সুপারফুড কেন খেতে হবে?

0
2

ফুলকুঁড়ি বন্ধুরা, আজ একটি ঘটনা দিয়ে শুরু করি। একদিন জনির বাসার সবাই তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে যাবে বলে পরিকল্পনা করলো। তারপর যথারীতি আমিসহ সকলে উপস্থিত হলাম সেই বাসায়। গিয়ে দেখি তার আরও দুটি কাজিন- তার সমবয়সী রুমন ও ফারহানা রয়েছে। বয়স এক হলেও তাদের উচ্চতা ও ওজনে বেশ হেরফের। রাতের খাবার খাবে সকলে। ডাইনিং এ খাবার সাজানো হয়েছে। খাওয়া শুরু করলাম, রুমন হঠাৎ করেই বলে উঠলো মা আমি ডিম খাবো না। ডিম আমার ভালো লাগে না। আমি পুষ্টিবিদ হিসেবে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করলাম, কেন এরকম করছে। খাওয়া শেষ করে তার মাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ডিম কি আগে থেকেই খেতে চায় না, না আজকে অনেক খাবারের আয়োজন দেখে বললো?’ উনি বললেন, ‘না আপা ডিম খেতে চায় না, ডিম গন্ধ লাগে।’
তারপর আস্তে আস্তে রুমন সারাদিন কী খায়, তার খাবারের তালিকা নিলাম এবং নোট করলাম। সবকিছু শুনে বুঝতে পারলাম রুমন রক্তস্বল্পতায় ভুগছে। তার সবকিছুতে বিরক্তিভাব, সবসময় ক্লান্ত শরীর, পড়াশোনায় অমনোযোগী। তার চোখ মুখ ফ্যাকাশে, নখ ভঙ্গুর। দেখে বুঝতে আর বাকি রইলো না।
এরপর তাকে ডিমের উপকারিতা বললাম, সে বুঝলো। প্রতিদিন একটি করে ডিম নিয়মিত খেতে বললাম। আর ডিমের পরিবর্তে আর কী কী খাওয়া যায় এবং ডিম আর কী কী উপায়ে খাওয়া যায় সেগুলো বিস্তারিত বললাম।

ডিমের পুষ্টিগুণ
ডিমের মধ্যে রয়েছে ১৩টি পুষ্টিগুণ, যার মধ্যে আয়রন, ভিটামিন এ, বি৬, বি১২, ভিটামিন ডি। এছাড়াও ডিমে রয়েছে সেলেনিয়াম, কোলিন, জিঙ্ক, আয়োডিন, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, তামা, পটাশিয়াম, সোডিয়াম প্রভৃতি। ডিমের এসব পুষ্টিগুণ শিশুদের শারীরিক বিকাশে, মস্তিষ্ক বিকাশে, চোখ ভালো রাখতে, পেশি গঠন ও মজবুত করতে সহায়তা করে। এছাড়া এসব পুষ্টিগুণ শিশুর শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়। এত পুষ্টিগুণ থাকায় ডিমকে সুপারফুডও বলা হয়। বিশ্বে প্রথম ডিম দিবস পালিত হয় ভিয়েনায় ১৯৯৬ সালে। ইন্টারন্যাশনাল এগ কমিশন পৃথিবীজুড়ে ডিমের গুরুত্ব ও উপকারিতা ছড়িয়ে দিতে এ সূচনা করেন। তারপর থেকে বিশ্বজুড়ে দিনটি পালনের জন্য নানা ধরনের আয়োজন করা হয়। শিশু জন্মের ১ হাজার দিন পর্যন্ত ডিম খাওয়া জরুরি।
আমাদের দেশে শিশুকিশোরদের রক্তস্বল্পতা বা রক্তশূন্যতা একটি সাধারণ সমস্যা। দীর্ঘদিন শিশুর শরীরে রক্তস্বল্পতা হলে শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও বিকাশে বাধাগ্রস্ত হতে পারে। রক্ত তৈরির প্রধান কাঁচামাল হলো আয়রন বা লৌহ। ৬ মাস বয়স হলেই শিশুকে ডিমের কুসুম খাওয়া শুরু করতে হবে। যেসব শিশু ২ বছর পেরিয়ে গরুর দুধ খাওয়া শুরু করেছে তারা যেন অন্যান্য খাবারের তুলনায় দুধ বেশি না খায় সেদিকে বিশেষভাবে দৃষ্টি দিতে হবে, না হলে রক্তস্বল্পতার ঝুঁকিতে থাকবে। ১ থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের প্রতিদিন ৬০০ মিলিলিটারের কম দুধ পান করা উচিত।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে প্রতিদিনের আয়রন সমৃদ্ধ খাবারের পাশাপাশি আমিষ, ভিটামিন সি, ফলিক অ্যাসিড, ভিটামিন বি১২ সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করতে হবে। আর হ্যাঁ, আয়রন সমৃদ্ধ খাবার আরও ভালোভাবে শোষণ করার জন্য অবশ্যই ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার যেমন লেবু, মাল্টা, আমলকী, কমলালেবু, আমড়া, জলপাই ইত্যাদি সাইট্রাসসমৃদ্ধ যেকোনো খাবার গ্রহণ করতে হবে। প্রাণিজ উৎসের খাবারে উদ্ভিজ্জ উৎসের তুলনায় আয়রন শোষণ ভালো হয়। এজন্য উদ্ভিজ্জ খাবারের সাথে ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
রক্তস্বল্পতা প্রতিরোধে একটি ভালো পুষ্টিকর খাবারের বিশাল ভূমিকা রয়েছে। আসুন জেনে নেয়া যাক খাবারের তালিকাগুলো।
আমিষ জাতীয় খাবার : গরুর মাংস ও কলিজা, মুরগির কলিজা, ডিম, সামুদ্রিক মাছ ইত্যাদি।
ভিটামিন সি সমৃদ্ধ খাবার : লেবু, কমলা, মাল্টা, আমলকী, আমড়া ইত্যাদি।
ফলিক এসিডযুক্ত খাবার : সবুজ পাতাযুক্ত শাকসবজি, কাঁচাকলা, কলার মোচা, ডুমুর, বিভিন্ন প্রকার ডাল।
আয়রনসমৃদ্ধ খাবার : আপেল, ডালিম, কলা, শুকনো ফল যেমন কিসমিস, খেজুর, বিভিন্ন ধরনের বাদাম, বিটরুট, গুড়, মধু ইত্যাদি। শিশুর বিকাশে এসব খাবারের খুব গুরুত্ব রয়েছে।

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