দানবীর নবাব সলিমুল্লাহ

0
0

ঢাকা শহর কবে গড়ে ওঠে, আগে এ শহরের নাম কী ছিলো এ নিয়ে যথেষ্ট মতভেদ রয়েছে। তবে সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে ঢাকা শহরের উন্নতি হয়। তিনি নবাব ইসলাম খানকে বাংলার সুবাদার করে পাঠান। ইসলাম খান ১৬০৮ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকায় আসেন। তিনি এসে এই শহরের নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর।
জানা যায়, ইসলাম খানের আগেও এখানে একটি শহর ছিলো। সেই শহরের নাম ছিলো ঢাকা। যা মোগল আমলে, দলিলপত্রে পাওয়া যায়। তাছাড়া ভারতের বীরভূমে এক সময় একটি মসজিদ গড়ে উঠেছিল, এই মসজিদের শিলালিপিতে লেখা আছে “কসবায় ঢাকা খাস”- এ থেকেও বুঝা যায় শহরের নাম ছিলো ঢাকা। এই ঢাকা নাম কেন হয়েছিলো তা সঠিকভাবে বলা যায় না। এ নিয়ে অনেক কল্পকাহিনীও রয়েছে। তোমরা বড় হলে এসব বিষয়ে জানতে পারবে।
তখন এখানে যে নগরটি গড়ে ওঠে তা ছিলো বিরাট। তখন এই শহরের পূর্ব-সীমানা ছিলো সূত্রাপুর, পশ্চিম সীমানা নওয়াবগঞ্জ এবং উত্তর-পশ্চিমে সীমানা ছিলো মিরপুর। দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার উত্তর তীর থেকে শুরু করে উত্তরদিকে সুদূর টঙ্গী পর্যন্ত প্রায় সব এলাকা ছিলো এই শহরের অধীনে।
এক সময় এই ঢাকা শহরের অবনতি হতে থাকে। লোকসংখ্যা কমে গিয়ে মাত্র ৬০ হাজারে দাঁড়ায়। ব্রিটিশ শাসন আমলেও এ শহরের তেমন কোনো উন্নতি ঘটেনি। তখন ঢাকা শহরের একজন নায়েব-ই-নাজিম রাখার ব্যবস্থা থাকে। কিন্তু নবাব নামে পরিচিত সেই নায়েব-ই-নাজিমের হাতে কোনো ক্ষমতাই ছিলো না। ফলে তিনিও তেমন উন্নতি করতে পারেননি। বুড়িগঙ্গার পাড় থেকে শুরু করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ পুরো এলাকা নিয়ে একটি মৌজা ছিলো। তখন এই মৌজার প্রধান ব্যক্তি ছিলেন সুজাত খান রুস্তমে জামান। তিনি ছিলেন সম্রাট আকবরের পীর সেলিম চিশতির নাতি ইসলাম খান চিশতির সেনাপতি। তাঁর নাম অনুসারেই এই মৌজার নামকরণ করা হয় সুজাতপুর।

