শীতের ছুটিতে ছোট্ট তায়িম এসেছে গ্রামের বাড়ি। চট্টগ্রামের এক নামকরা স্কুলে পড়ে সে। নামকরা স্কুলে পড়লেও গ্রামের মাটির ঘ্রাণ, পাখির ডাক আর খোলা মাঠ তার কাছে নতুন এক অভিজ্ঞতা। শহরের কোলাহল পেরিয়ে যেন সে এক নতুন জগতে পা রেখেছে।
কিন্তু এই শান্ত পরিবেশেও অপেক্ষা করছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ- সাইকেল চালানো শেখা।
শহরে তায়িম কখনোই সাইকেল চালায়নি। প্রতিদিন বিকেলে গ্রামের ছেলেরা মাঠে ঝড় তুলে সাইকেল চালায়, আর তায়িম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শুধু দেখে। এক বিকেলে দাদু হুমায়ূন সাহেব তাকে একটা লাল সাইকেল দিয়ে বললেন-
‘দাদাভাই, এই ছুটিতে সাইকেলটা শিখেই ফেলো। শহরে তো কাজে লাগবেই!’
তায়িম খুশিতে লাফিয়ে ওঠে। কিন্তু খুশি বেশিক্ষণ টিকল না। প্রথম দিন মাঠে গিয়েই বারবার পড়ে যেতে থাকলো সে। খসখসে ধুলা আর এবড়ো-থেবড়ো মাটিতে ভারসাম্য রাখা বেশ কঠিন হয়ে পড়ে। আশেপাশের ছেলেরা, এমনকি তার চাচাতো ভাই শাওন পর্যন্ত হেসে উঠল-
‘আহারে শহরের ছেলে! ধুলা দেখেই তো থরথর করে কাঁপে!’
তায়িম কিছু বলল না। তবে চোখে অশ্রু চলে এল তার।
কিন্তু হঠাৎ পেছনে হাত রাখলেন দাদু। ধুলোমাখা জামাটা ঝেড়ে দিয়ে বললেন, ‘চল দাদাভাই, একটু ধুয়ে নিই। পড়ে যাওয়া শেখারই অংশ।’
তারা বাড়ির পথে হাঁটল। বাড়িতে ঢুকতেই মারুফ, সাজিদ আর অন্যরা হাসাহাসি করছিল। দাদু এবার থামিয়ে দিলেন তাদের।
‘শোনো, একটা জিনিস কেউ একদিনে শেখে না। তায়িম শহরের ছেলে, ওর জন্য এই মাটি নতুন, এই মাঠ নতুন। ও সাইকেল চালাতে পারছে না বলে হাসা ঠিক নয়। বরং ভাবো, তোমরা যদি হঠাৎ শহরের ব্যস্ত রাস্তায় গিয়ে জেব্রা ক্রসিং পার হতে চাও, পারতে? ভয় পেতে না?’
সবাই একদম চুপ হয়ে গেল, ঘরে পিনপতন নীরবতা নেমে এলো।
দাদু এবার একটু গম্ভীর স্বরে বলেন-
‘সাইকেল চালানো শেখা মানে শুধু ব্যালেন্স নয়- এটা ধৈর্য শেখা, চেষ্টা করতে শেখা। জীবনে যেমন সতর্ক না থাকলে মানুষ পথ হারায়, তেমনি সাইকেলেও ভারসাম্য না থাকলে পড়ে যেতে হয়।’
তিনি একটু থেমে তার স্বভাবজাত গম্ভীর স্বরে পবিত্র কোরআন থেকে তেলাওয়াত করলেন—
‘হে ঈমানদাররা, আল্লাহকে ভয় করো। আর প্রত্যেকেই যেন লক্ষ রাখে, সে আগামীকালের জন্য কী প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। আল্লাহকে ভয় করতে থাক।
এরপর দাদু বললেন,
‘এই আয়াতে আল্লাহ্ তা’য়ালা তাকওয়ার কথা বলেছেন।’
শাওন প্রশ্ন করল, ‘দাদু, তাকওয়া মানে কী?’
দাদু মুচকি হেসে বললেন,
‘যখন তুমি একা থেকেও ভুল কাজ থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখো, যখন তুমি সত্যের পথে হাঁটতে সাহস পাও- সেটাই তাকওয়া। এটা সাইকেল শেখার মতোই, ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত হয়।’
সবাই চুপ করে শুনছিল। কারো মুখে আর হাসি নেই, বরং ভাবনার রেখা।
তায়িম এবার জানালার দিকে তাকিয়ে একটা হালকা হাসি দিল। সে জানে, কাল সে আবার মাঠে যাবে। হয়তো আবার পড়বে, কিন্তু এবার আর ভয় পাবে না।
প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৬



