আমার প্রথম ঈদের প্রভাতটি

0
0

ওই. ও..ই.. ও..ই..ই তো চাঁদ উঠেছে। ঈদের এক ফালি বাঁকা চাঁদ। ‘ও মন, রমজানের ওই রোজার শেষে, এল খুশির ঈদ; তুই আপনাকে আজ বিলিয়ে দে শোন আসমানী তাগিদ’ বেজে উঠেছে কাজী কবির চির আনন্দের গজল। অনন্তের গজলধ্বনি। রেডিও থেকে আসমানী হাওয়ার ধুম লেগেছে।
লাইলি খালা। আমার ছোট খালামনী। ঠাকুর বাড়ির চিলেকোঠার ওপার থেকে দৌড়ে এসে বলল- চাঁদ উঠেছে। চাঁদ উঠেছে। এক ফালি বাঁকা চাঁদ। কী সুন্দর। কী সুন্দর!
আমি দৌড়ে গেলাম। ওদিকে, চিলেকোঠার দিকে। হ্যাঁ। ঈদের চাঁদ। বাঁকা চাঁদের মুখেও হাসি ফোটা। স্বর্গের গ্রহ-উদ্যান থেকে উঁকি দিয়েছে।
সেই ছোট্ট বেলাটার কথা। একবার মনেমনে ভেবে নিলেই হল। খালামনী বলল- ‘খোকনবাবু, সবাইকে ডাকো, ডাকো। চাঁদ দেখাও। বেশিক্ষণ সে বসে থাকবে না তো। সহসা কোথায় মিলিয়ে যাবে।
আমরা ক’দিন আগে মামাবাড়ি এসেছি। নানা ভাইয়ের সঙ্গে কলকাতা থেকে। ঈদুল ফিতর করতে।
নানা ভাই, নানাবুজি, বড় মামা আর আমার আম্মুও চটপট চিলেকোঠার ছাদের ওপরে গেলেন। আচ্ছামতো চাঁদটা দেখলেন। আল্লাহর দরবারে হাত তুললেন। নানাবুজি সোহাগ করে বললেন- ‘চাঁদ দেখো, চাঁদ দেখো। নতুন সকাল, ফুটফুটে সকাল হবে কাল। আমার ট্রাংক ভর্তি সব নতুন জামা-কাপড়। নতুন জুতা, মোজা, টুপি আমি বের করে দেবোক্ষণ। তোমরা নাতি-নাতকুররা মজা করে পরে নেবে।’
আমার আম্মু সবার বড়। ভাই-বোনদের মধ্যে। আমি ওই বাড়ির প্রথম সন্তান। সবার বড়। বুঝতেই তো পারছো। বড় হওয়ার বাহাদুরি আছে না একটা! আমার কদরই আলাদা। গল্পে-সল্পে রাত কেটে গেল অনেকটা। আমি শুয়ে পড়লাম। নানা ভাইয়ের সঙ্গে বারান্দায় বড় কামরায়। আব্বু ভেতরের কামরায়। কাঞ্চনপুর থেকে আমার আরেক নানাজি এসেছেন। নামটা বেশ সুন্দর। হরমুজ খাঁন। আমি বলতাম ‘তরমুজ খাঁন’। তাই হাসাহাসি হতো ঢের। আম্মুকে আদর করতেন তিনি। কাঞ্চনপুর থেকে কলকাতা আম পাঠাতেন তিনি। আমের গায়ে চুন লাগিয়ে চিহ্নিত করে দিতেন, তার ভাগিনীর জন্য।
দালানের কার্নিশের চারদিকে চড়ুই পাখির খড়কুটো। চিচি শব্দ করছিল চড়ুইগুল। আমাদের সঙ্গে ওরাও যেন ঈদের আনন্দ করবে তাই ভাব করতে চায়। খুব সকালে মনু মামা দুটো চড়ুই পাখির ছানা এনে বলল- ‘এই নাও মামা, ওরাও ঈদের নামাজে যাবে।’ আমি বললাম- ‘নিয়ে চল ওদের, মামা। মন্দ হবে না। পাখিরা তো মানুষের কথা বোঝে। চিড়িকপিড়িক গান করে। ওদের খুশি, আমাদের খুশি।’
বলতে কি, এসব ব্যাপার তো ‘ঈদের ফ্যান্টাসি’।
সে যাই হোক। ৭০/৭২ বছর আগের ঘটনায় ফিরে এসেছি-সেই নতুন জামা-কাপড়, নতুন জুতা। এগুল সবই ঈদের সওগাত। আমি প্রথম ঈদ করেছি মামাবাড়িতে।
টাঙ্গাইল জেলা শহর থেকে কয়েক কিলমিটার দূরে। বাসাইল থানায় কাউলজানি গ্রামে। বেশ মনে পড়ে আজ সে সব কথা। সোনাঝরা স্মৃতি। মামাবাড়ির পশ্চিম দিক দিয়ে বয়ে গেছে বংশাই নদী। বর্ষায় ভরা স্রোতে কলতান তুলতো। ওই বংশাই নদীতে আমার সাঁতার কাঁটা শেখা। ঝুপ ঝাঁপ, ঝাঁপাতে ঝাঁপাতে দু’দিনেই সাঁতার শিখে গিয়েছিলাম। বড় মামা প্রথম দিনেই বলল- বাহ্ বা। আমাকে ছোঁও তো মামাজি। আমি সাঁতরে গিয়ে অনেক দূরে ভেসে গিয়েছিলাম…। তড়িঘড়ি করে মামা ধরে আনেন আমাকে। তীরে তুলে দেন।
নানা ভাইয়ের হাত ধরে মামাদের পুরোনো বাড়ির মসজিদের পাশে ঈদগাহ। ওখানে জীবনের প্রথম ঈদের নামাজ আদায় করেছিলাম। সোবহান নানা, বাসেত নানা, নজল নানা, বাহাদুর নানা, বাকী খাঁন, মফু নানা, গিনি নানা, নাদু নানা, শহীদ মামা, কলি মামা, বিলাতি মামা, খোকা মামা, রুফল মামা, তাঁরা মামা, করিম মামা, মোস্তা মামা, মতি মামা এদের সাথে ঈদের নামাজ পড়েছি। প্রাণ খুলে দুস্তর মতো কোলাকুলিও করেছি। কোলাকুলি করতে শিখেছিলাম ওই জামাতেই। কী মজা! কী আনন্দ! সবার সাথে এতোটা এভাবে মেলা মেশা আমার শৈশবের স্বর্ণ বর্ণ বিভাময়-ঐশ্বর্য ও অর্জন। নবতিপর করিম মামা এখন মামীকে নিয়ে ছেলের বাসা শান্তিনগরে বাস করছেন।
ঈদগাহ থেকে ফেরার পথে তালুকদার বাড়ির নানাভাই-নানাবুজি, কহিনুর মামা, আরো মামাদের সঙ্গে দেখা করে এলাম। তারপর ধীরে ধীরে হেঁটে হেঁটে নানা ভাইয়ের হাতে হাত রেখে ফিরে এলাম ঠাকুর বাড়ি। মামা বাড়ি। ঠাকুর বাড়ির কথা শুনে কেউ কেউ চমকে যেতে পারো। ঠাকুর বাড়িটা একসময় ননী ঠাকুরের বাড়ি ছিল। তাই কেউ কেউ কখনও সখনও আমাকে জিজ্ঞেস করতো, নানারা ঠাকুর-টাকুর নাকি। তা হতে যাবে কেন। প্রাচীন লোকজন এখনো ওই নামই উচ্চারণ করে। নানা ভাই আর ননী ঠাকুর কলকাতার অদূরে বাউরিয়া ফোর্ড গোলস্টার জুট কোম্পানিতে একসঙ্গে চাকরি করতেন। বৃটিশ আমলে ভারত পার্টিশনের সময় তারা ইন্টারচেঞ্জ করে নেন বাড়ি ও জমাজমি। কলকাতার বাড়ি ননী ঠাকুর নিয়ে নেন। কাউলজানি গ্রামের বাড়িটা আর এর সঙ্গে বেশ কিছু হালের জমাজমি আদান-প্রদান করেন উভয়ে। এই হল ‘ঠাকুর বাড়ির’ রহস্য।
আমার আব্বুও তখন কংগ্রেসী রাজনীতি করতেন। পরে শিক্ষকতায় ব্রতী হন। পশ্চিমবঙ্গেই বসবাস শুরু করেন। হুগলী জেলার সবলসিংহপুরে একটি হাই স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। আব্বু ওই স্কুলের ফাউন্ডিং সেক্রেটারীও ছিলেন দীর্ঘদিন। ওই স্কুলের ফার্স্ট ব্যাচের ছাত্র ছিলেন মুশহুর কথাশিল্পী শওকত ওসমান। আমার আব্বু আবদুল হালিম জামালী ছিলেন ওই স্কুলের প্রধান শিক্ষক।
আজ এতোগুল দিন-রাত্রি গড়িয়ে গিয়েছে আমার- তবু কেন যেন মনে হয়, কালের গর্ভে সবই বিলীন হয়ে যাবে একদিন। তবু, তবু আমার জীবনের প্রথম ঈদের প্রভাতটি স্বর্গীয় আভায় মোড়ানো। ওই দিনটি আজও আমার মনে পড়ে। বেঁচে থাক, চিরদিন বেঁচে থাক ওই আমার প্রথম ঈদের প্রভাতটি। আগামী ঈদের সোনালী প্রত্যুষ হ’য়ে…।

প্রকাশকাল : জুলাই ২০১৬।