বানর আর শেয়ালের ছলাকলা

0
1

শেয়াল বন্ধুত্ব করেছিল কুমিরের সাথে। বন্ধুত্ব পাতাতে গিয়েছিল মোরগের সাথেও। শেষ পর্যন্ত কোনো বন্ধুত্বই টিকেনি শেয়ালের মতলববাজির জন্য। সবখানেই কি আর শেয়ালি চতুরতা খাটে! শেষ পর্যন্ত শেয়াল এসে বন্ধুত্ব পাতায় বনের এক বানরের সাথে। কঠিন বন্ধুত্ব। এমন বন্ধুত্ব নাকি জগত-সংসারে আর কারোর মধ্যে নাই।
বানরের সাথে বন্ধুত্বের হাত প্রথম বাড়িয়ে দেয় শেয়াল নিজেই। একই বনে তাদের দুইজনেরই বাস। মায়াভরা ছায়াঘেরা এই বনের গাছ-গাছড়ায় নানান জাতের ফল ধরে। ফলগুলো যেমন রসে ভরপুর হৃষ্টপুষ্ট, তেমনই স্বাদেও অতুলনীয়। বানর তো অষ্টক্ষণ কলা খাচ্ছে। এছাড়াও বিভিন্ন মওসুমে হরেক রকম ফল-ফলারি। বানর ডালে ডালে ঘুরে বেড়ায় আর ফল খায়। আর এদিকে খাবার যোগাড় করতে শেয়ালের বেজায় কষ্ট। শুধু কষ্টই নয়, বিপদের ঝুঁকিও অনেক।
বনের পাশেই গৃহস্থদের বাড়ি। প্রায় প্রত্যেক বাড়িতেই রয়েছে পোষা হাঁস মুরগি ও মোরগের খোঁয়াড়। রাতের আঁধারে কিংবা নিরিবিলি দিনে সেই খোঁয়াড়ে হানা দিতে গিয়ে লেজ কাটা যায়। কিষাণদের আখ ক্ষেতে গিয়ে দৌড়ানি খেতে হয়। সাথে সাথে পিটুনিও কম জোটে না! আর ওদিকে পাহারাদার কুকুরদের তাড়া তো রয়েছেই। বানরকে এসব কোনো ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয় না। কারো সাথে তার কোনো ধরনের বিবাদও নেই। বনের গাছগুলোয় তো কারো কোনো মালিকানা নেই। তাই বানর গাছে গাছে ডালে ডালে পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঘুরে ঘুরে নিশ্চিন্ত মনে আম, জাম, কাঁঠাল, জামরুল, লিচু, পেয়ারা ও আনারস খায়। মানা করার কেউ নেই, বাধা দিতেও কেউ আসে না। শেয়াল নিচ থেকে সবই দেখে। দেখে আর হিংসায় মরে। তার জিভের ডগায় লোভের পানি জমতে থাকে। দেখতে দেখতেই শেয়াল বুদ্ধি আঁটে, বানরের সাথে তাকে দোস্তালি পাতাতে হবে। তাহলে বানরের সাথে ফন্দি-ফিকির করে ফলমূল খাওয়ার সাধ অনেকটাই মিটানো যাবে। শেয়াল এক সকালে বনের পাশের এক গাঁয়ে এক জেলের বাড়ি থেকে একটা পচা মাছ চুরি করে নিয়ে এলো। বানর তখন একটা গাছের এক ডালে বসে আরেক ডালে হেলান দিয়ে আয়েশ করছিল। পচা মাছ নিয়ে শেয়াল এসে দাঁড়াল সেই গাছটার তলায়। বানরকে মাছ দেখিয়ে বলল: ও বানর ভাই, তোমার মতো ভালো মানুষ, থুক্কু, ভালো প্রাণী আমি আর কোথাও পাইনি। কী সুন্দর তুমি দেখতে-শুনতে! কত্তো বুদ্ধি তোমার মাথায়! তুমি যেন ঠিক মানুষের মতোই বুদ্ধিমান প্রাণী! এজন্যই তো আমি তোমার সাথে দোস্তি করতে চাই! তাইতো সারাটা রাত জেগে জেগে বনের পাশের নদী থেকে শিকার করে তোমার জন্য তাজা মাছ নিয়ে এসেছি। তোমাকে আমার নিজ হাতে মাছ খাইয়েই আজ থেকে তোমার সাথে আমার বন্ধুত্ব হবে। তুমি না করতে পারবে না কিন্তু।
গাছের ডালে বানর যে হেলান দিয়ে বসেছিল, শেয়ালের মিষ্টি মিষ্টি কথা শুনে হেলান থেকে সটান হয়ে বসলো। বনের প্রাণীদের কাছে শেয়ালের সব নিন্দাবাদ তার শোনা আছে। এজন্য সবাই শেয়ালকে এড়িয়ে চলে। কিন্তু আজ বানরের মন খানিকটা গলে গেল। শেয়ালের মিষ্টি-মধুর কথাবার্তায়, বিশেষ করে মানুষের বুদ্ধির সাথে তার বুদ্ধির তুলনায় তার বুকটা ফুলে উঠল। আহা বেচারা শেয়াল! তার সাথে বন্ধুত্ব করবে বলে সারা রাত নদীর পানিতে ডুবে ডুবে মাছ ধরে উপহার হিসেবে এনেছে! বানর কয়েকটা উপাদেয় ফল হাতে করে নেমে এলো নিচে গাছতলায়। ফলগুলো শেয়ালকে দিলো। আর হাত পেতে নিল মাছ। মাছ নিজে যতটুকু খেলো, তার চাইতে বেশি ভাগ খাওয়াল শেয়ালকে। শেয়ালের সাথে বানরের বন্ধুত্ব গড়ে ওঠার শুরুর গল্পটা এমনই। এরপর থেকে শেয়ালের খাওয়া-খাদ্যে আর কোনো অভাব-অনটনই রইলো না। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কষ্ট করে তাকে আর গৃহস্থদের বাড়িতে হানা দিতে হয় না, কিংবা ক্ষেতে-খামারে ধান বা আখ বা অন্য ফসলাদি চুরি করতে যেতে হয় না। তার প্রতিদিনকার খাবারের জোগান দিয়েছে বন্ধুবর বানর। গাছ থেকে যা ফল সে খেয়েছে, তার চাইতে কয়েকগুণ বেশি দিয়েছে শেয়ালকে। বানর গাছ থেকে ফল ছিঁড়ে ছিঁড়ে নিচে ফেলে। গাছের তলাতেই ওঁৎ পেতে থাকে শেয়াল। ফল কুড়িয়ে সে গপাগপ মুখে গিলে।
বনের ফলমূল খেতে খেতে শেয়ালের একসময় অরুচি ধরে গেল। সে ধান্দায় থাকল, বানরকে দিয়ে গেরস্তবাড়ির কোনো কিছু লোপাট করানো যায় কি না। সেদিন হাটবার। শেয়াল বানরকে ডেকে বলল: দোস্ত, আজ হাটবার। গেরস্তবাড়ির ভালো ভালো জিনিসপত্তর হাটে বিক্রি করার জন্য নিয়ে যাবে এই বনেরই পাশ দিয়ে। বুদ্ধি করে সেগুলোর দখল নিতে হবে। তোমার তো বুদ্ধি একদম মানুষদের মতোই, কখনো কখনো তাদের চাইতেও বেশি। সাহসও তোমার বেজায়। তুমিই পারবে ওদেরকে ভয়-ডর দেখিয়ে খাবারের জিনিসগুলোর দখল নিতে। শেয়ালের পরামর্শ ঠিক বুঝে উঠতে পারল না বানর। জিজ্ঞেস করল: কীভাবে? শেয়াল সেয়ানা। সে নিজেই বানরকে বুদ্ধি বাতলে দিলো তুমি গাছের মগডালে উঠে যাবে। সেখান থেকে বনের পাশ দিয়ে যে রাস্তাটা গ্রাম থেকে হাটের দিকে গিয়েছে, সেই রাস্তার উপর নজর রাখবে। খেয়াল করবে, কোনো লোক খাদ্যদ্রব্য, হাঁস মুরগি বনের পাশের রাস্তা দিয়ে হাটে নিয়ে যায় কি না। এই ধরনের কোনো লোক যেতে দেখলেই তুমি গাছ থেকে হঠাৎ লাফিয়ে তার সামনে গিয়ে পড়বে। দেখবে, গৃহস্থ তোমাকে আচমকা লাফিয়ে পড়তে দেখলেই ভয় পেয়ে যাবে। সে তার সব জিনিসপত্র ফেলে দৌড়ে পালাবে। আমরা তখন ঐ জিনিসগুলোর দখল নিয়ে মজা করে খাব। তুমি আর আমি আমরা দুজন। বানর মাথা চুলকে বলল: গৃহস্থ যদি লাঠি-সোটা দিয়ে আমাকে পিটায়? শেয়াল আশ্বাস দিয়ে বলল: পেটাবে না। তার সাহসই হবে না। ভয়ের চোটে পালাবে। আর তুমি তো একা থাকবে না। আমিও তো বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে ব্যাটাকে তাড়া দেবো। বানর শেয়ালের বুদ্ধিটা নিল। যে পথ দিয়ে লোকজন হাটে যাওয়া-আসা করে, তার পাশের বনের ভিতর একটা উঁচু গাছের মগডালে উঠে বসে রইল। তার দৃষ্টি পথের দিকে। একসময় সে দেখতে পেল, এক লোক কাঁধে কলার আস্ত কাঁদি নিয়ে হাটের দিকে যাচ্ছে। বানর শেয়ালকে ডেকে বলল: দোস্ত, তাড়াতাড়ি