ডিজিটাল নেটিভস বা জেন-জি

0
0

জুলাই আন্দোলন পরবর্তী বাংলাদেশ গ্রাফিতিতে ছেয়ে গেছে। এরই মধ্যে গ্রাফিতির রাজধানী হিসেবে বাংলাদেশ অনানুষ্ঠানিক বিশ্বস্বীকৃতি পেয়েছে। একটা ইংরেজি গ্রাফিতি বেশ চোখে পড়ে; আর তা হলো Gen-Z। Gen-Z শব্দটি সংক্ষেপ; পূর্ণরূপ হলো Generation Z। বাংলা ভাষান্তর করলে হয় জেনারেশন জেড। Gen-Z এর বিশ্বব্যাপী উচ্চারণ জেন-জি।
এ জেনারেশন জেড বা জেন-জি কী? সাধারণত ২০ থেকে ২৫ বছর বা কাছাকাছি সময় ধরে একটি সামাজিক প্রজন্ম গড়ে ওঠে। প্রতিটি প্রজন্মেই থাকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সালের ভেতর যাদের জন্ম, তারাই সামাজিকভাবে জেন-জি বা জেনারেশন জেড। এদেরকে ডিজিটাল নেটিভসও বলা হয়। বর্তমানে এ প্রজন্মের সদস্যদের বয়স ১২ থেকে ২৭ বছর।
সামাজিক ও বৈশ্বিক পরিবেশে জেন-জি প্রজন্মের অধিকাংশই বড় হয়েছে একধরনের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের সময়ের মধ্য দিয়ে। ইন্টারনেট, ডিভাইস ও পোর্টেবল ডিজিটাল প্রযুক্তির সুযোগ নিয়ে বেড়ে ওঠা প্রথম সামাজিক প্রজন্ম জেন-জি বা জেনারেশন জেড। ছোটবেলা থেকেই স্মার্টফোন হাতে নানা ধরনের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে খুবই স্বাভাবিকতায়। তথ্য-জ্ঞান-বিনোদনে গুগল নির্ভরতা একদমই স্বাভাবিক। এআই-চ্যাটজিপিটি প্রযুক্তি এদের মানসিকতাকে আরও বিকশিত করছে। এরাই হলো প্রকৃত ডিজিটাল প্রজন্ম। ফলে জেন-জি’র সদস্যরা স্মার্টফোন আসার আগের কোনো জীবন বা জেনারেশনের কথা ভাবতেই পারে না। সেসব জীবনের কথা মা-বাবাদের কাছ থেকে শুনেও বিশ্বাসই করতে চায় না। সেসব জীবন তাদের কাছে খুবই ধীর, অচেনা-অজানা জগত বলে মনে হয়।
এদের মধ্যে বাস্তববাদিতা এবং অল্পবয়সে দ্রুত পরিপক্বতা একটু বেশি। শিক্ষা বা ডিগ্রি অর্জনের হার বাড়ার সাথে সাথে ক্যারিয়ার নির্ধারণে সতর্ক হয়ে উঠেছে। পূর্ববর্তী প্রজন্মগুলোর তুলনায় একাডেমিক পারফরম্যান্স এবং পেশাগত সুযোগ নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন এরা। ইলেকট্রনিক ডিভাইসে বেশি সময় ব্যয় করায় বই পড়ার জন্য কম সময় দিচ্ছে। চিন্তার দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে এরা খুবই সচেতন। সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় পরিমণ্ডলে চিন্তার দাসত্বের বিরুদ্ধে এরা প্রতিক্রিয়া দেখায় দ্রুত। কোভিড-১৯ মহামারীর বিস্তার রোধের জন্য আরোপিত গণ লকডাউন জেনারেশন জেড-এর মধ্যে একটি উপ-সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এটি এক ধরনের পালানো এবং আকাঙ্ক্ষামূলক নস্টালজিয়া। ঠিক এ উপ-সংস্কৃতিটা নিয়ে ‘বাসা থেকে পালিয়ে’ নামে আমার লেখা একটা উপন্যাস আছে। কাছ থেকে দেখা জেন-জির এক ধরনের পালানো আকাঙ্ক্ষামূলক নস্টালজিয়াকে নিয়ে লেখা ওই উপন্যাসটা।
একটি প্রজন্ম গড়ে ওঠার সময়টা সামাজিক ও পারিবেশিক পরিসংখ্যান ও তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে নির্ধারিত হয়। প্রযুক্তিগত ক্রমবিবর্তন, বিশ্বায়ন ও সভ্যতার উন্নয়নও এ ক্ষেত্রে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন বিশ্লেষণধর্মী গবেষণায় এমনটিই উঠে এসেছে। গত শতাব্দী থেকেই নানারকম সামাজিক ও পারিবেশিক পরিস্থিতিতে প্রজন্মকে বৈশিষ্ট্যগত শ্রেণিকরণ করে একটি নামকরণ করা হয়। প্রতিটি প্রজন্মের নামকরণ এবং এর শুরু ও শেষের সময়সীমা কোনো সরকারি কমিশন, গোষ্ঠী বা কোনো কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, স্বীকৃতও হয়নি। জন্মসাল হিসাব করে প্রস্তাব করা এসব শ্রেণিকরণ বরং কিছুটা এলোমেলো প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। অতঃপর পারষ্পরিক বা গোষ্ঠীবদ্ধ আলাপচারিতায় পরিচিতি পেয়ে ধীরে ধীরে ঐকমত্য গড়ে ওঠে। যেমন এখন গ্রাফিতির মাধ্যমে বেশ পরিচিতি পেয়েছে আমাদের দেশ। প্রতিটি প্রজন্ম কোনো না কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা দ্বারা গঠিত হয়, তাই তাদের মান ও সময়সীমা কখনো কখনো এক দেশ থেকে অন্য দেশে পৃথক হয়।
শ্রেণিকরণকৃত জেনারেশনের নাম ও পরিচিতি হলো-
১. গ্রেটেস্ট জেনারেশন বা মহত্তম প্রজন্ম : এ প্রজন্মের জন্মকাল আনুমানিক ১৯০১ থেকে ১৯২৭ সাল পর্যন্ত। এ প্রজন্ম প্রথম বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অংশ হয়েছে। দুই বিশ্বযুদ্ধের প্রত্যক্ষ স্বাক্ষী এরা। এ প্রজন্ম বিশ্বব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে গিয়েছে। এরা যেমন ভাঙতে দেখেছে, তেমনি গড়তেও দেখেছে। ব্যাপক নৃশংসতার পাশাপাশি মানবিকতার সব মুহূর্তও দেখেছে। প্রতিকূলতায় শিক্ষা নিয়ে পরিশ্রম আর গড়ার ভেতর দিয়ে নিজেদের সেরাটা হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছে প্রতিনিয়ত। আর এসব কারণেই এ প্রজন্ম গ্রেটেস্ট বা মহত্তম।
২. সাইলেন্ট জেনারেশন বা নীরব প্রজন্ম : এ প্রজন্মের জন্মকাল ১৯২৮ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত। পূর্ববর্তী মহত্তম প্রজন্ম ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে এগিয়েছে। আর এ প্রজন্ম যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক মন্দার সময় বেড়ে ওঠে। ফলে এ প্রজন্ম কোনো ঝুঁকি না নিয়ে নীরব পরিশ্রম করে কেবল একটা চলমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ প্রয়াস চালিয়েছে। ১৯৫১ সালে টাইম ম্যাগাজিন এ প্রজন্মকে তাই ‘সাইলেন্ট জেনারেশন বা নীরব প্রজন্ম’ বলে অবহিত করে।
৩. বেবি বুমার্স জেনারেশন : এ প্রজন্মের জন্মকাল ১৯৪৬ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জনসংখ্যা বৃদ্ধিকে একটি ‘বুম’ হিসেবে বর্ণনা করে এ প্রজন্মকে বেবি বুমার্স জেনারেশন বলা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যক্তিগত স্মৃতি রাখার জন্য এ প্রজন্মই প্রত্যক্ষ প্রজন্ম। এ প্রজন্মকালে শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সংস্কারের সাথে সাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি এবং দ্রুত প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সময় ছিল। যুদ্ধোত্তর যুবসমাজের কারণেও এই সময়টি ছিল গভীর রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সময়।
৪. জেনারেশন এক্স: এ প্রজন্মের জন্মকাল ১৯৬৫ থেকে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত। এ প্রজন্মে সাংস্কৃতিক শক্তিশালী একটি ভিন্নমাত্রা দেখা যায়। বাদ্যযন্ত্রের প্রসার যেমন বিকল্প রক, হিপ হপ, পাঙ্ক, পোস্ট-পাঙ্ক, রেভ এবং হেভি মেটালের ব্যাপকতা এ প্রজন্মের সহজাত হয়ে ওঠে। ফিল্ম, ফ্র্যাঞ্চাইজ মেগা-সিক্যুয়েলের জন্ম, স্বাধীন চলচ্চিত্রের বিস্তার, ভিডিও গেম, বিনোদন পার্লার ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল এ প্রজন্মের বৈশিষ্ট্য। রাজনৈতিকভাবে এ প্রজন্ম কমিউনিজমের শেষ দিনগুলি অনুভব করেছিল সাথে সাথে পুঁজিবাদে উত্তরণ প্রত্যক্ষ করেছিল।
৫. জেনারেশন ওয়াই বা মিলেনিয়ালস বা সহস্রাব্দ প্রজন্ম : এ প্রজন্মের জন্মকাল ১৯৮১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত। এ প্রজন্মকে জেন-ওয়াইও বলা হয়। সহস্রাব্দের বিশ্বব্যাপী প্রথম প্রজন্ম জেন ওয়াই ইন্টারনেট-সোশ্যাল মিডিয়ার প্রাথমিক সময়, মোবাইল ডিভাইস এবং প্রযুক্তির উন্নত ব্যবহারের পরিচিতির যুগের প্রজন্ম। ক্রমবর্ধমানভাবে সুশিক্ষিত হয়ে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হাত ধরে এদের পথ চলা। তবে এ প্রজন্মের যাদের জন্ম এবং শৈশব-কৈশোর পার করেছে শুধু নব্বই দশকে অর্থাৎ ১৯৯০-১৯৯৬ সালে, তাদের বলা হয় নাইন্টিজ কিডস।
৬. জেনারেশন জেড বা জেন-জি : এ প্রজন্মের জন্মকাল ১৯৯৭ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত।
৭. জেনারেশন আলফা : এদের জন্মকাল আনুমানিক ২০১২ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত।

জেনারেশন জেডের প্রাত্যহিক কাজে কিংবা আনন্দ-বিনোদনে প্রত্যক্ষতার চেয়ে ডিভাইস নির্ভরতা বেশি। শিক্ষা-বিনোদনের জন্য জাদুঘর বা গ্যালারিতে যাওয়ায় যত না আগ্রহ; তার চেয়ে বেশি আগ্রহ ইউটিউব, স্ন্যাপচ্যাট সঙ্গীত, টেলিভিশন দেখা বা সামাজিক মাধ্যম ব্রাউজিংয়ে। বিভিন্ন ধরনের ইভেন্ট, খাবার এবং পানীয়ের বিকল্পে অনলাইন উপস্থিতি ওদের মনোযোগ আকর্ষণ করে বেশি।
জেন-জি সত্যিকার অর্থে পুরোপুরি ডিজিটাল নির্ভর। স্বাভাবিকভাবেই তাই তাদের ডিজিটাল নেটিভস বলা হয়। জেনারেশন জেড বা জেন-জি প্রজন্মের সমকালীন ধাপ। চেতনায়, মননে, সৃষ্টিশীলতায় এরা বেশ অগ্রবর্তী, মুক্ত স্বাধীনচেতা। জেন-জির হাত ধরে নতুন পৃথিবী গড়ে উঠতে পারে- এমন প্রত্যাশা করা যেতেই পারে।

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