ঈদ আনন্দ ও ছেলেবেলার স্মৃতি

0
0

উৎসব হলো জীবনের অংশ। উৎসব ছাড়া কি আমাদের চলে? এজন্য প্রত্যেক জাতির জীবনে রয়েছে আনন্দ উৎসব। এই উৎসবের মাধ্যমে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস, রুচি, রীতি-নীতি ও সংস্কৃতির পরিচয় পাওয়া যায়।
মুসলিম জাতির জীবনেও দুটি উৎসব রয়েছে। রয়েছে খুশির দিন। একটি ঈদুল ফিতর। অন্যটি ঈদুল আজহা। এই দিনে বিশেষত ছোটদের আনন্দ আর ধরে রাখা যায় না। কেননা ঈদ মানেই খুশি। কিন্তু বলতে পারো কীসের খুশি?
হিজরি বছরের নবম মাস রমজান। এই এক মাস সিয়াম পালন শেষে শাওয়াল মাসের প্রথম দিনে পালিত হয় ঈদুল ফিতর। ফিতর মানে ভেঙে ফেলা। এই দিন পানাহারের মাধ্যমে এক মাসের কঠোর সাধনার অবসান ঘটে। কিন্তু খাওয়ার আনন্দই কি আসল আনন্দ? মোটেও নয়। আসলে মুসলমানদের ঈদ-আনন্দের সবকিছুতে রয়েছে আধ্যাত্মিকতার ছোঁয়া। কেউ যদি যথানিয়মে রোজা পালন করে, তবে তিনি নবজাত শিশুর ন্যায় মাসুম বা নিষ্পাপ ব্যক্তিতে পরিণত হন। তখন তার কেমন লাগে? কেউ যদি সারা জীবনের পাপ-পঙ্কিলতা থেকে মুক্ত হতে পারে, তবে তার কি ভালো লাগবে না? সে কি পাপের বোঝা থেকে মুক্তি পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবে না?
ঈদুল আজহার দিনেও পশু কুরবানির মাধ্যমে নিজেকে আল্লাহর জন্য উৎসর্গ করার আনন্দ নিহিত। কেননা আমাদের জীবন-মরণের মালিক তো তিনিই। এজন্য আমরা উভয় ঈদে দুই রাকায়াত ওয়াজিব নামাজ আদায় করে তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। একটা বিষয় লক্ষণীয়, অন্য ধর্মের তুলনায় মুসলিম জীবনে ঈদের আনন্দ সত্যিই অন্যরকম। লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের দিক থেকেও আলাদা। অবশ্য ঈদের দিন আমরা যেসব আচার-অনুষ্ঠান পালন করে থাকি, তা নিয়ে ভেবে দেখলে হয়তো তোমরা কেউ কেউ বলতে পারো, এতে তেমন আনন্দ কোথায়? এখানে খেলাধুলা বা গান-বাজনা নেই। বিনোদন বলতে যা বোঝায় তা তো নেই। এমনকি ঈদ উপলক্ষে নতুন পোশাক নিয়ে তোমরা যে এতো কবিতা-ছড়া লিখো, সেই ধরনের পোশাক পরাটাও তো জরুরি নয়।
বিশেষ করে ঈদুল ফিতরের দিন আমরা ঘুম থেকে উঠে ফজরের নামাজ আদায় শেষে গোসলসহ পাকপবিত্রতা অর্জন করি। কিছুটা মিষ্টিমুখ করে ঈদগাহ মাঠে যাই। এক রাস্তা দিয়ে ঈদগাহে যাই। আবার অন্য রাস্তা দিয়ে বাসায় ফিরি। যেতে-আসতে সবার সঙ্গে কুশল বিনিময় করি। তাকবির ধ্বনি দিই। নামাজের আগেভাগে গরিব-দুখীদের মাঝে সাদকাতুল ফিতর প্রদান করি। দুই রাকায়াত সালাত আদায় শেষে ইমামের খুতবা শুনি মনোযোগ দিয়ে। এরপর একসঙ্গে মোনাজাতে অংশগ্রহণ করি। ঈদগাহ থেকে বাসায় ফিরে এসে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটাই। ভালোমন্দ খাই। আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ করি। চলে মেহমানদারিও। এসব কাজের প্রধান উদ্দেশ্য একটাই। সৃষ্টিকর্তাকে খুশি করা। কেননা সৃষ্টিকর্তার আনন্দই বান্দার আসল আনন্দ।
ইসলামের বিধিবিধান মেনে এক মাস সিয়াম সাধনা শেষে আসে ঈদুল ফিতর। এর আগে তারাবিহ, সাহরি, ইফতার, ইতিকাফ, লাইলাতুল ক্বদর, কোরআন তেলাওয়াত, চাঁদরাতের ইবাদত ইত্যাদি কত কী পালন করা হয়। এসব ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জিত হলে ধর্মপ্রাণ মুসলমানের মনে আনন্দের সীমা থাকে না। তাছাড়া এক মাস কঠোর সাধনা শেষে ঈদের দিন তাকে দেওয়া হবে মহাপুরস্কার। সেই মহাপুরস্কার কী? এককথায় পাপ থেকে নিষ্কৃতি ও আল্লাহর সন্তুষ্টি। আরও বড় বিষয় হলো, রোজা রাখার পুরস্কার স্বয়ং আল্লাহ নিজ হাতেই দিবেন। এজন্য আমরা মহানন্দে সাদকাতুল ফিতর বিতরণ করতে করতে এবং মুখে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি দিতে দিতে ঈদগাহ মাঠে হাজির হই। এতে আমাদের আত্মা প্রশান্তি লাভ করে। স্রষ্টার সন্তুষ্টি লাভের জন্য আত্মার এই আনন্দই বড় কথা।