ঢাকার নবাবদের কথা তোমরা নিশ্চয়ই শুনেছ। এই নবাব পরিবারের একজন সুপুরুষের কথা বলার জন্যই তোমাদেরকে পুরনো ইতিহাসের দিকে নিয়ে গেলাম। যার গুরুত্বপূর্ণ অবদানে এদেশের প্রধান বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছে। প্রতিষ্ঠা হয়েছে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ অসংখ্য এতিমখানা। এই সুজাতপুরেই ১৮৬৬ সালে জন্ম হয় স্বনামধন্য এই মানুষটির। তাহলে কে এই মানুষটি? তিনি হলেন নবাব স্যার সলিমুল্লাহ। আর এই নবাবের নাম অনুসারে পরবর্তীতে সুজাতপুরের নাম হয় সলিমাবাদ। এই পুরো এলাকার মালিক ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর পিতা খাজা আহসান উল্লাহ। নবাব সলিমুল্লাহর দাদার নাম কী জানো? নবাব খাজা আবদুল গণি ছিলেন নবাব সলিমুল্লাহর দাদা।
নবাব সলিমুল্লাহ ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রিয়। ফলে অভিজাত পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি সাধারণ মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করতেন। সাধারণ মানুষের দুঃখকে তিনি নিজের দুঃখ মনে করতেন। তিনি অকাতরে দান-খয়রাত করতেন।
নবাব পরিবারে জন্মগ্রহণ করেও নবাবীর ভাব করতেন না। জনগণের কথা চিন্তা করে তিনি মোমেনশাহীর ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তার পিতা আহসান উল্লাহর মৃত্যু হলে তিনি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি ছেড়ে এসে জমিদারী গ্রহণ করেন। কিন্তু বেশিদিন জমিদারী ধরে রাখতে পারেননি। সকল ধন সম্পত্তি বিলিয়ে দিলেন সাধারণ মানুষের কল্যাণে।
এক সময় তিনি ঋণী হয়ে গেলেন। তার ঘরের মূল্যবান জিনিসপত্র বন্ধক রেখে এসব ঋণ শোধ করলেন। সোনালী ব্যাংক, সদরঘাট শাখায় এখনও নবাব সলিমুল্লাহর বন্ধক রাখা হীরকখণ্ড ‘দরিয়া-ই-নূর’ রক্ষিত আছে। পৃথিবীর যে কোনো দেশে মুসলমানরা কষ্টে আছে জানলেই নবাব সলিমুল্লাহ অর্থ পাঠিয়ে দিতেন। সুদূর তুরস্কে ভূমিকম্প হয়েছে, সেখানে মানুষ কষ্টে আছে, সলিমুল্লাহর মন কেঁদে উঠলো। তিনি তাদের সাহায্যে টাকা-পয়সা পাঠিয়ে দিলেন।
শুধু কি তাই? তার নিজস্ব সম্পত্তি সলিমাবাদ মৌজাও বিলিয়ে দিলেন জাতির কল্যাণে। তার সম্পত্তির উপর গড়ে উঠলো ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়। নাম রাখা হলো পিতা খাজা নবাব আহসান উল্লাহর নামে আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য সমস্ত সম্পত্তি দিয়ে দিলেন তিনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র হল ‘সলিমুল্লাহ মুসলিম হল’ নামে এখনো তার স্মৃতি বহন করে আছে।

দেখো, আমরা কতো অকৃতজ্ঞ জাতি, যে মানুষ তার সবকিছু বিলিয়ে দিয়ে এতো বড় বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান করে গেলেন আমরা তার জন্য কী করেছি? কিছুই না। বরং তাঁর ইতিহাস পর্যন্ত মুছে দেয়া হয়েছে। যেমন ধরো, তাঁর পিতা খাজা আহসানউল্লাহর নাম বাদ দিয়ে আহসানউল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটির নাম করা হয়েছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। অথচ মানবদরদী সলিমুল্লাহ মুসলমানদের জ্ঞানেগুণে বড় হওয়ার কথা চিন্তা করেই নিজের সমস্ত সম্পদ দান করে যান এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য।
নবাব সলিমুল্লাহ সবসময় ছিলেন অবহেলিত মুসলমানদের পাশে। তিনি ছিলেন ইংরেজদের অত্যাচারের সময় মুসলমানদের একমাত্র মুখপাত্র। তিনি ছিলেন মুসলমানদের হারিয়ে যাওয়া গৌরবকে পুনরুদ্ধার করতে আজীবন সচেষ্ট। তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার ফলেই ১৯০৫ সালে বঙ্গদেশকে দুই ভাগে ভাগ করে, ঢাকা, রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও আসাম নিয়ে ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ববঙ্গ গঠন করেন। তোমরা হয়তো শুনে থাকবে ইতিহাসে যা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন নামে পরিচিত।

জনদরদি এই নেতা ১৯১৫ সালের ১৬ জানুয়ারি পরলোকগমন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সলিমুল্লাহ এতিমখানাসহ বহু প্রতিষ্ঠান তার স্মৃতিবহন করে দাঁড়িয়ে আছে।

বন্ধুরা, চলো না আমরা জেগে উঠি আবার। ইতিহাসের পাতায় পাতায় খুঁজে দেখি আমাদের এসব দানবীর মানুষদের গৌরব উজ্জ্বল অতীত। তা না হলে আমাদেরকে প্রবেশ করতে হবে একটি অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে।

প্রকাশকাল: জানুয়ারি ২০২৬