রাস্তার দিকে যাও। একটা লোক কলার ছড়া নিয়ে হাটের দিকে যাচ্ছে। লোকটা কলার কাঁদি কাঁধে নিয়ে মনের আনন্দে গুনগুন করতে করতে হাটের পথে যাচ্ছে। বনের পাশ দিয়ে সে যখন পথটা পাড়ি দিচ্ছিল, তখন বানর গাছ থেকে আচমকাই তার সামনে লাফিয়ে পড়ল। এরপরই মুখ বিকৃত করে ভেংচি কাটল। লোকটা ঠিক তার সামনেই বানর ও তার বিকৃত মুখের ভেংচি দেখে ভিমরি খেলো। ভয়ও পেলো। সে কলার কাঁদি রাস্তার উপর ফেলে দিয়ে উল্টো পথে গ্রামের দিকে ভোঁ দৌড় দিলো। লোকটা পালিয়ে যাওয়ার পর শেয়াল এসে উপস্থিত হলো।
বানরকে তাড়া দিয়ে বলল: ধরো, ধরো ভাই, কলার ছড়াটা বনের ভিতর নিয়ে যাই। তা না হলে পথ-চলতি মানুষজন দেখে ফেলবে। শেয়াল কলার কাঁদি ধরার ভান করলেও কিন্তু ধরল না। বানরই এসে সেটা ধরল। ছেঁচড়াতে ছেঁচড়াতে সেটা নিয়ে চলল বনের ভেতর। শেয়াল এলো পেছন পেছন। সুযোগ সুবিধা বুঝেই সে পিছন থেকে বানরের অগোচরে একটা-দুটো করে কলা খেতে লাগল। বানর টেরই পেল না। কলার কাঁদি বনের ভেতর আনার পর সেটা একটা গাছের নিচে রাখা হলো। শেয়াল বানরকে বলল: তুমি আবারও গাছের ডালে চড়ে বস। এদিক-ওদিক ভালো মতো নজরদারি করে দেখ, কেউ এদিকে আসে কি না। বানর শেয়ালের কথা মেনে আবার গাছের মগডালে উঠে বসল। সে মনোযোগ দিয়ে অনেকক্ষণ রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকল। এই বেলায় এদিককার রাস্তা দিয়ে কাউকে চলাচল করতে দেখা গেল না। বানর গাছ থেকে নেমে যাবে ভেবে একবার নিচের দিকে তাকাল। তাকিয়েই সে থমকে গেল। দেখতে পেল, গাছের নিচে শেয়াল গপগপ করে কলা খাচ্ছে। বন্ধু ভেবেও তার জন্য অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন মোটেও বোধ করছে না। বানর মনে মনে বলল: দোস্ত আমার, চালাকি করে আমাকে কেবলই খাটায়। আর নিজে একা একা মজা মারে। আচ্ছা, আমিও এবার বন্ধুকে আমার বাঁদরামি বুদ্ধি দেখিয়ে দেবো। বানর গাছ থেকে নেমে এলো চুপচাপ। দাঁড়াল শেয়ালের পাশে। গলায় আতঙ্কের ভাব তুলে বলল: দোস্ত, সর্বনাশ হয়ে গিয়েছে। কলাওয়ালা সেই লোকটা সাথে আরো কয়েকজন লোককে নিয়ে লাঠিসোটা হাতে এদিকেই আসছে। শেয়াল ভয় পেয়ে বলে উঠল: পালাও তাহলে। বানর বলল: পালাব তো বটেই। তবে এই কলার কাঁদি ওদের হাতে পড়তে দেবো না, ওদেরকে এই কলা খেতেও দেবো না। আমি কাঁদিটা নিয়ে গাছের ডগায় উঠে যাই। তাহলে কেউ কলা দেখতেও পারবে না, আমাদের কাছ থেকে ছিনিয়েও নিতে পারবে না। বানর এক মুহূর্তও আর অপেক্ষা করল না। এমনকি শেয়ালের জবাবের জন্যও না। সে কলার কাঁদি নিয়ে গাছের উঁচু ডালে চট করে উঠে গেল। সেখানে এক ডালে কলার কাঁদি ঝুলিয়ে রাখল। পাশের ডালে নিজে বসল আয়েশ করে। বানর একটা একটা করে কলা খায়। আর খোসাটা ছুঁড়ে মারে নিচে। কলার ছোলার কোনো কোনোটা এসে পড়ে শেয়ালের গায়ে। পুরো ব্যাপারটাই শেয়াল বুঝতে পারল। সে আর কী করবে! মনের দুঃখ মনেই চেপে কলার খোসা চাটে আর ঢোক গেলে। [নোয়াখালীর উপকাহিনি অবলম্বনে]

প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৫