ঈদের এই আনন্দ বুঝতে হলে মুসলমানদের জীবনে ঈদ কীভাবে এলো, তাও এখানে বিবেচ্য বিষয়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা, এই মহান পুণ্যময় দিবস দুটির যাত্রা শুরু হয় আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ’ বছর পূর্বে। রাসুল সা. এর হিজরতের কিছুদিন পরেই। যেমন- হজরত আনাস রা. হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসুল সা. মদিনাতে আগমন করলেন, আর মদিনাবাসীর দুটি দিন ছিল যাতে তারা বিনোদন বা খেলাধুলা করত। রাসুল সা. তাদের জিজ্ঞেস করলেন, এই দিন দুটি কী? তারা বলল, আমরা এই দিনে জাহিলি যুগে খেলাধুলা করতাম। তখন রাসুল সা. বললেন, আল্লাহ তোমাদের এই দিন দুটির পরিবর্তে উত্তম দুটি দিন দান করেছেন। আর তাহলো ঈদুল ফিতরের দিন ও ঈদুল আজহার দিন (মিশকাত)।
এখানে দেখা যাচ্ছে, ইসলামপূর্ব যুগে মানুষ উৎসব বলতে বোঝাতো খেলাধুলা ও আনন্দ ফুর্তি করাকে। কিন্তু নবীজী বললেন, এর চেয়ে উত্তম ঈদ আমাদের দেওয়া হলো। তার মানে খেলাধুলা ও গানবাজনা প্রভৃতি আমোদ-ফুর্তির চেয়ে মুসলমানদের ঈদ উত্তম। কিন্তু এই বিষয়টি আমরা অনেকে সঠিকভাবে বুঝতে পারি না। ফলে ঈদ আনন্দ উদযাপনে এমন সব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি, যা বেমানান ও লজ্জার বিষয়।

এই কারণেই হাদিসে এমন কথাও বলা হয়েছে যার মর্মবাণী হলো, যে ব্যক্তি রোজা পালন করেনি, ঈদের আনন্দ তার জন্য নয়। কেননা ঈদের আনন্দ সে হৃদয় দিয়ে উপলদ্ধি করতে পারবে না। আমরা ঈদুল ফিতরের দিন যে সাদকাতুল ফিতরা প্রদান করি, তার মাধ্যমে গরিব-দুঃখী মানুষ ঈদের আনন্দে শরিক হওয়ার সুযোগ লাভ করে। এতেও আমাদের আত্মার আনন্দ লাভ হয়। এভাবে আত্মা বিশুদ্ধ হলেই ব্যক্তি শক্তিশালী হতে পারে। একারণে ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের প্রান্তরে মুসলমানগণ রোজা রেখে ও সংখ্যায় অনেক কম হওয়া সত্ত্বেও কাফেরদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেন। এই আধ্যাত্মিক শক্তির জোরেই পরবর্তীতে সাহাবারা তৎকালীন পৃথিবীর পরাশক্তি রোমান ও পারস্যদেরও পরাজিত করেন।
এবার তোমাদের জন্য আমার ছেলেবেলার ঈদ স্মৃতির ঝাঁপি কিছুটা খুলতে চাই। আসলে ছেলেবেলার সব স্মৃতিই মধুর। ঈদের স্মৃতি তো আরও মধুর। আমার জন্ম চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ উপজেলায়। এখানে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সম্বলিত একটি আলোকিত গ্রাম রয়েছে যার নাম সত্রাজিতপুর। যদিও সত্রাজিৎ হলো শ্রীরামকৃষ্ণের শ্বশুরের নাম, তথাপি এখানে ধর্মপ্রাণ মুসলিমের সংখ্যাই বেশি। একসময় হিন্দু জমিদারদের প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে এলাকার এরূপ নামকরণ হতে পারে। এই এলাকায় ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয় সত্রাজিতপুর সিনিয়র মাদ্রাসা সংলগ্ন ঈদগাহ ময়দানে। ছোটকালে আমরা চাঁদরাতে তথা ঈদের আগের দিন রাতে বেশি বেশি নফল ইবাদত করতাম। আর গভীর রাতে চুপিসারে ঈদ-শুভেচ্ছার বিভিন্ন বাণী পোস্টারিং করতাম সারা ঈদগাহ জুড়ে। সকালে নামাজের সময় নিজ নিজ হাতের লেখা সেসব বাণী পড়ে আমরা নিজেরাই পুলকিতবোধ করতাম।
আতর-সুরমা লাগিয়ে সেজেগুঁজে ঈদগাহে যাওয়ার আগে বড়দের কাছ থেকে পাওয়া যেত ঈদ বকশিশ। নতুন কড়কড়ে নোট। পাঁচ, দশ, বিশ, পঞ্চাশ ও একশো টাকা পর্যন্ত। এছাড়া আশেপাশের সবাইকে নিয়ে একসঙ্গে হেঁটে ঈদগাহে যাওয়ার মজাই আলাদা। আমাদের চেয়েও ছোট ছোট বাচ্চাদের আমরা আগলে রাখতাম। যেন তারা ভিড়ের মাঝে হারিয়ে না যায়। তাদের বিশেষ একটা নিরাপত্তা বেষ্টনিতে রাখা হতো। নামাজ পড়ে আমরা পার্শ্ববর্তী কবরস্থান জিয়ারত করতাম। আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীর জন্য দোয়া করতাম। এরপর ঈদমেলায় গিয়ে বিভিন্ন মিষ্টান্ন খাবার খেতাম সবাইকে নিয়ে। এই যেমন ধরো- তিলের খাজা, জিলাপি, ছানা জিলাপি, গোলজাম, চমচম, প্যাড়া কতো কী! শুধু মিষ্টিমুখ করলেই কি হবে? এরপর ভাজা পাপড়, পিঁয়াজু, বাদাম ইত্যাদিও খেতাম। আবার বাড়ির সবার জন্য সেসব কিনে নিতাম। বিশেষ করে আমাদের চেয়ে যারা ছোট ছিল, তাদের জন্য প্রতি ঈদে বাঁশিসহ বিভিন্ন খেলনা কেনা হতো। মেয়েদের জন্য কেনা হতো মাটির বিভিন্ন হাঁড়িপাতিল। যাতে তারা মিছেমিছি রান্না করতে পারে। এখানকার ঈদমেলা ঐতিহ্যবাহী যা অন্যান্য অনেক এলাকায় দেখতে পাওয়া যায় না। মজার ব্যাপার হলো, যারা মেলায় বিভিন্ন পসরা নিয়ে বসেন, এখনো তাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বিক্রেতা হিন্দু ধর্মাবলম্বী। তাই ধর্মীয় সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত এখানকার ঈদমেলা।

ঈদমেলায় কেনাকেটা শেষ করে বড়জনদের সঙ্গে আমরা সবাই বাড়ি ফিরতাম। ছোট ছোট বাচ্চারা তখন বাঁশি বাজাত। নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি-টুপি নিয়ে মেতে উঠত খুনসুটিতে। আর হাঁটতে অসুবিধা হলে বড়দের কোলে উঠে পড়ত।
ছেলেবেলার এই ঈদের আনন্দ ও স্মৃতি কখনো ভোলার নয়।

প্রকাশকাল: মার্চ ২০২৫