কে যেন তপুর গালে কষে চড় মেরে বসে। চড় খেয়ে তপু ধড়ফড় করে বিছানায় উঠে বসে। এবং আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলতে তুলতে বলল, কে?
কারোও কোনো সাড়া শব্দ নেই। ঘর জুড়ে অন্ধকার। সে বেড সুইজ টিপে বাতি জ্বেলে খাট থেকে নেমে দেখে দরজা বন্ধ। তার বুক ধক করে ওঠে। থাই কাচের জানালা খুলে দাঁড়ায়। জোছনা রাত। ফুরফুরে বাতাস বইছে। একটানা ব্যাঙ ডাকছে। দূরে পাহাড়, বন জঙ্গল ও ল্যাম্প পোস্ট। সে জানালা বন্ধ করে বাথরুমে ঢোকে। লুকিং ক্লাসে চোখ পড়তেই চমকে ওঠে। ডান গালে স্পষ্ট চড়ের দাগ। সে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পায়চারি করে। বোতলের ছিপি খুলে পানি খায়। এ সময় বাইরে মুষল ধারে বৃষ্টি নামে। বিদ্যুৎ চমকায়। বিকট শব্দে বাজ পড়ে। সে বিছানায় শুয়ে এপাশ ওপাশ করে। এক সময় বৃষ্টি থেমে যায়। সেও গভীর ঘুমে তলিয়ে যায়।
কে যেন দরজার কড়া নেড়ে চিৎকার করে ডাকে। সে বড্ড বিরক্ত হয়। পাশ বদলে শোয়। তার চোখ খুলতে ইচ্ছে করে না। শরীরও খুব ক্লান্ত। যে দরজার কড়া নাড়ছে সেও নাছোড়বান্দা। একনাগাড়ে কড়া নেড়ে যাচ্ছে। সে বিছানায় উঠে বসে। দুই চোখ কচলে জানালা দিয়ে বাইরে তাকায়। বাইরে ঝলমলে রোদ। অদ্ভুত সুন্দর লাগছে পাহাড়গুলো। বিছানা থেকে নেমে জানালা খুলে দেয়। পাখিরা কিচিরমিচির করছে। পাহাড়ের চূড়া কেটে মাঠ বানানো হয়েছে। একদল কিশোর ছেলে ফুটবল খেলছে। তাদের সে কী চিৎকার চেঁচামেচি হইচই। আবারও দরজার কড়া নাড়ার শব্দ হয়। সে বিরক্ত হয়ে বলল, কে?
– বদি। দরজা খোল। সেই কখন থেকে ডাকছি। এত বেলা পর্যন্ত কেউ ঘুমায়? বদি তার চাচাতো ভাই। গতকাল সন্ধ্যের সময় ময়নামতি বদিদের বাসায় বেড়াতে এসেছে তপু। সে প্রায় দৌঁড়ে গিয়ে দরজা খোলে।
– কি তপু তোর কান নষ্ট? বদি মুচকি হেসে বলল।
– না না না, কান নষ্ট না, কান ঠিক আছে। আয় ভেতরে এসে বস। বদি ভেতরে এসে বসে।
রাতে কোনো সমস্যা হয়েছে?
– না। গতরাতে ঘুমের ঘোরে চড় খাওয়ার ব্যাপারটা চেপে যায় তপু।
– কালরাতে ময়নামতি জাদুঘর থেকে একটা কষ্টি পাথরের মূর্তি চুরি হয়ে গিয়েছে। শুনেছি এই কষ্টি পাথরের মূর্তির নাকি অনেক দাম। আট থেকে দশ লক্ষ টাকা হতে পারে। অথবা তারও বেশি।
বলিস কী? তপু দুই চোখ কপালে তুলে বলল।
– হুঁ। পুলিশ পুরো জাদুঘর ঘিরে রেখেছে। আজ কোনো দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকতে দিবে না।
– এ এলাকার নাম কী?
– এ এলাকার নাম হলো সালমানপুর।
একটা দশ এগারো বছরের ছেলে নাশতা দিয়ে যায়।
– এটা কোনো সাধারণ চোর না। কষ্টিপাথর সম্পর্কে ভালো জ্ঞান আছে, এ রকম লোক এ মূর্তি চুরি করেছে। আরও একটা কথা।
– কী? বদির কপালে চিন্তার ভাঁজ। সে বাম হাতের কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে। সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট।
– চোর একাধিক ব্যক্তি হতে পারে। তপু বিছানায় পা গুটিয়ে বসে আরাম করে বসে নাশতা করে।
– পাহাড়ে ঘুরতে যাবি? বদি জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল। তার আগে শালবন বৌদ্ধ বিহার দেখতে যাব। তুইও সাথে চল।
– হুঁ। এ সময় বদির ক্লাসমেট সাদেক ও বাচ্চু ভেতরে ঢোকে।
শালবন বৌদ্ধ বিহার বাংলাদেশের প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে অন্যতম। এতে সপ্তম থেকে বারশ শতকের প্রত্নতাত্বিক নিদর্শন পাওয়া যায়। সাদেক একটা টুল টেনে বসে।
– খ্রিষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীর শেষ থেকে অষ্টম শতাব্দীর প্রথম ভাগে দেববংশের চতুর্থ রাজা শ্রীভবদেব এ বৌদ্ধ বিহারটি নির্মাণ করেন। এ হলো মোটামুটি ইতিহাস, তাই না? বাচ্চু সবার দিকে এক নজর চেয়ে নিয়ে বলল।
– আর ময়নামতি জাদুঘরে প্রাচীন নিদর্শনগুলোর মধ্যে রয়েছে ব্রোঞ্জ ও পাথরের ছোট-বড় মূর্তি, ব্রোঞ্জের বিশাল ঘণ্টা স্বর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা, পোড়ামাটির ফলক, ব্রোঞ্জ, তামা ও লোহার সামগ্রী, মাটির খেলনা, কাঠের নিদর্শন, মৃৎশিল্পের নিদর্শন ও প্রাচীন হস্তলিপির পাণ্ডুলিপি উল্লেখযোগ্য। বদি একটানা কথাগুলো বলে ঢকঢক করে পানি খায়।
– এখন প্রশ্ন হলো ময়নামতি জাদুঘরে কষ্টিপাথরের মূর্তি আসলো কোত্থেকে? তপুর কথা শুনে সবাই তাজ্জব বনে যায়। বদি, সাদেক ও বাচ্চু এ ওর মুখের দিকে তাকায়। কারও মুখে কোনো কথা নেই।
– ময়নামতি জাদুঘরের দিকে যাই। দেখি ঘটনা কী। বদি বলল।
তপুর নাশতা খাওয়া শেষ। সবাই ঘর ছেড়ে বের হয়। তাতানো রোদ উঠেছে। তারা একটা অটোরিকশা চেপে জাদুঘরে আসে। লোকজনের চিৎকার চেঁচামেচি হইচই। পুলিশ কাউকে ভেতরে ঢুকতে দিচ্ছে না। টিভি চ্যানেল ও প্রেস মিডিয়ার লোকজন এসে ভরে গেছে। অনেক চ্যানেল সরাসরি খবর প্রচার করছে। অনলাইন পোর্টালের লোকজনও বসে নেই। তপু একজন সাংবাদিকের কানের কাছে মুখ এনে ফিসফিস করে বলল, এ জাদুঘরে কষ্টিপাথরের মূর্তি আসলো কোত্থেকে?
– দিনাজপুর জেলার কোনো এক গ্রাম থেকে এ মূর্তিটা সংগ্রহ করা হয়েছে। বর্তমান বাজারে এ মূর্তির দাম প্রায় দশ লক্ষ টাকার কম না। আগেও এ জাদুঘর থেকে প্রাচীন নিদর্শন চুরি হয়েছে।
– সেগুলো কি উদ্ধার হয়েছে? তপু চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল।
– না। তুমি এতো কথা জিজ্ঞেস করছো কেন?
