রাকিবের নাম শুনলেই পাড়ার ছেলেরা একটু সাবধান হয়ে যেত। স্কুলে শিক্ষকরা বলতেন, ওটা একেবারে ডানপিটে ছেলে।
রাকিবের মা বলতেন, ওর মাথাটা বোধহয় উল্টো করে বসানো হয়েছে।
আর পাড়ার চাচিরা বলতেন, এই ছেলেটা একদিন বড় বিপদে পড়বে।
রাকিব নিজেও জানতো, সে একটু বেশি ডানপিটে। বাঁ হাতে লেখে, ডান চোখ দিয়ে নিশানা করে, ডান কানে হেডফোন লাগায়, আর কথায় কথায় ডানদিকের যুক্তি দিয়ে সবাইকে কুপোকাত করে দেয়। কিন্তু তার সবচেয়ে বড় ডানপিটেমি ছিলো সে সবকিছুকে উল্টোভাবে ভাবতো। যেখানে সবাই নিয়ম মানে, সে নিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলে। যেখানে সবাই চুপ থাকে, সে কথা বলে। যেখানে সবাই হাল ছেড়ে দেয়, সে বলে আরও একটা চেষ্টা করি।
রাকিব নবম শ্রেনীর ছাত্র। একদিন স্কুলে বিজ্ঞান ক্লাসে শিক্ষক বললেন, আজ আমরা বিদ্যুৎ নিয়ে পড়বো। বিদ্যুৎ না থাকলে আধুনিক জীবন অচল।
সবাই খাতা খুলে নোট লিখতে শুরু করলো। রাকিব হাত তুলে বললো, স্যার! বিদ্যুৎ না থাকলে মানুষ কী সত্যিই অচল হয়ে যাবে?
শিক্ষক একটু বিরক্ত হয়ে বললেন, কেনো, বিদ্যুৎ ছাড়া মোবাইল, ফ্যান, টিভি সব বন্ধ হয়ে যাবে না?
রাকিব হেসে বললো, কিন্তু মানুষ তো বিদ্যুৎ ছাড়াই হাজার বছর বেঁচেছে। তাহলে আধুনিক জীবনটাই কী আসলে মানুষকে অলস বানিয়ে দিচ্ছে না?
ক্লাসের সবাই হেসে উঠলো। কেউ কেউ বললো, ডানপিটে ছেলে আবার শুরু করেছে!
কিন্তু শিক্ষক একটু থেমে গেলেন।
এইভাবেই রাকিবের দিন কাটতো। প্রশ্ন, ভাবনা, উল্টো দৃষ্টিভঙ্গি সব মিলিয়ে সে ছিলো আলাদা।
রাকিবের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা ছিলো পুরোনো লাইব্রেরির পেছনের আমগাছটা। স্কুল শেষে সে সেখানে বসে গল্পের বই পড়তো, আকাশ দেখতো, আর নিজের মতো করে পৃথিবীকে নতুন করে কল্পনা করতো।
একদিন সেখানে সে নতুন একজনকে দেখলো, নাম তাসনিম। সে নতুন ভর্তি হয়েছে স্কুলে। চুপচাপ বই পড়ছিলো।
রাকিব ওর কাছে গিয়ে বললো, তুমি কী গল্প পড়ো, না ইতিহাস?
তাসনিম একটু অবাক হয়ে বললো, গল্প! ইতিহাসে বেশি মারামারি।
রাকিব হেসে বললো, গল্পেও মারামারি আছে, শুধু একটু সুন্দরভাবে।
তাসনিম হেসে ফেললো। তারপর থেকে দুজনের বন্ধুত্ব শুরু। রাকিব তাসনিমকে তার অদ্ভুত ভাবনার কথা বলতো। যেমন-
‘তুমি জানো, যদি পৃথিবী উল্টো ঘুরতো, আমরা কী তাহলে আকাশে ঝুলে থাকতাম?’
তাসনিম বলতো, তুমি সবকিছু উল্টো করে ভাবো কেনো?
রাকিব বলতো, কারণ সবাই সোজা ভাবে। উল্টো না ভাবলে নতুন কিছু বের হয় না।
একদিন স্কুলে বড় একটা ঘোষণা হলো। বিজ্ঞান মেলায় অংশ নিতে হবে। যে নতুন কিছু বানাতে পারবে, সে জেলায় যাবে।
সবাই শুরু করলো রোবট, সৌরচুলা, ছোটখাটো প্রজেক্ট বানানো। রাকিব ভাবলো, আমি যদি সবার মতো একই জিনিস বানাই, তাহলে তো আর আলাদা হবে না।
সে তাসনিমকে বললো, আমি এমন কিছু বানাতে চাই যা কেউ ভাবেনি।
তাসনিম বললো, কিন্তু ঝুঁকি আছে। সবাই হাসবে।
রাকিব বললো, ডানপিটে হলে হাসা খাওয়াই স্বাভাবিক।
রাকিব ভাবলো আমাদের পাড়ায় সবচেয়ে বড় সমস্যা কী? বিদ্যুৎ চলে গেলে সবাই অন্ধকারে পড়ে যায়। মোবাইল চার্জ নেই, ফ্যান চলে না, বাচ্চারা পড়তে পারে না। সে সিদ্ধান্ত নিলো, সে বানাবে ‘মানুষচালিত বিদ্যুৎ যন্ত্র’ যাতে মানুষ হাঁটলে বা খেললে বিদ্যুৎ তৈরি হবে।
বন্ধুরা বললো, এটা কী সাইকেলের ডায়নামোর মতো?
