শহীদ আনাসের চিঠি

0
0

সে এক রাজকুমার। তার মুখ ছিলো ভোরের সূর্যের মতো। অঙ্গ ছিলো কাঁচা সোনায় মাখা হলুদ বর্ণ। ঠোঁটে ছিলো ডালিম ফুলের হাসি। নাকটি যেন টিকল বাঁশি। যে-ই দেখতো, কাছে টেনে একবার আদর না করে যেতে পারতেন না। তাকে দেখলে সবার মন ভরে যেতো। এ যেনো এক পূর্ণিমার চাঁদকুমার। জোসনা রাতে আদুল গায়ে তাকে দেখে মনে হতো আকাশের চূড়ায় যেনো চাঁদ হয়ে কুটিকুটি হাসছে। হেমন্তের ভোরে ঘুম থেকে জাগলে মনে হতো এই বুঝি ভুবন আলো করে ফুটলো এক রক্ত লাল তরুণ অরুণ। মায়ের চোখের মণি। আঁচলের ধন শহীদ আনাস যেনো সেই রাজকুমার। মা কখনো তাকে রোদে নামতে দিতেন না। যদি তার গায়ে দাবা লাগে। মা ছায়ায় ছায়ায় রাখতো তাকে। দুধ থেকে ননি তুলে খাওয়াতেন। মাঠে খেলতে গেলে আঁই ঢাই করে মায়ের মন। দুরু দুরু করে মায়ের বুক। তার মন ঘরে বসে থাকতে চায় না। তার কালো ডাগর ডাগর চোখে ভাসে তামাম দুনিয়ার ছবি। তার দুই চোখের মণিতে জ্বল জ্বল নাচে সাত সাগরের নীল নীল ঢেউ। তাকে কোলের কাছে নিয়ে ঘুমায় মা। তার পিঠে হাত রেখে ঘুমায় মা। কিন্তু আনাসের চোখ জেগে থাকে অনিমিখ। যেনো নিশুথি রাতে ঝিরিঝিরি বাতাস আসে সাগরের বুক থেকে। সেই বাতাসে মাটির সোঁদা সোঁদা গন্ধ। চোখে কত অজানা দেশের স্বপ্ন দেখে ছোট্ট আনাস। রাতে কেবল তারারা জাগে তার সাথে। দুস্তর এক নীল সাগর যেনো আকাশটা। আকাশের সেই সাগরে ডিঙার বহর খুলে, সাদা পাল উড়িয়ে ভেসে বেড়ায়। মিটি মিটি বাতি জ্বলে ডিঙার মাস্তুলে। সেই মাস্তুলে বসে ওরা হাসে কুটিকুটি আর মন পবনের গান গায় মনের সুখে। ভাবতে ভাবতে এক সময় মনের অজান্তে বলে ওঠে, মাঝি বৈঠা ধরে রাখো শক্ত হাতে। ঠিক মতো চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে ডিঙা। আনাসের এসব কাল্পনিক কাণ্ড দেখে দুরু দুরু করে মায়ের প্রাণ। মা বার বার বলছেন ঘুমাও না কেনো? আনাসের চোখে তো ঘুম নেই। তার চোখে ভাসে বক্তৃতা, মিছিল, মিটিং আরও কত কী। সে অপেক্ষায় আছে বন্ধুদের। বন্ধুরা তাকে ডাকবে, চলো আনাস মিছিলে চলো। সেই অপেক্ষায় আছে আনাস। যাওয়ার আগে মা বাবাকে বলা যাবে না। তা হলে তো যেতেই দেবে না। মা ঘুমিয়ে গেলে সে কাগজ কলম হাতে নেবে। একটা চিঠি লিখে টেবিলে রেখে বন্ধুদের সাথে বেরিয়ে যাবে। মিছিলে যাবে। যে মিছিল মুক্তির মিছিল। যে মিছিল স্বাধীনতার মিছিল।
গভীর রাত। মা ঘুমিয়ে পড়েছে। আনাস কাগজ কলম হাতে নিলো। লিখতে শুরু করলো মায়ের কাছে চিঠি।

০৫/০৮/২০২৪
মা, আমি মিছিলে যাচ্ছি। আমি নিজেকে আর আটকিয়ে রাখতে পারলাম না। সরি আব্বুজান, তোমার কথা অমান্য করে বের হলাম। স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে থাকতে পারলাম না। আমাদের ভাইয়েরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কাফনের কাপড় মাথায় বেঁধে রাজপথে নেমে সংগ্রাম করছে। অকাতরে নিজেদের জীবন বিসর্জন দিচ্ছে। একটি প্রতিবন্ধী ৭ বছরের বাচ্চা ল্যাংরা মানুষ যদি সংগ্রামে নামতে পারে তাহলে আমি কেনো বসে থাকবো ঘরে। একদিন তো মরতে হবেই। তাই মৃত্যুর ভয় করে স্বার্থপরের মতো ঘরে বসে না থেকে সংগ্রামে নেমে গুলি খেয়ে বীরের মতো মৃত্যুই অধিক শ্রেষ্ঠ। যে অন্যের জন্য নিজের জীবনকে বিলিয়ে দেয় সেই প্রকৃত মানুষ। আমি যদি বেঁচে না ফিরি তবে কষ্ট না পেয়ে গর্বিত হয়ো। জীবনের প্রতিটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাই।
ইতি
আনাস

সকাল হয়ে আসছে। আনাস চিঠিটা টেবিলে রেখে আস্তে করে দরজা খুলে বাইরে আসলো। বন্ধুরা তার জন্য অপেক্ষা করছে। সবার সাথে এক হয়ে বড় রাস্তার দিকে যেতে লাগলো। ততক্ষণে মিছিল শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে মিছিল আর মিছিল। আনাসও সেই মিছিলে যোগ দিলো। গলা ফাটিয়ে বলতে লাগলো, পতন হোক পতন হোক স্বৈরাচার, স্বৈরাচার। অমনি ঠাস ঠাস গুলির শব্দ। একটি গুলি এসে লাগলো আনাসের বুকে। শহীদ হলো আনাস। আনাসের রক্তাক্ত লাশ মাটিতে পড়ে রইলো। আনাসের রক্তে রঞ্জিত হলো বড় রাস্তার পিচঢালা রাজপথ।
মা অপেক্ষা করছে। কখন আনাস ফিরবে মিছিল থেকে। একটু পরপর জানালার ফাঁক দিয়ে বড় রাস্তার দিকে তাকায়। আনাসের পথের দিকে তাকিয়ে থাকে। সকাল গড়িয়ে দুপুর হয়ে গেছে। আনাসের বাসায় ফেরার খবর নেই। চার দিকে বিজয় মিছিল। বন্ধুরা ফিরে এসেছে কিন্তু আনাস নেই। বাবা বুঝতে পেরে কিছুটা চমকিত। শক্ত করে ধরলেন মায়ের হাত। বাবার হাত প্রচণ্ড কাঁপছে। মা’র শরীরও কাঁপছে। বাবা হাত বাড়িয়ে বন্ধুদের নিয়ে আসা আনাসের রক্তমাখা জামাকাপড় মায়ের হাতে তুলে দিলেন। এই জামা শহীদ আনাসের রক্ত মাখা জামা। মা’র বুঝতে আর দেরি হলো না। নিশ্চয় কোথাও কোনো ওলট পালট হয়ে গেছে।

প্রকাশকাল: জুলাই ২০২৬