আজও দক্ষিণপাড়ার এক পরিবারের সদস্য মারা গেল। সে ছিল ওই পরিবারের সবচেয়ে দ্রুতগামী। যখন দৌড়াত, ছয় পা বৈদ্যুতিক ফ্যানের মতো দ্রুত চলত। বয়সে জোয়ান। গায়ের রঙটা অন্যদের তুলনায় একটু বেশিই লাল। তাই সবাই তাকে লালু নামে ডাকতো। গত বছর দৌড় প্রতিযোগিতায় সে প্রথম হয়েছিল। উত্তরপাড়া ও দক্ষিণপাড়ার মধ্যে এ রেস হয়। দুটি পাড়ার দূরত্ব মাত্র কয়েক গজ। উত্তরপাড়া একটু ওপর দিকে শুকনা বালুর মধ্যে। আর দক্ষিণপাড়াটি বিচের কিনারে। স্রোতের কোল ঘেঁষে। রাতে জোয়ার বেড়ে গেলে এ পাড়ার সবাই একটু ওপরে চলে আসে। আবার সকালে জোয়ারের পানি নেমে গেলে তারাও নেমে তাদের পাড়ায় চলে যায়।
দক্ষিণপাড়ায় আজ শোকের ছায়া। শোকার্ত পরিবারটিকে সান্ত্বনা দিতে দু’পাড়ার সবাই এসেছে। এখনও সুবহে সাদিকের আবছা আঁধার কাটেনি। ছোট ছোট মাছের খোঁজে সাঁই করে বিচের কিনারে নেমে পড়ল একটি সাদা সারস। নরম বালিয়াড়িতে চুপটি করে পা টিপে হাঁটতে হাঁটতে এক টুকরো কাঠের জীবাশ্ম পায়। তার ওপর চুপটি করে সারসটি দাঁড়ায়। ডান দিকে তাকাতেই দেখে শত শত লাল কাঁকড়া। কী ব্যাপার, এ সময় এত লাল কাঁকড়ার সমাবেশ! এরা তো গর্ত থেকে বের হওয়ার কথা আরও পরে। সূর্য পুরোপুরি উঠলে। রোদের হাল্কা তাপ ছড়ালে তারপর। সারসের কৌতূহল আরও বেড়ে যায়। সে দেখে একটি মরা কাঁকড়াকে ঘিরে শত শত কাঁকড়া নীরবে দাঁড়িয়ে আছে। কী হলো কিছুই বুঝে আসে না সারসের।
নীরবতা ভেঙে একটা বয়স্ক কাঁকড়া প্রথমে কথা বলা শুরু করলো, ‘যত দ্রুত সম্ভব লালুকে শেষ বিদায় জানাতে হবে। কিছুক্ষণের মধ্যেই মোটরবাইকের রাজত্ব শুরু হয়ে যাবে আবার।’
কুয়াকাটায় বেড়াতে আসা মানুষদের বহন করা মোটরবাইক। সকাল শুরু হতেই শত শত মোটর বাইকওয়ালা কুয়াকাটার বিচে দাঁড়িয়ে পর্যটকদের ডাকাডাকি শুরু করবে। ঝাউবন, লেবুবন, গঙ্গামতির চর, তিন নদীর মোহনা, লাল কাঁকড়ার চর…। তারপর একেকটি বাইকে চালকসহ তিনজন চেপে বসবে। ভোঁ ভোঁ বিকট শব্দে পুরো বিচ কাঁপিয়ে তোলে মোটরবাইকগুলো।
মাথার ওপর লালসাদা বড় অ্যান্টেনাওয়ালা আরেকটা কাঁকড়া বললো,
– ‘প্রতিদিন যেভাবে এখানে মোটরবাইকের হামলা হয় তাতে আমাদের আর বাঁচার দশা নাই। আজ আমরা যারা বেঁচে আছি, কাল হয়তো আমাদের মধ্যেই কেউ না কেউ লালুর মতো খারাপ পরিণতির শিকার হবো। এটাই আমাদের নিয়তি।’
– ‘আর দেরি না করে চলো, সবাই হাত লাগাই। দ্রুত গর্ত খুঁড়ে লালুকে কবর দিতে হবে।’
সর্দার কাঁকড়ার কথায় সবাই গর্ত খোঁড়ার কাজে নেমে পড়লো। গর্ত খুঁড়তে খুঁড়তে উত্তরপাড়ার কমলা রঙের কাঁকড়া বললো, ‘এভাবে চললে তো আমরা একেবারে নির্বংশ হয়ে যাবো।’
খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে সামনে এসে দক্ষিণপাড়ার খোঁড়া কাঁকড়াটি বললো, ‘গতকাল বিকেল বেলা মাথায় হ্যাট পরা এক পাজি লোক দূর থেকে আমাকে দেখে ফেলে। দৌড়ে কাছে আসতে না আসতেই আমি আমার গর্তে ঢুকে পড়ি। কিন্তু সে তো মহা নচ্ছার। দুই হাতে খাবলা মেরে বালি খুঁড়তে থাকে। আমি তো ভয়ে শেষ। প্রাণপণে হাত পা চালিয়ে গর্তের বেশ গভীরে ঢুকে যাই। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। বালি খুঁড়ে লোকটা আমাকে বের করে আনে। আমিও সুযোগ বুঝে তার হাতে কুট করে বসিয়ে দেই এক জম কামড়। ব্যথায় উহ্ করে ওঠে লোকটি। তবুও ছাড়ার নাম নেই। শেষে বিচে ছেড়ে দিয়ে এদিক ওদিক দৌড়ানি দিতে দিতে আমাকে একেবারে লটপটি বানিয়ে ছাড়ে। পাড়া খেয়ে আমার পা ভেঙে যায়। কোনোমতে প্রাণপণে দিই দৌড়। দৌড়াতে থাকি আর আত্মরক্ষার জন্য গর্ত খুঁজতে থাকি। আশেপাশে অনেক গর্ত পাই। কিন্তু একটাও আমার বডি সাইজের সাথে মিলে না। তাই কোনো গর্তেই ঢুকতে পারি না। জান বাঁচাতে আমার এদিক ওদিক ছোটাছুটি দেখে লোকটার সে কী উল্লাস আর অট্টহাসি! হঠাৎ বালিতে উষ্টা খেয়ে লোকটা চিৎপটাং। এবারের মতো আমার শেষ রক্ষা হয়। জান নিয়ে কোনো রকমে পালিয়ে বাঁচি। নইলে আমি এখন কোথায় যে থাকতাম, জানি না। হয়তো বোতলে ভরে নিয়ে যেত শহরের কোনো দালানে। সেখানে দু’দিন বেঁচে থাকার পর মরে-পঁচে গন্ধ বের হলে ফেলে দিত ডাস্টবিনে। মানুষ কেন যে এত নিষ্ঠুর হয়! আমরা তো কারো কোনো ক্ষতি করি না। বরং সবসময় উপকার করি। আমরা সমুদ্র সৈকতে মাটির জৈব রাসায়নিক গুণাগুণ ঠিক রাখি। লবণাক্ততা কমাতে সাহায্য করি। এতে জীব অনুজীব ও উদ্ভিদের বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি হয়। আমরা যদি এভাবে নিঃশেষ হতে থাকি তাহলে পরিবেশ ভালো থাকবে? পরিবেশ খারাপ হলে মানুষ কি ভালো থাকবে?’
কথা বলতে বলতে মাটি খোঁড়ার কাজ শেষ হলো। কাঁকড়া সমাজের রীতি অনুযায়ী কবরে বিছিয়ে দেয়া হলো সাদা ঝিনুক। সবাই ধরাধরি করে মৃত লাল কাঁকড়াটিকে কবরে শুইয়ে দিলো।
একেবারে থেঁতলানো শরীর। চেনাই যাচ্ছে না। দেখে মনে হচ্ছে মোটরবাইকের চাকা পুরো শরীরের ওপর দিয়েই চলে গিয়েছিলো। চাকাটা হয়তো নতুন, ধারালো খাঁজকাটা ছিল।
লালুর মা ছেলের এ অবস্থা দেখে কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না। বিলাপ করে কান্না করতে লাগলো। বাবা বেঁচে থাকলে খুব কষ্ট পেত। দু’বছর আগে ওর বাবা ঘূর্ণিঝড় ‘ইয়াস’-এর কবলে পড়ে মারা যায়। তারপর থেকে এতিম লালুকে পাড়ার সবাই আদর যত্নে বড় করেছে। সেও সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছিল। লালুকে শেষ বিদায় দিয়ে সবাই ডুকরে কেঁদে উঠল। সবার চোখে অশ্রু। স্মৃতি হিসেবে কবরে রোপন করে দেয়া হলো একটি কেওড়া গাছের চারা। পাশেই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এতক্ষণ সব দেখলো সারস পাখিটা। নিজেকে আর সামলে রাখতে পারল না সে। টলটল করে তারও অশ্রু গড়িয়ে পড়লো দু’চোখ বেয়ে।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫



