যারা ভূ-স্বর্গ কাশ্মীর ভ্রমণ করেন তাদের একটা লক্ষ্য থাকে শুভ্র বরফে আবৃত পাহাড়ের পাশাপাশি আপেল বাগান, জাফরান বাগান বা টিউলিপ বাগান পরিদর্শন করা। আমাদেরও কাশ্মীর ভ্রমণের একটা আকর্ষণ ছিলো টিউলিপ বাগান পরিদর্শনের।
২০২৩ সালের কথা। রমজানের ঈদের পরদিন আমরা ছয়জনের একটা টিম গিয়েছিলাম স্বপ্নের কাশ্মীর ভ্রমণে। প্রথম দিন পেহেলগাম, দ্বিতীয় দিন গুলমার্গ এবং তৃতীয় দিন সোনমার্গ ঘুরাফিরা শেষ করি। প্ল্যান অনুযায়ী শেষ দিন তথা চতুর্থ দিনে আমরা সকাল সকাল চলে আসলাম টিউলিপ বাগান দেখতে। শ্রীনগর থেকে ডাল লেক পার হয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনের সামনের রাস্তা দিয়ে এগোলেই টিউলিপ গার্ডেন। আমরা একে একে গাড়ি থেকে নামলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, এই টিউলিপ গার্ডেন মাত্র এক সপ্তাহের জন্য দর্শণার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়। সেটা হলো মার্চের শেষ সপ্তাহে। আর আমরা গিয়েছিলাম এপ্রিলের মাঝামাঝিতে। বিষয়টি আমাদের জানা ছিলো না। প্রাচীরের বাহির থেকেই যতটুকু দেখা গেলো তাই উপভোগ করলাম।
এটি ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেন নামে পরিচিত। শ্রীনগরের অপরূপ সৌন্দর্যের অন্যতম আকর্ষণ যা জাবারওয়ান পাহাড়ের পাদদেশে বিস্তৃত এই টিউলিপ বাগান এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ উদ্যান হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। শ্রীনগরের মনোরম পরিবেশ, জাবারওয়ান পাহাড়ের স্নিগ্ধ ছায়া এবং টিউলিপের রঙিন আভা মিলিয়ে এটি এক স্বপ্নময় পর্যটনস্থল। যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তাদের জীবনে একবার হলেও এই বাগানের সৌন্দর্য উপভোগ করা উচিত।
বিশ্বে বর্তমানে সৌন্দর্যমণ্ডিত এ ফুলের সাড়ে তিন হাজারের মতো প্রজাতি রয়েছে। ইউরোপসহ এশিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে টিউলিপের চাষ হয়ে থাকে। এশিয়ার সবচেয়ে বড় টিউলিপ ফুলের বাগান ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেন প্রায় ৭৫ একর জায়গাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে। রাজধানী শ্রীনগর থেকে বাগানটির দূরত্ব ১৮ কিলোমিটার। শ্রীনগরের ডাললেক লাগোয়া বোটানিক্যাল গার্ডেন-এর পাশেই এর অবস্থান। কাশ্মীরের সৌন্দর্যকে আরও স্বর্গীয় করে তোলে এই বাগান। লন্ডনের ওয়ার্লড বুক অফ রেকর্ডসের খেতাবও রয়েছে এই বাগানের ঝুলিতে।
বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ও স্বীকৃত ফুলগুলোর মধ্যে অন্যতম টিউলিপ। বসন্তের সবচেয়ে সুন্দর ফুল বলা হয় একে। বিভিন্ন ধরনের রঙে শোভিত এ ফুল সৌন্দর্যপ্রেমীদের আকর্ষণ করবেই। রংধনুর সব রঙেরই দেখা মেলে ফুলটিতে। টিউলিপ শব্দের অর্থ ‘নিখুঁত প্রেম’। অনেক ফুলের মতো টিউলিপের বিভিন্ন রংও প্রায়শই তাদের নিজস্ব তাৎপর্য বহন করে। লাল টিউলিপ ভালোবাসার প্রতীক, বেগুনি টিউলিপ রাজকীয়তার প্রতীক। সাদা টিউলিপ দক্ষতার বার্তা পাঠাতে ব্যবহার করা হয়।
ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ ছাড়াও নানা দেশ থেকেই পর্যটকেরা আসেন এই দিগন্তজোড়া টিউলিপ বাগান দেখতে। পাহাড়ঘেরা এই বাগানের হাঁটাপথের দুই পাশে শুধু রঙ-বেরঙয়ের টিউলিপ। লাল, কমলা, হলুদ, গোলাপি, বেগুনি, সাদা, কালোসহ নানা রং ও জাতের টিউলিপ ফোটে সেখানে। বসন্তের শুরুতেই এখানকার টিউলিপ ফুল ফোটে, যা পাহাড়ের পটভূমিতে এক রঙিন স্বর্গরাজ্যের সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মার্চের শেষে বা এপ্রিল মাসের শুরুর দিকে গেলে সবচেয়ে বেশি টিউলিপের দেখা মিলবে। টিউলিপ বাগানে প্রায় ৭৫ ধরনের টিউলিপ রয়েছে যা নেদারল্যান্ডস, তুরস্ক, জার্মানি ও অন্যান্য দেশ থেকে আনা হয়েছে। টিউলিপ ছাড়াও, ৪৬ ধরনের ফুল রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে হাইসিন্থ, ড্যাফোডিল এবং রানুনকুলাস যা হল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিল। প্রতিবছর ১৫ লাখ টিউলিপের উৎপাদন হয়ে থাকে এ বাগানে।
দর্শনার্থীরা যেন ফুল ছিঁড়তে না পারেন সেজন্য পুরো বাগান স্বচ্ছ নেট দিয়ে ঘেরা। জানা গেছে, ২০০৮ সালের দিকে কাশ্মীরে গড়ে তোলা হয় টিউলিপের এই বিশাল বাগান। মূলত শীত ও গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়ে পর্যটকের মনোযোগ কাড়তে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী গুলাম নবী আজাদের উদ্যোগে এই টিউলিপ বাগানের যাত্রা শুরু। সে সময় বাগানের নাম ছিল ‘সিরাজবাগ’। পরে নাম রাখা হয় ‘ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেন’।
প্রতি বছর বসন্তের সময় এশিয়ার বৃহত্তম টিউলিপ বাগানে টিউলিপ ফেস্টিভ্যালের আয়োজন করা হয়। মার্চের শেষ সপ্তাহে পর্যটকদের জন্য বাগানটি খুলে দেয় কর্তৃপক্ষ। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত খোলা থাকে। আর এই উদ্যোগ নেওয়ার ফলে ভূস্বর্গের পর্যটন ব্যবসা ফুলে ফেঁপে ওঠে। বাণিজ্যিকভাবেও এটি একটি লাভবান ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। ২০২৩ সালে, বাগানটিতে রেকর্ড সংখ্যক দর্শনার্থীর আগমন ঘটে। ২০২৩ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলের মধ্যে এক মাসে ৩,৬৫,০০০ পর্যটক বাগানটি পরিদর্শন করেছিলেন, যার মধ্যে ৩,০০০ বিদেশি পর্যটকও ছিলেন। ২০২৪ সালে ৪,৩০,০০০ পর্যটক বাগানটি পরিদর্শন করেছে বলে জানা যায়।
তবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় টিউলিপ বাগান দেখতে যেতে হবে নেদারল্যান্ডসের লিসি শহরে। বাগানটির নাম ‘কেউকেনহোফ গার্ডেন’। অনেকের কাছে ‘ইউরোপের বাগান’ নামেও পরিচিত। ১৯৪৯ সালে একটি দাতব্য সংস্থার তত্ত্বাবধানে এ বাগানের গোড়াপত্তন হয়। টিউলিপ ঠান্ডা আবহাওয়া ভালোবাসে। তাই ইউরোপের শীতপ্রধান দেশগুলোতে টিউলিপ উৎপাদন বেশি হয়। টিউলিপ ফুল চাষের ক্ষেত্রে দিনের বেলা ১৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং রাতে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা সহনশীল ধরা হয়। এর চেয়ে বেশি তাপমাত্রা হলে ফুল যথাযথভাবে নাও ফুটতে পারে। স্বাভাবিকভাবে রোপণের ১৮-২০ দিনের মধ্যে কলি আসতে শুরু করে। ২৫-৬০ দিন পর্যন্ত টিউলিপ ফুল স্থায়ী হয়। বর্তমানে কাশ্মীরের ইন্দিরা গান্ধী মেমোরিয়াল টিউলিপ গার্ডেনটি এশিয়ার মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
বিশ্বের অন্যতম সুন্দর ও রঙিন ফুলগুলোর মধ্যে টিউলিপ অন্যতম। এই ফুলটি তার সৌন্দর্য, রঙের বৈচিত্র্য ও চমকপ্রদ গঠনের জন্য বিশ্বব্যাপী পরিচিত। টিউলিপ ফুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর অসাধারণ রঙের বৈচিত্র্য। সাদা, হলুদ, লাল, গোলাপি, কমলা, সাদা-লাল মিশ্রিত রঙসহ বিভিন্ন রঙে এটি ফুটে ওঠে। প্রতিটি টিউলিপ ফুলই যেন একটি আলাদা গল্প বলে, যা গার্ডেন বা ফুলবাগানে বিশেষ সৌন্দর্য সৃষ্টি করে। টিউলিপের মৌ মৌ গন্ধে মাতোয়ারা হবেন যে কোনো পর্যটক। পাহাড়ের পাদদেশে টিউলিপ বাগানের এমন নান্দনিক দৃশ্যপট মোহনীয় করে তোলে আমাদের।
প্রকাশকাল: ডিসেম্বর ২০২৫

