রাজধানীর রমনা পার্কে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করে শিশু হৃদয় ইসলাম (৮)। পার্কে প্রতিদিন সকাল ৮ টায় ঢোকে, বের হয় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। পার্কের বাইরে ফুটপাতে গড়ে ওঠা ভ্রাম্যমাণ দোকানগুলোতে দুপুরের খাবার সেরে নেয় সে। খাওয়া শেষ হতেই পুনরায় কর্মে ফিরে যায়। প্রতিদিন প্রায় ১০ থেকে ১১ ঘণ্টা চা বিক্রির কাজ করে। তার অক্লান্ত পরিশ্রমের টাকায় তার পরিবারের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে। এক কথায় বলা যায়, শিশু হৃদয়ের উপার্জনের টাকায় তার মা আর বোনের মুখে খাবার জোটে। একদিন কাজে না গেলে সে সহ পরিবারের সবাইকে না খেয়ে থাকতে হয়।
শুধু ছেলে শিশুই নয়, বাসা-বাড়িতে বহু মেয়ে শিশু গৃহকর্মীর কাজে নিয়োজিত রয়েছে। সেসব শিশুর সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অমানবিক পরিশ্রম করতে হয়। দিনভর পরিশ্রম করেও অনেক শিশুর ভালো খাবার এবং ঘুমের জন্য আরামদায়ক বিছানা জোটে না। ১৪ বছরের কম বয়সী ছেলে বা মেয়েকে গৃহকাজের শ্রমে নিয়োগ না করতে হাইকোর্টের রায় থাকলেও তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না।
ঘর থেকে বেরোলেই ওদের দেখা যায়। কোথায় নেই ওরা? রাস্তাঘাটে, দোকানে-বাজারে, গার্মেন্টসে-কারখানায়- প্রায় সবখানেই আছে। একজন কিংবা দু’জন নয়- অসংখ্য। পেটের দায়ে, সংসার চালাতে দরিদ্র বাবা-মাকে সাহায্য করতে ওরা শ্রমিকে পরিণত হয়েছে, শ্রম দিচ্ছে। ওরা প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের সমপরিমাণ কাজ করতে পারে না। বড়রা যে পরিমাণ মজুরি পায় ওরা তা পায় না। তাই ওদের আয়ও কম। কিন্তু ওরাও শ্রমিক, শিশুশ্রমিক। শ্রমে যুক্ত হয়ে এসব শিশুর দুরন্ত শৈশব এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অন্ধকারের অতলে হারিয়ে যায়।
বাংলাদেশের পরিসংখ্যান ব্যুরোর জরিপ অনুযায়ী, ৪৫ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ রয়েছে। এর মধ্যে ৪১ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের অংশগ্রহণ থাকে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা এবং ইউনিসেফ পরিচালিত জরিপ অনুযায়ী দেশের শহরাঞ্চলে প্রায় ৩০০ ধরনের অর্থনৈতিক কাজে শিশুরা শ্রম দিচ্ছে। এক সমীক্ষায় ৭০৯টি কারখানার মধ্যে জরিপ চালিয়ে দেখা যায়, মোট ৯ হাজার ১৯৪ জন শ্রমিকের মধ্যে ৪১.৫ শতাংশ অর্থাৎ ৩ হাজার ৮২০ জনই শিশু। এ শিশুশ্রমিকদের অধিকাংশেরই বয়স ১০ থেকে ১২ বছরের মধ্যে। অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই মানা হচ্ছে না শ্রম আইন।
সব ক্ষেত্রে শিশুশ্রম নিষিদ্ধ হলেও ঘর থেকে বের হলে দেখতে পাওয়া যায় শিশুশ্রমের করুণ চিত্র। হোটেল, মোটেল, লঞ্চ, বাস, ইটভাটা, পাথরভাঙা, মোটর গ্যারেজ, অ্যালুমিনিয়াম কারখানা, কল-কারখানা, বাসাবাড়ি, মিষ্টি ও বিস্কুট ফ্যাক্টরি, তামাকশিল্প, চামড়াশিল্প, চা-শিল্প, ভারীশিল্প ইত্যাদিতে প্রতিনিয়তই দেখা যায় শিশুশ্রমের নির্মম চিত্র।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। করোনা মহামারির ফলে শিশুশ্রম বহুগুণে বেড়ে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও ইউনিসেফ তাদের এক প্রতিবেদনে বলেছে, কোভিড-১৯ সংকটের ফলে আরও লাখ লাখ শিশুকে শিশুশ্রমে ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে, যা শিশুশ্রম বন্ধে গত ২০ বছরের অগ্রগতির পর শিশুশ্রম আবারও বাড়িয়ে দিতে পারে।