এক সন্ধ্যায়

মোটর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছিলাম বাসার দিকে। হঠাৎ পেছনের চাকাটা কেঁপে উঠলো, সম্ভবত লিক হয়েছে। তাও পেছনের চাকা, কী মুশকিল। সন্ধ্যা ছুঁইছুঁই করছে। যেতে হবে অনেক দূরে আরেক উপজেলা সোনাইমুড়ীতে। আশপাশে দেখে নিলাম, কোথায় আছি স্থানটা নির্দিষ্ট করে নেই। চারদিকে তাকিয়ে বুঝলাম, মাইজদী বাজার থেকে একটু উত্তরে এসেছি মাত্র। এটা মাইজদী চৌমুহনী চার লেনের প্রধান সড়ক। গিয়েছিলাম মাস্টার পাড়ায় কবির ভাইয়ের সাথে দেখা করতে। তিনি মাস্টার পাড়ায় থাকেন। কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলাম, ভাই মোটরসাইকেলের লিক সারানোর দোকানটা কত দূর হবে, বলতে পারেন? কেউ বলতে পারলো না।
জানলাম, এক কিলো উত্তরে একটি গেরেজ আছে, মানে যে দিক থেকে এসেছিলাম। তাড়াতাড়ি সে দিকে যেতে হবে, না হয় যদি ওরা বন্ধ করে ফেলে? এমনিতে শুক্রবার, তাড়াতাড়ি চললাম। গিয়ে দেখি আহা! সেই গেরেজটি বন্ধ। হায়রে কপাল! এবার আরো প্রায় দুই আড়াই কিলোমিটার যেতে হবে, তারপর এখলাসপুর বাজার, বাজারে ওয়ার্কশপ পাওয়া নিশ্চিত হতে পারে। নিজেকে সান্ত্বনা দেয়ার জন্য হোন্ডা ঠেলতে ঠেলতে একটু গিয়েই জিজ্ঞাসা করি- চাকা সারানোর দোকানটা আর কত দূর!
হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম সামনে একটি মার্কেট দেখা যাচ্ছে, সামনে কয়েকটি লাইট জ্বলে আছে। হয়তো সেখানেও একটি সার্ভিসের দোকান পাওয়া যেতে পারে। এক পর্যায়ে এসে পৌঁছলাম মার্কেটের সামনে। ওমা! নেই কোনো দোকান, সব কটির শাটার বন্ধ। দাঁড়ানো আছে দু’জন। একজন বড়, আরেক জন শিশু। শিশুটির বয়স দশ এগারো হতে পারে। জিজ্ঞাসা করলাম তাদেরকেও। ছেলেটি হাসি মুখে এগিয়ে এসে আরো দূরের কয়েকটি জ্বলন্ত বাতি দেখিয়ে বললো, আঙ্কেল ঐ যে দোকানটা- ওখানে আছে। ছেলেটার কথায় বেশ মধু আছে, মুগ্ধ হলাম। আবার ঠেলে ঠেলে হাঁটতে শুরু করলে সে বললো, আমি একটু ঠেলে দেই? আমি অবাক চোখে তাকিয়ে হেসে উঠে বললাম, না বাবা লাগবে না। মনে মনে ভাবলাম এ যুগে এমন ছেলে পাওয়া যাবে? না। সে আবার বললো, না সমস্যা নেই আংকেল। আমি আবার বললাম, না আমি পারবো। দেখলাম সেও আমার যাওয়ার দিকে হেঁটে চলেছে। সাথের লোকটি তার বড় ভাই হতে পারে।
– তোমার নাম কী?
– ফাহিম।
– কোন ক্লাসে পড়ো?
– ষষ্ঠ শ্রেণি।
– কোন স্কুলে?
– জিলা স্কুলে।
এবার আগ্রহ বেড়ে গেলো, ভাবলাম, জিলা স্কুল মানেই হলো পরীক্ষা দিয়ে ভর্তি হতে হয়, ভালো স্কুল, সেরাদের স্কুল। ছেলেটা নিশ্চয়ই মেধাবী এবং ভালো পরিবারের হবে। তাই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আরো কথা বলা যেতে পারে।
– আচ্ছা সন্ধ্যার পরে তো তোমার বাসায় থাকার কথা, এখানে কী করো?
– বিকেলে খেলতে গিয়েছিলাম, দেরি হয়ে গেছে, তাই উনার সাথে বাসায় ফিরছি।
– উনি কে?
– আমার কেউ না।
– ও আচ্ছা, তুমি কতটুকু যাবে?
– ঐ বাজার পর্যন্তই। বাজারের সাথেই আমার বাসা।
এবার বুঝলাম ছেলেটা হয়তো তার সঙ্গ ত্যাগ করে আমার সাথে বাজার পর্যন্ত যেতে চাইছে। সেটা বুঝতে না দিয়ে আমার হাঁটার গতি কমিয়ে দিলাম যেন তাদের বরাবর হাঁটতে পারি। আবার প্রশ্ন করলাম,
– তুমি কি নিয়মিত খেলাধূলা করো?
– খেলার তো সময় নেই, মাঠও নেই, এখন শুধু শুক্রবারে ফুটবল খেলি।
– তোমার স্কুলে খেলতে পারো না?
– সেখানে শিফটের পর শিফট; আমরা খেলবো কখন! তবু সামান্য যে সময় পাই কখনো বল পাই না, কখনো বন্ধু পাই না। আবার মাঠ ভিজা থাকে।
– তুমি যে এখন সন্ধ্যায় বাসায় যাবে তোমার আব্বু আম্মু রাগ করবে না?
