সবার প্রিয় শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ

0
4

গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে গেছে কালজানি নদী। বর্ষায় এই নদী অপরূপ শোভা ধারণ করে। নদীর ভরা রূপ দেখে একটি ছেলে উদাস হয়ে পড়েন। সুযোগ পেলেই যেয়ে বসেন নদীর পাড়ে। ভাবেন, কোথা থেকে আসছে এতো পানি। কে জোগান দিচ্ছে এই অফুরন্ত জলরাশি। নদীর কুলকুল শব্দ তার অবচেতন মনে সুরের ব্যঞ্জনা তোলে, জোরে যখন বৃষ্টি পড়ে তাদের টিনের চালের উপর তখন আরেক সুরের ঝমঝম শব্দ তার মনকে করে তোলে উন্মনা। বসন্তকালে খুব ভোরে কোকিল ডাকে, তখন ছেলেটি আর শুয়ে থাকতে পারে না। চলে যায় গাছতলায় কান পেতে শুনতে থাকে কোকিলের একটানা সুর। কোকিলের সাথে সেও কণ্ঠ মিলায়, ভাবে এতো সুন্দর সুর কোকিল শিখলো কোথা থেকে? দূরে ডাকে ঘুঘু পাখি। তার কণ্ঠেও মিষ্টি মধুর ছন্দ শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে পড়ে বালকটি। বৌ কথা কও, পাখির ডাক যেন আরো একটু চড়া। সে যেন উচ্চকণ্ঠে সুর তুলতেই পছন্দ করে। সে ভাবে আর ভাবে এসব পাখির গলার সুরের ব্যঞ্জনা তাকে আকুল করে তোলে। গরমের দিন আরো মজার। ঘরে আর বন্দি থাকা যায় না। রাতে কাচারী ঘরের বারান্দায় বেঞ্চ পেতে শোয়া যায়। উপরে দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ। কখনো একটা দুটো তারা দৌড় দিয়ে ছুটে পালায় অন্য প্রান্তে। তার ভাবনা সেও যদি এমনি করে ছুটে যেতে পারতেন একদেশ থেকে আরেক দেশে। রাতে মায়ের কাছে ঘুমাবার সময়ও সহজে চোখে ঘুম আসে না। মাকে বলেন, ঘুমপাড়ানির গান শোনাতে। মা আর কতক্ষণ তার কাছে বসে থাকবেন। মার তো সংসারের কতো কাজ পড়ে আছে। মা চলে গেলে কান পেতে শোনেন ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাক। তার কাছে খুব ভালো লাগে, মধুর মনে হতো, একটুও যেন ক্লান্তি নেই। সুরের কোনো ছন্দপতন নেই। মনে হয় ঝিঁ ঝিঁ গানটা রাতেরই। ঘুম পাড়ানির গান শুনতে শুনতে একসময় ঘুমিয়ে যেতেন।
বাড়িতে বড় একটি ইঁদারা তার ভেতর শব্দ করলে কেমন ধুমধুম করে উঠে। সে ইঁদারায় ঝুঁকে গলা ছেড়ে গান গায় গানের আওয়াজ অনেক বড় হয়ে সারা ইঁদারা ভরে তোলে। গানের এই ছড়িয়ে যাওয়া ধ্বনিতে নিজেই মুগ্ধ হয়ে শোনে। ছেলের প্রাণ গানের সঙ্গে বাঁধা। যা কিছু সুন্দর সবকিছুই তার প্রিয়। মাঠ, নদী, পাখির ডাক, তারার ছুটাছুটি, চাঁদের আলো সবই তার কাছে সুরে ভরা। সবই তার গানের বিষয়। যেমন ধরো বর্ষায় সবুজ ধানে মাঠ ভরে যায়। সেই মাঠে কাজ করতে করতে চাষিরা গান গায়। কতো রকম গান পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, আরো কত গান। লম্বা সুরের টানে গান শোনা মাত্রই সে ওসব গান শিখে ফেলত। তারপর একা একা ওসব গান গেয়ে বেড়ায়। স্কুলে যাওয়ার পথে একটু আড়াল হয়ে সে গলা ছেড়ে ধরে ভাওয়াইয়া গান। কী আনন্দ হয় তখন! বড় হয়ে সত্যি সত্যি এই ছেলেটি খুব নামকরা একজন গায়ক হয়েছিলেন। গানে গানে তিনি সবার মন কেড়ে নিয়েছিলেন। এই ছেলেটি কে তোমরা কি জানো? তিনি ছোট বড় সবার প্রিয় শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ। বাবা মা আব্বাস বলে ডাকতেন। আর এই শিল্পী আব্বাসউদ্দীন ছিলেন বাংলার এক সময়ে সাড়া জাগানো সুর শিল্পী। তার কণ্ঠ ছিল কোকিলের মতো সুমিষ্ট। এই বরেণ্য শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমেদের পরিচয় জানতে হলে আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে বিংশ শতাব্দীর প্রথমদিকে ১৯০১ সালে ২৭ অক্টোবর পশ্চিমবাংলার কুচবিহার জেলার তুফানগঞ্জ মহকুমার বলরামপুর গ্রামে ২৭শে অক্টোবর আব্বাসউদ্দীন আহমদ জন্মগ্রহণ করেন। আকিকা দিয়ে পিতা জাফর আলী আহমদ পুত্রের নাম রাখলেন শেখ আব্বাসউদ্দীন আহমদ। তার পিতা ছিলেন মহকুমা শহরের নামকরা একজন আইনজীবী। তিনি বিপুল সম্পতির অধিকারী ছিলেন। মা হীরামন নেছা ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। এরকম অবস্থাসম্পন্ন ঘরের ছেলে হয়েও আব্বাসউদ্দিন আরাম-আয়েশ পছন্দ করতেন না।
বরেণ্য শিল্পী আব্বাসউদ্দীন আহমদ ১৯৫৯ সালে ৩০ শে ডিসেম্বর খুব ভোরে দুনিয়ার সফর শেষ করেন।

প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