সফল হবার জেদ

0
0

বাচ্চাটা খুব জেদি- একথা আমরা কখন বলি? সাধারণত যদি সে কোনো কিছু চায় এবং না পাওয়া পর্যন্ত উৎপাত করতে থাকে। তোমরাও অনেক সময় জেদি হয়ে ওঠো। তাই না? নতুন জামা কিনে না দিলে, নতুন বই, খেলনা কিনে না দিলে, খেলতে যেতে না দিলে জেদি হয়ে ওঠো। না পাওয়া পর্যন্ত আর কিচ্ছু খাবো না, কোথাও যাবো না, কোনো কথা শুনবো না- এ ধরনের আলটিমেটাম দিয়ে দাও। বাবা-মা তখন ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়ে তোমাদের দাবিদাওয়া পূরণ করার জন্য। এই যে জেদ, এটা ভালো উদ্দেশ্যেও তো হতে পারে, নাকি? এবার তেমন এক জনের গল্প শোনাবো।
১৯৭৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে জন্ম হয় ডেভিড গগিনের। প্রারম্ভিক শৈশব কাটে নিউইয়র্কে। তার বাবা ছিলেন মদ্যপ। মাতাল হয়ে গেলে তিনি উন্মত্ত হয়ে তার মাকে পেটাতেন। মাকে রক্ষা করতে গিয়ে ডেভিডও মার খেতেন। তার শৈশবের সেই দিনগুলোকে তিনি নরকের সাথে তুলনা করেন। গায়ের রঙ কালো বলে তাকে বর্ণবৈষম্যেরও শিকার হতে হয়েছে। শৈশবের সে মানসিক আঘাতের ফলে তার পড়াশুনাতেও বিঘ্ন ঘটে। তিনি ‘ডিসলেক্সিয়া’ রোগে আক্রান্ত হন। বইয়ের বর্ণগুলো তিনি উল্টাপাল্টা দেখতেন, তাই পড়তে পারতেন না। পড়াশুনায় ব্যর্থতার দরুণ তাকে স্কুল থেকে বের করে দেয়া হবে এ মর্মে চিঠি পাঠায় স্কুল কর্তৃপক্ষ। তার মা চিঠি পেয়ে তাকে সেটা জানান। ডেভিডের আত্মসম্মানে আঘাত লাগলো। আয়নার সামনে দাঁড়ালেন তিনি। তার ভাষ্যমতে- ‘আয়নায় আমি আমার বাবাকে দেখলাম না, মাকেও দেখলাম না। দেখলাম শুধু আমিই দাঁড়ানো। তাই সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমার ব্যর্থতার জন্য কাউকে দায়ী করবো না। নিজেকে বদলাবো’।
জেদ নিয়ে গগিন পড়াশুনা শুরু করেন। তার দুরবস্থা দেখে একবার কৌতুক করে তার গৃহশিক্ষক বলেছিলেন- তোমার যা মেধা! একটা বিষয় এক হাজার বার লিখলেই তবে তোমার মনে থাকবে। সেটা শুনে ডেভিড তা-ই করা শুরু করলেন। বারবার, বারবার করে লেখা। হাল ছেড়ে না দেয়ার এই সংগ্রাম তিনি এখান থেকে শুরু করলেন। এভাবে কোনো রকমে পড়াশুনা শেষ করেন ডেভিড।
চাকরিজীবনের শুরুতে তিনি মার্কিন বিমান বাহিনীতে প্যারা রেসকিউ হিসেবে যোগ দেন। তার কাজ মূলত আহতদের উদ্ধার করা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া। সেজন্য তাকে পানিতে প্রশিক্ষণ নিতে হয়, যা তার জন্য কষ্টসাধ্য ছিল। এরপর এনিমিয়া (রক্তাল্পতা) ধরা পড়ায় তিনি এ কাজের অনুপযুক্ত বিবেচিত হন। এরপর তিনি বিমান বাহিনীর একটি ইউনিটে কিছুদিন কাজ করেন। এরপর হতাশ হয়ে সে কাজ ছেড়ে দিয়ে তিনি পেস্ট কন্ট্রোল অর্থাৎ সোজা বাংলায় বললে তেলাপোকা, ছারপোকা মারার কোম্পানিতে কীটনাশক ছিটানোর কাজ শুরু করলেন।
এসময় একদিন তিনি বসে বসে টিভি দেখছিলেন। টিভিতে মার্কিন ‘নেভি সিল’ এর প্রশিক্ষণের উপর একটি ডকুমেন্টারি দেখাচ্ছিল। তোমরা হয়তো জানো, যে নেভি সিল হচ্ছে পৃথিবীতে সবচেয়ে কঠিন শারীরিক প্রশিক্ষণের কোর্স। এই প্রশিক্ষণে প্রায় দু’বছর ধরে নানা ধরনের শারীরিক পরীক্ষার মধ্য দিয়ে যেতে হয়। এই প্রশিক্ষণে যারা পাশ করে তারা পৃথিবীতে কঠিনতম যোদ্ধা হিসেবে বিবেচিত হয়। তারা আকাশপথ, নৌপথ এবং স্থলভাগের যুদ্ধেও সেরা হয়। তো, এই প্রশিক্ষণের ডকুমেন্টারি দেখে ডেভিড মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন যে তিনি নেভি সিল হবেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনি শারীরিক পরীক্ষা দিতে গেলেন। তার ওজন ছিল তখন ২৯৭ পাউন্ড বা ১৩৫ কেজি। পরীক্ষকরা তাকে বললেন এই ওজন নিয়ে নেভি সিলের প্রশিক্ষণে কোনোভাবেই অংশ নেয়া যাবে না। তবে ডেভিডের আগ্রহ দেখে একজন প্রশিক্ষক বললেন- তুমি যদি তিন মাসের মধ্যে ১০০ পাউন্ড ওজন কমিয়ে আসতে পারো, তাহলে আমরা চেষ্টা করবো তোমাকে ট্রেনিং এ নেয়ার জন্য। ডেভিড নেমে পড়লেন ওজন কমানোর যুদ্ধে। তিন মাসে ১০৬ পাউন্ড ওজন কমিয়ে তিনি হাজির হলেন সিলেকশন বোর্ডে। ফলে নির্বাচকদের তাকে ট্রেনিংয়ে নিতে দিতেই হলো।
ট্রেনিং শুরু করলে কী হবে! এটা কি আর স্কুলের কুচকাওয়াজ? যে এক মাস করেই শেষ হয়ে যাবে! যেহেতু আগে বিমানবাহিনীর কিছু প্রশিক্ষণ ছিল, তাই ডেভিডকে সরাসরি বাডস (BUDS) ট্রেনিংএ পাঠানো হয়। BUDS হলো বেসিক আন্ডারওয়াটার ডেমোলিশন সিল ট্রেনিং। এই ট্রেনিং হলো ২৪ সপ্তাহ। প্রথম দু’সপ্তাহ হলো প্রস্তুতি। এরপর তৃতীয় সপ্তাহকে বলা হয় ‘হেল উইক’ বা নারকীয় সপ্তাহ। এই সপ্তাহে টানা সাড়ে ৫ দিন একটি বিশেষ প্রশিক্ষণপর্ব চলে, এটি মূলত ‘কষ্টসহিষ্ণুতা’র প্রশিক্ষণ। এই সময়ের মধ্যে একজন সৈনিক সব মিলে মাত্র ৪ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পায়। বাকি সময়টা তারা ঠান্ডা, কাদা, পানি, পাহাড়ি রাস্তায় প্রশিক্ষণ নেয়। কখনো কয়েকজন মিলে বড় কাঠের খুঁটি হাতে নিয়ে হাঁটতে হয়, কখনো মাথার উপর নৌকা বহন করতে হয়, কাদায় মাখামাখি হয়ে পড়ে থাকতে হয়। এই সাড়ে ৫ দিনে মোট ২০০ মাইল (৩২২ কিলোমিটার) দৌড়াতে হয়, ভাবতে পারো! বিশেষ করে ঘুম না হওয়ায় আর হাড়ভাঙা পরিশ্রমে প্রশিক্ষণে আসা তিনভাগের দুই ভাগ সৈন্যই ‘হেল উইকে’ ঝরে পড়ে। যে আর কষ্ট সহ্য করতে পারছে না, নিয়ম অনুযায়ী বিশেষ পদ্ধতির ঘণ্টা বাজালেই তাকে মুক্ত করে দেয়া হয় ট্রেনিং থেকে। ডেভিড যেহেতু শারীরিকভাবে ফিট ছিলো না, হেল উইকে এসে সেও আর পেরে উঠছিল না। নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয় সে। কিন্তু অন্যদের মতো হাল ছেড়ে দেয়ার ঘণ্টা বাজাতে সে একদম রাজী না। তাই তাকে সুযোগ দেয়া হলো, তবে নিয়মানুযায়ী আবার শুরু থেকে অর্থাৎ প্রথম সপ্তাহ থেকে প্রশিক্ষণ শুরু করতে হলো। এবার হেল উইক শুরু হবার আগেই তার ‘নি ক্যাপ’ (যেটাকে আমরা হাঁটুর বাটি বলি) ভেঙে যায়। কিন্তু এই ভাঙা হাঁটু নিয়েও দুর্দমনীয় ডেভিড হেল উইক পার করে ফেলে। কিন্তু এরপর কোর্সমেটদের সাথে তাল মিলাতে পারছিল না বলে তাকে আবার প্রথম সপ্তাহে ফেরত পাঠানো হয়। ফলে তাকে দুইবার হেল উইক পার করতে হয় এবং অবশেষে তার কোর্স সম্পন্ন হয়।
নেভি সিল হয়ে উঠতে পারাটা ডেভিড গগিনের জীবনকে পাল্টে দেয়। ডেভিড নিজের উপর বিশ্বাস অর্জন করেন যে চাইলে তিনি অসাধ্য সাধন করতে পারবেন। এরপর ডেভিড শুরু করলেন তার জীবনের সীমাবদ্ধতা জয়ের যাত্রা। একবার যুদ্ধে অংশ নিয়ে তার কয়েকজন নেভি সিল বন্ধু মারা যায়। তাদের পরিবারের সহায়তার জন্য ফান্ড কালেকশন করতে তিনি ব্যাডওয়াটার ১৩৫ নামের একটি দৌড় প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। এই প্রতিযোগিতায় প্রচণ্ড গরমের মৌসুমে তিনটি পর্বতমালার মধ্য দিয়ে মোট ১৩৫ মাইল একটানা দৌড়াতে হবে। আবার, এতে অংশগ্রহণের শর্ত ছিল যে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১০০ মাইল (১৬১ কিলোমিটার) দৌড়ানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। ডেভিড কখনো এমন দৌড়ে অংশ নেননি। কিন্তু সেই যে ‘জেদ’!
