ব্রহ্মপুত্র নদের ধারে তখন ভোরের কুয়াশা। শেষ রাতের আঁধার কাটেনি। দূরে জলাভূমির ওপর ভেসে উঠছে বোকাই নগরের দুর্গ। সেই দুর্গের উঁচু প্রাচীরের ওপর দাঁড়িয়ে আছেন বাংলার এক অদম্য বীর- খাজা ওসমান। চিন্তামগ্ন বিষণ্ন মুখ। পায়চারি করছেন অস্থিরভাবে। তার হাতে চাঁদির ডাণ্ডায় গুটানো নীল রেশমের খত, মোগল সম্রাটের শাহী ফরমান। এটি কেড়ে নিয়েছে তার ঘুম আর স্বস্তি।
“আমি তো কারও শান্তি কেড়ে নিতে চাই না,” নিজেই নিজেকে বলেন, “তারা কেন বারবার আমাকে আক্রমণ করতে আসে? খাজা ওসমানের মনে ফুঁসে ওঠে দুর্জয় ক্রোধ- চিঠিতে তার দেশের স্বাধীনতা বাঁচানোর যুদ্ধকে তুচ্ছ করা হয়েছে! ‘অহমিকা ও গোঁর্তুমী’ তো তোমরা করছো! বিনা কারণে আমার দেশের স্বাধীনতা কেড়ে নিতে চাইছো’!
রাগে তাঁর হাত কাঁপতে লাগল। ইচ্ছে করল চিঠিটা টুকরো টুকরো করে ছুঁড়ে ফেলে দেয়। কিন্তু বিচক্ষণতার সাথে নিজেকে সামলে নিলেন। শাহী দূতকে অপমান করা বোকামি। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজন কৌশল। তাই বাংলা অঞ্চলের বারো ভূঁইয়াদের শেষ সুলতান-ই-আলা খাজা ওসমান মুখে নয়, লিখিত জবাব দেয়ার কথা ভাবেন। সুবাদার ইসলাম খাঁ তার বিরুদ্ধে অভিযান করছেন বারবার, নিঃশেষ করে দিতে চান তিনি বাংলার স্বাধীনতাকে। আত্মসমর্পনের আহবান জানিয়েছেন। বাংলার বুনো হাতির মতোই স্বাধীনচেতা খাজা ওসমান, আল্লাহ ছাড়া আর কারো কাছে যে শির নিচু করে না! তাই মোগল সেনাপতির কাছ থেকে আত্মসমর্পণের চিঠি পেয়ে অপমানে গর্জে ওঠেন!
তিনি ডাক দিলেন-
-‘শর ই দওয়াতদার’! দোয়াতদারের প্রধানকে ডেকে আনো। একজন ‘দবীর-এ-খাস’ চাই। আজই জবাব লেখা হবে।’
পরদিনই ওসমানের লেখা চিঠি মোগল শিবিরে পৌঁছাল। সেখানে লেখা ছিল-
“আমি আল্লাহর ফয়সালার ওপর নিজেকে সঁপে দিয়েছি। আমাকে যদি এই শান্ত কোণে থাকতে দেওয়া হয়, খুব ভালো। আর যদি আমাকে সৈন্য চালনায় বাধ্য করে যুদ্ধের স্বাদ গ্রহণ করতে চান, যদি আপনাদের নিজ রাজ্য নিয়ে সন্তুষ্ট না থেকে আমার এই নিভৃত কোণটি ছিনিয়ে নিতে চান এবং যুদ্ধ বাঁধান, তাহলে দু’টি মাত্র পথ খোলা থাকবে। ভাগ্য আপনাদের সহায় হলে আপনারা জয়ী হবেন, অপর পক্ষে সৌভাগ্য যদি আমাকে অনুগ্রহ করেন তাহলে দেখব তা আমায় কোথায় নিয়ে যায়”!
