বইয়ের সাথে হোক সখ্যতা

ফেব্রুয়ারি মানেই ভাষার জন্য যুদ্ধ, বাঙালির ভাষা ও মুক্তির আন্দোলনের অন্যতম ভিত। ফেব্রুয়ারি মানেই সালাম, বরকত, জব্বার, শফিক কিংবা প্রভাত-ফেরির মিছিল। ফেব্রুয়ারি মানেই প্রাণের বইমেলা। বন্ধুরা! সবাইকে ভাষার মাসে অনেক অনেক প্রীতি ও শুভেচ্ছা। আজ যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করবো সেটি তোমাদের খুবই পরিচিত ও প্রিয় জিনিস ‘বই’।
মানবসভ্যতার ইতিহাসে একটি অমূল্য সম্পদের নাম বই, যা জ্ঞানের ভাণ্ডার এবং সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হিসেবে কাজ করে। বই মানুষের সবচেয়ে ভালো বন্ধু। এটি আমাদের জ্ঞান বাড়ায় এবং সবসময় নতুন কিছু শেখার সুযোগ করে দেয়। বই পড়ে আমরা বিভিন্ন দেশের মানুষ, সংস্কৃতি, প্রকৃতি এবং বিজ্ঞানের নানা বিষয় সম্পর্কে জানতে পারি। এটি শুধু মজার গল্প বলে না, আমাদের মনও ভালো করে। বই পড়লে আমরা ভালো কথা শিখি এবং কল্পনার জগতে ভ্রমণ করতে পারি। এটি আমাদের চিন্তাশক্তি বাড়ায় এবং ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। বই পড়ার মাধ্যমে আমরা নতুন নতুন ধারণা পাই, যা আমাদের ভবিষ্যতের জন্য উপকারী পাথেয়। যারা নিয়মিত বই পড়ে, তারা বুদ্ধিমান ও সফল হয়। তাই সবার আগে আমাদের বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা দরকার, কারণ বই আমাদের জীবনে আলোর পথ দেখায়।
বই মানুষের জীবনের এক অনন্য নিয়ামক। এখান থেকে তুমি যতই জ্ঞান আহরণ করো না কেন, এটি কখনো ক্লান্ত হয় না, কখনো বিরক্ত হয় না। আমাদের জন্য বই শুধু জ্ঞান আহরণের উপকরণ নয়, বরং এটি আমাদের কল্পনার জগৎকেও রঙিন করে তোলে। বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব গড়ার মাধ্যমে আমরা হয়ে উঠি আরও জানুক, আরও চিন্তক ও আরও সচেতন। চলো তাহলে জেনে নিই, কেন বইয়ের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলা উচিত এবং এটি কীভাবে আমাদের জীবনে চমৎকার প্রভাব ফেলে।

বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা কেন জরুরি?
বই পড়ার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই তৈরি করা উচিত। কারণ এটি আমাদের মনোজগতে গভীর প্রভাব ফেলে। এ কথা খুবই পরিচিত যে, নিয়মিত বই পড়ার অনেক উপকারিতা রয়েছে। এ জন্য বই পাঠ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এটি আমাদের চিন্তা করার ক্ষমতা বাড়ায় এবং কল্পনার জগৎকে সমৃদ্ধ করে। বিভিন্ন ধরনের বই পড়ে আমরা নতুন নতুন চরিত্র, স্থান ও ঘটনা সম্পর্কে খুব সহজেই জানতে পারি। এর ফলে আমাদের মনের মধ্যে সৃষ্টিশীলতা জন্মায়। এছাড়াও বই আমাদের ধৈর্য ও মনোযোগ ধরে রাখতে শেখায়। এটি যেমন তোমার শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করবে, তেমনি ভাষাতেও তোমাকে দক্ষ করে গড়ে তুলবে।
বই মানুষের নৈতিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে সাহায্য করে। তোমরা যখন বই পড়বে, তখন ভালো-মন্দের পার্থক্য শিখতে পারবে। নীতিকথা, গল্প ও উপদেশমূলক বই তোমাদের মনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। গল্পের চরিত্রদের ভালো কাজগুলো দেখে তোমরা সঠিক পথে চলার শিক্ষা পাবে। একইসাথে বই পড়ে তোমরা দয়া, সততা, সহানুভূতি ও সম্মানের মতো গুণাবলি অর্জন করতে শিখবে। এটি তোমাদের জীবনকে সুশৃঙ্খল করে গড়ে তুলবে।

