জীবন দিয়ে অমর হলেন যারা

0
5
একুশে ফেব্রুয়ারি আমাদের ভাষা আন্দোলনের খুনে রাঙা একটি দিন। এ সম্পর্কে তোমাদেরকে কোনো প্রশ্ন করলে হয়তো বা তোমরা একুশের সেই কালজয়ী গানের ভাষায়ই জবাব দিবে-
‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো
একুশে ফেব্রুয়ারি
আমি কি ভুলিতে পারি’
হ্যাঁ, সত্যিই তাই। রক্তে রাঙা এই মহান দিনকে আমরা কি ভুলতে পারি? মোটেও না। কারণ ভাষা নিয়ে দেশে দেশে, জাতিতে জাতিতে লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যে পিচঢালা রাজপথে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দেয়ার এমন কোনো ঘটনা আর কোনো জাতির ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া যাবে না।
মহান ভাষা দিবস প্রতিবার আমাদের কাছে ফিরে আসে। এবারও ফিরে এসেছে প্রতিবারের মতো। ফলে এ দিন আমাদের গৌরবের দিন, প্রেরণার রক্তলাল মশাল। এদিন আমরা নতুন করে শপথ নিই সুন্দর হবার, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার জন্যে। দেশকে, দেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবাসার জন্যে। তাইতো দেখে নাও ছড়া কী বলে-
‘ভাষায় মরে ভাষায় বাঁচে
ভাষায় আগুন জ্বলে
মানব জাতির ইতিহাসে
ভাষায় কথা বলে।’
একুশে ফেব্রুয়ারি তাই আমাদের কাছে শুধু একটি তারিখ নয়। এ দিনের সাথে জড়িয়ে আছে ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সুদীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস। ভাষা শহিদদের রক্তে সিক্ত একুশে ধারণ আছে সে ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের সাথে আমাদের আবেগ-অনুভূতি প্রবলভাবে জড়িয়ে আছে। এই আবেগের উত্তাপে ও উচ্ছ্বাসে যেন এ ঐতিহাসিক আন্দোলনের প্রকৃত ঘটনা এবং তথ্য হারিয়ে না যায় সে জন্য আমাদের সচেতন হওয়া উচিত। সত্য নিষ্ঠ ইতিহাসের আলোকে ভাষা আন্দোলনের ঘটনা প্রবাহকে সুবিন্যস্ত করা আজ জরুরি হয়ে পড়েছে। তোমরা যারা ছোট তাদেরকে ভাষা আন্দোলনের সঠিক ইতিহাস জানানো আমাদেরই কর্তব্য। কিন্তু কে দেবে সত্য ইতিহাস?
ভাষা সৈনিকরা তো একে একে  বিদায় নিচ্ছে। তাই ভাষা শহিদদের পরিচয় অল্প কথায় তোমাদের জানার জন্য তুলে ধরছি।
রফিক
ভাষা আন্দোলনের অমর শহিদ রফিক। পুরো নাম রফিক উদ্দিন, বাবা আবদুল লতিফ, মা রাজিয়া খাতুন। জন্মগ্রহণ করেন মানিকগঞ্জ জেলার সিঙ্গাইর থানার পারিল বলধারায় ১৯২৬-এর ৩০ অক্টোবর। কলকাতায় মিত্র ইনস্টিটিউশনে কয়েক বছর পড়ার পর ১৯৪৭-এ দেশ ভাগের পর বাবার সাথে ঢাকায় চলে আসেন এবং মানিকগঞ্জের বায়রী স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মানিকগঞ্জের সরকারি দেবেন্দ্র কলেজে ১ম ও ২য় বর্ষ লেখাপড়া করেন। ১৯৫২ সালে ২১শে ফেব্রুয়ারি তিনি ঢাকা জগন্নাথ কলেজের ছাত্র ছিলেন। তার নিজ গ্রামের মেয়ে পানু বিবির সঙ্গে তাঁর বিয়ে ঠিক হয়েছিল। বিয়ের তারিখ ঠিক করার জন্য তাঁর বাবা ’৫২-এর ফেব্রুয়ারির প্রথম সপ্তাহে ঢাকা থেকে গ্রামে যান। কিন্তু বিয়ে আর করা হয়নি। মাত্র ২৬ বছর বয়সে রফিক ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহিদ হন।
বরকত
ভাষা আন্দোলনের অমর শহিদ বরকত। পুরো নাম আব্দুল বরকত। পিতার নাম শামছুদ্দোহা। মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর থানার বাবলা গ্রামে ১৬ জুন ১৯২৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় তালিবপুর হাইস্কুল থেকে ১৯৪৫ সালে মেট্রিক এবং বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন; ১৯৪৮-এ তিনি পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। ১৯৪৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। ১৯৫১ সালে অনার্স পরীক্ষায় দ্বিতীয় শ্রেণীতে চতুর্থ স্থান পান। ২১শে ফেব্রুয়ারি আমতলার সভায় যোগ দিয়ে গুলিবিদ্ধ হন এবং ঐদিন রাত ১০টায় লাশ কড়া পাহারায় হাসপাতাল থেকে আজিমপুর কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
জব্বার
শহিদ জব্বারের পুরো নাম আব্দুল জব্বার। তিনি গফরগাঁয়ে পাঁচুয়া গ্রাম নিবাসী মো. হাছেন আলীর ছেলে। পেশায় দর্জি ছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই তিনি শহিদ হন।
সালাম
ভাষা আন্দোলনের অমর শহিদ সালাম। পুরো নাম আব্দুস সালাম। তিনি তৎকালীন নোয়াখালী জেলার ফেনী মহকুমার লক্ষণপুর গ্রামের মোহাম্মদ ফাজিল মিয়ার পুত্র। তিনি ঢাকা সেক্রেটারিয়েটের একজন পিয়ন ছিলেন। ২১শে ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণে আহত হয়ে ৭ এপ্রিল ১৯৫২ তারিখে শহিদ হন। সালামের মৃতদেহ কী করা হয়েছিল সে সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায়নি।
শফিউর
ভাষা আন্দোলনের অমর শহীদ শফিউর, পুরো নাম শফিউর রহমান, পিতা মাহবুবুর রহমান। পশ্চিম বঙ্গের হুগলী জেলার কেন্না গ্রামে ১৯১৮ সালের ২৪শে জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি কলকাতা কমার্শিয়াল কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। ১৯৪৭-এর দেশ ভাগের পর সদ্য বিবাহিত স্ত্রী আকিলা বেগমসহ পূর্ব বাংলায় চলে আসেন। তিনি ঢাকা হাইকোর্টের কর্মচারী ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২২শে ফেব্রুয়ারি তিনি শহিদ হন। তিনি ছিলেন এক শিশুকন্যার পিতা। শফিউর রহমানের শাহাদাতের তিন মাস পরে তাঁর পুত্র সন্তানের জন্ম হয়।
[তথ্য: বাংলা একাডেমির স্মারক গ্রন্থ।]
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