এই চিঠি পড়েই মোগল সেনাপতিরা বুঝে গেল, এই মানুষটি সহজে মাথা নোয়াবার নয়।
বারো ভূঁইয়াদের নেতা ঈশা খাঁ’র মৃত্যুর পর বাংলার স্বাধীন শাসকরা দুর্বল হয়ে পড়ে। বাকিদের মধ্যে প্রায় সবাই মোগলদের সঙ্গে যোগ দিতে বাধ্য হয়। একমাত্র বাংলার শেষ পাঠান বীর খাজা ওসমান কিছুতেই মাথা নত করতে চায় না। জীবন দিয়ে লড়বে তবুও কারো কাছে শির নিচু করতে রাজি নয়।
ভারতের তখতে তখন মোগল সম্রাট মহামতি আকবর, বিশ্বজোড়া যার নাম-ডাক। মোগলদের তাকদ আর হিম্মতের কথা সবাই জানে। কিন্তু বাংলার স্বাধীনতাপ্রিয় ওসমান তাতে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ায় না। আল্লাহ্ ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না ওসমান।
সে সময়ের বাংলা ছিল জলাভূমির দেশ, শস্য-শ্যামল দেশ। ভারত উপমহাদেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ অঞ্চল। বাংলার মানুষেরা ছিল অদম্য সাহসী তেমনি সাহসী তাদের লড়াকু হাতির দল। মেসিডনের আলেকজান্ডার খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে সিন্ধু নদী পার হয়ে ভারতে আসেন। আশেপাশের রাজা ও প্রধানদের কাছে সন্ধির দূত পাঠান। ঝিলাম-রাজ পুরুর সাথে প্রচণ্ড যুদ্ধের সময় বাংলার হাতির তাণ্ডবের কথা শোনেন। হাতির ভয়ে তার সৈন্যরা কিছুতেই বাংলায় আসতে রাজি নয়। আলেকজান্ডার তাই এদিকে না এসে ঝিলাম থেকেই ব্যাবিলনে ফিরে যান! দিল্লীসহ সারা ভারতে খুব কদর ছিল বাংলার হাতির। প্রতি বছর যুদ্ধের ট্রেনিং-প্রাপ্ত প্রচুর হাতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রফতানি করা হতো।
খাজা ওসমান ছিলেন সেই হাতিগুলোর শ্রেষ্ঠ প্রশিক্ষক। তাঁর হাতিগুলো শুধু শক্তিশালী নয়- ছিল বুদ্ধিমানও। ওসমানের ‘শের ময়দান’, ‘বাজ’, ‘বাখতা’ হাতির নাম শুনলেই শত্রু শিবিরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ত। এরা অসম্ভব আঘাত সহ্য করতে পারে। সৈন্যদের তরবারি কেড়ে দু’ভাগ করে ফেলে। অন্য হাতি-ঘোড়ার ইস্পাতের আচ্ছাদন ‘পাখারে’ দাঁত ঢুকিয়ে শরীরে সৃষ্টি করে গভীর ক্ষত। ওসমানের সবচেয়ে সুনাম ছিল যোদ্ধা হাতির প্রশিক্ষক হিসেবে। বনের ভেতর বিশাল বিশাল ‘খেদা’ তৈরি করে হাতি পোষা হতো।
খাজা ওসমান ছিলেন বাংলার বারো ভূঁইয়াদের শেষ প্রতিনিধি। শত্রুর তাড়া খেয়ে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুটে বেড়িয়েছেন। বাংলার স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখতে যুদ্ধ করেছেন একের পর এক। শেষবার সিলেটের বোকাই নগরে আসেন। কেল্লাতাজপুর, মাতঙ্গ, তরফ ও উহারে বসতি স্থাপন করেন এবং উহারকে রাজধানী বানিয়ে নগরী-রূপে সাজান। গড়ে তোলেন প্রাসাদ ও দুর্গ। উহার থেকে দুই মঞ্জিল দূরে চুয়াল্লিশ পরগনার দৌলম্বপুরকে বেছে নেন যুদ্ধের জন্য।
মোগল বাহিনী এবার বিশাল শক্তি নিয়ে আসছে- অশ্বারোহী, পদাতিক, নৌবহর আর মত্ত হাতি। অসংখ্য সেনাপতিদের অধীনে প্রচুর সেনা। ব্রহ্মপুত্র নদীতে তখন প্রবল বন্যা। ওসমান বুদ্ধি করে জলাভূমির তীরেই বানালেন যুদ্ধ-শিবির এবং দুর্গ। সুপারী গাছ কেটে তৈরি হলো উঁচু মাচা। তার ওপর বসানো হলো বিশাল বিশাল কামান। চারদিকে পরিখা, জল আর কাদার ফাঁদ। মোগলরা জলাভূমি পার হয়ে এগিয়ে আসতে সময় নেবে। বিভিন্ন নামের কামান সাজাতে সাজাতে এক প্রহরী চিৎকার করে উঠল-
-“এবার শত্রুদের আর ফিরে যেতে দেওয়া হবে না!”