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা ও জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদে শিশুশ্রম প্রসঙ্গে বলা হয়েছে- ‘যখন কোনো শ্রম বা কর্মপরিবেশ শিশুর দৈহিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক বিকাশের ক্ষেত্রে বিপজ্জনক ও ক্ষতিকারক হয়ে দাঁড়ায়, তখন তা শিশুশম হিসেবে গণ্য হবে।’ ইউনিসেফ শিশুশ্রম সংজ্ঞায়িত করেছে, ‘যে ধরনের কাজ শিশুর স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ব্যাহত করে তাই শিশুশ্রম।’ শিশুদের অধিকার রক্ষা এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনে ২০০২ সাল থেকে জাতিসংঘের অঙ্গসংগঠন আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ১২ জুন ‘বিশ্ব শিশুশ্রম প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে আসছে। প্রতি বছর বাংলাদেশসহ বিশ্বের ৮০টি দেশে এ দিবসটি পালন করা হয়।
আইএলওর জরিপ অনুযায়ী, পৃথিবীতে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ৩৬ কোটি ৬০ লাখ। প্রতি ছয়জন শিশুর মধ্যে একজন শিশুশ্রমে নিযুক্ত। পাচার, সন্ত্রাস, নির্যাতন প্রভৃতি কারণে প্রতি বছর প্রায় ২২ হাজার শিশু মারা যায়। শ্রম অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, দেশে ৬৯ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। ইউনিসেফের প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বর্তমানে দেশে শিশুর সংখ্যা ছয় কোটিরও বেশি। ৯০ শতাংশ প্রাথমিকভাবে স্কুলে গেলেও শিক্ষা সমাপ্ত করার আগেই অর্ধেকের বেশি ছেলেমেয়ে স্কুল থেকে ঝরে পড়ে। বিশ্বখাদ্য সংস্থার এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ শিশু শ্রম দিচ্ছে শুধু খাদ্যের বিনিময়ে। ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ শিশুকে মজুরি দেওয়া হলেও এর পরিমাণ শিশু আইনের তুলনায় নগণ্য।
শিশুশ্রম বন্ধে আমাদের করণীয়
১. শিশুশ্রমকে বলা হয় দারিদ্র্যের ফসল। শিশুশ্রমের মূলে রয়েছে দরিদ্রতা, শিশুশ্রম বন্ধ করতে হলে প্রথমে দরিদ্রতাকে নিরসন করতে হবে।
২. অমানবিক শিশুশ্রম বন্ধে মানসিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে, অন্যের শিশুকে নিজের সন্তানের মতো মনে করতে হবে।
৩. প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ১৪ বছরের কম শিশুদের সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলোর সমাধান করতে হবে।
৪. শিশুশ্রম বন্ধে গ্রাম ও শহরভিত্তিক পুনর্বাসন প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। অভাবের কারণে যেসব শিশু শ্রমে নিয়োজিত হচ্ছে তাদের তালিকা তৈরি করে তাদের শিশুভাতা দিতে হবে।
৫. শিশুশ্রম নিরসনে যেসব আইন রয়েছে তা বাস্তবায়ন এবং স্বল্প, মধ্য, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা সরকারকে গ্রহণ করতে হবে। সবার সমন্বিত উদ্যোগে শিশুশ্রম নিরসন সম্ভব।
৬. শিশুশ্রম নিরসনের জন্য কোথায় কোথায় শিশুশ্রম হচ্ছে তা খুঁজে বের করা দরকার এবং গণমাধ্যমে এ বিষয়ে বেশি বেশি প্রচার করতে হবে।
৭. দেখা যায় অনেক মালিক আছে যারা বেশি বেতন দিতে হবে এজন্য বড়দের কাজে রাখে না। শিশুদের দিয়ে কাজ করায়, এ মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।
৮. জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মকৌশলে শিশুশ্রমকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গুরুত্ব দিতে হবে।
