডের পার্থক্যের ফলে প্রতি ৪০০ বছর অন্তর মূল ঋতু থেকে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির প্রায় তিন দিনের ব্যবধান ঘটত। পোপ ত্রয়োদশ গ্রেগরির সময়ে এই ব্যবধান ক্রমশ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ১০ দিনের এবং ফলস্বরূপ মহাবিষুব ২১ মার্চের পরিবর্তে ১১ মার্চ পড়েছিল। যেহেতু খ্রিষ্টীয় উৎসব ইস্টারের দিন নির্ণয়ের সাথে মহাবিষুব জড়িত সেহেতু মহাবিষুবের সাথে জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির এই ব্যবধান রোমান ক্যাথলিক গির্জার কাছে অনভিপ্রেত ছিল।
গ্রেগোরিয়ান বর্ষপঞ্জির সংস্কার দু’টি ভাগে বিভক্ত ছিল: পূর্ববর্তী জুলিয়ান বর্ষপঞ্জির সংস্কার এবং ইস্টারের তারিখ নির্ণয়ের জন্য গির্জায় ব্যবহৃত চান্দ্র পঞ্জিকার সংস্কার। জনৈক চিকিৎসক অ্যালয়সিয়াস লিলিয়াস কর্তৃক দেয়া প্রস্তাবের সামান্য পরিবর্তন ঘটিয়ে এই সংস্কার করা হয়। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি একটি সৌর পঞ্জিকা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি গাণিতিক বর্ষপঞ্জিকা। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জিকাতে ১২টি মাসের উপস্থিতি রয়েছে।
জানুয়ারি— ৩১ দিন,
ফেব্রুয়ারি— ২৮ বা ২৯,
মার্চ— ৩১
এপ্রিল— ৩০
মে— ৩১
জুন— ৩০
জুলাই— ৩১
আগস্ট —৩১
সেপ্টেম্বর—৩০
অক্টোবর—৩১
নভেম্বর— ৩০
ডিসেম্বর— ৩১
সম্রাট জুলিয়াস সিজার ওপরে বর্ণিত সমস্যা দূর করতে নিজের মতো করে সাজালেন বছরকে। নতুন দু’মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে বছরের শুরুর দিকে নিয়ে এলেন। এবার দেখা যাক কীভাবে এলো এই ইংরেজি বছরের বারোমাসের নাম।
জানুয়ারি : গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অর্থাৎ ইংরেজি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারি। ইউরোপের রোম নগরীতে ‘জানুস’ নামে এক দেবতা ছিলেন। কোনো কিছু শুরু করার আগে তারা এই দেবতার নাম খুবই সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করত। আর এ কারণেই ইংরেজি বছরের প্রথম মাসের নামটি দেবতা ‘জানুস’-এর নামে রাখা হয়। অন্য একটি তথ্য মতে, দেবতা ‘জানুস’ এর দুটি মুখ ছিল। একটি সম্মুখে, অপরটি পশ্চাতে। রোমের অধিবাসীরা বিশ্বাস করত, সামনের মুখটি তাকিয়ে আছে আগামীকালের অর্থাৎ ভবিষ্যতের দিকে, আর পেছনের মুখটি বিগতকালের অর্থাৎ চলে যাওয়া অতীতের দিকে। কেউ কেউ মনে করেন, পূর্বোক্ত মতের সঙ্গে মিল রেখে জানুয়ারিকে ইংরেজি বছরের প্রথম মাস করা হয়।
ফেব্রুয়ারি : গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির দ্বিতীয় মাস ফেব্রুয়ারি। খ্রিষ্টধর্মের প্রবর্তক যিশুখ্রিষ্টের জন্মের ৪৫০ বছর পূর্বে দ্বিতীয় মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারির ব্যবহার ছিল। বহুকাল পূর্বে রোমের অধিবাসীরা ‘ফেব্রুয়া’ নামে মনের মলিনতা দূরীকরণ অর্থাৎ হৃদয় শুদ্ধ করার উৎসব পালন করত। ‘ফেব্রুয়া’ মানে শুদ্ধ। রোমে বসবাসরত লোকজন তাই এ মাসটিকে শুদ্ধতার মাস মনে করে।
মার্চ : ইংরেজি বছরের তৃতীয় মাস মার্চ। রোমান যুদ্ধদেবতা ‘মারস’-এর নামানুসারে মার্চ মাসের নামকরণ হয়। যুদ্ধদেবতার নামে এ মাসের নামকরণ হওয়াতে অনেকেই এ মাসকে সামরিক কুচকাওয়াজের মাসও বলে থাকেন।
এপ্রিল : ইংরেজি বছরের চতুর্থ মাস এপ্রিল। অনেকের মতে, এ মাসটি দেবী ‘ভেনাস’-এর কাছে উৎসর্গ করা হয়েছে এমন একটি মাস। ‘ভেনাস’ শব্দটিকে গ্রিক ভাষায় ‘অ্যাফ্রোডাইটি’ বলা হয়, যা থেকে এপ্রিল শব্দটির জন্ম। এছাড়া অন্য মতও আছে। বসন্তের প্রবেশ পথ খুলে দেওয়াই এপ্রিলের কাজ। তাই কারও-কারও ধারণা, ল্যাটিন শব্দ ‘এপিরিবি’ (যার অর্থ খুলে দেওয়া) থেকে ‘এপ্রিল’ শব্দটি এসেছে।
মে : ইংরেজি বছরের পঞ্চম মাস মে। ইউরোপে বসবাসরত রোমানদের দেবী ‘মায়া/মেইয়া’-এর নামানুসারে মাসটির নামকরণ হয় মে। এই মায়া ছিলেন গ্রিকপুরাণে বর্ণিত পৃথিবী ধারণকারী ‘এটলাস’-এর আত্মজা। ভারতীয় ইতিহাসের আনুমানিক ১১শ থেকে ১৫শ শতাব্দীতে অর্থাৎ মধ্যযুগে যুক্তরাজ্যে পহেলা মে তারিখটি একজন ‘মে-কুইন’ অভিষিক্ত করার আনন্দানুষ্ঠান হিসেবে পালন করা হতো।
জুন : ইংরেজি সালের ষষ্ঠ মাস জুন। কেউ কেউ মনে করেন, ‘জুনিয়াস’ নামে কোনও একটি রোমান পরিবারের নাম থেকে ‘জুন’ শব্দটির প্রকাশ। তবে এটা সত্য যে, সবচেয়ে বেশি চলিত মত হলো, ‘জুন’ নামটি এসেছে গ্রিক দেবরাজ জুপিটারের রানি জুনো-এর নাম থেকে- যাকে নারী, চাঁদ ও শিকারের দেবী বলা হতো। যিনি ময়ূরবাহিত চাকাযুক্ত যানে চড়ে যাতায়াত করতেন। তাছাড়া জানা যায়, প্রাচীন রোমে জুন মাসের শুরুতে দেবী জুনোর সম্মানে আনন্দানুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো।
জুলাই : গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির সপ্তম মাস জুলাই। জুলিয়াস সিজারের নামে এ মাসের নাম রাখা হয়েছে জুলাই।
আগস্ট : গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অর্থাৎ ইংরেজি বছরের অষ্টম মাস আগস্ট। সম্রাট জুলিয়াস সিজারের পর রোম সাম্রাজ্যের সম্রাট হন তাঁরই ভাইপো অগাস্টাস সিজার। তাঁর নামেই এ মাসটির নাম রাখা হয় আগস্ট।
সেপ্টেম্বর : সেপ্টেম্বর শব্দের ব্যাকরণসম্মত অর্থ সপ্তম। কিন্তু সম্রাট জুলিয়াস সিজার কর্তৃক বছরের মাসগুলো সাজানোর পর তা এসে দাঁড়ায় নবম মাসে। ইংরেজি বছরের এই নবম মাস, পরে আর কেউ পরিবর্তন করেনি।
অক্টোবর : ইংরেজি বছরের দশম মাস অক্টোবর। অথচ এ মাসের ব্যাকরণ-অনুমোদিত অর্থ অষ্টম। সেই মতে এটা অষ্টম মাস হওয়ার কথা। কিন্তু তা না হয়ে এ মাস আমাদের খ্রিষ্টীয় বর্ষপঞ্জিতে দশম মাসে স্থান পেয়েছে ।
নভেম্বর : নভেম্বর হচ্ছে গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির এগারোতম মাস। অথচ ‘নভেম’ শব্দের অর্থ ‘নয়’। সে যুক্তিতে সুদূর অতীতে নভেম্বর ছিল নবম মাস। জুলিয়াস সিজারের কারণে নভেম্বরের স্থান নয়ের বদলে এগারোতে গেল।
ডিসেম্বর : গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জির অর্থাৎ ইংরেজি বছরের দ্বাদশ বা শেষ মাস ডিসেম্বর। কিন্তু ল্যাটিন শব্দ ‘ডিসেম’ অর্থ দশম। সম্রাট জুলিয়াস সিজারের বর্ষ সাজানোর আগে, অর্থানুসারে এটি ছিল দশম মাস। কিন্তু আজ আমাদের কাছে এ মাসের অবস্থান ক্যালেন্ডারের শেষভাগে।
উল্লেখ করা দরকার, জুলাই ও আগস্ট এ মাস দুটোর নাম পূর্বে ছিল কুইন্টিলিস ও সিক্সিলিস। অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ। জুলিয়াস সিজার রোমের সম্রাট হয়ে নিজের নামটিকে ইতিহাসের পাতায় বিশেষভাবে লিপিবদ্ধ করার জন্য পঞ্চম মাস কুইন্টিলিস-এর পরিবর্তে নিজের নামে জুলিয়াস রাখেন।
এভাবেই দীর্ঘ সময় এবং নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মানবজাতি পেয়েছে ইংরেজি বছরের বারোমাসের নাম।
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৫