– এমনি। কৌতূহল বলতে পারেন। পেছন থেকে বদি তাকে খোঁচা মেরে চুপ থাকতে বলে। সবাই জাদুঘর থেকে সোজা শালবন বৌদ্ধ বিহারে আসে। শালবন বৌদ্ধ বিহারে দর্শনার্থীদের ভিড়।
– চল এবার পাহাড় দেখতে যাই। তপু কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরির পর বলল।
– এ ভরদুপুরে ঐদিকটা যাওয়া ঠিক হবে না। সাদেক বলল।
– শুনেছি দিনে দুপুরে ডাকাতি হয়। বাচ্চু ঢোক গিলে বলল।
– ঠিক আছে। বাচ্চারা যদি যেতে না চায় তাহলে আমি একাই যাব। তপু হাসি চেপে রেখে বলল।
– কে বাচ্চা? বদি দুই চোখ কপালে তুলে বলল।
– সত্যি তো, বাচ্চা কে? সাদেকও অবাক।
– আমাদের সাথে তো কোনো বাচ্চা আসেনি। বাচ্চু চারদিকে চোখ বুলিয়ে বলল।
তপু আর কথা বাড়াল না। শালবন বৌদ্ধ বিহার থেকে নেমে পাহাড়ের দিকে হাঁটতে থাকে। প্রচণ্ড রোদ। সুনসান পরিবেশ। উঁচু নিচু পথ। হাঁটতে হাঁটতে তারা অনেক দূর চলে আসে। হঠাৎ ছয় সাত বছরের একটা ছেলে তাদের পথ আগলে দাঁড়ায়। ছেলেটার পড়নে হাফ প্যান্ট ও মাথায় গামছা বাঁধা। ছেলেটা দূরে একটা ঢিল ছুঁড়ে বলল, তোমরা কোথায় যাও?
– কোথাও যাই না। পাহাড় দেখতে এসেছি। তপু বলল।
– পাহাড় আবার দেখার কী আছে? ছেলেটা হলুদ দাঁত বের করে হাসে।
– তুমি এখানে কী করছ? তপু লক্ষ করে পেছন থেকে তার শরীরের ওপর কার যেন ছায়া পড়ে। সে এক মুহূর্ত দেরি না করে পেছনে ঘুরে দেখে কেউ নেই। তার বুক ধক করে ওঠে। আশ্চর্য মুহূর্তে ছায়াটা হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। তাকে পেছনে ঘুরতে দেখে অন্যরাও পেছনে ঘোরে।
– কী হলো তপু? বদি বলল।
– মনে হচ্ছে কারও ছায়া দেখতে পেয়েছি। পেছনে ঘুরে দেখি কেউ নেই। তপুর চেহারা ফ্যাকাশে।
– পিচ্চিটাকে জিজ্ঞেস করে দেখ, তার সাথে বড় কেউ আছে নাকি? সাদেক বলল।
– আমার খুব ভয় করছে। বাচ্চু এক মুহূর্তও দেরি না করে সামনে এগোতে থাকে। তপু পেছনে ঘুরে চমকে ওঠে।
ছোাট বাচ্চাটা নেই। বদি ও সাদেক পেছনে ঘুরে অবাক হয়ে যায়।
– হুঁ বুঝতে পেরেছি। ছেলেটার সাথে আরও মানুষজন আছে। তপুও একটু ভয় পায়। বদি তাদের রেখে সামনে কয়েক কদম হেঁটে আবার ফিরে আসে।
– কিরে কী বুঝলি? সাদেক বলল।
– একটা পোড়া গন্ধ পাচ্ছি। মনে হচ্ছে কারও তরকারি পুড়ে গেছে। বদি শব্দ করে শ্বাস নেয়।
তোর ধারণা সঠিক। তপু বুক ভরে শ্বাস নিয়ে বলল।
চল আর একটু সামনে এগিয়ে যাই। সাদেকের বুক ধড়ফড় করে। কে যেন বাঁশি বাজায়। অদ্ভুত সে সুর। তপু ডান কানে হাত দিয়ে বুঝার চেষ্টা করে, কোথা থেকে এ সুর ভেসে আসছে। পাহাড়ের চূড়া থেকে একটা পাথর গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে। এটা দেখে তারা হকচকিয়ে যায়।
ঘটনা কী? তপুর চোখে মুখে আতঙ্কের ছাপ।
সম্ভবত কেউ আমাদের উপস্থিতি পছন্দ করছে না। চল ফিরে যাই। বদি বলল।
– চুপ থাক। দেখি না কী হয়। বাঁশির সুর থেমে গেছে। তপু এদিক ওদিক কী যেন খোঁজে। একটা ঝোপের ভেতর থেকে ধোঁয়া বেরোতে দেখে। খুব মনোযোগ দিয়ে না দেখলে বুঝার উপায় নেই। সে চিৎকার করে ওঠে। তার চিৎকার শুনে বদি সাদেক দৌড়ে আসে।
– কী তপু? এভাবে চিৎকার করে উঠলি কেন? বদি বলল।
– সাপে কেটেছে? পাহাড়ে কিন্তু বিষধর সাপের অভাব নেই। সাদেক বলল।
– এ পাহাড়ের নিচে মানুষ থাকে। তারা আমাদের ফলো করছে। সাবধানে থাকতে হবে। তপুর কথা শুনে বদি ও সাদেক ঘাবড়ে যায়।
– সেজন্য এদিকে কেউ আসে না। জায়গাটা কেমন নির্জন, তাই না? বদি বলল।
– হুঁ। তপু ঝোপের চারপাশ ভালো করে দেখে। তিন থেকে চার ফুট দূরত্ব বজায় রেখে হাঁটছে বদি আর তপু। তাদের পেছন পেছন হাঁটছে সাদেক। হঠাৎ ঠাস করে একটা শব্দ হয়। তপু আর বদি পেছনে ঘুরে দেখে সাদেক নেই। তপুর শরীর থরথর করে কাঁপে। বদি মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। তার শরীর অসম্ভব রকম কাঁপছে।
– এটা কী হলো? বদি কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
– একটু ভাবতে দে। মোটেও ঘাবড়াবি না। তপু জোরে চিৎকার করে। আবারও বাঁশি বাজে। বাঁশিতে করুণ সুর। মনে হচ্ছে কেউ কাঁদছে। এক ঝাঁক সাদা বক উড়ে যায় উত্তরে। সম্ভবত কাছে কোথাও জলাশয় আছে।
– সাদেককে ছাড়া আমরা এখান থেকে যাব না। বদি উঠে দাঁড়ায়।
– একদম ঠিক। তপু একটা লাঠি খুঁজে নিয়ে পাহাড়ের চূড়ায় উঠতে থাকে। বদি তাকে অনুসরণ করে। পাহাড় চূড়ায় উঠে হাঁপিয়ে ওঠে দুইজন। চূড়ার ওপর শুকনো কাঠের স্তুপ। একটা কুকুর আয়েশ করে ঘুমিয়ে আছে। তাদের আসার শব্দ পেয়ে চোখ মেলে তাকায় এবং এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে নেমে যায়। তপু উপুড় হয়ে বসে দেখে স্তুপের নিচে একটা গর্ত।
কী দেখছিস? বদিও উপুড় হয়ে বসে। তপু ইশারায় তাকে স্তুপের নিচে গর্তটা দেখায়। দুইজন উঠে দাঁড়ায়। এবং শুকনো কাঠের স্তুপ সরাতে থাকে। তপু স্পষ্ট দেখতে পায় বদির হাত কাঁপছে।
– শুকনো কাঠের স্তুপ সরাতেই দেখে বিশাল একটা গর্ত। গর্তে নামার জন্য মই রয়েছে। তপু মই বেয়ে নিচে নামতে থাকে। বদিও তার পেছন পেছন নামে। নিচ থেকে বাদ্য-বাজনার শব্দ ভেসে আসছে। তারা যতই নিচে নামছে বাদ্য-বাজনার শব্দ ততোই স্পষ্ট হচ্ছে। নিচে নেমে দেখে একটা সুড়ঙ্গ। সুড়ঙ্গ ধরে কিছু দূর এগোলে বিশাল একটা ঘর। ঘর জুড়ে আলো আঁধারির খেলা। একটা খাটের ওপর ঢোল, তবলা, খোল, হারমোনিয়াম ও বাঁশি বাজাচ্ছে কিছু লোক। আর একটা লোক নিচু গলায় গান গাইছে। খাটের চারপাশে বসে আছে আরও কিছু লোক।
– হঠাৎ ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। লোকগুলো তাদের দেখে একসাথে হইচই শুরু করে। পাশের রুম থেকে একটা লোক বেরিয়ে এসে গোঁফের তলায় মুচকি হাসি লুকিয়ে রেখে বলল, তোমাদের স্বাগতম।
– তপু এতক্ষণে লক্ষ করে একপাশে বাচ্চু ও সাদেককে পিছমোড়া করে বেঁধে রাখা হয়েছে। সে মনে মনে অংক কষে। এ সুড়ঙ্গ ঘরে ঢোকার আরও পথ আছে। তপু হুংকার দিয়ে ওঠে, আমাদের এখান থেকে যেতে দাও। তা না হলে…
– তা না হলে কী? তোর তো দেখছি অনেক সাহস। আমাদের ডেরায় এসে আমাদেরকে হুমকি দিস। লোকটা খাটে বসে। লুঙ্গির কোচড় থেকে একটা পিস্তল বের করে তাদের দিকে পিস্তল তাক করে ধরে।
– ভয় দেখাচ্ছ না? ভয় পেলে কেউ এ গর্তের ভেতর ঢোকে? তপু লোকটার চোখে চোখ রেখে বলল।
– বুঝতে পেরেছি। সোজা আঙু লে ঘি উঠবে না। আঙুল বাঁকা করতে হবে। লোকটা কাদের যেন ইশারা করে। সাথে সাথে দুইজন লোক তপু আর বদিকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। তারপর লোকগুলো এক এক করে সুড়ঙ্গ দিয়ে চলে যায়।
– এখন কী হবে তপু? আমার তো খুব ভয় করছে। বাচ্চু হতাশ হয়ে বলল।
– একজন আরেকজনের উল্টো দিকে ঘুরে হাতের বাঁধন খুলতে চেষ্টা কর। তপু বলল।
– আচ্ছা এখানে কী আরও থাকার ঘর আছে? বদি বলল।
– হ্যাঁ আছে। সর্দার যে ঘরে থাকে সে ঘরে পুরোনো জিনিসপত্রে ভরা। বাচ্চু বলল।
– জিনিসপত্র না, আর কিছু আছে? তপু বলল।
– বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রসস্ত্রও আছে। এখন তারা সবাই গোসল করতে গেছে। এরা যা করে একসঙ্গে করে।
– ঘটনা সত্যি? তপু হাত খোলার চেষ্টা করে।
– হুঁ সত্যি। নিজ চোখে সব দেখেছি।
– বদি চিৎকার করে ওঠে। তার হাতের বাঁধন খুলে গেছে। সে দ্রুত সবার হাতের বাঁধন খুলে দেয়। তারপর একটার পর একটা ঘর ঘুরে দেখে তারা। প্রত্যেক ঘরে ছোট ছোট খাট রয়েছে। মনে হচ্ছে এখানে তারা অনেক দিন ধরে থাকে। সর্দারের ঘরে ঢুকে চমকে ওঠে তারা। ঘর জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য মূর্তি। লোহা, কাঠ, চুন-সুরকি ও পাথর বিভিন্ন ধরনের মূর্তি আছে।
– তার মানে এরাই মূর্তি চোর? তপু মনে মনে অংক কষে বলল।
– বাবা জাদুঘরে চাকরি করেন। সে সুবাদে রোজ স্কুলে যাওয়া আসার পথে কিছুক্ষণের জন্য হলেও জাদুঘরে ঢু মেরে দেখি। তাই কষ্টি পাথরের মূর্তি দেখলেই চিনব। কারণ আমি এ মূর্তি দেখেছি কয়েকশবার। দেবতা মহাদেবের মূর্তি।
– ও, গুড। একটা সূত্র পেলাম। সময় নষ্ট করা ঠিক হবে না। লোকগুলোর গোসল করতে বেশি সময় লাগবে না। তাড়াতাড়ি মূর্তি খুঁজে বের করতে হবে। বাচ্চু ব্যস্ত সমস্ত হয়ে পায়চারি করে।
– ইউরেকা বন্ধুরা। ইউরেকা। এই যে মহাদেবের মূর্তি। তপু চিৎকার করে ওঠে। মূর্তি দেখে সবার মুখে হাসি ফোটে। হঠাৎ কোত্থেকে যেন ছোট ছেলেটা আসে। বদি, সাদেক ও বাচ্চু ছেলেটাকে পিছমোড়া করে বেঁধে ফেলে। তারা ওপরে ওঠে। দ্রুত পাহাড় চূড়া থেকে নেমে দৌড়াতে থাকে। কিছুদূর আসার পর দেখে লোকগুলো পথ আগলে দাঁড়িয়ে আছে।
– মূর্তি ফেরত দাও। সর্দার তাদের দিকে পিস্তল তাক করে ধরে।
– সাহস থাকলে গুলি কর। তপু চোখ রাঙিয়ে বলল।
– পেপারে এ লোকটার ছবি দেখেছি। এটা তো রঘু ডাকাত। বদি ফিসফিস করে বলল।
– সত্যি এটা তো রঘু ডাকাত। সাদেকও ফিসফিস করে বলল।
– এখন কী হবে? ভয়ে আমার হাত পা কাঁপছে। বাচ্চুর মাথা ঘোরে। তপু মূর্তিটা বদির হাতে দিয়ে নিচু হয়ে একটা ইটের টুকরো কুড়িয়ে নিয়ে সর্দারের মাথা বরাবর ছুঁড়ে মারে। এক্কেবারে নির্ভূল নিশানা। সর্দার চিৎকার করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। তার হাতের পিস্তলও ছিটকে পড়ে। তপু দৌড়ে গিয়ে পিস্তল তুলে নেয়।
– খবরদার কেউ এক পা এগোবে না। তপু চিৎকার করে ওঠে।
– সামনে এগোলেই পায়ে গুলি করে দেবো। বাকি জীবন ভিক্ষে করে কাটাতে হবে। বদি বলল।
তারা দ্রুত সামনে এগোতে থাকে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল। ভ্যাপসা গরম পড়ছে। জাদুঘরে পৌঁছে খরব দিতেই হইচই পড়ে যায়। পুলিশ দ্রুত রঘু ডাকাতকে ধরতে ছুটে যায়। কিন্তু রঘু ডাকাতের আস্তানায় গিয়ে দেখে কেউ নেই। আস্তানা থেকে মূর্তিগুলো উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
এক সপ্তাহ বেশ হইচই করে কাটে। জাদুঘর কর্তৃপক্ষ তাদের পুরস্কৃত করে। আসার দিন তপুর চাচা বললেন, এ ঘরে থাকতে তোর কোনো অসুবিধে হয়েছে?
– না। শুধু প্রথম দিন রাতের বেলা ঘুমের মধ্যে কে যেন আমার গালে কষে একটা চড় মেরে ছিল। তপু বলল।
– অনেক বছর আগে এ ঘরে একটা লোক ফাঁসি দিয়ে মারা গিয়েছিল। মাঝেমধ্যে তার প্রেতাত্মা এ ঘরে আসে। বদি মুচকি হেসে বলল।
– সেটা আগে বলবি না? তপু অটোরিকশায় উঠে বসে। অটোরিকশা দ্রুত ছুটে চলে বাসস্ট্যান্ডের দিকে। আকাশটা বেশ মেঘলা। গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছে।
প্রকাশকাল- এপ্রিল ২০২৬



