
দাদীমা আচমকা হাতের তালুতে বেশ খানিকটা সর্ষের তেল নিয়ে রিফাতের মাথায় ঘষতে থাকেন। এ্যাঁ— এটা কী হলো? হলোটা কী? রিফাত বোকা বোকা চোখে, অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে থাকে।
হরলিকসের বোয়ামে রাখা সোনালি রঙের এই তেল গাঁয়ের ঘানি থেকে নিজের ক্ষেতের সর্ষে ভাঙিয়ে এনেছেন। প্রাণের ধন খাঁটি এই তেল কি দাদীমা এমনি এমনিই দিয়েছেন?
গুলবাহার বেগম বলেন, এ্যাই ব্যাক্কল, তাকায়া আছস ক্যান? এই তেল তালুতে ঘষলে মাথা ঠাণ্ডা থাকব।
বলেছে তোমাকে।
চাপা স্বরে কথা বলে বুনো ষাঁড়ের
মতো ঘোঁৎ ঘোঁৎ করতে থাকে রিফাত।
দাদীকে কে বোঝাবে— এখন আর আমরা ফেঞ্চুগঞ্জে নেই, ঢাকায় আছি। এখানকার নামী স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছি। এই তো কদিন আগে ভর্তি পরীক্ষা দিয়েছি, আব্বুর সাথে গিয়ে লিস্টে নাম দেখে এসেছি। সেদিন দাদী চুলে তেল মাখিয়ে দেয়নি তো। তাহলে পাশ করলাম কী করে?
আজ বকের পালকের মতো কড়া ইস্ত্রি করা ধবধবে সাদা শার্ট পরেছে, নেভি ব্লু রঙের শর্টস, গলায় নেভি ব্লু রঙের টাই। বুকের ভেতরে মুঠো মুঠো খুশি ছিল এতক্ষণ। ক্লাস থ্রি-তে ভর্তি হবে ও, বয়স এখন ওর নাইন প্লাস। আর দেড় মাস পর দশ বছরে পা রাখবে সে। জন্মদিন আসছে, সব মিলিয়ে দারুণ খুশি ছিল সে। দাদীর মাখানো খাঁটি সর্ষের তেল মেজাজটা ওর বিগড়ে দিলো।
রাগে-দুঃখে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে রিফাত।
ছেলেকে সান্ত¦না দিয়ে আম্মু বলেন, দাদী আগের দিনের মানুষ তো, তাই চুলে তেল মাখিয়ে দিয়েছেন। তোমার আব্বু আর বড় চাচুর চুলে এমনই করে তেল মাখিয়ে সিঁথি কেটে দিতেন।
এবার ফিক করে হেসে ফেলে রিফাত।
তেলে জবজবে চুল, তাঁর মাঝে সিঁথি কেটে—
আব্বু ডাকছেন— কই রিফাত, তাড়াতাড়ি করো—
এই তো আব্বু এখন খেতে বসব।
পুরনো নরম কাপড় দিয়ে তেল মুছিয়ে দেয় আম্মু। মন খারাপ করা সুরে রিফাত বলে, এখন সবাই চুলে জেল দেয় আম্মু।
রুখসানা চুলের ফাঁকে ফাঁকে পাউডার ছিটিয়ে চুলগুলো উড়ু উড়ু করে দিলেন। বলেন, বাহ্ এবার বেশ দেখাচ্ছে তো আমার ছেলেটাকে।
রুখসানা আজ মাছ রাঁধেনি, তাড়াহুড়া করে খেতে গিয়ে যদি কাঁটা বিঁধে গলায়। কাবাব, সালাড, আর মুরগির ঝোল দিয়ে খেতে থাকে রিফাত। বাটিতে বাদাম-কুচো আর গোলাপজল ছিটিয়ে দেয়া ঘন ফিরনি, খুব প্রিয় খাবার ওর।
এবার থেকে দারুণ খুশি রিফাত। প্রায় ছয় মাসের মতো স্কুলে যেতে পারেনি। কী এক বিদঘুটে সময় বদলি হয়েছেন আব্বু। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসার খবরটা দারুণ ছিল। এবার থেকে ও ঢাকায় থাকবে, স্বপ্নের শহরে যাচ্ছে রিফাত। সাকিব-মুশফিককে দেখবে, সামনা-সমনি দেখতে পাবে ওদের, মাঠে বসে খেলা দেখবে— এসব ভেবে শিউরে উঠছে সে। ক্লাসের বন্ধু টিটো, গোল্লা, রুবেল মন খারাপ করা সুরে বলেছিল, তুই ঘুড়ি উড়াবি না রে রিফাত?
উড়াব না মানে? লাল নীল সবুজ হলুদ সব রঙের ঘুড়ি উড়াব।
শীতের সকালে, ছুটির দিনে, সোনালি বিকেলে খোলা মাঠে, কুশিয়ারা নদীর ছুঁয়ে যাওয়া মিষ্টি বাতাস গায়ে মেখে নাটাইয়ের সুতো ছেড়ে দিত। এঁকে বেঁকে ঘুড়ি আকাশের রোদ আর গুচ্ছ মেঘের মাঝে ছুটে বেড়াত। বুকের ভেতর লাফিয়ে উঠত আনন্দের ঢেউ।
রিফাত দু’ আঙুলে তুড়ি বাজিয়ে বলেছিল, ঘুড়ি ওড়াব না মানে? ঘুড়ি ওড়াব আর তোদের কথা মনে করব।
কথা বলতে বলতে গলা বুজে এসেছিল ওর।
স্কুল থেকে ফিরে আজ ফের মনে পড়ছে ফেঞ্চুগঞ্জের বিশাল সার কারখানা, খোলা মাঠ, পুরনো বট আর হিজল গাছটির কথা, তিরতির করে বয়ে যাওয়া কুশিয়ারাকে কি কোনো দিনও ভুলতে পারবে রিফাত— কক্ষনো নয়।
ইউসুফ আর রুখসানা ছেলেকে ভর্তি করার জন্য বেশ কিছু স্কুলে গেছেন, এক কথাই শুনেছেন— বছরের মাঝামাঝি সময় ভর্তি করা যাবে না। ফাইনাল পরীক্ষার পর ভর্তি পরীক্ষা হবে, পাশ করলে অবশ্যই নেয়া হবে।
এ বয়সের ছেলে চার-পাঁচ মাস বাড়িতে বসে কাটাবে?
ইউসুফ মতিঝিল অফিসে চলে যান, দাদী গাঁয়ের বাড়িতে ফিরে গেছেন, আম্মু ঘরসংসারের কাজ নিয়ে ব্যস্ত— রিফাতের ভীষণ ফাঁকা লাগে সারা দিন।
কেন এ সময় অফিসের ওপরওয়ালা আব্বুকে বদলি করল? ও স্কুলে যেতে পারছে না, একা একা ওর সময় কাটছে না— এ প্রশ্নের জবাব কে দেবে?
চারতলায় ওদের বাসা। ছোট্ট বেলকনি দুটো। গ্রিলের নকশা মুঠো করে ধরে ও আকাশ দেখে। রঙবাহারি মেঘ, কখনো বা
বৃষ্টি, কখনো বা তেতে ওঠা রোদ।
ব্যালকনিতে কাপড় শুকোতে দিতে দিতে রুখসানা বলে, পড়ছ না কেন রিফাত?
মন খারাপ সুরে জবাব আসে, পুরনো বই পড়তে পড়তে সব মুখস্থ হয়ে গেছে আম্মু। আর ভাল্লাগে না।
এই তো আর ক’টা দিন, দু’তিনটে স্কুলে ভর্তি পরীক্ষা দেবে, আমি জানি তোমার সব ক’টা স্কুলেই হবে। এবার তাহলে অঙ্ক কষো।
মা তার কাজে ব্যস্ত। বলপেন আর অঙ্ক কষার খাতা নিয়ে মাথা গুঁজে বসে থাকে ও। ফের বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ায়। ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে রিফাত। গোল্লা, টিটো রুবেলকে বলেছিল, ঢাকায় যাচ্ছি তো দেখিস, আব্বুর সাথে স্টেডিয়ামে গিয়ে তামিম-সাকিব, মাশরাফি ভাইকে ছুঁয়ে দেখব, লাল-নীল-হলুদ-সবুজ ঘুড়ি উড়াব, ঢাকার সবার ঘুড়ি কেটে দিয়ে ভোকাট্টা বলে খুব চ্যাঁচাব।
গোল্লা বলেছিল, হ্যাঁ খুব চ্যাঁচাবি রিফাত, ঢাকার মানুষ যেন জানতে পারে ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে মি: রিফাত এসেছে।
ওরা কেউ তো জানে না— যা ভেবেছিল তা কিছুই হয়নি। বছরের মাঝখানে কেউ বদলি হলে তার ছেলে কোনো স্কুলে পড়তে পারে না। সবখানেই ডিসিপ্লিন রয়েছে, নিয়মের হেরফের হওয়ার জো নেই।
আব্বু-আম্মুকে লুকিয়ে বিছানায় শুয়ে, বালিশে মুখ গুঁজে মাঝে মাঝেই কেঁদেছে রিফাত। সে নীরব কান্না কেউ শোনেনি। অফিসের ওরা আব্বুকে ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে মতিঝিল অফিসে বছরের মাঝামাঝি কেন নিয়ে এলো? নতুন স্কুলের টিচার প্রিন্সিপ্যাল কেউ ভাবেননি একটি ছোট্ট ছেলে চার-পাঁচ মাস স্কুল ছাড়া কিভাবে থাকবে?
ছোটদের মনের কথা নিয়ে কেউ ভাবে না। বড়দের কথা ভাবতে ভাবতে ভীষণ কান্না পায় ওর।
(২)
আজ রিফাত দারুণ খুশি। নয়াপল্টনের বাসা থেকে পুরান পল্টনের নামী স্কুলটি বেশ কাছে। এ বিল্ডিংয়ের আকাশ আর রুবাইও এই স্কুলেই পড়ে। ও আজ চমৎকার সেই স্কুলে ভর্তি হতে যাচ্ছে।
প্রিন্সিপ্যাল ম্যাম জিজ্ঞেস করেন, হোয়াট ইজ ইয়োর নেম?
মিষ্টি রিনরিনে সুরে ও জবাব দেয়, মাই নেম ইজ হাসনাইন রিফাত। একটুও ভয় পায়নি ও, স্কুলে ভর্তি হবার আনন্দে দারুণ খুশি সে।
আব্বু আজ ওর জন্য অফিস থেকে ছুটি নিয়েছেন রিফাত টিচারের সঙ্গে ক্লাসে যায়। নতুন কাউকে দেখলে খুব কৌতূহল হয়, আজও তাই হলো, স্যার চলে যাবার পর মিষ্টি চেহারার একটি ছেলে (পরে জেনেছে ওর নাম পরশ) এগিয়ে এসে বলল, ও হলো ওয়াহিদ— আমাদের ক্লাসের ফার্স্ট বয়, ও হলো অমিত— সেকেন্ড বয়।
অমিতের সাথে হ্যান্ডশেক করে রিফাত কিন্তু ওয়াহিদ সরে গেল। ভাবখানা এই— তুমি ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে এসেছ— তোমার সঙ্গে ভাব করতে আমার বয়েই গেছে।
নতুন ক্লাস শুরু হয়েছে, তেমন করে পড়াশোনা শুরু হয়নি, আব্বু টাকা পয়সা মিটিয়ে দিয়ে রিফাতকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
আজ খুব ভালো লাগছে ওর। বুকের ভেতরে যদিও ছোট্ট একটি কাঁটা খচ্খচ্ করে, ফার্স্টবয় বলেই কি ওয়াহিদ হ্যান্ডশেক করল না ওর সাথে? কী জানি।
এরপরও ঢাকার একটি নামী স্কুলের ছাত্র সে, আগামীকাল থেকে পিঠে ব্যাগ নিয়ে, মজাদার টিফিন নিয়ে সে আকাশ আর রুবাইয়ের সাথে স্কুলে যাবে। আম্মুরাও অবশ্য সঙ্গে যাবেন। আনন্দে শিরশির করে ওঠে ওর শরীর। এত দিন মনে হতো ওর চারপাশে সব ফাঁকা, কেউ নেই- কিছু নেই। গ্রিলে বসা দুটি শালিক পাখি, নীল আকাশের সাদা মেঘদল, পাশের বাড়ির ঝুপসি আম আর শজনে গাছকে ও মনে মনে বলে, জানো— আজ থেকে আমি ‘লিটল স্কুল’-এর ছাত্র। এখন থেকে আমি বোকা বোকা চোখে হাঁ করে মেঘ-বৃষ্টি পাখিকে দেখব না। আমার অনেক কাজ, হোমওয়ার্ক, বাংলা কবিতা, ইংরেজি রাইমস মুখস্থ করা, অঙ্ক কষা— খুব বিজি আমি এখন। ভাবতেও দারুণ ভালো লাগছে।
সবই হবে ধীরে ধীরে। আব্বুর হাত ধরে স্টেডিয়ামে তামিম— সাকিব আর মাশরাফি ভাইদের খেলা দেখা, ওদেরকে ছুঁয়ে দেখা— ইস্স্— ভাবতেও সারা শরীর শিরশির করে ওঠে। কত কী যে করবে সে!
এবার থেকে রোজ বিকেলবেলা ঘুড়ি ওড়াবে রিফাত। বেলকনি থেকে তো ওড়ানো যায় না। ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ছাদে উঠে যাবে আকাশ আর রুবাইকে নিয়ে। রুখসানা বলেছে, এ বাড়ির ছাদে রেলিং দেয়া আছে, নিচে পড়ে যাবার ভয় নেই। ঘুড়ি ওড়ানো ওর প্রিয় খেলা।
এত দিন সাঁতার কাটা, কবিতা আবৃত্তির ক্লাস আর ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে মশগুল ছিল আকাশ আর রুবাই। ফুটবল খেলা ওদের তেমন টানে না। টানবে কী করে? এখানে খেলার মাঠ নেই, খোলা জায়গা নেই। ফেঞ্চুগঞ্জে ওরা শরীরের সমস্ত জোর পায়ে এনে বলে পা ছুঁইয়ে গোলপোস্টে পাঠিয়ে দিত— এখানে শুধু বড় বড় বিল্ডিং দেশলাই বাক্সের মতো জানলা-ফুটবল খেলার জায়গা নেই তো।
আজকাল সোনামাখা বিকেলে রিফাত ওদেরকে নিয়ে ছাদে যায়, হাতের কৌশলে লাটাই ঘোরায়, সুতো ছাড়ে, আবার সুতো গুটিয়ে নেয়। এগুলো দেখে।
শিখতে গিয়ে দারুণ লাগে আকাশ-রুবাইয়ের। ঘুড়ি যখন কেটে গিয়ে আমগাছের পাতার মাঝে, পানির ট্যাংকির মাঝে আটকে যায় তখন ‘ভোকাট্টা’ বলে গোটা নয়াপল্টন মাতিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে। রুখসানা বলে, আস্তে রে আস্তে, চ্যাঁচাস না রে— বাড়িওয়ালা আঙ্কেল এসে যাবে।
আনন্দের এই হুল্লোড়ে মাঝে মাঝেই হাজির হয়ে যান উনি। আকাশ চাপাসুরে বলে, নাম নিয়েছি অমনিই মানুষটা এসে হাজির।
এ্যাই, এত চিল্লাপাল্লা কিসের রে? হার্ট অ্যাটাকে মারবি নাকি আমারে? আপনারা ক্যামন মা, পোলাপানরে কিছু কন না।
গুটি গুটি পায়ে ওরা নেমে আসে, আবার ওরা ছাদে ওঠে
ঘুড়ি-লাটাই নিয়ে। বাড়িওয়ালার বকুনি ওরা গায়ে মাখে না।
ছেলে ঘুড়ি উড়াতে এত ভালোবাসে বলে শুক্রবার দিনটিকে আব্বু ঘোষণা দিয়েছেন— ঘুড়ি ওড়াবার দিন বলে।
শীতের দিনের ছুটির দিনগুলো তো ঘুড়ি ওড়াবারই দিন।
অলিম্পিকে কেন ঘুড়ির লড়াই হয় না— আব্বু?
সত্যিই তো ছোটদের— বড়দের সবার এই মজাদার খেলাটা তো অলিম্পিকে ঠাঁই পেতে পারে। বড়রা— যারা অনেক জানেন বোঝেন, ওরা কিন্তু ওসব ব্যাপার নিয়ে একেবারেই ভাবেন না।
রিফাত, আকাশ আর রুবাই— তিনটি ছোট ছোট ছেলের করুণ শ্বাস বাতাসে মিশে যেতে থাকে।
(৩)
কমলালেবু রঙমাখা শীতের দিনগুলো হুশ করে ফুরিয়ে গেল, ক্লাস থ্রি থেকে ফোরে ওঠে রিফাত। কী করে সময়গুলো যে চলে যায়। দ্বিতীয় হয়েছে ও, ফার্স্ট হয়েছে সেই গোমড়ামুখো ওয়াহিদ, হাড়জিরজিরে সেকেন্ড বয় অমিত হয়েছে থার্ড। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে আসা তেল জবজবে চুলের রিফাত হয়েছে সেকেন্ড। এই তো হয়, খেলায় যেমন হারজিত আছে পড়াশোনাতেও তাই।
স্কুলে যেতে যেতে, জানালায় দাঁড়িয়ে বাইরের গাছপালা-পথঘাট দেখতে দেখতে রিফাত অনুভব করে বসন্ত এসেছে। এলোমেলো পাগলা হাওয়া বয়ে যায়। দিন যেতে যেতে একদিন নতুন বছর এলো। বৈশাখের প্রথম দিন। খুব আনন্দ হলো। আব্বু-আম্মুর সাথে পথ চলতে চলতে গোলাপি রঙের হাওয়াই মিঠাই খেলো, আইসক্রিম খেলো। চিপস, ক্যাডবেরি কিনে এনে বাসায় ফিরল।
গেল বছর এত আনন্দ হয়নি। খুব এলোমেলোভাবে কেটেছে দিনগুলো। ফেঞ্চুগঞ্জ থেকে আব্বু ঢাকায় বদলি হবেন। ঢাকাতে অল্পভাড়ায় ভালো এলাকায় বাসা পাওয়া খুব মুশকিল। রিফাত কোথায় ভর্তি হবে, চেনা মহল ছেড়ে নতুন জায়গায় যাচ্ছে ওরা— খুবই অসহায় লেগেছে রিফাতেরও। কী করে বার্থডে এলো আবার নীরবে চলে গেল মনেও করতে পারে না ও। সন্ধেবেলা আব্বু অফিস থেকে ফিরেছিলেন কেক নিয়ে। একা একা কেক কেটেছে, কাউকে বলা হয়নি গেল বছর। এবার ফের বৈশাখ এসেছে, ইংরেজিতে মে মাসের চৌদ্দ তারিখে ওর জন্ম। বুকের ভেতরে খুব আনন্দ রিফাতের এর মাঝে শুনতে পায় দোহা থেকে ছোট চাচু আসছেন মাসখানেকের জন্য। ছোট চাচু ইঞ্জিনিয়ার, রিফাত খুব পছন্দ করে চাচুকে।
জন্মদিন আসছে, চাচুও আসছে— এত আনন্দ কোথায় রাখবে ও? মন খারাপ করা সময় আসে, ওকে হটিয়ে দিয়ে আনন্দও আসে।
বাড়িতে মেহমান আসা মানেই ভালো ভালো খাবার তৈরি হওয়া আর খাওয়া।
চাচু আসার পর নীরব-শান্ত বাড়িটি জমজমাট হয়ে ওঠে। চায়ের পেয়ালায় আয়েশী চুমুক দিয়ে চাচু বলেন, মে মাসের চৌদ্দ তারিখে জন্ম রিফাতের? বেশ হলো, খুব এনজয় করব।
রিফাতের দিকে তাকিয়ে বলেন, এ মাসে নামী একজনের জন্ম হয়েছে— বলো তো উনি কে?
পৃথিবীতে কত নামী মানুষই তো মে মাসে জন্মেছেন, ও কি সবার নাম জানে?
চাচু বলেন, হিন্ট্স্ দিই তোমাকে, গিটার হাতে উনি গান গেয়ে দেশে দেশে ঘুরে বেড়িয়েছেন। বলো, বলো পারবে না? ‘উই শ্যাল ওভারকাম সান ডে’— গানটি তো তারই। এটি মার্কিন দেশের মুক্তি সংগ্রামের বিখ্যাত গান।
খুব উৎসাহ নিয়ে রিফাত বলে, এই গানটির এতটুকুই তো জানি চাচু, খুব বিখ্যাত গান। আর কিছু তো জানি না।
আব্বু বলেন, নিউ ইয়র্কের পিট সিগারের গান না এটি? গিটার হাতে উনিই তো নানা দেশে গান গেয়ে বেড়িয়েছেন। মে মাসেই তার জন্ম— বুঝলে রিফাত?
ছোট চাচু বলে, চমৎকার চমৎকার গান রচনা করেছেন পিট সিগার।
ডিয়ার মিস্টার প্রেসিডেন্ট,
রিফাত বলে ওঠে— বাহ্—
অনেক গান লিখেছেন— ‘হোয়াট ডিড ইয়ু লার্ন ইন দ্য স্কুল’— স্কুলে তুমি কী শিখেছিলে, আর একটি দারুণ গান— ইফ আই হ্যাড আ হ্যামার— আমার যদি একটি হাতুড়ি থাকত?
খিল খিল করে হাসে রিফাত।
কী মজার মজার গান লিখেছেন পিট সিগার। ছোটচাচু এলেন বলে জানতে পারল মে মাসে তার জন্ম। চেষ্টা করলে রিফাতও কি বিখ্যাত হতে পারবে না? নিশ্চয়ই পারবে।
উনি পেরেছেন, আমি পারব না? আমাকে পারতেই হবে। মনে মনে আওড়াতে আওড়াতে চমৎকার একটি গান তৈরি করে সে।
‘মাই ড্রিম ইজ গোয়িং টু স্কাই’—
আমার স্বপ্ন আকাশে যাচ্ছে। হ্যাঁ-সত্যিই তো— ওতো রঙিন ঘুড়ি দিয়ে ওর স্বপ্নগুলো আকাশে পাঠিয়ে দেয়।
রুখসানা মাঝে মাঝে বলে, তুমি যদি মেঘের কাছে যাবার স্বপ্ন না দেখ, তবে তারার দেশে তুমি কী করে যাবে সোনা?
চৌদ্দ মে ওর জন্মদিনে খুব মজা হলো। গাঁয়ের বাড়ি থেকে দাদীমা এসেছেন।
কেমন আছ দাদুভাই?
ভালো আছি দাদীমা, আমার চুলে সর্ষের তেল মাখাবে না বলে দিলাম।
খুব দুঃখী সুরে দাদী বলেন, এবার তো তেল আনতে পারি নাই দাদু ভাই।
খুশি হয় রিফাত, খুব ভালো কাজ করেছ।
দুপুরে দাদীমা রাঁধলেন পোলাও-কোরমা আর রেজালা। খুব আনন্দ আজ বাড়িতে।
দাদী আব্বুর দিকে তাকিয়ে বললেন, কি রে দুরন্ত, তোকে আর একটু পোলাও দিই?
দুরন্ত! খাওয়া থামিয়ে অবাক হয়ে আব্বুর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে রিফাত।
আব্বুর নাম ইউসুফ তা সে জানে, কিন্তু দুরন্ত? আব্বু ছোটবেলায় নিশ্চয়ই খুব দুষ্টু ছিলেন।
ছোটচাচু ধীরস্থির, তার নাম ইমরান।
দাদী বলেন, ও শান্ত ছিল তো তাই তোমার দাদাজান ওর নাম রেখেছেন— সুশান্ত।
কী অদ্ভুত আর মজাদার কথা শুনতে পাচ্ছে ও জন্মদিনে।
সন্ধ্যার মুখে কাছের দু’চারজন বন্ধু এলো। আকাশ ও রুবাই এলো ওদের আম্মুদের সঙ্গে নিয়ে। কেক-চানাচুর-কলা তো ছিলই, ছোটচাচু নিয়ে এলেন চায়নিজ। দারুণ জমল ব্যাপারটি।
রুখসানা বলল, ঠিক ন’টায় খাওয়া-দাওয়া সার্ভ হবে। এবার আমরা গল্প করব সবাই মিলে।
রিফাত ফিসফিস করে ছোটচাচুকে বলে, চাচু চলো না প্লিজ, ছাদে গিয়ে আমরা ঘুড়ি ওড়াই।
আব্বু বলেন, সে কি রে, রাতে আবার ঘুড়ি ওড়ানো যায় নাকি?
জন্মদিনের খাবার খেয়ে বাড়িওয়ালা আঙ্কেল খোশমেজাজে আছেন। তবু দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলেন, বাড়ি ভাড়া দেবার মতো এ দুনিয়ায় ঝুটঝামেলার কাম আর নাই ইমরান সাহেব।
তিনিও সবার সাথে সাথে ছাদে যাবার সিঁড়ি ভাঙতে থাকেন। আকাশ-রুবাই আর রিফাতের হাতে ঘুড়ি আর লাটাই।
দাদীমা সিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে পায়ের ব্যথায় কোঁকিয়ে ওঠেন।
উফ্ আর পারি না রে, রাইতে ঘুড়ি উড়াইবো, পারেও বটে রিফাত।
আব্বু ভাতের ফেন আর কাঁচের গুঁড়ো দিয়ে সুতোতে মাঞ্জা দিয়েছেন, আনন্দে তাই তো ভাসছে রিফাত।
ছাদে উঠে অবাক হয়ে যায় সবাই। চাঁদের আলোয় ভেসে যাচ্ছে চারদিক। দাদীমা বলেন, ফকফইক্যা চন্দনি।
রুখসানা বলে, শুক্লপক্ষের চাঁদ— কী চমৎকার, পূর্ণিমা বোধ হয় খুব কাছে।
চাঁদের আলো শরীরে মেখে বড়রা সবাই চুপচাপ বসে থাকেন, শুধু রিফাত-আকাশ-রুবাই আকাশে উড়িয়ে দেয় নানা রঙের ঘুড়ি। ঘুড়িগুলো চাঁদের আলোয় আকাশে ভাসতে থাকে। ওর স্বপ্নগুলোও ঘুড়ির সাথে সাথে ভাসতে থাকে।
মনে মনে রিফাত পিট সিগার হয়ে গেছে। গুনগুন করে গাইতে থাকে সে নিজের গান— মাই ড্রিম ইজ গোয়িং টু স্কাই।
ঘুড়ির বুক ভরে ভেসে যাচ্ছে রিফাতের হাজারো স্বপ্ন।
ছোটচাচু কবিতা আবৃত্তি করতে থাকেন—
শীতসকালে হাজার রঙের ঘুড়ি ওড়ে ঐ
রাতেরবেলা সেই ঘুড়িকে পায় না খুঁজে কেউ।
রিফাত মনে মনে পিট সিগার হয়ে গেছে। সে কি হেরে যেতে পারে? কক্ষনো নয়।
রিফাতও আবৃত্তি করে—
চাঁদকপালী নীল আকাশে মেঘ-জোছনার ঝড়
রঙবাহারি আমার ঘুড়ি যাচ্ছে তেপান্তর—
বাড়িওয়ালা আঙ্কেল খুশিতে ডগমগ হয়ে বলেন,
এ তো চাচা-ভাইজতার কবির লড়াই রে।
অবাক হয়ে বড়রা দুধের বাটির মতো আকাশে চাঁদ আর ঘুড়ির লড়াই দেখতে থাকেন।
ঘুড়ির সাথে সাথে ছোট্ট রিফাতের মনও অনেক স্বপ্ন নিয়ে ছুটে যেতে থাকে দূরে, বহু দূরে— আকাশপারে।
প্রকাশকাল: জুন, ২০১৭