– প্রত্যেক শুক্রবার একটু লেইট হয়। আব্বু আমাকে অনুমতি দিয়েছে।
– তোমার আব্বু কী করেন?
– টিচার। শরীফপুর স্কুলের টিচার।
– ও তাইতো বলি …
– আংকেল কিছু বললেন?
– না ভাবছিলাম, তুমি আমায় সালাম দিলে, আবার আমার গাড়িটা ঠেলে দিতে চাইলে। এই আচরণ তো সবার হয় না। এখন বুঝলাম তুমিতো টিচারের ছেলে।
– আংকেল আমি ফুলকুঁড়ির সদস্য।
– আরে! কি বলো, তুমি ফুলকুঁড়ি পড়ো?
– আমি ফুলকুঁড়ির শুধু পড়ি না, এর সাথে কাজ করি। এখানে গান শেখানো হয়, আর্ট শেখানো হয়, বই পড়তে হয়, কার সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় তাও শেখানো হয়। মাঝে মাঝে ভ্রমণে নিয়ে আমাদের ক্যাম্পিং শেখানো হয়। বেশ ভালো লাগে।
– ও তাহলেতো ভালো। তুমি কি তোমার কোনো বন্ধুকে ফুলকুঁড়ির সদস্য করতে পেরেছো?
– হ্যাঁ করেছি।
এসব বলতে বলতে সামনের আরেকটা দোকান খোলা দেখা গেলো, আর সেটি চাকা মেরামতের দোকানই। একটি ছেলে, ঘরের সামনে চেয়ারে বসে আছে। জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি কি চাকার কাজটা সারিয়ে দিতে পারবে? ও বললো, জ্বি পারবো। এবার ফাহিম বললো আংকেল আপনি কাজ সারেন আমি যাই।
ছেলেটি চাকা খুলতে ব্রেকের অংশও খুলে ফেললো, তাতে বুঝলাম ছেলেটি কাজে পাকা নয়। এবার তার চেয়ারে আমি বসে পড়লাম এবং জিজ্ঞাসা করলাম-
– তুমি কত বছর এ কাজ করছো?
– ছয় বছর। এবার মনে হলো সে পারবে। কিন্তু ব্রেকসুসহ খুললো কেন? সবাই তো ব্রেক খোলে না। যাই হোক আলাপ করে দেখি। সে চাকা খুলে কাজ শুরু করে দিয়েছে।
জিজ্ঞাসা করলাম – তোমার নাম কী?
– নিচের দিকে তাকিয়ে কাজ করতে করতে বললো, মেহেদী। তার বয়স হবে ১৭ বা ১৮।
– এই কাজ কি তুমি একাই করো?
– না, এটা আমার বাবার ব্যবসা, আমি তাঁকে সহযোগিতা করি।
রাস্তার দুই ধারে বাতি জ্বলছে, মাঝে মধ্যে দুই একটা ল্যাম্পপোস্টে বাতি নেই। তবে রাস্তার ঐ পাড়ের বাতিতে বেশ আলো আছে। উপরে আকাশের দিকে তাকালাম, তাকালে কিছু দেখা যায় না, অমাবশ্যার মতো ঘুটঘুটে অন্ধকার। যেখানে কোনো বাতি নেই সেখানে হাঁটতে ভয় লাগার কথা। আহা যারা গহীন গ্রামে বাস করে তারা তো আঁধার দেখে, চাঁদের আলো দেখে, চাঁদের আলোতে গ্রাম দেখে। অদ্ভুত সময় দেখে। সন্ধ্যার নামতি সময় দেখে, সূর্যোদয়ের রহস্য ভেদাভেদ দেখে। সব মানুষ যদি আধা বছর গ্রামে থাকতো, আধা বছর শহরের চাকচিক্য দেখতো। শিশুরা কী মজা করতে পারতো, জোনাক পোকা দেখেনি কত শিশু, কত শিশু জীবনে সাঁতার কাটেনি। কত শিশু জীবনে বাঁশ বাগানের ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো দেখেনি।
এ সব কথা ভাবতে ভাবতে মেহেদী ডাক দিলো স্যার, আপনার কাজ কমপ্লিট। টাকা দিয়ে চলে এলাম।
কিন্তু দুর্ভাগ্য আমাকে ছাড়লো না, এক কিলো বা আধা কিলো যাওয়ার পর আবার পেছনের চাকাটি জোরে কেঁপে উঠলো, পেছনে তাকিয়ে দেখি আগে যেমন ছিলো এখনো তেমনই আছে। মাঝখানে আমার পকেট ফাঁকা।
এবার এখলাসপুর বাজারের সামনে পৌঁছেছি আর অসুবিধা নেই। আবার গেলাম সামনের বড় ওয়ার্কশপে। লোকটি চাকা খুললো এবং টিউব বের করে বললো-
: আগের দুটি লিক আছে, এবার নতুন টিউব লাগাতে হবে। মাথাটা ঘুরে উঠলো। জিজ্ঞাসা করলাম,
: কী হয়েছে, কোনো পেরেক পেয়েছেন?
: না, তবে যে লাগিয়েছে সে সম্ভবত স্ক্রু ডাইভার দিয়ে কাজ করেছে তাই পাশ থেকে চাপ লেগে ছিদ্র হয়েছে বুঝা যাচ্ছে। বলল মেকানিক। এরপর জিজ্ঞেস করলো-
: কী করবেন ভাই? বলেন।
: যা ভালো তাই করেন।
: সাড়ে তিনশো টাকা টিউবে লাগবে, মজুরীসহ পাঁচশো। নতুন টিউব লাগিয়ে দেবো।
: ওকে, সেরে দেন। বলে তার কাজের দিকে তাকিয়ে রইলাম।

প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৫