প্রযুক্তি বনাম বই
আজকের দিনে প্রযুক্তি যেমন আমাদের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে, তেমনি এটি প্রতিনিয়তই আমাদের বই পড়ার অভ্যাস থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। মোবাইল, ট্যাব বা কম্পিউটারের স্ক্রিনে কাটানো সময় আমাদের মস্তিষ্কের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অপরদিকে একটি ছোট গল্পের বইয়ের মাধ্যমে হলেও তোমরা নতুন নতুন ধারণা সম্পর্কে জানতে পারবে, নিজেদের চিন্তাশক্তি বাড়াতে পারবে। তবে প্রযুক্তি ও বই মোটেও একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং তারা একে অপরের পরিপূরক। প্রযুক্তি নতুন কিছু শেখার দ্রুত মাধ্যম হতে পারে, কিন্তু বই গভীর জ্ঞান ও মানসিক প্রশান্তি দেয়। তাই, আমাদের জীবনে প্রযুক্তি ও বইয়ের সঠিক ভারসাম্য থাকা উচিত। প্রযুক্তি শেখার জন্য, আর বই জীবন গড়ার জন্য অপরিহার্য।

পৃথিবীতে কত ধরনের বই পাওয়া যায়?
পৃথিবীতে নানা ধরনের বই পাওয়া যায়, যা আমাদের জ্ঞান, কল্পনা এবং বিনোদনের চাহিদা পূরণ করে। গল্পের বই শিশুদের কল্পনাশক্তি বাড়ায় এবং আনন্দ দেয়। উপন্যাসের বই বিভিন্ন চরিত্র ও জীবনের গল্প উপস্থাপন করে। ইতিহাসের বই থেকে মানুষ অতীতের ঘটনা ও শিক্ষা সম্পর্কে জানতে পারে। কবিতার বই আমাদের আবেগকে জাগিয়ে তোলে এবং ভাষার সৌন্দর্য তুলে ধরে। আত্মউন্নয়নের বই আমাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত উন্নতিতে সাহায্য করে। ধর্মীয় বই বিভিন্ন ধর্মের শিক্ষা ও নৈতিকতা সম্পর্কে জানায়। রন্ধনশাস্ত্রের বইতে বিভিন্ন রেসিপি এবং রান্নার পদ্ধতি শেখানো হয়। ভ্রমণসংক্রান্ত বই মানুষকে বিশ্বের বিভিন্ন স্থান সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞান কল্পকাহিনি, রহস্য, থ্রিলার, জীবনী, স্বাস্থ্য, শিল্প ও সংস্কৃতি বিষয়ক বইও জনপ্রিয়। বর্তমান সময়ের ডিজিটাল যুগে ই-বুক এবং অডিওবুকও বেশ জনপ্রিয় হয়েছে। বইয়ের এই সৃষ্টিশীল বৈচিত্র্য আমাদের চিন্তাধারা ও অভিজ্ঞতাকে সমৃদ্ধ করে। তাই, পৃথিবীতে প্রায় সব বিষয়ে বই পাওয়া যায়, যা প্রতিটি মানুষের মনের চাহিদা পূরণ করতে সক্ষম।

বই পাঠের ব্যাপারে ইসলাম কী বলে-
বই পড়ার গুরুত্ব কুরআন ও হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনের প্রথম নাজিল হওয়া শব্দ ছিল ইকরা, যার অর্থ পড়ো। এটি মানবজাতিকে জ্ঞান অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করে। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, “যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কি সমান?” এই আয়াতটি পড়া ও জ্ঞানার্জনের প্রতি বিশেষ গুরুত্বারোপ করে।
হাদিসেও বই পড়া ও জ্ঞান অর্জনের গুরুত্ব উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রতিটি মুসলমানের ওপর ফরজ।”
কুরআন ও হাদিসে বই পড়াকে আলোকিত জীবনের পথ বলে বর্ণনা করা হয়েছে। এটি মানুষের চিন্তাশক্তি বৃদ্ধি করে এবং সঠিক পথে পরিচালিত করে। ইসলামে বই পড়া কেবল ধর্মীয় শিক্ষা নয়, বরং বৈজ্ঞানিক, সামাজিক ও নৈতিক জ্ঞান অর্জনেও উৎসাহিত করে। তাই, বই পড়া ইসলামের দৃষ্টিতে অত্যন্ত মূল্যবান একটি কাজ।