৯. শ্রমজীবী প্রতিটি শিশুর শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
১০. শিশুশ্রম এবং শিশুদের অধিকার সম্পর্কে গণসচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে। শিশুশ্রম নিরসনে সামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে হবে।
জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদ অনুযায়ী, একটি শিশুকেও তার জীবিকা নির্বাহের জন্য কোনো প্রকার শ্রমে নিয়োজিত করা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটে শিশুরা শ্রমে জড়িত হয়ে থাকে।
মে দিবসের কথা
১৮৮৬ সালে রবার্ট ওয়েনের এক চিন্তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে ট্রেড ইউনিয়নগুলো দিনে ৮ঘণ্টা কাজের দাবিতে প্রতিবাদ কর্মসূচি শুরু করে।
রবার্ট ওয়েন ৮ ঘণ্টা কাজের দাবি পূরণে স্লোগান ঠিক করেন, ‘আট ঘণ্টা কাজ, আট ঘণ্টা বিনোদন এবং আট ঘণ্টা বিশ্রাম’। সবচেয়ে বড় আন্দোলনটা হয় পহেলা মে শিকাগোতে, যেখানে প্রাায় ৪০ হাজার শ্রমিক সমবেত হন। সে সময় কারখানায় কোনো নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা বা বিশ্রাম ছাড়াই টানা কাজ করে যাওয়াটা স্বাভাবিক ছিল। আর সেসময় শিকাগো ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শিল্পকারখানা ও ইউনিয়ন সংগঠনগুলোর কেন্দ্র। আন্দোলনে উত্তেজনা বাড়তে থাকে, পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়, একজন মারা যায় ও অনেকে আহত হয়।
পুলিশি নিষ্ঠুরতায় ক্ষুব্ধ ও উত্তেজিত বিক্ষোভকারী এবং শ্রমিক নেতারা পরদিন শিকাগোর বিখ্যাত হে মার্কেট স্কয়ারে কর্মসূচির ডাক দেয়।
এ সময় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তি পুলিশকে লক্ষ্য করে বোমা ছোঁড়ে। ওই বিস্ফোরণের ফলে এলাকাজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, সাতজন পুলিশ সদস্য নিহত হয় এবং ৬৭ জন কর্মকর্তা আহত হয়। চারজন বিক্ষোভকারীও নিহত হয় এবং ৩০ জনেরও বেশি আহত হয়। এই ঘটনা পরে পরিচিতি পায় হে মার্কেট ম্যাসাকার হিসেবে।
এই ঘটনাগুলোর স্মরণে ১৮৮৯ সালে ২০টি দেশের সমাজকর্মী, শ্রমিক নেতা ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর এক আন্তর্জাতিক কংগ্রেসে পহেলা মে তারিখ ‘মে দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
হে-মার্কেট স্কোয়ারের ঘটনায় আট জনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। গ্রেফতারকৃতরা হলেন, আলবার্ট পার্সন্স, অগাস্ট স্পাইস, স্যামূয়েল ফিল্ডেন, অস্কার নীবি, মিশেল সোয়াব, জর্জ এঙ্গল, অ্যাডলফ ফিশার এবং লুই লিং। তাদেরকে খুনের দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। যদিও এদের মধ্যে মাত্র তিনজন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন। গ্রেফতারকৃতদের বিচারের জন্য যে জুরি বোর্ড গঠন করা হয়েছিল তাদের মধ্যে ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ ছিলেন! সমস্ত বিশ্ব এই বিচার কার্য পর্যবেক্ষণ করেছে। ১৮৮৭ সালের ১১ই নভেম্বর পার্সন্স, স্পাইস, এঙ্গেল এবং ফিশারকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
এখন শুধু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই নয়, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতি বছর ১লা মে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে পালিত হয়ে থাকে।
প্রকাশকাল: মে ২০২৫