আরেকজন বলে উঠল- “বাজ আর বখতার পায়ের নিচে ওরা পিষ্ট হবে!”
দু’পক্ষ যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। ভোর হতেই রণ-দামামা বেজে উঠল। মোগল শিবিরের সৈন্যরা মার্চ করে এগিয়ে এলো আগে। ঘোড়ার খুরের আওয়াজে বোকাই নগরের মাটি প্রকম্পিত! আকাশ-বাতাস কেঁপে উঠল যোদ্ধা-হাতির ভয়ানক গর্জনে। দু’পক্ষেই শুরু হলো তুমুল লড়াই। খাজা ওসমানের প্রশিক্ষিত হাতির দাপটে মোগল বাহিনীর বিপর্যস্ত অবস্থা। সৈন্যদের তরবারি চমকাচ্ছে বিদ্যুতের মতো। আজই তাদের শেষ ফয়সালার দিন! জয় না পেলে মাথা নত করে থাকতে হবে মোগলদের কাছেই!
‘শের ময়দান’, ‘বাজ’, ‘বাখতা’, ‘সিংহলী’ ‘দাস্তা’ ইত্যাদি নামের পাহাড়ের মতো বিশাল হাতির দল যুদ্ধক্ষেত্রে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এরা অসম্ভব আঘাত সহ্য করতে পারে। শত্রুর তরবারি কেড়ে দু’টুকরো করে বা বাঁকিয়ে ফেলে। ঘোড়ার ইস্পাতের ‘পাখারে’ দাঁত ঢুকিয়ে ঘোড়ার শরীর জখম করা তাদের প্রিয় কাজ!
