
দেখতে দেখতে কেটে গেল চারটি বছর। ২০২২ সালে মধ্যপ্রাচ্যের দেশ কাতারে অনুষ্ঠিত হয়েছিল বিশ্বকাপ ফুটবলের সর্বশেষ আসরটি। আরেকটি আসর শুরু হতে আর মাত্র কয়টা ঘণ্টা বাকি। সকল প্রস্তুতি শেষ। এখন কেবল বাঁশি বাজার অপেক্ষা। কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী মানুষ দিন গুনছেন কখন শুরু হবে।
পৃথিবীর বুকে খেলার জগতে তো বটেই, সবমিলিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলের মতো এত বড় আয়োজন আর নেই। অলিম্পিক গেমসকে বলা হয় দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ। কারণ অংশগ্রহণকারী, খেলোয়াড় ও খেলার সংখ্যার দিক থেকে সেটাই সবচেয়ে বড় আয়োজন। কিন্তু দর্শকসংখ্যা আর মানুষের আগ্রহের হিসাব করলে বিশ্বকাপ ফুটবলের চেয়ে আকর্ষণীয় আর কোনো কিছুই নেই। ২০১৮ বিশ্বকাপের খেলা নাকি বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক মানুষ অর্থাৎ প্রায় চার’শ কোটি মানুষ দেখেছে। বর্তমানের আধুনিক প্রচার ব্যবস্থার কারণে যে যেখানেই থাকুক না কেনো, খেলা দেখার যন্ত্র এখন সবার হাতের মুঠোয়। মাসব্যাপী আয়োজন নিয়ে ছয় মহাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে তৈরি হয় একধরনের উৎসাহ-উদ্দীপনা, যা কখনও রূপ নেয় উন্মাদনায়।
এবারের আয়োজক দেশ তিনটি। মূল আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র। সাথে আছে মেক্সিকো এবং কানাডা। বিশ্বকাপ ফুটবলের চূড়ান্ত পর্ব কোথায় হবে তা আট বছর আগেই ঠিক করা হয়। তারও আগে যে যে দেশ আয়োজক হতে আগ্রহী তাদের আবেদন করতে হয়। এরপর ফিফা অর্থাৎ যে সংস্থা বিশ্ব ফুটবলের প্রধান পরিচালনাকারী সংগঠন, তাদের কংগ্রেসে ভোটের মাধ্যমে চূড়ান্ত আয়োজক নির্ধারিত হয়। যেমন এবারের এই মূল আসর যে যুক্তরাষ্ট্রে হবে, তার সিদ্ধান্ত হয় সেই ২০১৮ সালে রাশিয়ায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপের সময়।
১৯৩০ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের শুরু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে ১৯৪২ আর ১৯৪৬ সালে বিশ্বকাপ ফুটবলের আসর বসেনি। এবারের আসরটি হচ্ছে ২৩তম। এবারই প্রথম তিন দেশে বিশ্বকাপ হচ্ছে। ২০০২ সালে প্রথম একাধিক দেশে বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়। সেবার সহ আয়োজক ছিল এশিয়ার দুই ধনী দেশ জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া।
প্রায় শত বছরে বিশ্বের অনেক কিছু যেমন বদলেছে তেমনি বদলেছে বিশ্বকাপ ফুটবলেরও অনেক কিছু। বিশেষ করে এবারের আসরটি একদম অন্য রকম। একসময় বিশ্বকাপের চূড়ান্ত পর্বে খেলতো ১৬ দল। এরপর ২৪ দলের খেলা চলে ১৯৯৪ পর্যন্ত। ১৯৯৮ থেকে গত সাতটি আসর হয়েছে ৩২ দলে। গতবারের চেয়ে ১৬টি দল বেশি অংশ নিচ্ছে এবার। ফিফা সদস্য সংখ্যা দু’শয়ের বেশি। অনেক দেশের আপত্তি ছিল এতো দল বাড়ানোতে। তাদের যুক্তি ছিল এতে খেলার মান কমবে, কমবে আকর্ষণ। তাদের আপত্তি টেকেনি। ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দল বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত হয়। আর ২০২৩ সালে সিদ্ধান্ত হয় যে, ৪৮ দল ১২ গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রথম পর্বে খেলবে। ফিফার বর্তমান সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর চেষ্টায় এবার চূড়ান্ত পর্বে দলের সংখ্যা বাড়িয়ে করা হয়েছে ৪৮। এবার আরেকটি অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করতে যাচ্ছে মেক্সিকো। তারাই প্রথম দেশ যেখানে বিশ্বকাপ ফুটবল তৃতীয়বারের মতো খেলা হচ্ছে। এর আগে ১৯৭০ এবং ১৯৮৬ সালে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ মেক্সিকো এককভাবেই বিশ্বকাপ আয়োজন করেছিল। এ পর্যন্ত ১৮টি দেশ বিশ্বকাপ আয়োজন করতে পেরেছে।
এ পর্যন্ত মোট ৮০টি দেশ বিভিন্ন সময়ে বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে। এদের মধ্যে শিরোপা জেতার স্বাদ পেয়েছে মাত্র আটটি দেশ। ব্রাজিল সবচেয়ে বেশি পাঁচবার বিশ্বকাপ শিরোপা জেতার কৃতিত্ব দেখিয়েছে। কিন্তু তারা নিজেদের দেশে অনুষ্ঠিত দুই আসরে কিন্তু চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। এছাড়া ইতালি ও জার্মানি চারবার, আর্জেন্টিনা তিনবার, ফ্রান্স ও উরুগুয়ে দুইবার এবং ইংল্যান্ড ও স্পেন একবার করে শিরোপা জয়ের স্বাদ পায়। সবার প্রথম আসরে উরুগুয়ে আর সবার শেষ আসরে আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। হয় ইউরোপ না হয় দক্ষিণ আমেরিকার দেশ বিশ্বকাপ জিতেছে। এশিয়ার দেশের মধ্যে ২০০২ সালে সহ-আয়োজক দক্ষিণ কোরিয়ার চতুর্থ আর ২০২২ সালে আফ্রিকা থেকে মরক্কোর চতুর্থ স্থান অর্জনই সেরা সাফল্য।
৪৮ দল খেললেও এটা কেনো বিশ্বকাপ?
কারণ, এই ৪৮ দল এমনিতেই মূলপর্বে উঠে আসেনি। আর্জেন্টিনা হোক আর ব্রাজিল, প্রতিটি দলকেই বাছাই পর্বে অনেক ধাপ পেরিয়ে এই মূল আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে হয়েছে। যেমন ইতালির মতো চারবারের চ্যাম্পিয়ন দল এবার নিয়ে টানা তিনবার বিশ্বকাপের মূল আসরে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারলো না। অথচ নাম না জানা দেশকেও এবার মূলপর্বে খেলতে দেখবো আমরা। সত্যি বলতে কি, বিশ্বকাপ না হলে কুরাসাও বা কেপ ভার্দে নামে কোনো দেশ পৃৃথিবীর বুকে আছে জানতামই না। এই দেশ দুটি আয়তনে যেমন ছোট, তেমন এদের জনসংখ্যাও অনেক কম। তারপরেও মাঠের লড়াইয়ে এরা অনেক বাঘা বাঘা দেশকে পেছনে ফেলে উঠে এসেছে বিশ্বমঞ্চে। পৃথিবীর মোট মানুষের চারভাগের একভাগ মানুষ বাস করে ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ আমাদের এই উপমহাদেশে। অথচ আমরা যুগের পর যুগ বিশ্বকাপ ফুটবলের দর্শক হিসেবেই থেকে যাচ্ছি। ক্রিকেটের বিশ্বকাপে আমরা এগিয়ে থাকলেও ফুটবলে বাছাই পর্বের বাঁধা আমরা টপকাতে পারি না।
বাছাই পর্বের লড়াইটা কেমন?
এক বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার পরের বছর থেকেই শুরু হয়ে যায় পরের আসরের খেলার লড়াই। ২০২৬ বিশ্বকাপে কারা খেলবে তার লড়াই শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের ৭ সেপ্টেম্বর। বিশ্বকাপের মূল পর্বে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছে প্রথমবারের মতো জর্দান, উজবেকিস্তান, কুরাসাও ও কেপ ভার্দে। কাতার গত আসরে আয়োজক দেশ হিসেবে বিশ্বকাপে প্রথমবার খেললেও এবারই বাছাই পর্ব খেলে মূল পর্বে খেলতে যাচ্ছে। ২০৬টি দল বাছাই পর্বে অংশ নেয়। ৯৩৭ দিনের মধ্যে বাছাই পর্বে মোট খেলা হয় ৮৯৯টি।
৫২ বছর পর মূল পর্বে
এবার আমরা হাইতি ও গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো বা ডি আর কঙ্গোকে বিশ্বকাপে খেলতে দেখবো। এই দেশ দুটি সর্বশেষ ৫২ বছর আগে ১৯৭৪ সালের জার্মান বিশ্বকাপে খেলার পর আর বাছাই পর্বের ধাপ পেরোতে পারেনি। তখন অবশ্য কঙ্গোর নাম ছিল জায়ার। অবশ্য এরচেয়েও বেশি বছর পর ফিরে আসার রেকর্ড আছে ওয়েলস ও মিশরের। ২০২২ বিশ্বকাপে আমরা যুক্তরাজ্যের একটি দেশ ওয়েলসকে খেলতে দেখেছিলাম ৬৪ বছর পর। এছাড়া মিশর ১৯৩৪ বিশ্বকাপে খেলার ৫৬ বছর পর ১৯৯০ বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিলো।
বাছাই পর্বে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ
মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরাক বাছাই পর্বে সবচেয়ে বেশি ২১টি ম্যাচ খেলে যুক্তরাষ্ট্রে খেলতে যাওয়ার টিকিট পেয়েছে। এশিয়া অঞ্চলে সরাসরি দ্বিতীয় রাউন্ড থেকে খেলা শুরু করে। তিন রাউন্ডে ১৬টি ম্যাচে খেলেও অপেক্ষায় থাকতে হয়। এরপর মহাদেশীয় পর্যায়ে দুটি প্লে অফ ম্যাচ খেলে টিকে থাকে লড়াইয়ে। শেষ পর্যন্ত আন্তঃমহাদেশীয় পরীক্ষায় বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে স্বপ্ন পূরণ হয় এই আরব দেশটির।
কোন মহাদেশের কয়টি দল?
বরাবরই বিশ্বকাপে ইউরোপের দল বেশি খেলার সুযোগ পায়। না, এমনিতেই নয়, মাঠের লড়াইয়ে তাদের শক্তিও বেশি। এবার যেহেতু ৪৮ দল খেলছে, তাই আরও বেশি দলের খেলার সুযোগ পেয়েছে সব মহাদেশ থেকেই। ইউরোপ থেকে ১৬টি আর আফ্রিকা থেকে ১০টি দেশ খেলছে।
খেলা হবে কোন কোন শহরে?
১১ জুন উদ্বোধনী খেলাটি হবে মেক্সিকো সিটির স্তাদিও আজটেকাতে। প্রথম খেলায় মুখোমুখি হবে স্বাগতিক মেক্সিকো ও দক্ষিণ আফ্রিকা আর দ্বিতীয় খেলায় মুখোমুখি হবে দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র| সমাপনী অর্থাৎ ফাইনাল খেলা হবে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়কের্র নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে। ২০১০ সালে এ স্টেডিয়ামটি উদ্বোধন করা হয়। এর আসন সংখ্যা ৮২ হাজার ৫০০। মোট ১৬টি শহরে এবারের চূড়ান্ত পর্বের খেলাগুলো হবে। এর মধ্যে ১১টি শহরই যুক্তরাষ্ট্রের, তিনটি মেক্সিকোর আর দুটি কানাডার।
যুক্তরাষ্ট্রের যে ১১ শহরে খেলা হবে : আটলান্টা, বোস্টন, ডালাস, হাউস্টন, ক্যানসাস সিটি, লস অ্যাঞ্জেলস, মিয়ামি, নিউ জার্সি, ফিলাডেলফিয়া, সান ফ্রান্সিসকো বে এরিয়া ও সিয়াটল।
মেক্সিকোর তিনটি শহর হলো গুয়াদালায়ারা (স্তাদিও আক্রন), মেক্সিকো সিটি ও মনটেরে।
আর কানাডার দুই শহর হলো টরন্টো ও ভ্যানকুভার।
এবারের আসরে মোট খেলা হবে ১০৪টি।
এবার যে গ্রুপে যে দল খেলবে
| গ্রুপ | দেশ |
| Group A | মেক্সিকো, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও চেক প্রজাতন্ত্র। |
| Group B | কানাডা, কাতার, বসনিয়া-হারজেগোভিনা ও সুইজারল্যান্ড। |
| Group C | ব্রাজিল, মরক্কো, স্কটল্যান্ড ও হাইতি। |
| Group D | যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া ও প্যারাগুয়ে। |
| Group E | জার্মানি, ইকুয়েডর, আইভরি কোস্ট ও কুরাসাও। |
| Group F | নেদারল্যান্ডস, জাপান, সুইডেন ও তিউনিসিয়া। |
| Group G | বেলজিয়াম, মিসর, ইরান ও নিউজিল্যান্ড। |
| Group H | স্পেন, সৌদি আরব, উরুগুয়ে ও কেপ ভার্দে। |
| Group I | ফ্রান্স, ইরাক, সেনেগাল ও নরওয়ে। |
| Group J | আর্জেন্টিনা, আলজেরিয়া, জর্দান ও অস্ট্রিয়া। |
| Group K | পর্তুগাল, উজবেকিস্তান, ডি আর কঙ্গো ও কলম্বিয়া। |
| Group L | ইংল্যান্ড, ঘানা, ক্রোয়েশিয়া ও পানামা। |