রাকিব বললো, না এটা হবে খেলার মাঠের মতো বাচ্চারা দৌড়াবে, লাফাবে আর বিদ্যুৎ তৈরি হবে।
সবাই হেসে বললো, ডানপিটে আইডিয়া!
রাকিব স্কুলের পুরোনো সাইকেলের পার্টস, ডায়নামো, তার, বাল্ব সব জোগাড় করলো। তাসনিম তাকে সাহায্য করলো। দুজন মিলে মাঠের এক কোণে ছোট একটা কাঠের প্ল্যাটফর্ম বানালো। বাচ্চারা প্ল্যাটফর্মে উঠলে সেটি একটু দুলবে, আর নিচের ডায়নামো ঘুরে বাল্ব জ্বলবে— এই ছিলো ধারণা।
অনেকে এসে বলতো, এতে কত বিদ্যুৎ হবে?
রাকিব বলতো, খুব বেশি না, কিন্তু আলো জ্বালানোর মতো।
কেউ বলতো, এটা দিয়ে ফ্যান চলবে?
রাকিব বলতো, একদিন চলবে।
সবচেয়ে বেশি বিরক্ত করতো স্কুলের এক সিনিয়র, নাম ছিলো সোহান। সে বলতো, এইসব পাগলামি করে কী হবে? জেলায় যেতে চাইলে রোবট বানাও।
রাকিব শুধু বলতো,সবাই রোবট বানালে পৃথিবীটা রোবটেই ভরে যাবে।
মেলা এলো। স্কুল মাঠে সবাই তাদের প্রজেক্ট সাজালো। রাকিবের প্ল্যাটফর্ম দেখে অনেকে হাসলো। কেউ কেউ বললো, খেলার মাঠ দিয়ে বিজ্ঞান?
কিন্তু তাসনিম সাহস দিয়ে বললো, তুমি দেখাও, কীভাবে কাজ করে।
রাকিব কয়েকজন ছোট বাচ্চাকে ডেকে বললো, তোমরা লাফাও।
বাচ্চারা লাফাতে শুরু করলো। হঠাৎ পাশে লাগানো বাল্ব জ্বলে উঠলো। সবাই চমকে গেলো।
একজন শিক্ষক বললেন, এটা কীভাবে সম্ভব?
রাকিব বুঝিয়ে বললো, মানুষ যখন নড়াচড়া করে, সেই শক্তি নষ্ট হয়। আমি সেই শক্তিকে বিদ্যুতে বদলেছি।
বিচারকরা এসে দেখলেন। তারা বললেন,এই ধারণা খুব বাস্তবসম্মত। গ্রামে খেলাধুলার মাঠ থাকলে বিদ্যুৎও পাওয়া যাবে।
শেষ পর্যন্ত ফলাফল এলো। রাকিব প্রথম হয়নি, কিন্তু বিশেষ পুরস্কার পেলো ‘সেরা উদ্ভাবনী ধারণা।’ সে জেলায় যাওয়ার সুযোগও পেলো।
স্কুলের সবাই তখন আর তাকে শুধু ‘ডানপিটে’ বলে হাসে না। কেউ কেউ বললো, ডানপিটে মানে আসলে আলাদা ভাবে চিন্তা করা।
তাসনিম বললো, তুমি তো সত্যিই উল্টো পথে হেঁটে সামনে গেলে।
রাকিব হেসে বললো, ডানপিটে হলে সামনে যাওয়ার পথটা একটু ঘুরে যায়, কিন্তু যায়।
জেলায় গিয়ে রাকিব আরও অনেক বড় বড় প্রজেক্ট দেখলো। কেউ বানিয়েছে ড্রোন, কেউ বানিয়েছে স্বয়ংক্রিয় গাড়ি। প্রথমে তার মনে হলো, সে খুব ছোট কিছু করেছে।
কিন্তু একজন বিজ্ঞানী বিচারক এসে তার কাছে বললেন, তোমার ধারণাটা খুব মানবিক। সবাই বড় প্রযুক্তির কথা ভাবে, তুমি মানুষের শক্তিকে ব্যবহার করার কথা ভেবেছো। এটা বড় আবিষ্কারের প্রথম ধাপ।
রাকিবের বুকটা আনন্দে ভরে গেলো। বাড়ি ফিরে সে আমগাছটার নিচে বসে তাসনিমকে বললো, ডানপিটে হওয়া খারাপ না, তাই না?
তাসনিম বললো, ডানপিটে হওয়া মানে সাহসী হওয়া। সবাই যেখানে বাঁ দিকে যায়, তুমি ডান দিকে যাওয়ার সাহস করো।
রাকিব আকাশের দিকে তাকালো। সূর্য ডান দিক থেকে অস্ত যাচ্ছিলো। সে ভাবলো, পৃথিবী যদি সবসময় সোজা পথে চলতো, তাহলে কী সূর্যাস্ত এতো সুন্দর হতো?
সেদিন থেকে রাকিব বুঝলো- ডানপিটে মানে শুধু উল্টো করা নয়। ডানপিটে মানে সাহস করে নতুন পথে হাঁটা, প্রশ্ন করা এবং নিজের মতো করে পৃথিবীকে একটু বদলানো।
পাড়ার চাচিরা এখন বলেন, এই ডানপিটে ছেলেটাই একদিন বড় বিজ্ঞানী হবে।
রাকিব শুধু হাসে। কারণ সে জানে, সে বড় বিজ্ঞানী হোক বা না হোক- সে অন্তত নিজের মতো করে ভাবতে শিখেছে।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৬



