সালটা ১৯৫২। ৮ ফাল্গুন। ২১ ফেব্রুয়ারি। একটা বাংলা তারিখ, আরেকটা ইংরেজি। কিন্তু তারিখ দুটো খুব জ্বলজ্বলে। বাংলা ভাষা আন্দোলন, আমাদের ভাষার লড়াই ছিল এই অঞ্চলে একটি ঐতিহাসিক আন্দোলন। সেই আন্দোলনের কথা বলবো, স্মরণ করবো ভাষা শহিদদের।
দেখতে দেখতে কতগুলো বছর চলে গেল। কিন্তু ভাষা শহিদদের কথা আমরা ভুলিনি। কেন ভুলিনি? কারণ আমরা স্বাধীন দেশ পেয়েছি, নিজের ভাষা পেয়েছি তাদের আন্দোলনের পথ ধরেই।
আরও একটু খোলাসা করে বলি। ১৯৪৭ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত তৎকালীন পূর্ব বাংলায় (বর্তমান বাংলাদেশে) সংঘটিত একটি সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন ছিল ভাষা আন্দোলন। এ আন্দোলনের মাধ্যমে তৎকালীন পাকিস্তান রাষ্ট্রে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গণদাবির বহিঃপ্রকাশ ঘটে।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি। জ্বলজ্বলে সেই তারিখটা। এ দিন ভাষা আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ ধারণ করে। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত ভাগ হয়ে পাকিস্তান ও ভারত দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়। পাকিস্তানের ছিল দুইটি অংশ: পূর্ব বাংলা (১৯৫৬ সালে নাম হয় পূর্ব পাকিস্তান) ও পশ্চিম পাকিস্তান। প্রায় দুই হাজার কিলোমিটারের বেশি দূরত্বের ব্যবধানে অবস্থিত পাকিস্তানের দুটি অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও ভাষাগত দিক থেকে কিছু মৌলিক পার্থক্য ছিল।
১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের শাসকরা পূর্ব বাংলার জনমানুষের ভাষা বাংলাকে অবহেলা করে ঘোষণা করে যে, উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। এর প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলায় অবস্থানকারী বাংলাভাষী সাধারণ জনগণের মধ্যে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয় ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। কার্যত পূর্ব বাংলার বাংলাভাষী মানুষ আকস্মিক ও অন্যায্য এ সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে পারেনি এবং মানসিকভাবে মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
এর ফল কী হলো? ফলস্বরূপ বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে পূর্ব বাংলায় আন্দোলন দ্রুত দানা বেঁধে উঠলো। আন্দোলন দমনে পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে ঢাকা শহরে মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি বেআইনি ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করল। ১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি (৮ই ফাল্গুন ১৩৫৮) এ আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বহু ছাত্র ও কিছু রাজনৈতিক কর্মী মিলে বিক্ষোভ মিছিল শুরু করেন।
মিছিলটি চলছিল। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কাছাকাছি গিয়েও পৌঁছালো। কিন্তু না। আর এগুনো গেল না। পুলিশ ১৪৪ ধারা অবমাননার অজুহাতে আন্দোলনকারীদের ওপর গুলিবর্ষণ করল। মুহূর্তেই ঝরে পড়ল কয়েকটি তাজা প্রাণ। অবশ্য গত জুলাই আগস্টে ছাত্র জনতার অভ্যুত্থানের সময়ও দেখা গেছে এই ধরনের জঘন্য চিত্র। এটা দেখে তোমরা বুঝতে পারবে তখন কী ঘটেছিল।
যাই হোক, গুলিতে নিহত হন বাদামতলী কমার্শিয়াল প্রেসের মালিকের ছেলে রফিক, আরেকজন সালাম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এম. এ. ক্লাসের ছাত্র আবুল বরকত আর আব্দুল জব্বারসহ আরও অনেকে। এছাড়া ১৭ জন ছাত্র-যুবক আহত হয়। শহিদদের রক্তে রাজপথ রঞ্জিত হয়ে ওঠে।
মানুষ এতে খুব কষ্ট পেল। শোকাবহ এ ঘটনায় সমগ্র পূর্ব বাংলায় তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। ২১শে ফেব্রুয়ারির ছাত্র হত্যার প্রতিবাদে সারাদেশে বিদ্রোহের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে। ২২শে ও ২৩শে ফেব্রুয়ারি ছাত্র, শ্রমিক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষক ও সাধারণ জনতা পূর্ণ হরতাল পালন করে এবং সভা-শোভাযাত্রাসহ ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে।
২২শে ফেব্রুয়ারি পুলিশের গুলিতে শহিদ হন শফিউর রহমান, রিকশাচালক আউয়াল এবং অহিউল্লাহ নামক এক কিশোর। ২৩শে ফেব্রুয়ারি ফুলবাড়িয়ায় ছাত্র-জনতার মিছিলেও পুলিশ অত্যাচার-নিপীড়ন চালায়। ভাষা আন্দোলনের শহিদ স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে রাতারাতি ছাত্রদের দ্বারা গড়ে ওঠে শহিদ মিনার, যা ২৪ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করেন শহিদ শফিউর রহমানের পিতা। ২৬শে ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে শহিদ মিনারের উদ্বোধন করেন দৈনিক আজাদ পত্রিকার সম্পাদক আবুল কালাম শামসুদ্দীন। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা হয় এবং প্রতিষ্ঠা করা হয় বাংলা একাডেমি। এটা ১৯৫৬ সালের ঘটনা।