এক সময় ‘বাখতা’ প্রধান মোগল সেনাপতি মির্জা নাথানকে শুঁড়ে তুলে দূরে ছুঁড়ে মারে, মির্জা অজ্ঞান হয়ে যান। অন্য সেনাপতি শাজাত খাঁকেও কাবু করে ফেলে এবং সেনাপতি ইফতিখার খাঁ মৃত্যুবরণ করেন। আফগান সৈন্যরা মির্জা নাথানের হাতি ‘বালসুন্দর’ এর পা কেটে দেয়। খাজা ওসমানের একটি হাতি মোগলদের দশটি হাতির সমান হওয়ায় যুদ্ধে প্রচুর লোকবল থাকলেও তারা টিকতে পারছিল না। মত্ত হাতিদের ভীষণ হুংকারে যুদ্ধক্ষেত্র টালমাটাল। মোগল শিবিরের মনোবল ভেঙে পড়ে। দু’পক্ষেই হতাহত প্রচুর, মোগল বাহিনীরই ক্ষতি হয় বেশি।
খাজা ওসমানের কৌশল ছিল অসাধারণ। তিনি শাহী ফৌজদেরকে বিভ্রান্ত করার জন্য তার সেনাবাহিনী ও হাতিদের সমস্ত পতাকা মোগলশাহী পতাকার হুবহু একই রঙে তৈরি করেন। এতে যুদ্ধের মাঝখানে মোগল সৈন্যরা বুঝতে পারছিল না- কে শত্রু, আর কে নিজের লোক! সামনা সামনি ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে।
‘বখতা’ শুঁড় তুলে একের পর এক আহত করতে লাগল। ‘শের ময়দান’ ছুটে গিয়ে শত্রুর ঘোড়ার বর্ম ভেঙে দিল। যুদ্ধক্ষেত্র কেঁপে উঠল। পিছিয়ে পড়তে লাগল মোগল বাহিনী ।
ঠিক তখনই এক অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটল। এসময় ইফতিখার খাঁর এক ভৃত্য জলিল দূর থেকে ওসমানকে লক্ষ করে তীর ছোঁড়ে। সাঁই সাঁই করে সেই তীর ওসমানের চোখে বিদ্ধ হয়। তীব্র যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে খাজা ওসমান। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিরবে রুমালে চোখ চেপে সবার কাছ থেকে আড়াল করেন। তীব্র যন্ত্রণায় কলিজা ছিঁড়ে গেলেও যুদ্ধ থামায়নি। বসে থাকে ঘোড়ার পিঠে। খবর পেয়ে তাঁর পুত্র এসে চুপিচুপি পিতাকে সরিয়ে নিল। যুদ্ধ চলতেই থাকল, যেন কিছুই ঘটেনি। যুদ্ধের ময়দানেই ওসমানের শেষ নিঃশ্বাস পড়ে।
দুপুরের পর হাতাহাতির যুদ্ধ একসময় শেষ হয়। তবে সারা রাত ধরেই দু’পক্ষের মুষলধারে গোলাগুলি নিক্ষেপ চলে। মোগল শিবিরে তখনো ওসমানের খবর প্রকাশ পায়নি। জয়-পরাজয় নির্ধারণ করা যায়নি।
গভীর রাতে খাজা ওসমানের ছেলে ও ভাইয়েরা লাশ ও যুদ্ধের সরঞ্জামসহ সিলেটের উহারে পালিয়ে যায়। তারা বীর ওসমানকে দাফন করার ব্যবস্থা করে। দু’টি পাহাড়ের মধ্যবর্তী চিহ্নহীন কোনো স্থানে কবর দেয়, যাতে কেউ কোনোদিন খুঁজে না পায়। স্বাধীনতা সংগ্রামী বীর ওসমান চলে যান চির নিদ্রায়। পরদিন মোগল শিবিরে খবর পৌঁছাল, খাজা ওসমান আর নেই। ওসমানের মৃত্যুর খবরে মোগল শিবির স্বস্তি অনুভব করে। শত্রুরাও নীরব হয়ে যায়। কারণ তারা জানত…
এমন সাহসী বীর খুব কমই জন্মায়। মরে গিয়েও খাজা ওসমান হেরে যাননি। মির্জা নাথান তাঁর বিখ্যাত ইতিহাস ‘বাহারিস্তান-ই-গায়বী’তে খাজা ওসমানের বীরত্ব ও তার হাতিদের কলা-কৌশলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।
খাজা ওসমান বাংলার স্বাধীনতার জন্য লড়াই করে শহিদ হয়েছিলেন। দেশের মানুষ তাঁকে দিয়েছেন মহান বীরের সম্মান ও মর্যাদা। আজও বাংলার নদী ও জলাভূমির ফিসফিসে বাতাসে যেন শোনা যায় হাতির গর্জন আর এক বীরের অদম্য কণ্ঠ-
“মাথা নত নয়- জীবন দিয়ে হলেও স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টা করতে হবে!”
এপ্রিল ২০২৬



