রহস্যময়ী চিঠি

মুনতাসির এক দুরন্ত বালক। ছোটবেলা থেকে সে ভাবুক প্রকৃতির হওয়ায় বিদ্যালয়ের অনেকেই তাকে পাগলা গোয়েন্দা বলে ডাকতো। তখন তার খুব রাগ হতো। যদিও তার বড় হয়ে গোয়েন্দা হওয়ার বড় শখ। আনন্দপুর রেলস্টেশনের পাশেই তাদের বাড়ি। গ্রামের নাম আনন্দপুর হলেও এখন এ গ্রামে বিরাজ করছে আতঙ্কের ছাপ আর রহস্যের কষাঘাত। প্রতিদিন মুনতাসিরের পাখির ডাকে ঘুম ভাঙলেও আজ তার ঘুম ভাঙলো মানুষের কোলাহলে। বাইরে বেরিয়ে এসে দেখে রেলস্টেশনের পাশের ঐ পুরনো জমিদার বাড়ির দিকে অনেক মানুষ ছুটে যাচ্ছে। কী হয়েছে তা দেখার জন্য মুতাসিরের ভাবুক হৃদয় আকুল হয়ে ওঠে। বিষয়টি দেখার জন্য মুনতাসিরও ওখানে যায়। মুনতাসির যখন জমিদার বাড়ির উঠানে পৌঁছায় তখন সে দেখে কিছু মানুষ একটা লাশকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। সে রক্তমাখা মানুষটির মাঝেও যেন রহস্যের চাপা গন্ধ পাচ্ছে। সে তাদের আনন্দপুর গ্রামের পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করে। ঐ পুলিশ স্টেশনের একজন পুলিশ অফিসার তাকে জানায় এটা হয়তো আত্মহত্যা। এটি তদন্তের জন্য এসে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। যখন কেউ ঐ লাশটির কাছে যাওয়ার সাহসই পাচ্ছিলো না, তখন মুনতাসির লাশটির কাছে যায় এবং ভালোভাবে দেখতে শুরু করে সে দেখে তার হাতে রক্তাক্ত মুচড়ানো একটা চিঠি। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে ঐ চিঠিটা খুলে পড়তে শুরু করে। ওখানে রক্ত দিয়ে লিখা আছে ‘এখানে যে আসবে সেই মরবে।’

এটা শুনে গ্রামবাসীর মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। এতক্ষণ এটাকে সবাই আত্মহত্যা মনে করলেও এখন এটিকে সবাই ভূতুড়ে বিষয় মনে করছে। কিন্তু মুনতাসিরের মনে অন্য এক রহস্যের জাল তৈরি হয়েছে। এরপর গ্রামবাসীরা ঐ লাশটিকে ধর্মীয় রীতিতে দাফন করে। এভাবে একেক পর এক আরও সাতটা লাশ পাওয়া যায় ঐ জমিদার বাড়ির সামনে। কিন্তু অবাক করার মতো বিষয় হলো প্রত্যেক লাশের সাথে সেই রহস্যময়ী চিঠি থাকে, যাতে সেই একই মেসেজ – “এখানে যে আসবে সেই মরবে।”

মুনতাসির আবারও পুলিশ স্টেশনে বিষয়টি জানায়। কিন্তু বিষয়টি যেন পুলিশের কাছে অবাক হওয়ার বিষয় না। তারা বিষয়টিকে বার বার এড়িয়ে যাচ্ছিলো। এভাবে একের পর এক লাশ পাওয়ার বিষয়টি গ্রামবাসীর মনে এক গভীর ছাপ ফেলতে শুরু করে। এটি গ্রামের সবাই ভূতুড়ে ঘটনা ভাবতে শুরু করে। এখন গ্রামের সবাই ঐ পুরোনো জমিদার বাড়ির দিকে যাওয়া বন্ধ করে দেয়। পুরো গ্রাম জুড়ে বিরাজ করছে আতঙ্কের কালো মেঘ। সবাই এ বিষয়টিকে ভূতুড়ে ঘটনা মনে করলেও মুনতাসির মোটেও এ ঘটনাটিকে ভূতুড়ে ঘটনা মনে করেনি। তার মনে হচ্ছিলো এটা পরিকল্পিত খুন। তার ভাবুক হৃদয় বলতে শুরু করে যেভাবেই হোক রহস্যের দেয়াল ভাঙতেই হবে আর দূর করতে হবে কুসংস্কার।