১৯৫২ সালের ২১শে ফেব্রুয়ারি রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করেছে ছাত্রসমাজ। শান্তিপূর্ণ মিছিলে নির্বিচারে গুলি চালায় পাক জান্তাদের মিলিটারি-পুলিশ। গুলিতে রফিক, আবদুল জব্বার, আবুল বরকত শহিদ হন। গুলিতে গুরুতর আহত আবদুস সালাম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন, পরে তিনি মারা যান। পুরো ঢাকা শহর তখন থমথমে ও গুমোট পরিবেশ। শহরের সর্বত্র সেনাদের টহল বৃদ্ধি করা হয়েছে। ভাষা আন্দোলনে শহিদ হওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো দেশে ছাত্র-জনতা উত্তাল হয়ে ওঠে। দেশের সর্বত্র চলে মিছিল-মিটিং-সমাবেশ। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি সকালে পুরান ঢাকার নবাবপুর রোডে পাকিস্তানি সৈন্যদের টহল চলছে। পুরো নবাবপুর রোড এলাকা সুনসান নীরবতা। লোকজনের মাঝে অজানা আতঙ্ক ভর করেছে।
১৯৫২ সালের ২৩শে ফেব্রুয়ারি শনিবার প্রকাশিত ভাষা আন্দোলনের অন্যতম পত্রিকা ‘সৈনিক’-এর প্রতিবেদনের শিরোনাম ছিল ‘শহীদ ছাত্রদের তাজা রক্তে রাজধানী ঢাকার রাজপথ রঞ্জিত’। খবরে বলা হয়েছে, মেডিকেল কলেজ হোস্টেলে ছাত্র সমাবেশে নির্বিচারে পুলিশের গুলিবর্ষণ বৃহস্পতিবারেই ৭ জন নিহত: ৩ শতাধিক আহত। তাছাড়া দৈনিক আজাদের ওই সময়ে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুসারে ২১ ও ২২ ফেব্রুয়ারি গুলিতে ৯ ব্যক্তির মৃত্যু হয়েছিল।
ভাষা শহিদ হিসেবে ৫ জনের কথা বলা হয় বিভিন্ন বইতে। তারা হলেন আবুল বরকত, রফিকউদ্দিন আহমদ, শফিউর রহমান, আবদুস সালাম, আবদুল জব্বার। বর্তমানে সেই তালিকায় যুক্ত হয়েছে কিশোর অহিউল্লাহর নাম।
ভাষার দাবিতে গুলিতে হত্যার শিকার রফিক, জব্বার, বরকতদের নিয়ে শোক ও প্রতিবাদ মিছিল বের করেন ছাত্ররা। ছাত্রদের মিছিল আর স্লোগানে স্লোগানে নবাবপুর এলাকার আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। পাকিস্তানি সৈন্যরাও মিছিল প্রতিরোধের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। নবাবপুর এলাকা যখন স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত। ঠিক তখন ওই এলাকার খোশমহল রেস্টুরেন্টের সামনে আনুমানিক ৯ বছর বয়সী একটি ছেলে দাঁড়িয়ে ছিল। ছাত্রদের মিছিলটি তার সামনে আসে। চালানো হয় গুলি। ঘাতকের বুলেটে সেই অহিউল্লাহর মাথার খুলি উড়ে যায়।
শহিদদের পরিচয় :
আবুল বরকত : আবুল বরকতের জন্ম ১৯২৭ সালের ১৬ জুন পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার বাবলা গ্রামে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মাতৃভাষা বাংলার দাবিতে ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ২০ নম্বর ব্যারাকের বারান্দায় ছাত্র-জনতার মিছিলে আবুল বরকত শামিল হন। মিছিলে পুলিশ গুলি চালায়। বরকত পেটে গুলিবিদ্ধ হন। মুহূর্তে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তাঁকে আজিমপুর গোরস্থানে সমাহিত করা হয়।
রফিকউদ্দিন আহমদ : ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর সোয়া তিনটা। বাংলাভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলনে প্রথম শহিদ রফিকউদ্দিন আহমদ। ঐদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুলার রোডের মিছিলে পুলিশের গুলিতে রফিক ঘটনাস্থলে শহিদ হন। তাঁকে আজিমপুর গোরস্থানে সমাহিত করা হয়। তার জন্ম ১৯২৬ সালে।
শফিউর রহমান (১৯১৮-১৯৫২) : ১৯৫২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। সময় সকাল সাড়ে দশটা। ঢাকার নবাবপুর রোডে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে বিক্ষোভরত ছাত্র-জনতার ওপর পুলিশ বেপরোয়া গুলি চালায়। মিছিলে শামিল শফিউর রহমান গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গুরুতর আহত শফিউর ঐ দিন সন্ধ্যা সাতটায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
আবদুস সালাম (১৯২৫-১৯৫২) : মহান ভাষা আন্দোলনে শহিদ। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনের রাস্তায় ১৪৪ ধারা জারি অবস্থায় ছাত্র-জনতার মিছিল চলে। মিছিলে অংশ নেন আবদুস সালাম। মিছিলে পুলিশের গুলিতে আবদুস সালাম মারাত্মকভাবে আহত হন। তিনি ৭ এপ্রিল ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসারত অবস্থায় মারা যান।
আবদুল জব্বার (১৯১৯-১৯৫২) : ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল প্রাঙ্গণে সংগ্রামী জনতার বিশাল সমাবেশ চলছিল। পুলিশ সমাবেশে গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে সমাবেশে অংশগ্রহণকারী আবদুল জব্বার গুলিবিদ্ধ হন। ঐদিন রাতে চিকিৎসাধীন আবদুল জব্বার মারা যান। তাঁকে আজিমপুর গোরস্থানে দাফন করা হয়। আমরা শহিদদের জন্য দোয়া করি। তাদের রুহের মাগফেরাত কামনা করি মহান আল্লাহর দরবারে। বিশেষ করে কিশোর অহিউল্লাহর কথা স্মরণ করছি।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫


