
মাসটা হলো ডিসেম্বর। গ্রামে গিয়ে শীতের সকালে ঘুম ভাঙতেই আরাফ বুঝতে পারল তার নাকে-মুখে ঠান্ডা বাতাস লাগছে। কম্বলের বাইরে হাত বের করতেই কনকনে ঠান্ডায় কেঁপে উঠল সে। তাড়াতাড়ি হাত কম্বলের ভেতরে ঢুকিয়ে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে রইল।
আরাফ বার বছরের এক ছটফটে বালক। ওরা শহরে থাকে। বার্ষিক পরীক্ষার পর শীতকালীন ছুটিতে মায়ের সঙ্গে ওরা দাদাবাড়ির গ্রামে এসেছে। বাবার কাজ পড়ে যাওয়ায় তিনি আসতে পারেননি।
এ সময় একটু পরে ঘরে ঢুকলেন আরাফের মা। তিনি বললেন, আজ বাইরে খুব কুয়াশা আর ঠান্ডা। ঘর থেকে বের হলে সোয়েটার আর টুপি পরে নিও কিন্তু। নাহলে ঠান্ডা লেগে শরীর খারাপ হয়ে যাবে।
মায়ের কথা শুনে চুপ করে থাকল আরাফ। শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগল— শীতকাল মানেই নতুন কিছু দেখার সময়। নতুন কিছু অনুভব করার সময়।
সূর্য উঠলেও ঘন কুয়াশার কারণে তার আলো পৃথিবীতে এসে পড়েনি তখনো। তবু আরাফ শীত উপেক্ষা করে উঠে পড়ল কম্বলের নিচে থেকে। হাতমুখ ধুয়ে দ্রুত নাশতা সেরে নিল। তারপর সে উঠোন পেরিয়ে বাইরের রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল একা একাই। কারণ, এ গ্রামের প্রায় সব অলিগলি তার চেনা।
বাইরে এসে আরাফ দেখল, কুয়াশা পুরো গ্রামটাকে যেন ধবধবে সাদা একটা পাতলা চাদরে মুড়িয়ে রেখেছে। তার ভেতর দিয়ে কাছের তালগাছটাও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। সামনে তাকালে মনে হচ্ছে, সামনে বুঝি আরেকটা দুনিয়া রয়েছে! যাকে কুয়াশার দুনিয়া বলা যেতে পারে।
হাঁটতে হাঁটতে পুকুরের ধারে গিয়ে সে দেখল, ঘাসের মাথায় ঝিলমিল করছে শিশিরবিন্দু। মনে হচ্ছে সেখানে ছোট ছোট কাচের চুমকিদানা বসানো। পুকুরের ওপারে বাঁশঝাড়ের দিক থেকে ভেসে এলো আরাফের কাছে অচেনা এক পাখির ডাক— কিক… কিক… কিক…
আরাফ কুয়াশার ভেতর দিয়ে সেদিকে তাকিয়ে দেখে, কয়েকটা বড় সাদা-কালো পাখি পুকুরের পানির ওপর ভেসে রয়েছে। পাশেই দুটো চিল উড়ে বেড়াচ্ছে।
এ সময় পুকুরের ধারে এলেন আরাফের দাদা। তিনি তাকে দেখে বললেন, ও, তুমি এখানে? আমি তো তোমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছি! তোমার মা বলল, বাইরে এসেছ। কিন্তু কোথায়, তা তো জানে না। তাই খুঁজতে খুঁজতে এই যে তোমাকে পেয়ে গেলাম। আর আগে থেকে তো আমি জানিই, আমার দাদাভাই প্রকৃতিকে কতটা ভালোবাসে। শহরে থাকলেও গ্রামের এই প্রাকৃতিক দৃশ্য তোমাকে মোহিত করে। এটা কিন্তু আমার খু&বই ভালো লাগে।
দাদার কথা শুনে আরাফও পুলকিত হলো। মুখে হাসি ছড়িয়ে বলল, তুমি ঠিকই বলেছ দাদাভাই। আমার এসব ভীষণ ভালো লাগে। আচ্ছা দাদাভাই, পুকুরে ওই যে ভেসে বেড়াচ্ছে, ওগুলো তো পাখি। কিন্তু আমি চিনি না। মনে হচ্ছে অচেনা কোনো পাখি!