বেশি বেশি পাঠাভ্যাস তৈরি করতে আমাদের কী কী করা প্রয়োজন?
প্রথমত, সবার মধ্যে পাঠাভ্যাস গড়ে তোলার জন্য বাড়িতে বই পড়ার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা প্রয়োজন। ছোটদের জন্য তাদের বয়স উপযোগী রঙিন এবং আকর্ষণীয় বই থাকতে পারে। বইগুলো সহজে পাওয়া যায় এমন স্থানে রাখলে ছোটরা স্বাভাবিকভাবেই বইয়ের প্রতি আগ্রহী হবে।
দ্বিতীয়ত, পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে প্রয়োজন সচেতনতা সৃষ্টি করা। বই পড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে মানুষকে জানানো জরুরি। বাড়িতে হোক কিংবা কর্মস্থলে একটি পাঠপরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে, যেখানে সবাই বই পড়ার সুযোগ পায়। স্থানীয় লাইব্রেরিগুলোতে সহজলভ্য এবং আকর্ষণীয় বই রাখার ব্যবস্থা করা উচিত, যাতে পাঠকদের আগ্রহ বাড়ে।
তৃতীয়ত, অভিভাবকদেরও উচিত শিশুদের সামনে বই পড়ার অভ্যাস দেখানো। শিশুরা তাদের অভিভাবকদের কাছ থেকে শিখে, তাই যদি বাবা-মা নিয়মিত বই পড়েন, তাহলে শিশুরাও সহজেই বইয়ের প্রতি আগ্রহী হবে। শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে, যেমন ঘুমানোর আগে একটি গল্পের বই পড়া। এটি তাদের নিয়মিত পাঠাভ্যাস গড়ে তুলতে সাহায্য করবে।
চতুর্থত, শিশুদের সঙ্গে লাইব্রেরি ভ্রমণ একটি চমৎকার অভ্যাস হতে পারে। এটি তাদের বইয়ের জগৎ সম্পর্কে জানতে এবং পছন্দমতো বই নির্বাচন করতে উৎসাহিত করবে। এছাড়া স্কুলে বই পড়ার কার্যক্রম, বইমেলা পরিদর্শন এবং পাঠ প্রতিযোগিতার আয়োজন আমাদের শিশুদের মধ্যে পাঠাভ্যাস বাড়াতে সহায়ক। প্রযুক্তির যুগে ই-বুক এবং অডিওবুক ব্যবহারও পাঠাভ্যাস বাড়ানোর একটি কার্যকর উপায় হতে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বই পড়ার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে পাঠাভ্যাসকে তোমরাই জনপ্রিয় করে তুলতে পারো।
সবশেষে, সবাইকে পছন্দমতো বই পড়তে উৎসাহ দেওয়া প্রয়োজন বিশেষত শিশুদের। জোর করে পড়ানোর চেষ্টা করা উচিত নয় এতে যে কেউ আগ্রহ হারাতে পারে। শিশুদের গল্প বলার মাধ্যমে বইয়ের প্রতি আগ্রহ তৈরি করা যেতে পারে। পাঠাভ্যাস শুধু জ্ঞান অর্জনের জন্য নয়, বরং এটি সৃজনশীলতা, মনোযোগ, এবং নৈতিকতার বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

বইমেলা :
বইমেলা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সাহিত্য ও সংস্কৃতির মিলনস্থল। বাংলাদেশে একুশে বইমেলা ভাষা আন্দোলনের স্মারক। ভারতের কলকাতায় অনুষ্ঠিত বইমেলা এশিয়ার সবচেয়ে বড় মেলা। জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা বাণিজ্যিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্রে নিউইয়র্ক বইমেলায় সাহিত্য ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটে থাকে। বইমেলা আমাদেরকে জ্ঞান ও সংস্কৃতির সাথে যুক্ত করে। সুতরাং আমাদের বইমেলা ঘুরে দেখা উচিত।
বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা সবার জীবনের সবচেয়ে বড় একটি সম্পদ হতে পারে। এটি অবশ্যই আমাদের সফল, সৃজনশীল এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হতে সাহায্য করবে। তাই বইয়ের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার জন্য তোমাদের এখন থেকেই চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। আমরা যখন বইয়ের সাথে বন্ধুত্ব করব, তখনই আমাদের জীবনের পথ আলোকিত হবে।
“বইয়ের সাথে হোক সখ্যতা” এই স্লোগানকে সামনে রেখে আমরা যদি নিজেদেরকে বই পড়ায় উৎসাহিত করতে পারি, তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ হবে উজ্জ্বল ও সম্ভাবনাময়। আজ এ পর্যন্তই! আবারও কথা হবে ভিন্ন কোনো বিষয়ে, ভিন্ন কোনো আয়োজনে।

প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৫