১০০ মাইলের দৌড়ে নেমে পড়েন ডেভিড। ৭০ মাইলের পর তার কিডনি ফেইল করে। প্রস্রাবের সাথে রক্ত যাওয়া শুরু হয়। কিন্তু হাল ছাড়েননি তিনি। ১৯ ঘণ্টা ৬ মিনিটে ১০১ মাইল দৌড় শেষ করেন। এরপর ‘ব্যাডওয়াটার ১৩৫’ এ ৩০ ঘণ্টা ১৮ মিনিটে ১৩৫ মাইল পাড়ি দেন। তারপর থেকে এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি আলট্রা ম্যারাথন সাফল্যের সাথে শেষ করেছেন ডেভিড। একবার ২০৫ মাইল দৌড়েছেন ৩৯ ঘণ্টায়। প্রতি সপ্তাহেই শত মাইল দৌড়ানোকে নিজের রুটিনের মধ্যে নিয়ে নিয়েছেন তিনি।
শুধু দৌড় নয়, একবার তার জেদ চাপলো বিশ্ব রেকর্ড করার। তিনি ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ পুল আপ (বারে ঝুলে উঠা-নামা করা) করার সিদ্ধান্ত নিলেন। ২০১৩ সালের কথা। ডেভিডের আগে একজন ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০২০টি পুল আপ করেছিল। ডেভিড সে লক্ষ্য অর্জনের জন্য দুবার প্রচেষ্টা করেন। প্রথমবার আড়াই হাজার পুল আপ, দ্বিতীয়বার তিন হাজার পুল আপ করেই ক্ষান্ত হন তিনি। তৃতীয়বারে ১৭ ঘণ্টায় ৪০৩০টি পুল আপ করে গিনেস রেকর্ডে নাম লেখান। এরপর ২০২৩ এ আবার ৭৮০০টি পুল আপ করে আবার রেকর্ড করেছিলেন তিনি।
এই যে প্রতিবার নিজেকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টা, এটি তাকে বর্তমান পৃথিবীর Toughest বা ‘কঠিনতম’ ব্যক্তিতে পরিণত করেছে। প্রতিবার নিজের উপর কঠোরতার সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত চেষ্টা করে যান ডেভিড। তার স্লোগান হলো- Stay Hard বা ‘দৃঢ় থাকো’। তিনি শরীরের চাইতে মনের শক্তির উপর বেশি জোর দেন। তিনি মনে করেন- কেউ যদি হাল না ছাড়ার প্রতিজ্ঞা করে, তার মন যদি তাতে বিশ্বাস করে তাহলে শরীর সে অনুযায়ী সাড়া দেয়। তখন শারীরিক অক্ষমতাও দূর হয়ে যায়। সফলতার রাস্তা তখন সহজ হয়ে যায়।
ডেভিড গগিন যদি শৈশবের ট্রমা নিয়ে গুটিয়ে যেতেন, আজ হয়তো তার নাম কেউ জানতো না। কিন্তু সফলতার জন্য জেদ করেছিলেন বলেই লাখো মানুষের কাছে অনুপ্রেরণার রোল মডেলে পরিণত হয়েছেন। সুতরাং জেদ যদি করোই, নিজেকে ভালো কাজে সফলতার শীর্ষে নিয়ে যাওয়ার জন্য করো। কোনো প্রতিবন্ধকতাই তখন আর তোমার সামনে দেয়াল হয়ে দাঁড়াতে পারবে না।

প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০২৫