দাদা বললেন, তুমি ঠিকই বলেছ। ওরা এদেশে অচেনা পাখি। আমাদের দেশের পাখি নয়। ওদেরকে আমরা বলি, পরিযায়ী পাখি। অনেক অনেক দূর দেশ থেকে আসে ওরা। হাজার হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে প্রতি বছর এই ডিসেম্বরে শীতের সময় ওরা উড়ে উড়ে আমাদের এখানে চলে আসে। আমাদের গ্রামের পুকুর আর ফসলের মাঠ আর বিলঝিলে ওরা নিরাপদে থাকতে পারে। পর্যাপ্ত খাবার পায়। মূলত এজন্যই ওরা এখানে ছুটে আসে।
পাখিগুলোর ওড়ার ভঙ্গিমা আর চরে বেড়ানোর দৃশ্য দেখে আরাফ অবাক হয়ে গেল। মনে হলো— ওরা সত্যিই যেন বিশেষ অতিথি— যেন আমাদের দেশে শীতের দূত হয়ে এসেছে।
ঠিক তখনই রাস্তার দিক থেকে একটা হাঁক শোনা গেল— টাটকা খেজুর রস হবে!
গাছি আনার কাকা খেজুর গাছ থেকে সকালের রস সংগ্রহ করে বড় মাটির হাঁড়ি কাঁধে নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। বললেন, বাড়িতে এসো ভাতিজা, সকালে ঠান্ডা টাটকা রস খাওয়ার মজাই আলাদা! চুলোর পাশে বসে খাবে এসো।
দাদা আরাফের দিকে তাকিয়ে বললেন, চলো, মুচমুচে মুড়ি দিয়ে রস খাবে। আনারের রস কিন্তু খুব মিষ্টি।
দাদার সঙ্গে আরাফ আনার কাকার পেছন পেছন তাদের বাড়ি গিয়ে প্রথমে ঠান্ডা রস পান করল। দারুণ ঠান্ডা। কিন্তু এই অসীম ঠান্ডার মধ্যেই যেন অসম্ভব মজা লুকিয়ে রয়েছে। চুলোর পিঠে বসে হালকা আগুনের আঁচে রস খেতে খুব ভালো লাগল।
এরই মধ্যে আনার কাকা সংগ্রহ করা রস চুলোর তাপালে চাপিয়ে দিয়েছেন। কিছু সময় পর তাপালে টগবগ করে গরম রস নড়তে লাগল। ধীরে ধীরে রসের মিষ্টি গন্ধও বের হতে শুরু করল। রসের সেই গন্ধ হালকা মিষ্টি, হালকা ধোঁয়াটে, মনে হলো যেন পুরো শীতকে একটি তাপালের ভেতর ভরে রেখেছেন আনার কাকা।
জিজ্ঞেস করতেই আনার কাকা রস সংগ্রহের প্রক্রিয়া নিয়ে বললেন, সন্ধ্যার আগে গাছের মাথার একটা অংশ পাতলা করে কিছুটা কেটে সেখানে মাটির কলস ঝুলিয়ে দিতে হয়। গাছ থেকে সারারাত ধরে ফোঁটায় ফোঁটায় রস নামে সেই কলসের ভেতর। ভোরবেলা সেই রস নামিয়ে আনতে হয়। জানো তো, এই রস কিন্তু কেবল শীতকালেই পাওয়া যায়। অন্য সময় খেজুর গাছ থেকে এই রস কোনোভাবেই পাওয়া যায় না।
এরপর আরাফ মাটির কাপভর্তি গরম রস খেলো। এতে তার গাল লাল হয়ে গেল, শরীরটাও কিছুটা গরম লাগল।
সেখান থেকে দাদার সঙ্গে বাড়িতে ফিরতেই তারা দেখল, আরাফের মা আর দাদি উঠোনে উনুন জ্বালিয়ে পিঠা বানাচ্ছেন। উনুনের ধোঁয়া, ভাপা পিঠার গন্ধ, সরু নল দিয়ে ভাপ ওঠা— সব মিলিয়ে উঠোনটা যেন ছোট্ট একটা উৎসবে পরিণত হয়েছে।
তাদের দেখে দাদি হাসতে হাসতে বললেন, আজ এখন কিন্তু ভাপা পিঠা, চিতই হবে। আর সন্ধ্যায় পাটিসাপটা হবে। খেজুরের গুড় আছে— চিন্তা নেই।