জোসনা মাখা রাত। চারিদিকে তখন পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। রাত তখন ঠিক ১২টা। একলা পথে হাঁটছে ছোট্ট মুনতসির। তার একটাই উদ্দেশ্য কুসংস্কারের বেড়িবাঁধ ভেঙে গ্রামবাসীর আতঙ্ক দূর করা। সে হাঁটতে হাঁটতে যখন সেই পুরনো জমিদার বাড়ির সামনে এসে পৌঁছায় তখন সে লক্ষ করে জমিদার বাড়ির দরজা খোলা। এতে সে খুবই অবাক হয়। কারণ প্রতিদিন সন্ধ্যা হলেই রামু কাকা এই জমিদার বাড়ির দরজা বন্ধ করে দেয়। রামু কাকা এ জমিদার বাড়ির অনেক বছর ধরে খেয়াল রাখে। সে সামনে একটু এগিয়ে যেতেই লক্ষ করে রামু কাকা কার সাথে যেন কথা বলছে। সাথে আনন্দপুর পুলিশ স্টেশনের কয়েকজন পুলিশ অফিসার। একজন বিদেশি মানুষ চাপা কণ্ঠে রামু কাকাকে বলছে-‘আমার মালগুলো রেডি আছে তো? কোনো ঝামেলা হবে না তো? ’
রামু কাকা বলে, ‘জ্বি সাহেব। সব ঠিক আছে। এর মধ্যে একটা বড় ট্রাক এসে দাঁড়ায় জমিদার বাড়ির সামনে। কয়েকজন মানুষ বড় বড় বাক্সে করে কী যেন নিয়ে যাচ্ছিলো। মুনতাসিরের খুব জানতে ইচ্ছে করছিলো ঐ বাক্সে কী আছে। তাই সে ঐ মানুষগুলোর কথা আরও মনোযোগ দিয়ে শোনে। যখন বাক্সগুলো গাড়িতে তোলা শেষ হয় তখন একজন পুলিশ অফিসার ঐ বিদেশি মানুষকে উদ্দেশ্য করে বলে, ‘স্যার এত টাকার ড্রাগস চালান করতে সাহায্য করছি, আমাদের একটু খুশি করবেন না?’
এরপর বিদেশি লোকটি পুলিশ অফিসারগুলোকে এবং রামু কাকাকে কিছু টাকার বান্ডিল দেয়। তখন সবার মুখে একটা দুষ্ট হাসি দেখা দেয়। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে মুনতাসির পুরো বিষয়টা ক্যামেরাবন্দি করে। এরপর সে চুপি চুপি তার বাসায় চলে যায়। তার মামা একজন উচ্চপদস্থ পুলিশ অফিসার ছিলেন। সে তার মামাকে পুরো বিষয়টি জানায়। পরদিন সে গ্রামের সবাইকে জড়ো করে এবং ক্যামেরাবন্দি করা ভিডিওটা দেখায়। এই যে একের পর এক লাশ পাওয়া যেত এটা ছিলো তাদের ব্যবসা করার জন্য পরিবেশ তৈরি করার একটা পরিকল্পনা মাত্র। তারা যখন প্রথম প্রথম এই মাদক দ্রব্য চালান শুরু করে তখন কিছু মানুষ জেনে যায়। বিষয়টিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য তারা সেই মানুষগুলোকে হত্যা করে আর গ্রামবাসীর মনে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তাদের হাতে একটা রহস্যজনক চিঠি রেখে দেয়, যাতে লিখা থাকে- “এখানে যে আসবে, সেই মরবে।”
এতে গ্রামবাসীর মনে আতঙ্ক সৃষ্টি হয় এবং গ্রামবাসীরা এটাকে ভূতুড়ে বিষয় মনে করে এদিকে আসা যাওয়া বন্ধ করে দেয়। এতে তাদের অবৈধ ব্যবসাটা করতে সুবিধা হয়।

অবশেষে গ্রামের মানুষের আতঙ্ক আর কুসংস্কার দূর হয়। তার মামা ঐ পুলিশ অফিসারগুলোকে গ্রেফতার করে, সাথে রামু কাকা আর বিদেশি মানুষগুলোকে। চারদিকে মুনতাসিরের জয়ধ্বনি। সরকারিভাবে মুনতাসিরকে সাহসিকতার জন্য ‘বীরত্ব’ পুরস্কার দেয়া হয়।

প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