যদি প্রশ্ন করা হয়, ভ্রমণ করতে ভালো লাগে না বা পছন্দ করো না কে কে? তাহলে তোমাদের খুব কম সংখ্যকই হয়তো পাওয়া যাবে যারা ভ্রমণ খুব একটা পছন্দ করে না। বাকিরাসহ অধিকাংশ মানুষই ভ্রমণ করা পছন্দ করে।
আমরা পড়ে শিখি নয়তো দেখে শিখি। ভ্রমণের মাধ্যমেও অনেক কিছু শেখার আছে। এজন্যই তো বিশ্ব পরিব্রাজক খ্যাত ইবনে বতুতা দেশে দেশে ভ্রমণ করেছেন আর জেনেছেন বিশ্ব সম্বন্ধে। মহাগ্রন্থ আল কুরআনেও ভ্রমণকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে।
যাইহোক, এত তাত্ত্বিক আলোচনায় না যেয়ে আমরা বরং ভ্রমণের গল্পে ফিরি। গতমাসে আমরা গিয়েছিলাম হামহাম ঝরনা দেখতে। এটি মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বনাঞ্চলে অবস্থিত।
আমরা তিনজন ঢাকা থেকে আগেরদিন গিয়ে পৌঁছাই মৌলভীবাজারে এবং সেখানেই রাত্রিযাপন করি। পরদিন সকালে নাশতা শেষ করে স্থানীয় পরিচিত দু’জনসহ মোটরবাইক যোগে রওয়ানা হই কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বনাঞ্চলের চাম্পারার চা বাগান কলাবনপাড়ার উদ্দেশ্যে। কাঁচা-আধাপাকা রাস্তা সবমিলিয়ে প্রায় দুই ঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে যাই কলাবনপাড়ায়। পথিমধ্যে অবশ্য হঠাৎ বৃষ্টিতে কয়েকদফা ভিজে যাওয়াটাও উপভোগ্য ছিল। কলাবনপাড়ার স্থানীয় বাসিন্দারা মূলত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর লোক। মোটরবাইক সেখানে রেখে এখন আমাদের যেতে হবে পায়ে হেঁটে বনের মধ্য দিয়ে পাহাড়-টিলা অতিক্রম করে। সরকারিভাবে হামহাম জলপ্রপাতটি পর্যটন ব্যবস্থাপনার আওতায় এখনো আসেনি। সেজন্য, হামহাম জলপ্রপাত ভ্রমণে যারা আসে তাদেরকে স্থানীয়দের মধ্য থেকে কেউ কেউ অল্প টাকার বিনিময়ে ঘুরে দেখান বা গাইড হিসেবে সাথে যান। আমরা সাথে নিয়েছিলাম ১২-১৪ বছরের স্থানীয় এক কিশোর জয়-কে। যাত্রার শুরুতেই প্রত্যেকে নিয়ে নেই মাঝারি সাইজের চিকন একটি করে বাঁশ, যেটা পাহাড়ি পথ অতিক্রমে সুবিধা দিবে। পানি ও হালকা কিছু শুকনো খাবার সাথে নিয়ে শুরু হলো জলপ্রপাত দর্শনের যাত্রা।
ঘনসবুজ বনের মধ্য দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। হামহামে যাওয়ার মূলত দুইটি পথ, পাহাড়ি উঁচু নিচু পথ ও ঝিরিপথ। চম্পারায় চা-বাগান থেকে ঝরনার দূরত্ব প্রায় ৭ কিলোমিটার। পথে অত্যন্ত খাড়া মোকাম টিলা পাড়ি দিতে হয় এবং অনেক ঝিরিপথ ও ছড়ার কাদামাটি দিয়ে পথ চলতে হয়। হামহাম যাবার পথ এবং হামহাম সংলগ্ন রাজকান্দি বনাঞ্চলে রয়েছে সারি সারি কলাগাছ, জারুল, চিকরাশি কদম গাছ। এর ফাঁকে ফাঁকে উড়তে থাকে রং-বেরঙের প্রজাপতি। ডুমুর গাছের শাখা আর বেত বাগানে দেখা মিলতে পারে হনুমানের। এছাড়াও রয়েছে ডলু, মুলি, মির্তিঙ্গা, কালি ইত্যাদি বিচিত্র নামের বিভিন্ন প্রজাতির বাঁশ।
আমরা বেশ উৎসাহ নিয়েই কর্দমাক্ত পাহাড় পাড়ি দিচ্ছিলাম। সঙ্গে থাকা বাঁশ এবং প্রবল আগ্রহের কারণে শুরুতে কোনো কষ্টই মনে হচ্ছিল না। কিন্তু কিছুদূর যাওয়ার পর পথিমধ্যে যখন দেখলাম কিছু পর্যটক হামহাম জলপ্রপাত দেখে ফেরত আসছে এবং কেউ কেউ আমাদের বলছে আমরা নাকি অনেক দেরি করে ফেলেছি, দিনের আলোয় হয়তো আমরা ফিরতে পারবো না, তখন কিছুটা হতাশা আর শঙ্কা নিয়েই পথ চলতে লাগলাম। তার উপর কাদাযুক্ত পিচ্ছিল উঁচু নিচু, কখনো খাড়া ঢাল পথ। পথিমধ্যে এরকম অসংখ্য লোকজন ফেরত আসছে দেখে শঙ্কা বাড়তে থাকলো। কিন্তু, এসেছি যখন ঝরনা দেখেই ফিরবো, এই ভেবে আগাতে লাগলাম। পাহাড়ে আরোহন করার অভ্যাস না থাকায় ক্লান্ত হয়ে, কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নিয়ে আগ্রহ নিয়ে আবারও পথচলা শুরু। অবশেষে প্রায় পৌনে ২ঘণ্টা হেঁটে আমরা পৌঁছে গেলাম হামহাম এর পাদদেশ থেকে বেয়ে আসা ঝিরিপথে। ঝিরিপথের কোথাও হাঁটু পানি, কোথাও আবার বুক পর্যন্ত পানি। পাথর এবং পানির সমন্বয়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি সেপথ বেয়েই এবার পৌঁছালাম হামহাম।
হামহামে পৌঁছেই সবাই নেমে গেলাম গোসলে। প্রায় ১৩৫ বা কারো কারো মতে ১৪৭ ফুট উচ্চতার এই ঝরনা থেকে নেমে আসা পানিতে প্রাণভরে গোসল করে মহান সৃষ্টিকর্তার অপরূপ সৃষ্টিতে মন প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। এরপর স্মৃতি রক্ষার্থে সবাই মিলে বেশ কিছু ফটোগ্রাফি করলাম। অতঃপর ফেরার পালা। তখনও দু-এক গ্রুপ পর্যটক সেখানে আছে। আমাদের টার্গেট তাদের আগেই আমরা যেন ফিরতে পারি অর্থাৎ সেখান থেকে ফিরতি হিসেবে আমরাই যেন শেষ গ্রুপ না হই।
একই পথে ফেরার কারণে ফিরতি পথে চলাটা একটু সহজ ছিল। মাঝপথে পাহাড়ের উপরেই সেরে নিলাম যোহর ও আছরের কসর নামাজ। ফিরতি পথে সবাই মিলে প্রকৃতির সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে কিছুক্ষণ পর পর গেয়ে উঠছিলাম সবুজের গান। কলাবনপাড়ায় পৌঁছে ভেজা কাপড় পরিবর্তন করে বাইকযোগে রওয়ানা হই মৌলভীবাজারের উদ্দেশ্যে। ফিরতি পথে শ্রীমঙ্গলের চা বাগানের মাঝ দিয়ে সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে রাত হয়ে যায় শহরে পৌঁছাতে। হালকা খাবার ছাড়া দুপুরে যেহেতু খাওয়া হয়নি, সেজন্য রাতের খাবার শেষে বাসে উঠে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই এবং সকালে পৌঁছে যাই।
সবমিলিয়ে, ভ্রমণটা বেশ চমকপ্রদ ছিল এবং নতুন অভিজ্ঞতা ও কঠিনকে জয় করার শিক্ষা বেশ ভালোভাবেই রপ্ত করি সবাই। বন্ধুরা, তোমরাও চাইলে যেতে পারো প্রকৃতির এমন অপার সৌন্দর্য উপভোগ করতে।
প্রকাশকাল: সেপ্টেম্বর ২০২৫