দাদির কথা শুনে আরাফ খুশি হয়ে গেল। একটা ভাপা পিঠা তুলে নিয়ে চিবোতে লাগল। পিঠার ভেতর থেকে গুড় গলে নরম হয়ে গেছে। তার মুখে যেন এ সময় মিষ্টি শীত ঢেউ খেলে গেল। পিঠা খেয়ে খানিকটা বিশ্রাম নিয়ে সে দৌড় দিল মাঠের দিকে। দেখল, ক্ষেতে জমে থাকা কুয়াশারা তখন ধীরে ধীরে উঠে যাচ্ছে। চাষিরা মাঠে এসেছেন। সরষে ক্ষেতে ফুলের হলুদ গন্ধ চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে। যেন একটা বিশাল হলুদ সামিয়ানা মাঠটাকে ঢেকে দিয়েছে। এই সঙ্গে কোথাও বাঁধাকপি, কোথাও ফুলকপি কেটে গাদাগাদি করে রাখা হচ্ছে বাজারে নেয়ার জন্য।
হেঁটে হেঁটে সারা মাঠ ঘুরে দেখল সে। চারদিকে যেন সবুজের ছড়াছড়ি। এসব দেখতে দেখতে এক সময় বাড়ি ফিরে এলো সে। বিকেলে আরাফ দেখল, তার মা হাঁড়িভরা দুধ জ্বাল দিচ্ছেন। তিনি বললেন, আজ আমরা খেজুর গুড়ের পায়েস করব। শীতের শুরুর দিকের এই গুড়ের স্বাদই আলাদা। দুধ, নারকেল আর গুড়ের মিশেলে অমৃত স্বাদ হবে পায়েসের।
হাঁড়ির ভেতর টগবগ করে দুধ ফুটছে। তাতে গুড় দেয়ার পর বাদামি রঙ ধারণ করল। তার উপরে যেন মাখন জমে গিয়েছে। অপূর্ব ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে তা থেকে।
এসব দেখে আরাফ মনে মনে বলল, শীতের সবকিছু সত্যিই অন্যরকম। শীতের স্বাদ-গন্ধ অতুলনীয়!
দুপুরের কিছু আগে নরম আলো ছড়িয়ে সূর্য দেখা দিয়েছিল। বিকেল হতেই হালকা ঠান্ডা বাতাস শুরু হলো। সূর্য ডুবতে শুরু করলে শীতটা আবার বাড়ল। চারদিকে ধোঁয়া-ধোঁয়া গন্ধ ছড়ানো। দাদা ভাই গোয়ালে গরুর খাবার দিচ্ছেন। গোয়াল থেকে এ সময় খইল পচা গন্ধ আরাফের নাকে এসে লাগছে। পচা হলেও কেন যেন খইলের এই গন্ধটা আরাফের ভীষণ ভালো লাগে। দাদি আগুন জ্বালিয়ে হাত-পা গরম করছেন। তার পাশেই মা বসেছেন। আরাফও সেখানে যোগ দিল। সবকিছু ছাপিয়ে শীতল হাওয়া ছুটে যাচ্ছে চারদিকে।
সন্ধ্যা নামতেই পরিযায়ী পাখিরা এখান-সেখান থেকে ফিরে এসে পুকুরের ধারের উঁচু গাছগুলোতে এসে বসতে শুরু করেছে। একই সঙ্গে তারা কিচিরমিচির ডাক শুরু করে দিয়েছে। এ সময় মনে হলো— ওরা যেন বলছে, শীতের এই গ্রামটা আরাফের মতো আমাদেরও ভীষণ ভালো লাগে।
রাতে খেয়ে-দেয়ে আরাফ কম্বলের নিচে গুটিশুটি মেরে শুয়ে পড়ল। মা শুয়েছেন পাশেই। দাদি এ সময় গল্প বলা শুরু করলেন। বললেন, শীত আমাদের শুধু ঠান্ডার কাঁপুনি দেয় না। নিয়ে আসে অতিথি পাখি, নানারকম ফুল-ফসল, পিঠাপুলি, খেজুর রস। আর পুরো গ্রামকে করে তোলে আলাদা রকমের স্নিগ্ধতার মোড়কে আবদ্ধ।
আরাফ তৃপ্তির ঢেকুর তুলে হাসল। ঘুম ঘুম চোখে তার মনে হলো, শীতটা আসলেই গল্পের প্রাচুর্যে ভরা এক মায়াময় ঋতু।
প্রকাশকাল: ফেব্রুয়ারি ২০২৬



